ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

আয়েশা সিদ্দিকা পিপিএম

প্রশ্নঃ সাইবার ক্রাইম কাকে বলে? (What is Cyber Crime in Bangla) সাইবার অপরাধের শিকার হলে করণীয় কি?

উত্তরঃ সাইবার ক্রাইম, সাইবার অপরাধ বা কম্পিউটার অপরাধ, এমন যে কোনো ধরণের অপরাধ, যেখানে একটি কম্পিউটার (Computer) নেটওয়ার্ক (internet) বা ইন্টারনেট সংযুক্ত ডিভাইজ (device) অপরাধের সাধন (object) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

একটি কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে যদি কারো ব্যক্তিগত তথ্যের অবৈধ ব্যবহার, copyright infringement, ঠকানো, personal data চুরি, hacking, phishing, spamming বা privacy theft এবং এগুলির মতো অপরাধ করা হয়, তাহলে একে বলা হয় “cybercrime”. Cybercrime কে computer-oriented crime ও বলা যেতে পারে। কারণ, এই ধরণের অপরাধে একটি computer device অবশ্যই ব্যবহার করা হয়। এই ধরণের অপরাধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সহজে লাভ আয়ের উদ্দেশ্যে এবং ডাটা চুরির করার উদ্দেশ্যে করা দেখা গেছে। যেমন, কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্য চুরি করা, তথ্যর ভুল ব্যবহার করা, কারো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যকে দিয়ে দেয়া।

সাইবার অপরাধের শিকার হলে করণীয়

সাধারণত সাইবার অপরাধের নানা ধরনের হয়রানীর শিকার হতে পারেন:

ফেসবুক বা ইমেইল একাউন্ট হ্যাক হওয়া, ফেক আইডি খুলে আপত্তিকর ছবি/ভিডিও শেযার, উগ্রধর্মীয়-সন্ত্রাসবাদী কনটেন্ট শেয়ার, অন্যকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে তার বিকৃত তথ্য ও ছবি ব্যবহার, হুমকি দিয়ে টাকা আদায়, অনলাইনে প্রশ্নফাঁস ইত্যাদি।

সাইবার অপরাধের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করবেন

০১। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ করতে পারেন আপনার নিকটস্থ থানায়। অথবা,

০২। ই-মেইলে অভিযোগ জানাতে পারেন cyberunit@dmp.gov.bd এবং acdfcc.ct@dmp.gov.bd এই ঠিকানায়। অথবা,

০৩। যদি পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করতে চান তাহলে Google Play Store থেকে ডাউনলোড করে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশন এর Hello CT অ্যাপ। এ অ্যাপ ব্যবহার করে পাঠাতে পারবেন আপনার ব্যক্তিগত তথ্য। অথবা,

০৪। সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলে চলে আসতে পারেন ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের Cyber Crime Unit অফিসে। কথা বলতে পারেন দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে। ঠিকানাঃ ৩৬ শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী স্মরণী, রমনা, ঢাকা।

কিভাবে অভিযোগ করবেন

ভিক্টিমাইজড হলে যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ জানানো উচিত। অভিযোগ করার ক্ষেত্রে আপনার অভিযোগের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণাদি প্রয়োজন। যেমন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলামতের স্ক্রীনশট, লিংক, অডিও/ভিডিও ফাইল অথবা রিলেটেড ডকুমেন্টস। স্ক্রীনশট সংগ্রহের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন Address Bar এর URL টি দৃশ্যমান হয়। Hello CT অ্যাপ ও ই-মেইল এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে চাইলে এসব কন্টেন্ট এটাচ করে আপলোড করতে পারেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে সরাসরি সফট কপি দেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি আপনি প্রয়োজনে Cyber Crime Unit এর অফিসারদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন যা আপনার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সহায়ক হতে পারে।

প্রশ্নঃ মুঠোফোনে অপরাধের শিকার হলে আপনার করণীয় কি?

উত্তরঃ দিন যত যাচ্ছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মান তত আধুনিক হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। মুঠোফোনে বিরক্ত কিংবা যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হলে নির্দিষ্ট আইনে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সম্ভব এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তির শাস্তি পেতে হবে। সিম কার্ড বা মুঠোফোনের নতুন সংযোগের মালিকানা অর্জন, মালিকানা পরিবর্তন, নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত তথ্য সংস্করণ করা প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মকানুন রয়েছে। এ আইন মানা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে মুঠোফোনের সিম নিবন্ধন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে সহজে মুঠোফোনের মাধ্যমে অপরাধ সংগঠনকারী ব্যক্তিকে সহজেই বের করা সম্ভব হচ্ছে, যদিও সিম নিবন্ধন নিয়েও একধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। মুঠোফোন-সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের অপরাধের বিচার চাওয়ার সুযোগ আইনে রয়েছে।

সুনির্দিষ্টভাবে মুঠোফোন অপরাধ সংঘটিত হলে সাজার পরিমাণ কী হবে, তা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০১০)-এ বলা আছে। কেউ অশ্লীল কোনো ছবি বা বার্তা মুঠোফোনে আদান-প্রদান করলে ৬৯ ধারা ক, খ দফায় বলা আছে, ওই ব্যক্তিকে দুই বছরের কারাদন্ড অথবা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় সাজা ভোগ করতে হবে। এ ছাড়া ৬৯ ধারার গ-তে বলা হয়েছে, কেউ যদি চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে খুদে বার্তা বা কল করে হুমকি দেয়, তবে তার পাঁচ বছর জেল অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদন্ড প্রদান করা হবে।

৭০ ধারায় বলা হয়েছে, ফোনের মাধ্যমে কাউকে বিরক্ত করলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদন্ড প্রদান করা হবে। কারও ফোনে যদি আড়ি পাতা হয়, তবে ৭১ ধারায় বলা হয়েছে, দুই বছরের কারাদন্ড অথবা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের অতিরিক্ত কারা ভোগ করতে হবে। এই আইনের ৯৭ ধারার ক-তে বলা হয়েছে, সরকার যদি মনে করে, তবে সে ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজনে যেকোনো সময় যে কারও মুঠোফোনে আড়িপাতার অধিকার সরকারের আছে। এ আইনের ৬৬ ধারায় বলা আছে, কাউকে উদ্দেশ করে যদি মিথ্যা বার্তা পাঠানো হয়, সে ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কারাদন্ড অথবা ১০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে। মুঠোফোনের মাধ্যমে কোনো আপত্তিকর বা অশালীন কোনো ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনেও প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

মুঠোফোনে অপরাধের শিকার হলে কীভাবে প্রতিকার চাইতে হবে

এ আইনে প্রতিকার চাইতে হলে অপরাধের শিকার ব্যক্তি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের নিকট তাঁর অভিযোগ লিখিতভাবে জানাতে পারেন। কমিশন এ অপরাধের তদন্ত সাপেক্ষে থানায় গ্রাহকের পক্ষে মামলা করতে পারে। এ আইনের আওতায় অপরাধের বিচার হয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে প্রথম শ্রেণির বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আদালত কোনো পরিদর্শক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো লিখিত প্রতিবেদন ছাড়া অপরাধের বিচার শুরু করবেন না। অপরাধের অভিযোগ গঠনের দিন হতে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রশ্নঃ সহ অপরাধীর দোষ স্বীকারোক্তি কি?

উত্তরঃ কোন অপরাধী যদি নিজেকে ও অন্যকে জড়িয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করে তাহলে আদালত এই স্বীকারোক্তি অপর লোকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন। সাধারণত কোন মামলায় যদি একাধিক আসামী থাকে তাহলে কোন আসামী তার নিজের দোষ স্বীকার করলে অন্য আসামীর ও নাম বলে দেয়। আসামীর এই অপরাধটি করতে কারা তাকে সহযোগিতা করেছে তা তদন্তের সময় সামনে চলে আসে। আসামী যদি তার নিজেকে না জড়িয়ে শুধু অপর লোকের নাম উল্লেখ করে স্বীকারোক্তি প্রদান করে তবে এই স্বীকারোক্তির কোন মূল্য নাই। সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এর ৩০ ধারায় একজন অপরাধী লোকের অপরাধ স্বীকারোক্তি যখন অপর অপরাধী লোকের বিরুদ্ধে প্রমান করার জন্য ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী একই অপরাধে একাধিক অপরাধীর যখন যৌথভাবে বিচার করা হয়, তখন সহ আসামীর নিজেকে ও অন্যকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদালত অন্য আসামীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য বিবেচনা করতে পারেন। আদালত ব্যবহার করতে পারেন আর ব্যবহারে জন্য বিবেচনা করতে পারেন এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য আছে। আদালত পারিপার্শিক অবস্থা অনুযায়ী তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বলে এই বিবেচনা করবেন। ৩০ ধারা অনুযায়ী এই যৌথ বিচার এই অপরাধের বা তার সহায়তার বা অপরাধটি করার প্রচেষ্টার জন্য হতে হবে। যদি পৃথক বিচার অনুষ্ঠিত হয় তাহলে এই দোষ স্বীকারোক্তি অপর লোকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।

সহ আসামীর অন্যকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সাক্ষ্য মূল্য দুর্বল প্রকৃতির। এই জাতীয় বিবৃতি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও অন্যান্য সমর্থন মূলক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত না হলে এর ভিত্তিতে অন্য লোককে সাজা প্রদান করা যায় না। সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারার (খ) উদাহরণে বলা হয়েছে যে, সহযোগীর বিবৃতি যদি প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দ্বারা সমর্থিত না হয় তবে তা বিশ্বাসের অযোগ্য। আবার সাক্ষ্য আইনের ১৩৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, দুঙ্কর্মের সহযোগীর (Accomplice) সাক্ষ্য শুধু গ্রহণীয় ই নয়, তার ভিত্ততে আসামীকে সাজা দেয়া যায়। এই ক্ষেত্রে আইনবিদরা এই দুটি ধারাকে একত্রে বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে দুঙ্কর্মের সহযোগীর সাক্ষ্য অন্যান্য সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। অপরাধ এবং প্রতিটি অপরাধীর কার্যকলাপ সম্পর্কে সমর্থন মূলক সাক্ষ্য থাকতে হবে।

সহ আসামীর বিবৃতি দুর্বল প্রকৃতির সাক্ষ্য বিধায় শুধুমাত্র এর উপর ভিত্তি করে অপর আসামীকে শাস্তি প্রদান করা যায় না। 

(সংগৃহীত-চলবে)

প্রতিবেদক : পুলিশ সুপার, গোপালগঞ্জ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *