ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ডিটেকটিভ ডেস্ক

বাংলাদেশ পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট হচ্ছে রেঞ্জ। বর্তমানে আটটি প্রশাসনিক বিভাগের সমান্তরালে আটটি রেঞ্জ আছে। প্রত্যেক রেঞ্জের দায়িত্বে আছেন একজন উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি)। খুলনা রেঞ্জে ১০টি জেলা, ৬৪টি থানা, ১৪টি তদন্ত কেন্দ্র, ১৯টি ফাঁড়ি, ২৩৪টি ক্যাম্প, একটি আরআরএফ এবং তিনটি ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। এ রেঞ্জে ১৬ হাজার ১৫৬ জন পুলিশ সদস্য এবং ৭৫৮ জন নন-পুলিশ সদস্যসহ মোট ১৬ হাজার ৯১৪ জন কর্মরত আছেন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং বাগেরহাট জেলায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্র বন্দর অবস্থিত।

১)   শুদ্ধাচার এবং তদন্ত তদারকি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা : জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল (NIS)-এর আলোকে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততার উপর একাধিক সভা ও প্রশিক্ষণ আয়োজন করার ফলে খুলনা রেঞ্জের পুলিশী কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। খুলনা রেঞ্জাধীন সার্কেলগুলোয় কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সহকারী পুলিশ সুপারদের নিয়ে মামলা তদন্ত তদারকি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা একাধিকবার রেঞ্জ কার্যালয় অনুষ্ঠিত হয়। মামলা নিবিড় তদারকির মাধ্যমে তদন্তের গুণগত মান নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এছাড়া থানা পর্যায়ে কর্মরত ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার অফিসারদের থানা এলাকায় অপরাধ দমন ও পেশাদারিত্বের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যা মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্বের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে পুলিশের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পেশাদারিত্বের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে।

২) সুন্দরবনের অপরাধ দমন : খুলনা রেঞ্জের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গ কিমি, যার মধ্যে  তিন হাজার ৯৯৭ বর্গ কিমি (৬৬%) বনভূমি, এক হাজার ৯০৫ বর্গ কিমি (৩২%) নদ-নদী ও খাল এবং ১১৫ বর্গ কিমি বালুতট, চারণভূমি ও মাঠ (২%) এলাকা। সুন্দরবনের বাকি অংশ তিন হাজার ৯৮৩ বর্গ কিমি এলাকা ভারতের মধ্যে রয়েছে। ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার (https://www.ramsar.org/wetland/bangladesh) স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো (https://whc.unesco.org/en/ list/798) সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু/বনদস্যুরা সংঘবদ্ধভাবে নানা রকম অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে অপরহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, অবৈধভাবে গাছ কাটা, বন্যপ্রাণি বিশেষ করে হরিণ শিকার, নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ও জলজ প্রাণি নিধন ইত্যাদি। এসব জলদস্যু/বনদস্যু সুন্দরবন এলাকায় অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ করতো এবং স্থলভাগে বসে পৃষ্ঠপোষক গডফাদারেরা চাঁদা আদায় করতো। সুন্দরবনের জলজ ও বনজ সম্পদ রক্ষা এবং পর্যটনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা তথা আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার লক্ষে র‌্যাব ও স্থানীয় পুলিশের সম্মিলিত অভিযানের কারণে ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে সুন্দরবন এলাকায় ৩২টি জলদসু্যু/বনদস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য, ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদসহ বর্তমান সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পণের লক্ষে জলদস্যু/বনদস্যুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অভিযান পরিচালনায় এককভাবে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার)। এই আত্মসমর্পণের পর বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো জলদস্যু/ভূমিদস্যুরা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং স্থলভাগে বসবাসকারী গডফাদারদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ, অভিযান পরিচালনা ইত্যাদি কার্যক্রমকে চলমান রাখতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় তিনটি শক্তিশালী স্পিডবোট সরবরাহ করা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জ অফিস থেকে নিয়মিতভাবে জেলা পুলিশের সুন্দরবন কেন্দ্রিক অভিযান তদারকি করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু/বনদস্যু এবং অন্য অপরাধীদের নিয়মিতভাবে সার্ভিলেন্সে রাখা হচ্ছে। ফলে এক সময়কার অপরাধের স্বর্গরাজ্য সুন্দরবন এখন জলদস্যু/বনদস্যুমুুক্ত এবং পর্যটনবান্ধব এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে।

৩)        বিট পুলিশিং কার্যক্রম : সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ পুলিশের সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার) মহোদয়ের নির্দেশনায় খুলনা রেঞ্জাধীন ১০টি জেলায় ৬৯২টি বিট পুলিশিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ‘বিট পুলিশিং বাড়ি বাড়ি, নিরাপদ সমাজ গড়ি’ এই স্লোগান নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিটের অফিসারগণ বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি তাদের সমস্যার ভিত্তিতে পুলিশিং সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদে এবং পৌরসভার ওয়ার্ডে বিট কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। ফেসবুক পেজ, জেলার ওয়েব পেজ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিট অফিসারের সরকারি নম্বর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে ছোটখাটো বিরোধ ও সমস্যা স্থানীয়ভাবে বিট কার্যালয়ে বসে সমাধানের মাধ্যমে প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং কার্যকর হচ্ছে। বিট এলাকায় চোর, ডাকাত, মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের তালিকা প্রস্তুত করে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করার ফলে অপরাধ সংঘটনের হার ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। বিট পুলিশিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভা করার ফলে দিন দিন নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার সংখ্যা কমেছে। এছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর, জনপ্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এলাকার অপরাধ দমনে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।

৪) সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ফাইন ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম : গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ, ব্যাংক, স্বর্ণের দোকান, ট্রেন স্টেশন, বাস স্টেশন প্রভৃতি স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। শহর এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এসব স্থানের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মনিটর করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ফলে চুরি, ডাকাতি, দস্যুতাসহ অন্যান্য অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ট্রাফিক ফাইন ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেমে শতভাগ POS Machine ব্যবহার করার বিষয়ে রেঞ্জাধীন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, সার্জেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে তদারকির ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে।

৫)        মামলা, জিডি সম্পর্কিত কার্যক্রমের তদারকি এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা তামিল : প্রতিদিন রুজুকৃত মামলা এবং সাধারণ ডায়েরি সংক্রান্তে খুলনা রেঞ্জ অফিস থেকে বাদী/অভিযোগকারীর কাছে ফোন করে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। এর ফলে অপরাধ দমনে পুলিশ সদস্যগণের কার্যকর গতিশীল ভূমিকার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে। বিজ্ঞ আদালত থেকে পাঠানো ওয়ারেন্ট তামিলের ব্যাপারে জেলার পাশাপাশি খুলনা রেঞ্জ কার্যালয় হতে তদারকির কারণে অপরাধীদের গ্রেফতার নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিজ্ঞ আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেজিস্ট্রারে উত্তোলন করা হয়। ওয়ারেন্ট তামিলে নিয়মিতভাবে তদারকি করার ফলে জুলাই ২০১৯ মাসে খুলনা রেঞ্জে মূলতবী গ্রেফতারী পরোয়ানা ৭২ হাজার ৪০৭ এর বিপরীতে জুলাই ২০২১ মাস শেষে ৪৫ হাজার ০৮৬টি মূলতবী আছে। সাজা ওয়ারেন্ট তামিলে ওয়ারেন্টধারীর পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিবিড় তদারকির মাধ্যমে মামলা তদন্তের গুণগত মান বজায় রাখা ও অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করা হচ্ছে। জুলাই ২০১৯ মাসে খুলনা রেঞ্জে তিন হাজার ৩৩৫টি মূলতবী মামলা বিপরীতে জুলাই ২০২১ মাস শেষে মূলতবী মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৭১টি।

সর্বোপরি বিভিন্ন থানায় অফিসার ইনচার্জ পদায়নের জন্য এই রেঞ্জের পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ফিট লিস্ট তৈরি করা হয়েছে। সর্ব স্তরের পুলিশ অফিসারদের সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন করার ফলে অপরাধ দমনসহ অন্যান্য পুলিশী কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রেঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *