ই-পেপার

মোঃ কামরুজ্জামান

অসংখ্য ঘটনার উজ্জ্বল সাক্ষী এই মার্চ নানা কারণে হয়ে উঠেছে বাঙালির জীবনে অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস। এ মাসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের পর ’৫২-এর  একুশে ফ্রেব্রুয়ারি ভাষার জন্য যে আগুন জ¦লে উঠেছিল-সে আগুন যেন ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। এরপর ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে একাত্তরের মার্চ বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে নতুন বারতা।

মাতৃভূমির স্বাধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন। লক্ষ্য স্থির করে, ধাপে ধাপে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তিনি। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা শুরু হয়েছিল মূলত ৬ দফার মধ্য দিয়েই। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হল। নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গবন্ধু সত্তরের নির্বাচনকে নিলেন তার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণভোট হিসেবে। আর ব্যালটে তিনি  এমন অভাবিত বিজয় অর্জন করলেন যখন পাকিস্তানের বুলেট, ট্যাঙ্ক, কামান-সবই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। এ নির্বাচনের বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাকে অভূতপূর্ব একটি বিজয় উপহার দিয়েছিল।

এরপর নানা টালবাহানার মধ্যদিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ এক হঠকারী সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলার আপামর জনতা। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিন পরিষ্কার বলা হয়েছিল, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারে সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ সাত মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক ৬ দফা মূলত স্বাধীনতার এক দফায় রূপান্তরিত হয়। প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন স্বাধীনতা ‘অমর কবিতাখানি।’

কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়-

“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলতে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকন্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।”

২৩ মার্চ ভোরে পাকিস্তান দিবসে বঙ্গবন্ধু নিজহাতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেন। এটা ছিল সেই পতাকা যা বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের জুন মাসে পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জয়বাংলা’ বাহিনীর হাতে গচ্ছিত রেখেছিলেন। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় ‘জয়বাংলা’ বাহিনীর কুচকাওয়াজ।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানিরা বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে বাঙালি নিধনে নামে। ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে সৈন্যরা নির্বিচারে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এর প্রথম প্রহরে (১২.২০ মি.) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ওয়ারল্যাস, টেলিফোন ও টেলিগ্রাম দিয়ে স্বধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি ছিল- ‘This may be my last message from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.’  (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ৩য় খ- পৃ. ১)

রাত ১ টার পর বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রেফতার করে তার বাড়ি থেকে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ প্রতিরোধের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা হয়। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পর ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি লাভ করে আজন্ম লালিত স্বাধীনতা।

লেখক : সাব-ইন্সপেক্টর, প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-২,

বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x