ই-পেপার

মোঃ গোলাম সাকলায়েন পিপিএম

যতদূর মনে পড়ে সকাল নয়টা, সোয়া নয়টা হবে। কয়েক বছরের অপচর্চার অংশ হিসেবে ঘুম ভাংগে না বলে ঘুম থেকে ওঠা হয় দেরিতে। ফোন বাজে অচেনা নম্বর থেকে আবার কিছুটা চেনাও, করপোরেট নম্বর, পুলিশের নম্বর। চেনার কথাই তো! পাওয়ার পাশাপাশি কত না পাওয়ার গল্প লেখার পটভূমি তো এইটাই, আজকাল চিনতে অসুবিধা হয়না একটুও। যাই হোক রিসিভ করলাম অচেনা নম্বর এর ফোন কল।

: হ্যালো! গোলাম সাকলায়েন বলছেন?

– জী বলছি। কে বলছেন?

: আমি নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিএসবি অফিস থেকে বলছি।

– জী বলুন।

: আপনি থাকেন কোথায়? কি করেন?

– জী আমি ঢাকায় থাকি, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি আমি।

: ওহ স্যার, আপনি তো আমাদের লোক, স্যার আপনি কি করোনা টেস্ট করতে দিয়েছিলেন? তবে অসুবিধা নাই স্যার, আপনারা ইয়াংম্যান, কিছু হবেনা ইনশাল্লাহ। শুধু একটা বিষয় স্যার শ্বাসকষ্ট থাকলে একটু অসুবিধা। আর একটা কথা, আপনি কি আমাদের এখানে থাকেন?

– না না আসলে আমার ওয়াইফ বন্দর উপজেলার ইউএনও, তাই..

: ওহ স্যার অসুবিধা নাই, আমরা যোগাযোগ করে নিচ্ছি।

– এই শোনেন কি হয়েছে?

: স্যার ওইতো… পজিটিভ এসেছে তবে চিন্তা করবেন না, কোন অসুবিধা হবে না স্যার।

ঘুমটা ইতিমধ্যে ভেঙ্গেছে।

এমন অপ্রত্যাশিত ফোন কলের মধ্যে তো মনের মধ্যে কয়েকবার উঁকি দিয়েছে আইবিএতে বিজনেস কম্যুনিকেশন ক্লাশ এ মেলিটা ম্যাডাম এর কথা কিভাবে নেগেটিভ মেসেজ দিতে হয়!!!

যেই ঘুমে চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না; মুহূর্তে সেই ঘুমের ‘ঘ’ ও নাই হয়ে গেল। বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠেই বুঝতে চেষ্টা করছি কি ঘটছে। বিশ্বাস হচ্ছিল না।

প্রথম জ্বর আসল ২৮ তারিখ ভোরের দিকে। একটা ছোট্ট অপারেশন শেষ করে এসেই অসুস্থ বোধ করলাম। মনে পড়তে শুরু করেছে ওই দিনের কথা, সেদিন যাওয়ার কথা ছিল শাননদের ওখানে। শানন আমার একমাত্র মেয়ে, আমার শক্তি, আমার ভালবাসা, আমার ভাললাগা, আমার বেঁচে থাকা। মেয়েটা থাকে ও’র মায়ের সাথে। নিকটবর্তী একটা উপজেলা কমপ্লেক্স এর ইউএনও বাংলোয়। হঠাৎ জ্বর চলে আসায় যেতে পারিনি সেদিন, মেয়ে আর মেয়ের মা দুজনকেই বুঝাতে হয়েছে অন্যান্য দিনের মতই অজুহাত দিয়ে, পরদিন রাতের মধ্যেই জ্বর বেড়ে গেল অনেক, গলায় প্রচন্ড ব্যাথা, সর্দি, কাশি সবমিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। শরণাপন্ন হতে হলো ছোট ভাই ডাক্তার মারুফ এর। অসম্ভব মেধাবী এক ছেলে, কোরআনে হাফেজ, গুড সোল। আমাকে ওষুধ খেতে বলল। নাপা, ফেক্সো, টুসপেল সিরাপ। শুরু করে দিলাম কিন্তু কমার নাম নেই একটুও। তাই পরেরদিনে ডাক্তার মারুফ এর পরামর্শে এন্টিবায়োটিক এজিথ্রোমাইসিন খাওয়া শুরু হলো। এভাবে পাঁচ দিন চলল। আর গরম পানি গার্গল, গরম পানি খাওয়া সবই চলছে নিয়ম করে। তো ইতোমধ্যে উপশম হয়েছে কিছুটা তবে কাশি, গলা ব্যাথা, সর্দি যায়নি পুরোপুরি। প্রতিদিন মেয়ের সাথে কথা হয় আর কাল আসার সময় কি কি আনতে হবে তার শেষ না হওয়া লিস্টে বাড়তে থাকে আইটেম এর সংখ্যা। এভাবে চলে আসলো ৭ তারিখ। শুক্লা মানে আমার স্ত্রীও আজকাল খুব বেশি ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন, সারাদিন ছুটছেন এই ইউনিয়ন থেকে ওই ইউনিয়ন এ। জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ বলে কথা। এত এত ত্রাণ বিতরণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ এ নিয়মিত তদারকি, লকডাউন নিশ্চিতকরণ, বিদেশ ফেরত বাছাধনেরা বাসায় থাকতে চাননা তাই ইউএনও স্যারকে ফোনে জানায় গ্রামের সবচাইতে অলস ব্যক্তিটিও, এর পাশাপাশি ইউএনও স্যারের মিষ্টি গলার কথা শুনতে কি যে ভাল লাগে এমন হাজারো ফোন এটেইন করতে করতে বেচারা একবারে কাহিল। আমার শাশুড়ী ভদ্রমহিলা বলতে গেলে এককথায় নিজের দুই মেয়েকে মানুষ করার মহান দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করার পর এ যাত্রায় বোধ করি হার মানতে যাচ্ছেন আমার মেয়ের কাছে। এ বিষয়ে আমার ধারণা উনি পেরেছিলেন কারণ উনাকে যে পারতেই হতো। আমার শশুর মশাই মারা গিয়েছিলেন ছোট দুইটা মেয়েকে এক সরল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিধবা গৃহবধুর হাতে তুলে দিয়ে।

আর একটা কারণ হল তার নিজের অসুস্থ শরীর। ক্যান্সার এর গ্রাস থেকে মুক্ত হয়েছেন মাত্রই কয়দিন হলো, কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে প্রায় এক বছর। তারপরও পরম মমতায় লালন করে চলেছেন আমার, আমাদের শাননকে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ এ করোনা পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও খারাপ হচ্ছে। কথা হচ্ছিল শুক্লার সাথে। আমি বল্লাম দেখ আমিতো অনেকটাই সুস্থ, তাই ভাবছি মা আর শাননকে ঢাকায় নিয়ে চলে আসি। সেও এমনটাই ভাবছে জানাল তবে সেক্ষেত্রে আমারও করোনা টেস্ট করা দরকার বলে সে মনে করে। আমি শুরুতেই রাজি না বলে দিলেও যখন ভাবলাম শাননের নিশ্চয়তার বিষয়, মেনে নিলাম। কিন্তু টেস্ট করাব

কোথায়, কিভাবে? শুক্লাই ব্যবস্থা করল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণানুযায়ী প্রতি উপজেলায় একদিনে দুইটা স্যাম্পল টেস্ট করার সুযোগের অংশ হিসেবে পরেরদিন সকাল সকাল গেলাম বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স এ। কিভাবে এই টেস্ট করে এই নিয়ে আমার তেমন কৌতূহল ছিল না তবে যা দেখলাম তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। যে অদৃশ্য ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে চোখের পলকে আছড়ে ফেলছে তার টেস্ট কিনা কান চুল্কানো কটন বাট দিয়ে! স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স এ শুক্লাও এসেছিল। স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সটা মেইন রাস্তা থেকে একটু ভিতরে। ফিডার রাস্তায় ঢুকার মুখেই গাড়ি নিয়ে দাড়ানো ছিল শুক্লা। অনেকদিন পর নিজেকে কেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে শুরু করলেও ধারণা ভাংতে সময় বেশি লাগেনি। গাড়ি থেকে নেমেই কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কেমন আছ বলতেই তড়িঘড়ি কয়েক পা পিছনে সরে গেল আমার স্ত্রী। হ্যাঁ সে ঠিক কাজটাই করেছিল। অদৃশ্য শক্তির সামনে আসতে গেলে আবেগতাড়িত হলে চলবেনা। মাসুম আর প্রতাপ শুক্লার প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী সেই শুরু থেকেই দেখে আসছি। সেদিনও ব্যতিক্রম ছিলনা। পরম দায়িত্বশীলতায় একবার জীবানুনাশক স্প্রে করছিল তাদের স্যার শুক্লার দিকে আবার একবার আমার দিকে। তাছাড়াও ওদের কাছে আমার আরও অনেক ঋণ আছে তা তো এখন বলে শেষ করা যাবে না। তবে আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী সন্তানকে অপরিচিত জায়গায় যারা একটু হলেও দেখাশুনা করে তাদের কাছে আমি যে কৃতজ্ঞ থাকব এটা তো খুবই স্বাভাবিক।

যাইহোক করোনা টেস্ট স্যাম্পল দিলাম ৮ এপ্রিল, বুধবার। ফেরার পথেই অফিস থেকে ডাক পেয়ে অফিসে গেছি, শরীরে তেমন কোন অস্বাভাবিকতা বুঝতে পারিনি সত্য তবে গলা ব্যথাটা যায়নি পুরোপুরি, বেশ দুর্বলও লাগে। এগুলো অবশ্য পাত্তা পায়নি কোনকালেই আমার কাছে। তাছাড়া সবার সব ধরণের সুখ থাকতে নেই বলেই আমি বিশ্বাস করি। অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি বিকাল নাগাদ। সারা অফিসে খাখা। একরকম কেউ নেই বললেই চলে। অন্যান্য দিনের মত শুধু একটা টিম গুলশান এলাকায় ডিউটিতে গেল সময় কিছুটা বদলে ২.৩০ এ। আগে যেতে হত বিকাল ৫ টায়। পরেরদিনেও অফিস করেছি নিয়ম মাফিক। তারপরের দিন ছিল শুক্রবার, অফিসে যেতে হয়নি। বাসায় বসে বসে অনলাইনে ক্লাশ করেছি আইবিএ তে। বাসায় থাকে সুজন মামা, আমার সার্বক্ষনিক ছায়াসংগী। পরিবারে নারী না থাকলে আসলেই কোন ঘরকে ঠিক ঘর বলা যায়না। জীবনের কোন রুটিন থাকেনা, জীবন হয়ে উঠে অনেকটা ঠেলাগাড়ির মতন। প্রতিদিনের মতই দেরি করে ঘুমাতে গেছিলাম আর সকালে তো ঘুম ভাংল করোনা আক্রান্ত হওয়ার নিউজ পেয়ে।

ভাবনার দেয়ালে কত্তরকম আঁকিউঁকি যে শুরু হয়েছে বলা মুশকিল। জানতাম যে আমাকে হয়তো পিপিই পরা এলিয়েন এর মত দেখতে মেডিকেল স্টাফরা এম্বুল্যান্স এ করে নিয়ে যাবে, আলাদা করে ফেলা হবে আমার সাথে থাকা মানুষদের। ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে সুজন মামাকে নিয়ে, এদিকে আমার অফিসিয়াল ড্রাইভার, বডিগার্ড আছে, সবচাইতে বড় টেনশান আমার ছোট্ট মেয়ে। ভাবছি শুক্লা কিংবা আমার শাশুড়ী উনারা ঠিক আছেনতো? এসব ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধান্ত নিলাম আমার আব্বা, আম্মা, ছোট বোন কাউকেই জানানো যাবেনা। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে ফেরান তাহলে একদিন হয়তো তাঁরা গল্প শুনবেন কিন্তু তার আগেই তাঁদের কোনরকম টেনশনে রাখা ঠিক হবেনা। শুক্লাকেও জানাতে চাইনি কিন্তু উপায় ছিলনা কারণ ওর ওখান থেকেই তো স্যাম্পল দেয়া হয়েছে। প্রথমেই জানালাম শুক্লা কে অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই। এদিকে ড্রাইভার বাদশাহ আর কন্সটবল তাপসকে খবর দিয়ে বাসায় ডাকলাম, ওদের অনেক অভয় দিতে চেষ্টা করেছি সাধ্যমত। তারপরেও মনুষ্যমন বলে কথা। তাপসের চোখের কোনে জমে থাকা জলের কনা এখনও তাড়া করে আমাকে। কি অসহায়ত্ব ছিল ওই চাহনিতে!! বাদশাহ কে সবসময় একটু নিরুত্তাপ দেখে দেখে অভ্যস্ত আমি তাই ভেবেছিলাম সে বোধহয় ঠিক থাকবে কিন্ত হায় একি! বাদশাহ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে স্যার একটু আমাদের দিকে খেয়াল রাইখেন!! হ্যাঁ, আমিও বলছি কোন টেনশন নাই, ইনশাআল্লাহ কিছু হবেনা। এদিকে নিজেকে ঘরের মধ্য আবদ্ধ করে ফেলেছি সেই শুরু থেকেই। বারবার সুজনকে সাহস দিচ্ছি। শুক্লা ফোন দিচ্ছে বারবার। আমি তাকেও আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করছি। মাঝখানে জানালাম আমার বস, ডিসি ডিবি উত্তর স্যারকে। শুনেই চমকে উঠলেন তিনি। জানতে চেষ্টা করলেন আমি কোথায় কোথায় গেছি, উনার সামনাসামনি কবে সবশেষ গেছি, মনে করে বল্লেন উনার রুমে তো চা’ও খেয়েছিলাম। উনাকে অনুরোধ করেছিলাম কোনভাবে আইইডিসিআর এ যোগাযোগ করা যায় কিনা। উনি অনেক চেষ্টা করেছেন। আমার ইউনিট এর প্রায় সব সিনিয়রদের জানিয়েছেন। সারাক্ষণ আমার খোঁজ নিয়েছেন, হাসপাতালে বাসা থেকে খাবারও নিয়ে এসে খাইয়েছেন। ওই সময় উনিও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। উনার আশংকা ছিল আমার মাধ্যমে কোনভাবে সংক্রমন হয়েছিল কিনা?

আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র এডিসি স্যারকে বেশ কয়েকবার চেষ্টায় পেয়ে জানালাম। উনিও বেশ আপসেট হলেন মনে হল। আমার চিকিৎসা কি হবে এসব নিয়ে বিশদ জানতে চেয়েছেন। উনারও টেস্ট কিভাবে করা যায় তা নিয়ে স্যারকে বেশ চিন্তিত দেখে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। আইইডিসিআর এর সাথে যোগাযোগ হলে উনার টেস্ট এর বিষয়ে যেন আমি বলি এবং উনিও আইসোলেশান এ যাচ্ছেন জানালেন। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা করোনা সেল থেকে ফোন করেছে জানতে চেয়েছে আমার শারীরিক কোন অসুবিধা আছে কিনা, আমার ক্লোজ কন্টাক্ট এ কে কে ছিল এসব। সম্ভবত শুক্লা খুব অস্থির বোধ করছিল। আমাকে জানাল নারায়ণগঞ্জ এর একজন ডাক্তার যিনি নিজেও করোনা আক্রান্ত আমাকে ফোন দিবেন আমি যেন না ঘাবড়ে যাই। একটু পরেই ফোন আসল এক অকুতোভয় ডাক্তার জাহিদ ভাই এর। আমাকে সাহস দিয়েছেন। জাহিদ ভাই আপনার কাছে অনেক ঋণী, ভুলবনা কোন দিন। আপনার প্রেস্ক্রাইবড ওষুধই খেয়েছি আর সুস্থও হয়েছি আল্লাহর রহমতে ওই ওষুধ খেয়েই। বাসায় অলরেডি আমার ড্রাইভার, বডিগার্ড আছে। ওদের অভয় দিয়ে বাসায়ই আলাদা থাকতে বলেছি। ডিসি স্যার জানালেন যে সিনিয়র স্যারদের সাথে উনি কথা বলেছেন, সকলেরই মতামত আমি যেন বাসায়ই থাকি। কিন্তু আমি বারবারই বলতে চেষ্টা করছিলাম যে কোন একটা হাসপাতালের আওতায় থাকা দরকার। হঠাৎ যদি শারীরিক অবস্থা অবনতি হয় কিংবা পুনরায় টেস্ট করার ক্ষেত্রে দরকার হবে। স্যার বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছিলেন। একপর্যায়ে রাজারবাগ হাসপাতালের ডাক্তার এমদাদ স্যার এর ফোন পেয়ে আস্বস্ত হয়েছি। স্যার জানিয়েছেন বাসায় থাকতে যে কোন সমস্যা হলে টেনশন করার কোন কারণ নাই। রাজারবাগ হাসপাতালের সেই সক্ষমতা আছে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট দেয়ার। কিন্তু গন্ডগোল বাঁধলো আর কিছুক্ষণ পরে। আমি যে সরকারী বাসায় থাকি সেখানকার আশেপাশের অন্যান্য বাসিন্দাদের ভিতরে অজানা ভয়ের বহিঃপ্রকাশ দেখে। জানতে পারলাম এখানকার একাধিক সিনিয়র প্রতিনিধি স্যার এর মাধ্যমে। আমি উনাকে জানিয়েছি যে বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত আমার সিনিয়র স্যার এবং রাজারবাগ হাসপাতালের সাথে কথা বলেই নেয়া হয়েছে।

যাইহোক কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নাগাদ আমাকে যেতে হল রাজারবাগ হাসপাতালের আবদ্ধ বায়ু চলাচলহীন বন্ধ এক রুমে। যাওয়াটাও বেশ নাটকীয় ছিল। হাসপাতালের সিনিয়র একজন স্যার জানালেন তোমার গাড়ি নিয়ে চলে আস। এখানে থাকতে হবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসো। স্যারকে জানালাম একটু দেরী করে আসি, চা খেয়ে আসি। উনি অনুমতিও দিয়েছিলেন। চা খাওয়া শেষ করে বের হওয়ার পূর্বে দেখলাম সুজনকে বেশ চিন্তিত। বুঝলাম ওরা ভয় পাচ্ছে। আমারও একটু একটু ভয় যে হচ্ছেনা তা কিন্তু নয়। আমার ভয় হচ্ছে সুজন এর টেস্ট, বাদশাহ, তাপস এর টেস্ট কিভাবে হবে? যদি ওদের ও পজিটিভ আসে তখন কি হবে? অনেক অজানা ভয়!!!

হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলনা। গেইটে যাওয়ার আগেই ফোন দিয়েছি হাসপাতালের ডাক্তার স্যারকে কথামত। দেখলাম বেশ কয়জন এলিয়েন এর মত পোষাক পরা লোক দাড়িয়ে আছেন আমাকেও ওই একইরকম পোশাক পরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। করোনা আক্রান্তদের জন্য নির্ধারিত লিফট দিয়ে উঠে যেতে হল ৯ তলার সেই বিখ্যাত ঘরটায় যাকে মেডিকেল এর ভাষায় কেবিন বলে!!

ভিতরে যেতেই বাইরে থেকে কে জানি দরজাটা আটকে দিল। একটু পর আমি আমার জিনিসপত্র আসছেনা দেখে দরজা খুলতে যেয়ে দেখি লক করা। হায় আল্লাহ একি হচ্ছে! অনেক ডাকাডাকি করেও কারো দেখা মিলল না। অবশেষে হাসপাতালের ডাক্তার স্যারকে ফোন করে বল্লাম। আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে স্যার বল্লেন যে করোনা রোগীর ক্ষেত্রে দরজা না লাগালে যদি আবার বাইরে বের হয়ে যায়! তবে তালা লাগানো নেই শুধু হেজবোল্ট লাগানো! আমি কি বলব আর কি করব বুজতে পারছিলাম মা। শুধু স্যারকে বল্লাম স্যার, আমি একজন এডিশনাল এসপি, এইটুকু সেন্স অব রেস্পন্সিবিলিটি আমার আছে। এটা আটকানো

থাকলে স্যার আমি এখানে থাকবনা। স্যার আমার কথায় কনভিন্সড হয়ে আমাকে আশ্বস্ত করে খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে জানালেন। তারও প্রায় ২০ মিনিট পর খুলে দেয়া হয়েছিল আমার কেবিনের দরজা। তবে তখন থেকে বের হয়ে আসার আগে পর্যন্ত একবারের জন্য পা দরজার বাইরে দেইনি। দ্যাট ওয়াজ মি।

শুরু হলো বন্দী উৎকন্ঠাময় দিন। শুক্লাকে জানালাম, দেখলাম সে খুবই অস্থির হয়ে উঠছে তার স্বভাবসুলভ। বারবার জানতে চায় আমার অবস্থার অবনতি হয়েছে নাকি? কি করে বুঝাই তাকে যে এই অবস্থা কখন যে অবনতি হয় এ তো মানুষের জ্ঞানের বাহিরে। আর আমরা তো থাকি ভাড়া বাসায় যেখানে মৃত্যু আসন্ন জেনেও তোমাকে অন্যদের স্বস্তির যোগান দিতে হবে

হাসপাতালে যেয়েই একলা বন্দীত্ব যেনো চেপে বসেছিল। ডাক্তারের পরামর্শ মত গরম পানি খাওয়া, গার্গল করা, ভাপ নেওয়া, লেবু পানি খাওয়া, আদা চা খাওয়া সবকিছুতেই পানি গরম করার একটা ঝামেলা কিন্ত আছেই। পানি গরম করার জন্য ইলেকট্রিক কেটলি যেন করোনা চিকিৎসার প্রধানতম বাহন। পরম মমতায় আমার কর্মের প্রধানতম গুরু আর তার সহধর্মিণী হাসপাতালের বদ্ধ কেবিনে পাঠিয়েছেন কেটলি, নানা রকমের খাবার আর অবসরের সঙ্গী হিসাবে মহামূল্যবান কতগুলো বই। স্যার, এগুলোর দরকার ছিলনা। দরকার ছিল আপনাদের ভালবাসার, আপনাদের মনের ভিতর ছোট্ট একটু ঠাই। আর তা তো অনেক আগে থেকেই ছিল।

এরমধ্যে আমার ছোট বোনের ফোন, কন্ঠ বেশ ভারি দেখে আঁতকে উঠেছি, তাহলে কি আব্বা মা জেনে গেছেন? আশ্বস্ত হয়েছি যে শুক্লা শুধু আমার ছোট বোনকেই জানিয়েছে তবে সে আব্বা মাকে বলবেনা। তাকে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলতে পেরেছি যে কিছু হয়নি আমার। বুঝলাম অনেক কষ্টে কান্না চেপে বোন আমার কথা বলছে। বাহ! আমাদের ছোট্ট কেয়ামনি অনেক বড় হয়ে গেছে। মাশাল্লাহ।

কতজন যে আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন অনেকটা লজ্জাই পেয়ে গেছি। কার কথা বাদ দিব, সিনিয়র, জুনিয়র, সহকর্মী, ব্যাচমেট, পরিচিত, অপরিচিত বাদ ছিলেন না কেউই। মানুষ বড় হয় তার কর্মে এই সময়ে এই বোধ আরও সুদৃঢ় হয়েছে আমার। যারা আমার খোঁজ নিয়েছেন অনেকেই ছিলেন আমার কল্পনার হিরো। কি দরকার ছিল তাদের, না দরকার ছিলনা। তথাপিও কথা বলেছেন বারে বারে জানতে চেয়েছেন কেমন আছি, কি দরকার? আপনাদের এই ভালবাসা আমার জীবনকে চিরকৃতজ্ঞতার ঋণে, বেঁধেছে এইটুকু বলতে পারি নির্দ্বিধায়। সবার সাথেই কথা বলেছি স্বাভাবিকভাবে শুধু পারিনি একজনের সাথে। আমার শিক্ষাগুরু, মুস্তাফিজ স্যার, এমন ভালবাসার কাছে কেমন যেন অসহায় হয়ে পড়েছিলাম এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই সামলে নিয়েছি নিজেকে। স্যার, আপনার এমন অসহ্য ভালবাসা আমার মত কতজনের যে জীবন পরিবর্তন করেছে আপনি জানেন না। এভাবে কৃতজ্ঞতার পাল্লা মোটেও কম নয় কিছু। হাসপাতালের দিনগুলো যেতেই চায়না। ২য় ৩য় ৪র্থ দিনে শরীরটা একটু বেশি খারাপ ছিল, বুকে ব্যাথা অনূভব করেছি, মাথা ব্যাথা করেছে অনেক। আর এই কেবিনের দিনগুলোতে ঘুম ছিল সবচাইতে মূল্যবান।

অনেক কষ্টে আসা ঘুম আবার অল্পতেই ভাংত অনেক শুভানুধ্যায়ীদের ফোনে। নিয়মিত ওষুধ, গরম পানির চর্চা সবকিছুই চলেছে ঠিকমত। কিন্তু এই কয়টা দিন ছিল নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক নতুন দিগন্তের সূচনা। সাধারণত আমি আমার বাবা মায়ের সাথে দিনে কয়েকবার কথা বলি। এই কয়দিন ওই সময়গুলোতে অসুবিধা হয়েছে সবচাইতে বেশি, কারণ উনারা আমার অসুস্থ হওয়া কিংবা হাসপাতালে থাকার বিষয়টা তখনও জানতেন না। আর একটা মারাত্মক অসুবিধা হত এই সময়ে। আমার একমাত্র কন্যা, শানন এর সাথে কথা বলার সময়…

বাবা! কখন আসবা?

– এইত মা কালকেই চলে আসব।

এভাবে মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে উঠছিলাম ।যাইহোক প্রায় ১৩ দিন পর শেষ হলো আমার করোনাকালীন হাসপাতাল অধ্যায়।

আমাকে নিয়ে আসার জন্য গেছিল সুজন মামা। আমার আরও ২ জন সহকর্মী। ডিবি পরিবহন পুল থেকে গাড়ী নিয়ে হাসপাতালের গেইটে অপেক্ষায় ছিল ওরা।

কেবিন থেকে নিচে নেমে একবার প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতেই চোখের মধ্যে কেমন জানি জল গড়িয়ে পড়ার এক অনূভুতি।

আকাশটা কি বিশাল! কি চমৎকার!

হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া সম্বিত ফিরে পেতেই ড্রাইভার দৌড়ে কাছে এসে বলে স্যার আপনি সুস্থ হইছেন, আল্লাহর কাছে কত দোয়া করছি, আলহামদুলিল্লাহ। বের হইয়া প্রথম আমার গাড়িতে উঠতাছেন, তাই একটা সেলফি তুলবার চাই।

ক্লিক! ক্লিক!

জীবন সত্যি অনেক সুন্দর!!

(লেখক নিজে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। সেসময়ের ঘটনা অবলম্বনে, তবে ছোটখাট তথ্য বিচ্যুতি মার্জনীয়)

লেখক : অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার

গোয়েন্দা-উত্তর বিভাগ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x