ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

হোসনে আরা বেনু

আজ সবকিছুই যেন একটু অন্যরকম লাগছে। কারণটা ঠিক ধরতে পারছে না কায়েস। চারিদিকে চোখ বুলাতেই  জিহ্বায় কামড় দিল, যেন বিরাট কোনো অন্যায় করে ফেলেছে না বুঝতে পেরে।

ওহহহ! আজ তো বসন্ত, উচ্ছল উচ্ছ্বাস জাগানিয়া বসন্ত। পঞ্জিকার কিছুটা রদবদলের ফলে বসন্ত বরণ আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে পড়ে গেছে এবার। একদিক থেকে অবশ্য ভালোই হয়েছে, নিজের বুকপকেট চেপে ধরে ঠোঁটের কোনে সূর্যরশ্মির আলো ফুটিয়ে আপনমনে বলে কায়েস ঃ অনুষ্ঠান দুটো একই দিনে পড়াতে পকেট ফুটো হবার চান্সটা কিন্তু কম!

ঋতুরাজ বসন্ত প্রকৃতিতে ফিরে আসায় শহরের অলিতেগলিতে তরুণ-তরুণীর সাজে বসন্ত বরণের ছোঁয়া আর ভালোবাসার রঙ। তাজা ফুলের মালা পেঁচিয়ে মেয়েদের হাত জুড়ে ফাগুন এসেছে।

বসন্ত বাতাসে ভালোবাসা মিশে আছে। দূর থেকে গান ভেসে আসে ………

দূর দেশে যাবো রে, বাসা বানাবো রে

থাকবো দুজনে এক সাথে ;

আজ ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে

চল পলায়ে যাই …….

এক বুক হাহাকার নিয়ে কায়েস তার পাশের শূন্য বেঞ্চিতে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে ঃ এখানেই ওর থাকার কথা ছিল!!! আজ পর্যন্ত ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলাই হলো না, কাকে নিয়েই আর পালাবো! 

গোলাপটা যে আজও দেওয়া হলো না………..

এমন সময় তার শ্রবণেন্দ্রিয় শুনতে পায়, রিনরিনে কণ্ঠে বারো তেরো বছরের একটা মেয়ে বলছে ঃ ভাইয়া ফুল নিবেন? বেশি ট্যাকা লাগবো না। ন্যান না ভাইয়া…..

টকটকে তাজা লাল গোলাপগুলো যেন ওরই প্রতিক্ষায়। কায়েস মেয়েটিকে কাছে নিয়ে জিজ্ঞেস করে ঃ কিরে, নাম কী তোর?

 ঃ ফুলকি আমার নাম।

মেয়েটির হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে আবারও বলে ঃ পুরো ঝুড়িটা নিয়ে নিলাম, বুঝলি!

ফুলকির চোখেমুখে উপচে পড়ছে আনন্দের ফোয়ারা।

কায়েস আঙুলের ইশারায় একজনকে দেখিয়ে বলে ঃ ফুলকি যা তো, ফুলগুলো ঐ লাল শাড়ি পরা মেয়েটাকে দিয়ে আয়।

পারবি না!

ফুলকি লজ্জা পেয়ে মিটিমিটি হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বলে ঃ খুব পারমু।

এইডা আমার বাঁ হাতের কাম! কত্ত করলাম এই পার্কের আফা আর ভাইয়াগো লাইগা।

অক্ষুণী যাইতাছি………

লিলি আর অরুপ চৌধুরী এসেছেন তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে অদ্রিজার ভ্যালেন্টাইনের সাথে পরিচিত হতে। মায়াবী বিকেলের ঝিরিঝিরি বাতাসে ওরা পার্কের সবুজ গালিচায় ছায়াবীথি তলে বসেছে। ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব করায় লিলি একটু কেঁপে ওঠে। অরুপ ওর লম্বা সিল্কি চুলগুলো সরিয়ে কাঁধের ভাঁজ করা পাতলা শালটা খুলে লিলির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলে ঃ এটা কি ফ্যাশন করার জিনিস!

শীত করছে, বুঝতে পারছো না?

লিলির ঠোঁটের কোনে কৃতজ্ঞতার আলো জ্বলে।

বয়স হচ্ছে তো। শরীর সুস্থ রাখতে আজকাল খুব নিয়ম মেনে চলতে হয়। লিলি নিজের ব্যাপারে বড় বেশি উদাসীন। আর তাই এসব অরুপকেই দেখভাল করতে হয়।

লিলি স্মিত হেসে অরুপের হাতটা চেপে ধরে নিজের কোলের ওপর রেখে বলে ঃ তুমি আছো তো!

অরুপ লিলির হাতের উষ্ণতা টের পায়।

চারিদিকে লাভ বার্ডের মতো জোড়াগুলোকে ফাগুন হাওয়ায় মাতোয়ারা হতে দেখে লিলির বেশ ভালোই লাগে।

হঠাৎই লিলি একটু ঝাঁজের সাথে বলে ঃ তোমার কা-জ্ঞান দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত। তুমি এসেছো মেয়ের হবু জামাই দেখতে?

তোমার মেয়ে ভালোবাসা বোঝে? সেই স্কুল থেকে কতগুলো বিএফ চেঞ্জ করলো! হিসেব করেছো কখনও? তুচ্ছ কারণে ভালো লাগা তৈরি হয় আবার ঠুনকো কারণেই সে ভালো লাগা জলাঞ্জলি দেয়। ইনফেক্ট এ যুগের ছেলেমেয়েরা “লাভ” শব্দটি নিজেদের মধ্যে ধারণই করতে পারেনি। দুদিন প্রেমের জোয়ারে ভেসে কয়েকদিনের মধ্যেই ব্রেকআপ। আর তারপরই অন্য বন্ধুদের সাথে তাকে নির্দ্বিধায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তার “এক্স” হিসাবে।

হা হা হা।

আমি তো তোমার কন্যার প্রেমের বহর দেখে ভেবেছিলাম স্কুলটা পাশ করে কিনা! আল্লাহর অশেষ রহমত, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে পেরেছে। তবে এটা ঠিক যে, তোমার আহ্লাদেই কিন্তু মেয়ে এতটা মাথায় উঠেছে ……

কন্ঠে লিলির অভিযোগ।

অরুপ হাসতে হাসতে বলে ঃ নাগো না, অতটা খারাপ বলো না আমার মেয়েকে। “ও” একটু বেশিই চঞ্চল প্রকৃতির। আসলে আজকালকার মেয়ে তো, কখন কী করে বসে ঠিক নেই। যুগ পাল্টেছে লিলি।

সেদিন দেখলে না সিদ্ধেশ্বরীতে ছাদ থেকে একটা মেয়েকে ফেলে দিল প্রেমিক তার বন্ধুদের সহায়তায়। অবশ্য এটা পত্রিকার কথা। ওদের বোঝাপড়াটা নাকি ভালো ছিল না।  সম্পর্কের মধ্যে বোঝাপড়া, সম্মানবোধ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। আমি নিজে একটু যাচাই করে দেখতে চাই কেমন ছেলেকে ভালোবেসেছে কন্যা আমার। হাজার হোক একটাই তো রাজকন্যা আমার।

“অচেনা বন্ধুর চেয়ে চেনা শত্রুও অনেক ভালো”, জানো তো। হা হা।

আর এ ছেলে সম্পর্কে তো কিছুই জানি না আমরা। তাই একটু পরখ করে নিতে চাই, কি বল!

কি আবার বলবো আমি! মেয়ে তোমার, তুমিই ভালো বুঝবে। তবে একটা কথা বলি, এগুলো ভালোবাসা নয়। ভালো লাগা।

ভালো লাগা কি ভালোবাসা নয়?

না। কারো বিশেষ কোনো গুণের জন্য হয়তো কাউকে ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য।  ভালোবাসলে কোনো গুণ না থাকলেও তাকেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হবে। তার প্রতি অনুভূতি থাকবে, থাকবে প্রেম। ধ্যান জ্ঞানে সারাক্ষণই সে থাকবে। 

ধরো, একটা ফুল ভালো লাগে বলেই আমরা সেটা  তুলে নিজের করি আর ভালোবাসার কারণেই গাছটির যতœ নিয়ে তাতে আমরা ফুল ফোঁটাই। তার সৌন্দর্য উপভোগ করি।

কারো কথা বলার ভঙ্গি পছন্দের কারণেই হয়তো তাকে ভালো লাগে, কারো গান শুনে। অনেকের অনেক কিছু ভালো লাগে কিন্তু আমরা সবাইকে ভালোবাসি না। ভালোবাসি একজনকে।

ভালোবাসা অনন্তকালের। একে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা ঠিক হবে না।

কথার মাঝেই অরুপ লিলিকে থামিয়ে দেয় ঃ ভালো লাগা থেকেই ভালোবাসার সুত্রপাত, এটা মানো তো!

মানুষের আবেগের সীমা থাকে না, ভালোবাসা প্রকাশের তরিকাটা ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হয়। দেখো, কাল অদ্রিজার চোখে আমি জল দেখেছি যা মিথ্যে হতে পারে না। এবার বোধ হয় সত্যি সত্যিই প্রেমে পড়েছে মেয়ে আমার। 

ঃ হয়তো!  মানুষের আবেগ অনুভূতির স্বাভাবিক রূপ ভালেবাসা।

এখন এই তর্ক আপাতত বাদ দাও। ঐ যে তোমার রাজকন্যা আসছেন আমাদের জামাইকে নিয়ে, বলেই মুচকি হাসে লিলি।

পরক্ষণেই চোখ কপালে তুলে বলে ঃ কী অবস্থা দেখ, এত্তো শুকনা! নাকি আবার গাঁজা টাজা খায়! 

ঃ আরে নাহ, আজকাল কী সব সিক্স প্যাকট্যাক বলে না, তাই হবে হয়তো। বুয়েটে পড়লেই তো হলো না সাথে শরীরটাকেও তো ফিট রাখা উচিত। নাকি আমার মতো সুখের ভুড়ি থাকলে খুশি হতে? লিলির দিকে পাল্টা হাসি ছুড়ে দেয় অরুপ।

ওরা ওঠে দাঁড়ায়।

দূর থেকে ওরা দেখে হলুদ পাঞ্জাবি পরা এক যুবক আসছে। পাশে নীল শাড়ি পরা অদ্রিজাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন হিমু আর রুপা হেঁটে আসছে। কাছে আসতেই অদ্রিজাকে দেখে মনে হলো সে খুব মারমুখো হয়ে আছে।

বাবামায়ের সাথে পরিচয়ের পর হালকা কথাবার্তার সময় হঠাৎ অদ্রিজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ঃ

কতোবার বলেছি তাহিন, হলুদ রঙটা দেখলে আমার গা ঘিনঘিন করে। সেটাই তোমাকে পরতে হলো? হলুদ বিবর্ণ করে ফেলে ভালোবাসাকে। আর বসে বসে পা নাচাচ্ছ কেন? দেখছো না মা বাবা আছেন। অসহ্য। ফোনে পাওয়া যায়নি কেন তখন? 

কোথায় ছিলে?

নিশ্চয়ই সোমাপুর সাথে ব্যস্ত ছিলে? জানো কতবার নক করেছি! 

এভাবে চললে কিন্তু ব্রেকআপ হয়ে যাবে। আমার পক্ষে কনটিনিউ করা সম্ভব হবে না।

অদ্রিজা ভুলে যায় ওরা মা বাবার সামনে বসে আছে।

অভিমানগুলো তাহিনের গলায় ওঠে আসে। মাথা নিচু করে ফিসফিস করে ঃ কী বলছো এসব! আঙ্কেল আন্টি দেখছেন……. 

সামান্য একটা পাঞ্জাবির জন্য! তোমাকে আসলেই আমি বুঝতে পারছি না ঠিক কী চাও? বলেছিলাম তোমাকে সময় নিতে। নিজেকে আগে স্থির কর, তারপর এসব নিয়ে ভাবা যাবে।

আসছি আমি ……………

লিলি আর অরুপ পরস্পরের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। লিলি বিদ্রুপের সুরে বলে ঃ কি অরুপ সাহেব, বলেছিলাম না!!!

তারপর অদ্রিজার দিকে ফিরে  বলে ঃ

এই হচ্ছে তোমাদের এ যুগের ভালোবাসা। কথায় কথায় ব্রেকআপ!

কেন ওর পছন্দকে চেঞ্জ করতে হবে? তুমি ওর হলুদ রঙটাকে ভালোবেসে বসন্ত নিয়ে আস। যাকে ভালোবাসবে তার ভুল ত্রুটি, খারাপ লাগা, মন্দ লাগা সবটাকেই আপন করে নেবে। আর এতো সন্দেহ করলে চলে? চার অক্ষরের ভালোবাসা টিকে থাকে আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর।

ভ্রু কুঁচকে শুধায় ঃ আচ্ছা এবার আমাকে বল, তুমি কেন নীল পরেছ?

অদ্রিজা ঃ নীল আমার পছন্দের রঙ, তুমি জানো মা। তাছাড়া আকাশের রঙ নীল, সমুদ্র নীল। নীল বিশালত্বের প্রতীক। তাই আমি চাই আমার ভালোবাসাও যেন ওমনই …… ……..

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মা ধীর কণ্ঠে বলেন ঃ কষ্টের রঙও কিন্তু নীল অদ্রিজা।

অদ্রিজা প্রায় কেঁদে ফেলে ঃ তাহলে ????

লিলি হেসে সস্নেহে বলেন ঃ ভালোবাসার কোনো রঙ রূপ নেই মামণি। প্রিয় মানুষের দেয়া বেদনাও মধুর হয়ে যায় ভালোবাসার কাছে। কাছে না থাকলেও প্রিয় মানুষটির সৌরভ সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকবে তোমায়। চোখের গভীরতা নয় হৃদয়ের পবিত্রতা দিয়ে একে অনুভব করতে হয়। ভালোবাসা মানে নিজের পছন্দকে হাসিল করে নেওয়া নয় বরং নিজেই কারো জন্য হেরে যাওয়া। নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। এর জন্য আত্মবিসর্জনও দেয় অনেকে। ভালোবাসার মৃত্যু হয় না, ঠিক একই কারণে আত্মারও মৃত্যু নেই।

তাহিন মুগ্ধ হয়ে লিলি আন্টির কথাগুলো শুনে বলে ঃ সরি আন্টি, আমারই ভুল হয়ে গেছে। ওকে বকবেন না, প্লিজ। ও একটু অস্থির প্রকৃতির, কিন্তু মনটা ভীষণ ভালো। আমতা আমতা করে বলে ঃ আর এমন ভুল হবে না আমার, অদ্রিজা।

লিলির খুব পছন্দ হয় তাহিনকে। বুঝতে পারে তাহিন তাদের মেয়েকে আসলেই ভীষণ ভালোবাসে। এতদিনে মনে হয় হিমুর হাতে নীল পদ্ম সত্যিই উঠে এসেছে। বুক থেকে যেন চেপে বসা পাথরটা সরে যায় লিলির।

হঠাৎ ফুলকি পেছন থেকে লিলির চাদর ধরে টান দিতেই ও উত্তেজিত হয়ে বলে ঃ এই, এই কী করছিস, ছিঁড়ে যাবে তো …….. বলে অতি যত্নে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নেয়।

ফুলকি ওকে দেখে মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে বলে ঃ ও আল্লাহ, এ তো দেহি খালাম্মা! আর হ্যায় কত্ত সুন্দর। বড় চিন্তিত দেখায় তাকে।

থাকগে আমার কি! অহন নাকি পোলাগো চাইতে মাইয়ারাই বয়সে বড় অয়। এইডাই হালের ফ্যাশন! 

হে হে হে।

খালাম্মা থুক্কু আন্টি, আফনার লাইগা কায়েস ভাইয়া ফুল পাঠাইছে।

লিলি কিছুক্ষণের জন্য অনড় হয়ে যায়।

চারিদিকে পাগলের মতো চোখ বুলায়। তারপর ফুলের ঝুড়িটা সযত্নে আঁকড়ে ধরে অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে যায়।

অরুপ মজা করে বলে ঃ তাই তো বলি, কীসের অভাবে যেন আজ বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। যাক এবার ফুলফিল হলো তাহলে।

অদ্রিজার চোখে বিস্ময় দেখে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন ঃ একেই বলে ছাচ্চা পেয়ার মামণি। তোমার মাকে ক্লান্তিহীন ভালোবাসার গোলাপ দিয়ে যাচ্ছে গত বিশটি বছর ধরে। কোনো প্রত্যাশা না করেই।

জানো লিলি, মাঝে মাঝে বড় হিংসে হয় তোমার ঐ কায়েসকে। আমি কেন কায়েস হলাম না!

অদ্রিজার চোখে কৌতূহল।

বাবার কথা শুনে ও হিম শীতল বরফের মতো জমাট বেঁধে যায়…………………

সেদিন কার্জন হল, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে হৈচৈ শেষে লিলি আর কায়েস বন্ধুদের সাথে ফুলার রোডে এসে বসেছে।

ভালোবাসা দিবস। প্রেমিক প্রেমিকাদের মধুর যন্ত্রণায় পা ফেলানোই যাচ্ছে না রাস্তায়।  এক যুগেরও বেশি নিজেদের  বন্ধুত্বের ওপর গবেষণা চালিয়ে ওরা আজ একটা থিসিস পেপার জমা দিতে এসেছে। কিন্তু পাতা ওল্টাতে পারছে না কেউই। বন্ধুরা চেপে ধরেছে “তুই” সম্বোধন পরিবর্তন করে “তুমিতে” উঠতে হবে। সারাদিন টেপরেকর্ডারের মতো বাজতে থাকা ওদের কারো মুখে কোনো কথা নেই যেন শব্দেরা সব নির্বাসনে গেছে। ভীষণ বিব্রত ওরা। বেকুবের মতো উল্টো ঘুরে বসে আছে দুজন। কেউ কারো চোখের দিকে তাকাতেই পারছে না।

কই এমন তো আগে কখনও হয়নি। মনে হচ্ছে কেউ বুঝি করলার রস খাইয়ে দিয়েছে।

বন্ধুরা কাউন ডাউন শুরু করেছে……….. এক, দুই, তিন। বল বল…..

একটু রেগেই ওঠে কায়েস ঃ আমার মা তো বাবাকে সারাজীবন আপনি করেই বললো, তাতে তো একটুও ভালোবাসার কমতি দেখলাম না।  পারবো না ওকে তুমি বলতে। 

তাই তো! তুইতোকারির মধ্যেই হঠাৎই যেন ওরা আবিষ্কার করলো এই বন্ধুত্বের মাঝে আলাদা একটা অনুভূতি মেশানো আছে। টম এ- জেরীর মতো লেগে থাকা ওরা ক্যাম্পাসে “লাইলী মজনু” বনে গেল সবার কাছে। এই তো সেদিন লিলি অসুস্থতার জন্য ইয়ার ফাইনালের একটা এক্সাম দিতে না পারায় কায়েসও পরীক্ষাটা মিস করলো ইচ্ছে করে। ইদানীং ওর সামনে এলে কায়েসের হার্টবিট বেড়ে যায়। লিলির মন খারাপে রৌদ্রস্নাত সকালেও ওর হৃদয়ে শ্রাবণের মেঘ বাসা বাঁধে। একদিন না দেখলেই জ্বর আসে। এগুলো নাকি প্রেমে পড়ার লক্ষ্মণ!

দুজন দুজনার মনের গভীরে প্রবেশ করেছে কখন, কীভাবে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। কিন্তু অফিসিয়ালি প্রপোজ করা হয়ে ওঠেনি।

আজ লাল তাঁতের শাড়িতে অনিন্দ্য সুন্দর লিলির দিক থেকে চোখই ফেরাতে পারছিল না কায়েস। অনেক সাহস সঞ্চয় করে চোখ দুটো বন্ধ করে হাঁটু গেড়ে বসে। লিলি লজ্জায় রাঙা হয়ে থরথর কাঁপতে থাকে যেন কোনো অচেনা লোকের সামনে ও দাঁড়িয়ে আছে। কায়েস হঠাৎ খেয়াল করলো লিলির মেঘবরণ চুলের খোঁপাটা ফুল ছাড়া বড্ড  প্রাণহীন লাগছে।

ঃ এই রে! আমি যে একদম খালি হাতে এসেছি, প্রেয়সীকে খালি হাতে প্রপোজ করলে ভালোবাসার অপমান হবে।

একটু অপেক্ষা কর, আসছি আমি। বলে দৌড়ে রাস্তার ওপাশে ফুলের দোকান থেকে দুহাত ভরে গোলাপ নিয়ে একগাল হেসে লিলির কাছে আসছিল। নীল পাঞ্জাবিতে বেশ মানিয়েছিল কায়েসকে। হঠাৎ কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবকের বেপরোয়া গতির গাড়ি কায়েসের জীবনের গতি চিরজীবনের জন্য স্টপ করে দিল। ওদের  আর ভালোবাসার ট্রেনে চড়া হলো না।

তাহিন আর অদ্রিজা ছলছল চোখে মাকে জড়িয়ে ধরে।

শিউরে ওঠে কিছুটা।

অরুপ অন্যমনস্ক হয়ে বলেই যায় ঃ মৃত্যুর পরেও যে আত্মা তার ভালোবাসার জন্য এতোটা তৃষ্ণার্ত থাকে, এতোটা আকুতি নিয়ে আজও অপেক্ষা করে তাকেই বোধ হয় শুদ্ধ প্রেম বলে।

অদ্রিজার মা নয়, বাবার জন্য ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো।

বাবা সব জেনেশুনে মাকে এখনও এতোটা ভালোবাসে! কি করে এতো শক্তি পায়!!! এমন প্রেমিক কি আজও আছে! অদ্রিজা বাবার বুকে মাথা রেখে ধরা গলায় বলে ঃ তাহিন আমি বাবার মতো এমন বিশাল হৃদয়ের প্রেমিক চাই। পারবে এতটা উদার হতে?

বাবা মেয়ের মাথায় আদরের পরশ বুলিয়ে ম্লান হেসে লিলিকে দেখেন।

আজও চুলে গোলাপ পরা হলো না তার। কায়েসের দেওয়া সেই মনিপুরী চাদর শরীরের সাথে লেপ্টে খোলা চুলে বিষণœতার নেকাবে ঢেকে আছে মিষ্টি মুখটা। অরুপ পরম মমতায় লিলির হাতটা শক্ত করে ধরতেই ওর চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।

এই অশরীরী আত্মা যেন এখনো দম্ভের সাথে ওদের মাঝে বিরাজ করছে। অরুপের বড্ড অপ্রতিরোধ্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয় ওকে। শারীরিকভাবে উপস্থিত না থেকেও লিলির পুরোটা জুড়ে যেন কায়েসেরই বসবাস এখনও।

লিলি শূন্য বেঞ্চের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। কায়েস তৃষ্ণার্ত চোখে বলে ঃ এভাবে আমাকে তোমার হৃদয় গহীনে লুকিয়ে রেখো। ঐ হৃদ প্রকোষ্ঠের উষ্ণতা ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না লিলি।

  লেখক : গল্পকার, পুলিশ পরিবারের সদস্য

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *