ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

হোসনে আরা বেনু

১.

ঠকঠক ঠক…….

শব্দটা শুনে চমকে ওঠে শায়লা।

সেইই শব্দটা!

আবারও!

কিন্তু কেন?

কেন?

বহুকাল আগে এমনই শব্দ শুনে বেশ কয়েক বছর একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে ওকে। আজও শব্দটা শুনলেই শায়লা একদম বরফের মতো হিম হয়ে যায়।

শায়লা ভয়ার্ত চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, নিষ্পলক।

পরক্ষণেই আবার নিজ হাতে মেহেদী পড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। খুব সাবধানে। যেন একটুও এদিকসেদিক না হয়। মেহেদী রাঙানো হাত তার স্বামীর খুব পছন্দের। সেজন্যই শায়লার হাতদুটো সবসময়ই গোধূলির রক্তিম আকাশের মতো সেজে থাকে। ওর হাতে রঙটাও বেশ ধরে। নানির মুখে শায়লা শুনেছে মেহেদীর রঙ যাদের হাতে যত্ত বেশি দীর্ঘায়ু হয় সেসব মেয়েরা নাকি ভীষণ স্বামী সোহাগি হয়! সবার হাতে রঙটা ঠিক বসে না। পুরনো ধ্যান ধারণার নানীর আঁকড়ে ধরা অনেক বিশ্বাসকে কুসংস্কার মনে হলেও এই কথাটি শায়লার মনে গেঁথে গেছে। কারণ শায়লার স্বামী ওকে চোখে হারায়। ভীষণই ভালোবাসে।

হাতের তালু ও নখে কালচে রক্তের মতো এ রঙ আনতে অবশ্য শায়লার অনেক মেহনত করতে হয়। মেহেদী পাতার সাথে খয়ের, পানের বোঁটা মিশিয়ে মিহি করে বাটতে হয়। সেখান থেকে কিছুটা আলাদা করে রাখে নখের জন্য। আর বাকীটার সাথে সামান্য পানি মিশিয়ে থকথকে ক্লে তৈরি করতে হয়। তারপর চিকন শলার সাহায্যে হাতের তালুতে নিখুঁতভাবে নকশা ফুটিয়ে তোলে। হঠাৎ শব্দে, মেহেদী পরায় ব্যাঘাত ঘটাতে একটু বিরক্ত নিয়ে ধীরপায়ে দরজা খুলে একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক হয়। একমাথা তার সফেদ শুভ্র চুল, সাদা দাড়ি। আগে কখনো দেখেনি। ভুল করে আসেনি তো!

লোকটি ওর দুচোখের প্রশ্ন বুঝতে পেরেই যেন বললোঃ ভুল হবে কেন!

আমাকে চিনতে পারছো না শায়লা! দেখ, ভালো করে তাকাও আমার দিকে। আমি তোমার জামিল। কেমন আছো তুমি?

অষ্টাদশী শায়লা গভীর পর্যবেক্ষণের পর লোকটির বাম গালের জড়–লটার উপর মমতার পরশ বুলিয়ে অস্থির হয়ে বলে : আপনি!

এতোদিন পর!

কোথায় ছিলেন?

আপনি আমাকে ছাড়া বুড়ো হলেন কেন? আমাদের তো একসাথে বুড়ো হবার কথা ছিল, তাই না! আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেলেন?

কোথায়?

বিড়বিড় করতে করতে শায়লার ঘুম ভেঙে গেল। ঠিক ঘুমও বলা যায় না একটু তন্দ্রাঘোরে ছিলো। চোখের কোনে তখনও দুফোঁটা অশ্রু জমা হয়েছিল।

২.

দরজা খুলতেই কয়েকজন তরুণ ঘরে ঢুকেই হাঁকডাক শুরু করে দিল :

কি রে শুভ্র, দাদী রেডি?

মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছি। দেখ তো ব্যানারটা পছন্দ হয়েছে কিনা। আর ফুল গাড়িতেই আছে। আমরা কিন্তু বারোটার পরেই বের হবো। সাভার যেতে বেশি সময় লাগবে না। আর তাছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের দৌরাত্ম্যে আমরা আগে ‘বেলও’ পাবো না, সুতরাং আগে গিয়ে লাভ নেই।

শায়লার দুই নাতি ডাক্তার শুভ্র আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেঘ তাদের ফুপি দাদীর দু’হাতে ‘কাভেরী মেহেদীর টিউব দিয়ে’ মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছিল। খুব দ্রুতই রঙ হয় এতে। হঠাৎ সবার শোরগোল শুনে দাদী চিৎকার করে বললেন : একদম চুপ!

আমার মেহেদী যদি সুন্দর না হয় আমার উনি কিন্তু রাগ করবেন, সাবধানে।

অমনি শুভ্র আর মেঘের অট্টহাসি, এমনিতেই তাদের ফুপি দাদী অনেক স্মার্ট, সবই বোঝেন। শুধু দাদুর বেলাতে মাঝে মাঝে অবচেতন মনে দু’একটা এলোমেলো কথা বলে ফেলে। খুব ভালোবাসতেন কিনা।

শুভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে : ইশশশ, কাছে নেই তাও এখনও এত্তো প্রেম! আর যদি বেঁচে থাকতো কি করতে ফুপি দাদী, বলতো!

৩.

শায়লা আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। না, নেই তার স্বামী জামিল আহমেদ। কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানা নেই তার। নানীর কথা মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। নানী বলতো, যে মেয়ের হাতে মেহেদীর রঙ বেশি দীর্ঘায়ু হয় সে ততই বেশি স্বামী সোহাগি হয়। সুখী হয়। সুখ! রঙধনুর সব রঙ নিয়েও মাত্র এগারো মাসের সংসার তাদের। দুজনের বয়সের পার্থক্য অনেক হলেও সেটা তাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রে কোনো বাঁধা হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক জামিল হলের প্রভোস্ট ছিলেন। ছাত্র শিক্ষক সকলের প্রিয় ছিলেন। শায়লাকে খুব ভালোবাসতেন। শায়লাও ছিল চোখে পড়ার মতোই সুন্দরী। ওর চাপাকলির মতো হাত দুটো ছিল তার খুব পছন্দের। সবসময় মেহেদী দিয়ে রাঙিয়ে রাখতে বলতেন।

সেদিন ছিল ১৪ ই ডিসেম্বর। দু আঙ্গুলের ব্যবধানেই বিজয় হতে চলেছে দেশের। সেই আনন্দেই জামিল নিজ হাতে শায়লাকে নিবিষ্ট মনে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছিল। খুব ছটফটে স্বভাবের শায়লা বসতেও চাচ্ছিল না তাই জামিল কপোট রাগ দেখাচ্ছিল। এমন সময় শায়লার জীবনে সবচেয়ে ভয়ার্ত শব্দটা এলো….. ঠকঠকঠক।

জামিল দরজা খুলতেই ওরই ইউনিভার্সিটির কয়েকজন ছাত্র সালাম দিয়ে বললো : স্যার একটু বাইরে আসেন।

পরিচিত ছাত্রদের দেখে নিঃসংকোচে বেরিয়ে গেল জামিল, সাথে ছিল বিশ্বাস।

কিন্তু শায়লা ভয় পেয়ে গেল। কিছুতেই যেতে দেবে না। ও শুনেছে, চেনাজানা অনেককেই কারা যেন নিয়ে গেছে। এখনও ফেরেনি তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পাশাপাশি জামিল দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান ইত্যাদি অনেকগুলো পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। বাঙালিদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের একনিষ্ঠ সমর্থক জামিল লেখালেখির মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন। লেখালেখি ছিল তার অস্ত্র। গভীর রাতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তার বাসায় আসতো। খাওয়াদাওয়া করতো আর যাবার সময় তিনি তাদের প্রয়োজনীয় কাপড়, ঔষধ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। এসব চোখে পড়ে যায় রাজাকার আলবদরদের।

যাবার আগে জামিল ওর গায়ের লাল চাদরটা শায়লার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললো : তোমার ঠা-ার ধাত আছে, ঠাণ্ডা লাগিও না। আর চিন্তা করো না। আমি ঠিক চলে আসবো।

কথা রাখেনি জামিল।

আজও ফিরে আসেনি জামিল।

দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর

শত্রুর পরাজয় তখন নিশ্চিত হয়ে গেছে। শুধু আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা বাকি। এমন সময় বাঙালি জাতিকে মেধা শূণ্য করতে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঘৃণ্য পরিকল্পনা করলো পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। জাতির সূর্য সন্তানদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো রায়েরবাজারে।

৪.

করোনার প্রভাব যদিও কিছুটা কমে এসেছে তবু সাবধানের তো আর মার নেই। শীতের প্রকোপও মারাত্মক। ভোরের আলো ফোঁটার পরপরই মাস্ক পরে রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে আসতে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা কর্মীরা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে সাধারণ মানুষের ঢল। শহীদ বেদী ঢাকা পড়ে যায় ফুলেল ভালোবাসায়।

সকাল নয়টায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে গূণীজনের বক্তব্য, কবিতা পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। প্রতিবছরের মতো গতরাতেও সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বাসায় ফিরে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে আর ঘুমোয়নি শায়লা। একবারে রোযা রেখে ফজরের নামাজ পড়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এখন এই সকাল ন’টায় দর্শক সারিতে বসে কেমন ক্লান্ত লাগছে, বয়স তো আর কম হয়নি! অবশ্য দুপাশে দুই নাতি নানান গল্পে তাকে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করছে।

জামিল নিখোঁজ হবার পর থেকেই তার বড় ভাই তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। অর্থনীতিতে মাস্টার্স করিয়েছে। নিজ পায়ে দাঁড় করিয়েছে। এলাকার সবাই তাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছে, দিয়েছে ভালোবাসা। শায়লাও ভালোবেসে সবাইকে আপন করে নিয়েছে। কেবল জামিলের ভালোবাসাটুকুই কাউকে আর দিতে পারেনি।

হুম, শায়লা একাই রয়ে গেছে। জামিলের অপেক্ষায়………

শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী হিসেবে মঞ্চে শায়লা আহমেদকে কিছু বলার অনুরোধ করে উপস্থাপক। দুধে আলতা গায়ের রঙের সাথে গাঢ় সবুজ শাড়ি আর সেই লাল চাদরে খুব মানিয়েছে শায়লাকে। তার উপর মেহেদী রাঙানো দুটো হাত। খুব স্নিগ্ধ লাগছিল।

মঞ্চে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই পেছন থেকে শুনতে পায় : আজ নাকি শোক দিবস! বুড়ির সাজ দেখেছিস! ইনি নাকি শহীদের স্ত্রী! দেখবি, এই ছবিটাই আজ ভাইরাল হলো বলে! যত্তসব ভাঁওতাবাজি! শায়লা এক’পা পিছাতেই শুভ্র আর মেঘ ওর দুহাত ধরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শায়লা বিস্মিত হয়ে যায় ওদের কথা শুনে। ওরা তার ভাইয়ের নাতীদেরই বয়সী হবে। এ কেমন শিক্ষা? বড়দের সম্পর্কে এভাবে কথা বলছে এরা কারা? এই প্রজন্ম কি শুধু মেবাইল টিপতেই শিখেছে? নাহ, সবাই হয়তো না। তার শুভ্র মেঘ তো এমন নয়। এসব মূল্যবোধহীন প্রজন্মই সেদিন স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে ছিল।

আফসোস! তোমরা জানো না বাছারা, সেদিন বাংলাদেশ কতটা কষ্ট পেয়েছিল! আপনমনে বকতে থাকে শায়লা।

শায়লা মঞ্চে উঠতেই উপস্থাপক বলেন : একজন শহীদের স্ত্রী হিসেবে জামিল আহমেদ সম্পর্কে কিছু কথা আমরা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে

শায়লা বলে : তিনি তো শহীদ হননি। তিনি হারিয়ে গেছেন। তার লাশ আমি পাইনি, কেউ কিছু বলতেও পারেনি। দেশে কতো রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলো, কই কোনো সরকারই তো তার মতো হারিয়ে যাওয়াদের খুঁজে এনে দিতে পারলো না আমাদের কাছে। হঠাৎই শায়লার গলাটা ভারি হয়ে যায়। এই যে আমার সাজ দেখছেন, সবই তার জন্য। আমি আজও তার ইচ্ছেতেই নিজেকে রাঙাই। আমি জানি সে আমায় দেখছে, আর একদিন ঠিকই আমার কাছে ফিরে আসবে। পরক্ষণেই চোখদুটো বারুদের স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে :

এদেশকে মেধা শূণ্য করার জন্য, রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশকে পঙ্গু করার জন্য, অর্থনৈতিকভাবে মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলার জন্যই সেদিন জাতীর সূর্যসন্তানদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পেরেছে কি আমাদের দমিয়ে রাখতে! কতটা লাভবান হয়েছিল তারা?

আজ আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করেছি। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের শেয়ারবাজার পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকে অনেকখানিই দূর্বল। বছর দুয়েক আগে এহেন অবস্থায় ওরা দুঃখ করে বলেছিল : ইউরোপ নেহি, খোদাকে ওয়াস্তে হামকো বাংলাদেশ বানাদো। এখানেই ওদের পরাজয়…..

সাবাশ, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

অবাক তাকিয়ে রয়,

জ্বলে পুড়ে- মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়।

শুভ্র মেঘ আর ওদের বন্ধুরা শায়লাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে। মৌলবাদ ও একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে তখন মুখর স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গন। কেউ একজন ভীষণ আবেগি কণ্ঠে আবৃত্তি করছে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটি। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুনে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যায় শায়লার। একটা হিমেল হাওয়া যেন ওকে ছুঁয়ে যায়। আবেশে চোখদুটো বন্ধ হয়ে যায় শায়লার। সে আজও বাতাসে জামিলের প্রণয়ের সুগন্ধ পায়।

আজও অপেক্ষা করে তার ঘরে ফেরার, ফিরবে সে

ফিরবেই একদিন, হয়তো অন্য কোনো রুপে।

লেখক : সহধর্মীনী, অ্যাডিশনাল এসপি, ঢাকা জেলা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *