ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

সংকলন: প্রান্ত সেলিম

আজকে আমরা মানবিক পুলিশ ইউনিট এর পক্ষ থেকে এসেছি অসহায় দুইজন মহিলার নিকট। উনাদের একজন মেনুকা রানি দাস উনার মেয়ে হচ্ছেন কাঞ্চন মনি দাস, উনার স্বামীর নাম হচ্ছে দেবেন্দ্র দাস। স্বামী আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে মারা যায়। ত্রিশ বছর পর উনার সন্তান বলতে দুই ছেলে, এক ছেলে নিরুদ্দেশ, আরেক ছেলে মায়ের কোনো খোঁজ খবর রাখে না। আলাদা বা অন্য কোথাও থাকে। এখন এই দুই অসহায় মানুষ, মানবেতর জীবন-যাপন করে। এই দুই অসহায় প্রাণী থাকে জরাজীর্ণ একটা ঘরে। আমরা কে রাখি কার খবর, শুধু নিজের উন্নতির পিছনেই আমরা শুধু ছুটছি। কয়জন রাখি আমরা এসমস্ত মেনুকা রানি দাস আর কাঞ্চন রানি দাসের খবর। ছবিতে যে বাসাটা দেখছেন এটা হচ্ছে এই দুইজন মানুষের ঘর। কত বছর আগে থেকে জরাজীর্ণ, ভেতরে যাওয়ার অবস্থা নাই সেটা বুঝতেই পারছেন। একটু বৃষ্টি আসলেই হাওয়া তুফান লাগবে না, বৃষ্টি আসলেই পড়ে যাবে, এই হলো ঘরের অবস্থা। এরপরে উনারা রান্না করে খায়, রান্না করার দুটো পাতিল। একটিতে তরকারি আরেকটিতে ভাত যদি কখনও উঠে আর কি। আর কিছুই নাই। ছাদ তো দূরের কথা। এটিই হচ্ছে রান্না ঘর। আর বাথরুম হচ্ছে ঐ খোলা আকাশের নিচে। জায়গা সম্পদ বলতে এই ছোট্ট ভিটাটুকু। আর এই ঘর খুবই নড়বড়ে এককথায় পড়ে যাচ্ছে উনাদের গায়ের উপরে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে ভেঙে পড়বে।

নতুন যে ইয়ং তরুণ সমাজ অনেকেই আসমানীদের ভেন্না পাতার ছাউনি যে কবিতা পড়ে এসেছে, তোমরা যদি দেখতে চাও সেই আসমানীদের তা দেখতে আর খুব দূরে যাওয়া লাগবে। এই ভিডিও চিত্রের মধ্যে অনেকে দেখতে পাবেন। অনেক দু:খের বিষয় যে উনারা কিন্তু কাউকে বলতেও পারে না উনাদের যে অসহায়ত্ব! আরও আশ্চর্য হয়ে যাবেন আমি উনাদের নাম জিজ্ঞাসা করেছি প্রতিবেশী থেকে। উনি কানে শোনে না আর উনি বলতেও পারে না। উনাদের এতো দুর্বিষহ অসহায় অবস্থা। উনারা যে উনাদের নাম বলবে সে অবস্থাটুকু উনাদের মধ্যে নেই। বয়স শত মনে হয় পেরিয়ে গেছে যতটুকু ধারণা করছি। উনাদের যে অবস্থা কারও কাছে বলা তো দূরের কথা আসলে নীরবে নিভৃতে একদিন ঘরের মধ্যে মরে পরে থাকলে যদি দুর্গন্ধ বের হয় তাহলে কেউ বুঝতে পারবে এখানে মানুষ মারা গেছে। আমরা যদি এইটার সতত্যা যাচাই করি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তাহলে ভালো হয়।

আপনার নাম কি?

প্রতিবেশী: আমার নাম হচ্ছে আদুরি রানী মনি দাস।

আদুরি রানী মনি দাস, আপনার স্বামীর নাম কি?

প্রতিবেশী: মতি লাল মনি দাস।

এই যে অসহায় পরিবারটা তাদের যে একটা ছেলে সন্তান কোথায় থাকে, নিরুদ্দেশ?

প্রতিবেশী: ভারতে।

আরেকটা ছেলে খোঁজ খবর রাখে না?

প্রতিবেশী: না, রাখে না।

এই অসহায় পরিবারটা এভাবে কারোর সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া এভাবেই, এটা সত্যি তো? এই যে অসহায় পরিবারটা?

প্রতিবেশী: সত্য, এই ঘটনা সত্য।

এই যে অসহায় পরিবারটা ওরা যা বলছে আসলে তো সত্য এইটা?

প্রতিবেশী: হ্যা, সত্যি।

আসেন এদিকে আসেন কি নাম আপনার?

প্রতিবেশী: স্বর্ণাকার মনি দাস

স্বর্ণাকার মনি দাস, এইটা হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার বাদ্যপাড়া গ্রাম। এই মহিলা দুজন অসহায়। উনি যা বলছে আপনারা আমাদেরকে নিউজ দিয়েছেন উনার তো কেউ নেই তিন কূলে আর খুব অসহায় অবস্থায় আছে?

প্রতিবেশী: না কেউ নেই, সত্যি, খুব অসহায়।

এরা খুব অসহায় অবস্থায় আছে। আপনার নাম কি?

প্রতিবেশী: জয়তুন মনি দাস।

জয়তুন মনি দাস, উনি যে অবস্থায় আছে অসহায় পরিবারটা এটা সবকিছু কি সত্যি?

প্রতিবেশী: সত্যি, সত্য এইটা।

ভাই সবকিছূ কি সত্যি মনে হচ্ছে? মানে উনারা যা বলছে বা আপনাদের পাড়ায় এই অবস্থায়-

প্রতিবেশী: সব সত্য।

এটা তো সব সত্য না কি?

প্রতিবেশী: সত্য।

ঠিক আছে। আসলে আমরা যে কতোটা অসহায় অবস্থায় এ পরিবারটাকে দেখেছি। তো এখানে সর্বপ্রথম আমাদের টাঙ্গাইল পিটিসি’র জসিম স্যার উনি প্রথম আসেন আমার আগে। উনি আসার পরে উনি যেটা দেখেছেন আসলে উনার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে। মানুষ কতোটা অসহায় হতে পারে। তো আপনার কাছ থেকে শুনি।

প্রথম দেখে আপনার কি মনে হয়েছে স্যার?

জসিম স্যার: আসলে আমি যখন প্রথম আসি, এসে দেখি যে এই আন্টি ঐ ঘরের মধ্যে বসে আছে। আশে পাশে লিটনসহ আরো অনেকেই ছিলো তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছি যে উনার থাকার জায়গা কি এটা? ওরা বলেছে যে হ্যা এটাই। এটাই উনার থাকার জায়গা। এর সাথে আরো বলেছে যে সাথে একটা পাগলি মেয়ে আছে, পরে উনাকে এনেছে। উনাকে জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু অন্যারা বলেছে যে উনি কথা বলতে পারে না। হ্যা কথা বলতে পারে না। উনিও তো কথা বলতে পারে না কানে তো কিছু শোনেও না। তারপরে প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করলাম যে আসলে উনাদের কে কে আছে? তো তারা বলেছে যে একটা ছেলে ভারতে চলে গেছে। আরেকটা আছে, কিন্তু সে কোনো খবর রাখে না। তখন আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে তাহলে এরা খায় কিভাবে? উনারা চলে কিভাবে? তো বলেছে যে উনারা মানুষের কাছে চেয়ে চেয়ে গোবর – টোবর ফেলে খায় এইসব।

ঠিক আছে, ধন্যবাদ।

আসলে আমরা খুবই দু:খজনক একটি কথা, হৃদয় বিদারক কথা যে যে কেউ যদি দেয় তাহলে খায় আর যদি কেউ না দেয় তাহলে এভাবেই উনারা পড়ে থাকে। তো আমরা আসলে কেউ উনার যে মেয়ে গোবর ফেলে তো যদি কেউ দেয় খায় না দিলে এখানেই পড়ে থাকে। এটা আমাদের জন্য একটা লজ্জাকর বিষয় যে আমরা অনেক ভালো মন্দ খাচ্ছি বা এই যে আগামীকাল থেকে শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসব শুরু হবে আর এই অসহায় দুজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী অসহায় বৃদ্ধ মানুষ তারা নীরবে এখানে পড়ে থাকবে তাদের আসলে কোনো ধরনের সক্ষমতা নাই পূজাই বা কি জিনিস আর সাধারণ দিনই বা কি জিনিস। আমি অনুরোধ রাখবো যে এই সমাজের যারা বিত্তবান আছে তারা এই অসহায় পরিবারটির পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দাঁড়াবেন। তবে উনার একটি সন্তান ভারতে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে আরেকটা সন্তান থেকেও না থাকার মতো অন্যত্র চলে গিয়েছে খোঁজ খবর রাখে না। আমরা মানবিক পুলিশ ইউনিট এর আমরা যে পুলিশ সদস্যরা আছি আমরা আমরা এই পুলিশ সদস্যরাই উনাদের সন্তান। আমরা কিন্তু এই দায় এড়িয়ে যাবো না।  আমরা শুধু চিন্তা করি এটাই যে আমরা আমাদের গায়ে যে পবিত্র পোশাক আছে এই পোশাক এই জনগণকে রক্ষা করার জন্য। এই জনগণের জন্যই আমাদের বাংলাদেশ পুলিশ। সেই ধারাবাহিকতায় সেই আমাদের স্লোগান- ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’ সেই ধর্মটাকে আমরা উজ্জীবিত রাখার জন্য এই অসহায় দুই বয়স্ক মানুষের সন্তান আমরা পুলিশ সদস্যরাই হলাম। আমরা কথা দিয়ে যাচ্ছি আজকে আমরা মিস্ত্রি ডেকেও নিয়ে আসছি আমরা এই ঘরটা কনট্রাক্ট দিবো। এই ঘরটা ভেঙ্গে সুন্দর করে যাতে নতুন ঘর উঠিয়ে দেয়। আমরা মানবিক পুলিশ ইউনিটের পক্ষ থেকে এই কাজটা আমরা করবো আর উনাদের জন্য কয়েক মাসের চাল ডাল তেল এবং নতুন কাপড় যাতে অন্তত এই পূজায় এই ছেঁড়া কাপড় পড়ে ঘরের মধ্যে শুয়ে না থাকে। এই জন্য আমরা উনাদের এই নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা ইনশাল্লাহ করবো। আসলে আমরা যেটা চিন্তা করি যে একজন অসহায় মানুষ তার অসহায়ত্বটাই সবচেয়ে বড় কথা। উনি যে করুণ অবস্থার মধ্যে আছে সেটাই আমাদের কাছে বড় কথা। ধর্ম বর্ণ গোত্র এটা আমাদের কাছে কিছু না। আমি মুসলিমের ছেলে উনি হিন্দু মা তাতে কি এসে যায়? উনার যে রক্ত কাটলে উনারও লাল রক্ত আসবে আমারও লাল রক্ত আসবে। তাহলে আমরা তো সবাই মানুষ। আগে তো মানুষের মনুষত্ব তারপর না হয় অন্য কিছু আসে। আমরা সেই নিরিখেই উনাদের জন্য ইনশাল্লাহ কয়েক মাসের অন্তত খাবার, ফল, নতুন কাপড় পূজা উপলক্ষ্যে এবং এই ঘরটা এখন মিস্ত্রি আসছে মিস্ত্রির সাথে কথা বলে কন্ট্রাক্ট দিয়ে দিবো। এই ঘরটায় সুন্দর করে উনাদেরকে উঠিয়ে দিবো। যাতে এই ঘরটা উনাদের গায়ের ওপর ভেঙে না পড়ে যায়। আর এতোদিন যাবৎ কোনো মানুষ সহায়তার চোখে এই জিনিসটা পড়ে নাই আর বাংলাদেশের বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের যারা জনপ্রতিনিধি উনাদের প্রতি আহ্বান করবো আপনাদের মানুষ অনেক সম্মান করে শ্রদ্ধা করে আপনাদেরকে মনের মণিকোঠায় রেখে তারা জনপ্রতিনিধি বানায় আপনারা এই জিনিসগুলো খুব কাছ থেকে দেখবেন। এটাই আশা করি। আর আমাদের এই দুই অসহায় মা’কে আমরা যখন নতুন ঘরটা দিবো তখন ইনশাল্লাহ আপনাদের দেখাবো যে উনাদের পাশে বাংলাদেশ পুলিশ কিভাবে আছে এবং উনাদের সন্তান হয়ে আমরা রইবো। ধন্যবাদ সবাইকে। সবার মানবতাবোধ জাগ্রত হোক। মানবিক পুলিশের পক্ষ থেকে আসসালামু আলাইকুম।

সূত্র: ফেসবুক, প্রকাশ, ৩১ ডিসেম্বর ২০২০

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *