ই-পেপার

মোঃ শহিদুল্লাহ

আমি তখন বরিশাল জেলার গৌরনদী থানায় প্রবেশনার এস আই হিসেবে কর্মরত। মাগুরা মাদারীপুর গ্রামের রেবেকা(২০) অপহরণ রহস্যের সাধারণ ডায়েরির অনুসন্ধান আমার ওপর ন্যস্ত। এ ব্যাপারে আমি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি। অভিযুক্ত সিদ্দিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে তাকে নিবিড়ভাবে রেবেকা অপহরণের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি কিন্তু সে রেবেকাকে অপহরণ করেনি বলে বারবার বলে গেছে। কয়েক দফা আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি, কিন্তু অপহরণের কোনো কুল কিনারা হয়নি। আসলে অভিযোগকারীর অভিযোগে অভিযুক্তরা রেবেকাকে অপহরণ করেছে কি-না সেটাও পরিষ্কার নয়। অভিযোগের সপক্ষে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ মেলেনি, অভিযুক্তরাও কোন তথ্য দেয়নি। এ কারণে আমাকে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য গোপন সোর্স নিয়োগ করতে হয়েছে, কিন্তু সে সোর্সও আজ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখাতে পারেনি- তাই মনের মধ্যে একটা হতাশা বিরাজ করছে। একটা ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য অপরাধী যে সমস্ত ক্লু অকুস্থলে রেখে যায় শত চেষ্টা করেও সে ধরনের কোনো ক্লুর নাম নিশানা খুঁজে পাইনি। এমন সময় মাগুরা মাদারীপুর গ্রাম থেকে দফাদার লতিফ এক দুঃসংবাদ নিয়ে আমার ডাকবাংলোয় হাজির হলো। সে  আমাকে জানালো মাগুরা মাদারীপুর গ্রামের বিলের পানিতে অপহৃত রেবেকার লাশ ভেসে উঠেছে এবং সে লাশ দেখার জন্য গ্রামবাসীরা বিলের পাড়ে ভিড় জমিয়েছে। আমি দ্রুত পোশাক পরে দফাদার লতিফসহ থানায় উপস্থিত হয়ে দফাদার লতিফকে ওসি সাহেবের সামনে হাজির করলাম। দফাদার লতিফ আমাকে যেমনভাবে জানিয়েছিল ওসি সাহেবকেও তেমনভাবে জানালো যে অপহৃতা রেবেকার লাশ মাগুরা মাদারীপুরের বিলে ভেসে উঠেছে এবং মাগুরা মাদারীপুর গ্রাম সহ আশপাশ কয়েক গ্রামের উৎসুক জনতা সে ভাসমান লাশ দেখার জন্য মাগুরা মাদারীপুর বিলের লাশ ভাসার স্থানে ভিড় জমিয়েছে। ওসি সাহেব তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যাবার জন্য মনস্থির করলেন। তিনি থানার তৃতীয় দারোগা আব্দুর রশিদকে ঘটনাস্থলে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন এবং মৃতার লাশ পরিবহনের ডিউটিসহ আমাদের তিন জন অফিসারের সাথে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় ফোর্স প্রস্তুত করবার জন্য থানার মুন্সি কনস্টেবল আবুল কালামকে নির্দেশ দিলেন। ওসি সাহেব বললেন প্রবেশনার তুমি দফাদারসহ কয়েকজন ফোর্স নিয়ে বাসযোগে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা করে যাও আমি দারোগা রশিদ সাহেবকে নিয়ে আমার মোটরসাইকেল যোগে ঘটনাস্থলে আসছি। আমি দেরি না করে দফাদার লতিফ আর কয়েকজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে বাসযোগে ইল্লা বাস ¯ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আনুমানিক ঘণ্টাখানেক পর আমাদের বহনকারী বাস ইল্লা বাস¯ট্যান্ডে উপস্থিত হলো সেখানে নেমে ভ্যানযোগে আমরা ঘটনাস্থল মাগুরা মাদারীপুর বিলের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। ভ্যানযোগে আনুমানিক আধা ঘণ্টা পরে মাগুরা মাদারীপুর বিলে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলাম। এসে দেখলাম সেখানে লোকে লোকারণ্য, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিনসহ অভিযোগকারী দুই ভাইও সেখানে ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছে। আমি পৌঁছবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে দারোগা রশিদ সাহেবকে নিয়ে ওসি সাহেব সেখানে এসে পৌঁছালেন। মৃত রেবেকার লাশ উপুড় অবস্থায় বিলের পানিতে ভাসমান অবস্থায় ছিল। ওসি সাহেব আমাকে বললেন পি এস আই বিলের পানিতে দফাদারসহ নামো। ভাগ্য ভালো যে এমন একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে ধারণায় আমি ব্যাগে করে লুঙ্গি গামছা এবং সিভিল ড্রেস সাথে করে এনেছিলাম। ওসি সাহেবের নির্দেশ মতে আমি আমার ইউনিফর্ম বদল করে লুঙ্গি এবং একটা গেঞ্জি পরে নিলাম এবং মাথায় নীল রংয়ের গামছা পাগড়ির মতো করে বেঁধে নিলাম। এ ধরনের মরা পচা লাশ থেকে অনেক দুর্গন্ধ বের হয়। এ ছাড়া মরা পচা লাশ এভাবে নাড়াচাড়া করার অভ্যাস আমার ইতোপূর্বে কোনোদিন ছিল না। কিন্তু সব কিছু তো আমার হাতে নাই। ওসি সাহেবের নির্দেশ অবনত মস্তকে মেনে নিতে হবে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়েরও একটা বিষয় রয়ে যায়। আমি আল্লাহর নাম নিয়ে বিলের পানিতে দফাদার লতিফসহ নামলাম। দুর্গন্ধের জন্য সামনের দিকে এগোনো দুষ্কর। আমি নাকে রুমাল চাপা দিয়ে আস্তে আস্তে মৃত রেবেকার লাশের কাছে উপস্থিত হলাম। দফাদার লতিফের সাহায্যে মৃতার লাশকে খালের পাড়ের দিকে টেনে আনলাম। আনুমানিক দু সপ্তাহের ওপর রেবেকার মৃত্যু ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। মৃত লাশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে পানিতে। উপরন্ত লাশের গায়ে যে ধরনের দুর্গন্ধ তা ভাষায় বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণতঃ মরা লাশ ধরাধরি বা পানি থেকে টেনে তোলার কাজ ডোমেরা করে থাকে। কিন্তু দ্রুত ঘটনাস্থলের আসতে হয়েছে বিধায় ওসি সাহেব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ডোমকে খবর দিয়ে ঘটনাস্থলে আনতে পারেননি, ফলে মরা পচা লাশ পানি থেকে বিলের পাড়ে টেনে আনার কাজ আমাকেই করতে হলো। লাশের দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার জোগাড় হলেও পেশাগত কারণে আমাকে সে কষ্টটুকু সহ্য করতেই হলো। এ কাজে আমি ওসি সাহেবের আদেশের কোনো দ্বিমত পোষণ করিনি। লাশ বিলের পাড়ে টেনে আনার পর আমি বিলের পানি থেকে উপরে উঠলে ওসি সাহেব আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বললেন প্রবেশনার তুমি আসলেই ভবিষ্যতে একজন ভালো পুলিশ অফিসার হবে। যে কাজ একজন ডোমের করার কথা সেটা তুমি আমার এক কথায় নির্দ্বিধায় করে ফেললে, সত্যিই তোমার কাজ প্রশংসার দাবি রাখে। তাছাড়া ডোমেরা বরিশালে থাকে, কোনো ডোমকে বরিশালে খবর দিয়ে আনতে গেলে অনেক সময়ের ব্যাপার। যেহেতু লাশ বিলের পানিতে ভেসে উঠেছে এবং এখানে উৎসুক জনতার ভিড় রয়েছে সে কারণে ডোমের অপেক্ষায় দেরি করার আর কোনো সুযোগ নেই, এ কারণে আমি দারোগা রশিদ সাহেব সহ ঘটনাস্থলে দ্রুত চলে এসেছি। ওসি সাহেব বললেন রেবেকার অপহরণের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছিলাম, কিন্তু যেহেতু ঘটনাটা আর অপহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এবং যেহেতু মৃত লাশের নমুনা দেখে মনে হচ্ছে তাকে খুন করা হয়েছে এ কারণে প্রবেশনার হিসেবে তোমাকে একটা স্পর্শকাতর হত্যা মামলার তদন্তভার এই মুহূর্তে দেয়া সমীচীন হবে না মনে করে হত্যা মামলার তদন্তভার এস আই আব্দুর রশিদ সাহেবকে দেব। এ কারণে এ লাশের সুরতহাল রিপোর্ট এসআই আব্দুর রশিদ সাহেব প্রস্তুত করবেন, তুমি তাকে সর্ব  প্রকার সহযোগিতা প্রদান করবে। আমি ওসি স্যারকে বললাম স্যার আপনি যথার্থই বলেছেন, এই মামলার তদন্তভার আমাকে দিলে যে আমি তদন্ত করতে পারব না এমনটি নয় তবে এ ধরনের মামলা থানার একজন স্থায়ী অফিসারের দ্বারা তদন্ত করানোই হয়তো সমীচীন হবে। আমি আপনার নির্দেশ মতো দারোগা রশিদ সাহেবকে এ ব্যাপারে সর্ব প্রকার সহযোগিতা প্রদান করব। এরপর মৃত রেবেকার আত্মীয় স্বজনের শনাক্ত মতে মৃত রেবেকার লাশের সুরতহাল  প্রতিবেদন গৌরনদি থানার তৃতীয় দারোগা এস আই আব্দুর রশিদ নিজ হাতে তৈরি করলেন, আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে এ বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করলাম। লাশ বাধার জন্য দড়ি চাটায় এবং লাশের শরীরের গন্ধ কমাবার জন্য কেরোসিন তেল স্থানীয় বাজার থেকে চৌকিদার অনন্ত সংগ্রহ করে আনল। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা শেষ হলে মৃত রেবেকার লাশ বরিশাল মর্গে নেওয়ার জন্য লাশ পরিবহনের জন্য নিয়োজিত কনস্টেবল মোঃ লুৎফর রহমানের কাছে মফস্বল  সিসি মোতাবেক এসআই আব্দুর রশিদ মৃত রেবেকার লাশ হস্তান্তর করলেন। এবং  লাশ বহনের জন্য প্রয়োজনীয় চালান সুরতহাল রিপোর্ট ইত্যাদি কাগজাদিসহ কনস্টেবল ৩২৫ মোঃ লুৎফর রহমানকে বুঝিয়ে দিলেন। তখন এলাকায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কি কারণে রেবেকাকে খুন করা হয়েছে এ বিষয়ে কারো কিছু জানা নেই, কেউ কিছু বলতেও পারে না। শুধু অভিযোগকারীদের ভাষ্যে তাদের শ্যালিকাকে নাদের খলিফা, ছাদের খলিফা এবং সিদ্দিকসহ অন্যান্যরা অপহরণ করে খুন করে লাশ মাগুরা মাদারীপুরের বিলে ভাসিয়ে দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে মৃত রেবেকার লাশ গৌরনদী থানা পর্যন্ত পরিবহনের জন্য একটি ডিঙ্গি নৌকা ঠিক করা হলো। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মৃত ব্যক্তির লাশ হোগলা পাতার চাটায়-এ মুড়িয়ে দড়ি দিয়ে ঠিকমতো আঁটোসাঁটো করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। লাশের গন্ধ দূর করবার জন্য লাশের ওপর কেরোসিন তেল ছিটানো হয়েছে তাতে করে লাশের দুর্গন্ধ একটু কম হলেও সম্পূর্ণরূপে দুর্গন্ধ যায়নি। চৌকিদার দফাদাররা ধরাধরি করে মৃতা রেবেকার লাশ ডিঙ্গি নৌকাতে তুলে দিল। নৌকাতে লাশ বহনকারী কনস্টেবল লুৎফর রহমান উঠে বসলেন। ওসি সাহেব বললেন প্রবেশনার তুমি আর দফাদার রশিদ লাশের সাথে গৌরনদী থানা ঘাট পর্যন্ত যাও, আমরা গ্রামের মধ্যে থেকে এ ঘটনার বিষয়ে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তারপর আসছি। লাশের সাথে আমাকে ডিঙ্গি নৌকা করে এভাবে আসতে হবে তা আমি এর আগে  কখনো ভাবিনি বা এভাবে যাবার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি আমার ছিল না। এর আগে কোনো দিন কোনো মৃত লাশ বিলের মধ্য দিয়ে রাতের বেলা নিয়ে যাওয়ার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু কিছু করণীয় নেই আমার। আমি যে প্রবেশনার এস আই, অফিসার ইনচার্জের কথা আমি শুনতে বাধ্য, যদিও লাশ পরিবহনের দায়িত্ব কনস্টেবল লুৎফর রহমানের ওপর ন্যস্ত, কিন্তু তারপরেও ওসি সাহেবের নির্দেশ যা আমাকে অবনত মস্তকে মানতে হবে। পুলিশ বিভাগের মূল মন্ত্রই হলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অবনত মস্তকে মেনে নেওয়া, আমিও ঠিক তাই করলাম। দফাদার লতিফ চৌকিদার সুরতকে দিয়ে একটা কেরোসিন তেলেভরা হ্যারিকেন জোগাড় করে আনল। আমি, দফাদার লতিফ কনস্টেবল লুৎফর রহমান এবং ডিঙ্গি নৌকার মাঝি হাবিব মৃতা রেবেকার লাশ নিয়ে গৌরনদী থানা ডাক বাংলো ঘাটের উদ্দেশ্যে হাবিবের ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করেন বদর বদর বলে রওনা হলাম। চারিদিকে সুনসান নীরবতা, চতুরদিকে অন্ধকার শুধু বিলের পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। মাগুরা মাদারীপুর বিল থেকে গৌরনদী থানা ডাকবাংলো ঘাট প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরত্বের হবে, কি বলবো কি করব ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছি না, নৌকায় খুনের শিকার একজন রমণীর লাশ। ছেলেবেলায় অনেক গল্প শুনেছি রাতের আঁধারে মৃত লাশ নাকি ভুতের বেশ ধরে জেগে ওঠে, তারপর আশপাশ যাকেই পায় তার নাকি ঘাড় মটকায়। এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন যে  হয়নি সে কোনোদিনই বুঝতে পারবে না পরিস্থিতি কি! সাধারণত ভ্যানে করে মৃত লাশ বহন করা হয় দিনের বেলায়, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারে বিল পথে লাশের ডিঙ্গি নৌকায় রয়েছে শুধু টিম টিমে হারিকেন বাতি। এই বাতির আলোয় বিলের পানির যতটুকু দেখা যাচ্ছে সেটুকু দেখে দেখে মাঝি হাবিব তার হাতের বৈঠা টেনে নৌকাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমি কেন ডিঙ্গি নৌকার প্রতিটি প্রাণী ঢিপ ঢিপ বুকে নৌকায় বসে আছে, যদি কিছু ঘটে যায় কোনো কিছু করার নেই। শুধু ভাগ্যের ওপর ভরসা আর মুখে মুখে আল্লাহর নাম স্মরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। অমাবস্যার এই নিকষ কালো অন্ধকার রাতে আমাদের ডিঙ্গি নৌকা আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, মাঝি হাবিব দুই হাতে বৈঠা টানছে। রাতের অন্ধকারে নৌকার মধ্যে থাকা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, চারিদিকে নিবিড় অন্ধকার। নৌকাতে হারিকেনের টিম টিমে আলো। যদি কোন প্রতিবন্ধকতার সাথে আমাদের নৌকার সংঘর্ষ ঘটে আমরা সবাই মিলে মৃতা রেবেকার লাশ নিয়ে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাব সেটা দেখার কেউ নেই (সে যুগে মোবাইল ফোন মানুষের হাতে ছিল না)। অন্ধকারে লাশ বহনকারী নৌকায় বসে বসে অসহায় আমি আর আমার মনোপাখি মনের দুঃখে গেয়ে উঠেছে “পথহারা পাখি, কেঁদে ফিরে একা। আমার জীবনে শুধু আঁধারেরই লেখা। পথহারা পাখি, কেঁদে ফিরে একা। “এভাবে চলতে চলতে রাত ১২ টা নাগাদ মৃত রেবেকার লাশ নিয়ে আমাদের ডিঙ্গি নৌকা গৌরনদী থানার ডাকবাংলো ঘাটে এসে পৌঁছালো। আমি যে ডাকবাংলোতে থাকি সেখান থেকে এ ঘাটের দূরত্ব প্রায় ১০০ গজ হবে। ঘাটে এসে দেখি থানার মুন্সি কনস্টেবল আবুল কালাম ঘাটের পাড়ে একটা ভ্যান নিয়ে বসা অবস্থায় আছে। এই ভ্যানে করে মৃত রেবেকার লাশ আজ রাতের জন্য গৌরনদী থানা চত্বরে রাখা হবে এবং সেখান থেকে ভোরবেলা লাশ বহনকারী কনস্টেবল লুৎফর রহমান এ লাশকে ময়না তদন্ত করবার জন্য বরিশাল মর্গে নিয়ে যাবে। মৃত রেবেকার লাশ ভ্যানে তুলে গৌরনদী থানা চত্বরে নিয়ে আসা হল। থানায় এসে দেখি ওসি সাহেব থানায় তার চেয়ারে বসে আছেন ওসি সাহেবের কাছে রিপোর্ট করে বললাম স্যার রেবেকার ডেড বডি ডিঙ্গি নৌকা করে এবং পরবর্তীতে ভ্যানযোগে থানার মধ্যে নিয়ে এসেছি। ওসি সাহেব বললেন প্রবেশনার তুমি অনেক কষ্ট করেছ, তুমি এ কাজে তোমার পেশাদারিত্বের শতভাগ উজাড় করে দিয়েছে। সারাদিন অনেক কষ্ট হয়েছে যাও ডাকবাংলোয় ফিরে গিয়ে কাপড় চোপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম করো। আমি ওসি সাহেবকে সালাম জানিয়ে আমার ডাক ডাকবাংলোয় ফিরে এলাম। ডাকবাংলোর চৌকিদার জামিনউদ্দিন মোল্লাকে বললাম মোল্লা রাতের খাবার বানাতে পারবেন? বলল জি স্যার রাতের জন্য ডাল ভাত খাওয়াতে পারব। আমি বললাম সেটা হলেই চলবে। তারপর জামিনউদ্দিন মোল্লা আমাকে রাতের খাবার সরবরাহ করার জন্য খাবার পাক করতে গেলো। আমি পোশাক বদলিয়ে ডাকবাংলোর পিছনের পুকুর থেকে গোসল সেরে এলাম। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে, ঘরের টেবিলে থাকা বিস্কুটের প্যাকেট থেকে দুটো বিস্কুট নিয়ে খাওয়ার পর একটু ঠান্ডা পানি খেলাম। অপেক্ষায় রইলাম জামিনউদ্দিন মোল্লা কখন রাতের খাবার পাক করে আমার সামনে নিয়ে আসে। প্রায় ঘন্টা খানিক পর জামিন মোল্লা গরম ভাত ডাল মুরগির ডিম ভাজা আর আলু ভর্তা এনে আমার সামনে হাজির করলো। চটজলদি হাত মুখ ধুয়ে জামিনউদ্দিন মোল্লা পরিবেশিত খাবার খেয়ে নিলাম। খাওয়া শেষে জামিনউদ্দিন খাওয়ার সব আইটেম টেবিল থেকে গোছগাছ করে তার নিজের জায়গায় নিয়ে এলো। আমি আমার শোবার বিছানা ঠিকঠাক করে নিয়ে রাতের মতো বিশ্রামের আয়োজনে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম। বিছানায় যাবার আগে মনে মনে বললাম গতকালকেও কখনো আমার মনে হয়নি এমনি একটি পরিবেশের মধ্যে আমাকে কোনো দিন পার করতে হবে। দুর্গন্ধযুক্ত লাশ আমাকে ঘাঁটাঘাঁটি করে নিজের হাতে টেনে বিলের পাড়ে আনতে হবে। আসলে বুঝে ফেললাম আমাদের পুলিশের চাকরিটিই এমনই। শুধু আজ নয় পুলিশ জীবনের সামনের অনাগত দিনেও হয়তো পেশাগত কারণে আরো অনেক এ ধরনের পচা গলা লাশ আমাকে দুহাতে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার, লেখক ও কলামিস্ট

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x