ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জান্নাতুন নিসা

সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে প্রতি শতাব্দী অন্তর প্রকৃতির অগ্নিমূর্তি আমাদের দেখতে হচ্ছে। কিন্তু কেন এমনটি ঘটছে! প্রায় প্রতি শতাব্দীতেই বিশ্ব অর্থনীতি একবারের জন্য হলেও ধসের মুখে পড়ছে। এর কারণ কি আমাদের কারও জানা নেই! না কি আমরা জানতে চাইছিনা। প্রকৃতির এই রুদ্র চেহারা কি আমাদের একটুও ভাবাচ্ছে না! প্রাচীন যুগে মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য শিকারের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখনও ছিলো সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত, প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু প্রভৃতি রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। আর ২০২০ সালে এসে বিশ্ববাসী নভেল করোনাভাইরাস নামক এক অণুজীবের বিভৎস চিৎকারে স্তব্ধ হয়ে আছে। তাই বলা চলে বিশাল এই সৃষ্টি জগতে যেমন রয়েছে দানবাকৃতি পশু-পাখি কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত মানবের আধিপত্য তেমনি রয়েছে ক্ষুদ্র্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস। যুগে যুগে মরণঘাতি বিষাক্ত এই ভাইরাস পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টিকে করেছে বিপর্যস্ত। সেক্ষেত্রে এই অণুজীব খুব সাধারণ কিছু তো নয়-ই বরং কখনও কখনও তা হয়ে উঠে বিশ্ব মহামারীর কারণ।

মানবসভ্যতা যত উন্নত হয়েছে, মহামারিও তত শক্তিশালী হয়েছে। নিশুতি রাতে জোনাকজ্বলা পথে প্রদীপ ছাড়িয়ে ফিলামেন্টের আলো জ্বালাতে আমরা বড্ড বেশি অত্যাচার করে ফেলেছি প্রকৃতির উপর। কার্বনে ছেয়ে দিয়েছি পৃথিবী, উষ্ণায়নে পূর্ণ করেছি বাতাস। ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্সিংয়ে প্রকৃতি আজ নিজেই সজাগ হয়েছে। ভয়াবহ একটি সংক্রামক ভাইরাস করোনাভাইরাস, যা কিনা কোভিড-১৯ নামের পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশ্বময়। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই কোভিড-১৯ কে বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে। আমাদেরও তাই হয়তো প্রকৃতির সেই ব্যালেন্সিংয়ের অংশীদার হতে করতে হচ্ছে স্যোসাল ডিসট্যান্সিং।

রাজার মুকুটটি কার মাথায় থাকবে এ নিয়ে যখন গোটা বিশ্ব অন্যায়, অবিচার, দূষণসহ নানা মাত্রায় অসহনীয় দাপটযজ্ঞ চালাচ্ছে হরদম, ঠিক তখনই পৃথিবীতে প্রকৃতির দাপটের মুকুট হয়ে এসেছে করোনা। ল্যাটিন শব্দ করোনা থেকে করোনাভাইরাস নামটির উৎপত্তি, যার অর্থ মুকুট। নির্মম হলেও সত্যি কেউ আর আজ মাথায় মুকুট নিয়ে রাজাধিরাজ হতে চাইছে না, বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকৃতির ক্রোধ সংবরণ করতে চাইছে। অথচ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে শীতল গালিচায় চেপে সমগ্র বিশ্ব জয় করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে করোনাভাইরাস। শুধু তাই নয়, করোনাভাইরাস রাইবোভিরিয়া পর্বের নিদুভাইরাস বর্গের করোনাভিরিডি গোত্রের অর্থোকরোনাভিরিন্যা উপ-গোত্রের সদস্য। যার নিউক্লিওক্যাপসিড সর্পিলাকৃতির এবং এর জিনোমের আকার সাধারণত ২৭ থেকে ৩৪ কিলো বেস-পেয়ার (kilo base-pair) এর মধ্যে হয়, অর্থাৎ আরএনএ ভাইরাসের মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ।

এ ভাইরাসটি ১৯৬০-এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে এটি প্রথম দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কাছাকাছি দুই ধরণের ভাইরাস পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি হলো-১. মনুষ্য করোনাভাইরাস ২২৯ই এবং ২. মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি৪৩। ২০০২ সালে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স (সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামের ভাইরাসটিও ছিলো এক ধরণের করোনাভাইরাস। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ভাইরাসটির আরো বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-২০০৩ সালে ‘এসএআরএস-সিওভি’, ২০০৪ সালে ‘এইচসিওভি এনএল৬৩’, ২০০৫ সালে ‘এইচকেইউ১’, ২০১২ সালে ‘এমইআরএস-সিওভি’ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে চীনে এসএআরএস-সিওভি-২’ পাওয়া যায়। প্রথম দিকে ভাইরাসটি চায়না ভাইরাস, করোনা ভাইরাস, ২০১৯ এনকভ, নতুন ভাইরাস, রহস্য ভাইরাস সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলো। যা পরবর্তী সময়ে নোভেল করোনাভাইরাস নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের একটি প্রজাতির সংক্রমণ দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০১৯- এনসিওভি নামকরণ করে। আর সবশেষ আমরা পাই করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯-এর সংক্ষিপ্ত রূপ কোভিড-১৯।

স্রষ্টার অপার মহিমায় সৃষ্টির সুদীর্ঘ ছায়াতলে আমরা অতিক্রম করেছি প্রায় ৪৫০ কিংবা পাঁচশত কোটি বছর। অতিক্রান্ত এ সময়ে পৃথিবী আমাদের দিয়েছে দু’হাত ভরে, যা কিছু আশির্বাদ কিংবা মঙ্গলময়। পক্ষান্তরে আমরাও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব-বিবেকসম্পন্ন প্রাণী হয়েও পৃথিবীকে উজার করেছি আপন দু’হাতে; প্রকৃতির পেয়ালা পূর্ণ করেছি বিষ ঢেলে। প্রকৃতি শতাব্দী অন্তে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কোভিড-১৯ এর ভয়াল আঘাতে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিচ্ছে বিশ্ব। ভেঙে ফেলছে শিল্প, অর্থ, শিক্ষা, পর্যটন, স্বাস্থ্য সহ সমস্ত সেবার খুঁটি। পৃথিবী যেনো থমকে আছে প্রকৃতির মহাপ্রলয়ঙ্করি উন্মাদনা দেখবে তাই। আধুকায়নে মত্ত হয়ে শত-সহস্র প্রাণীর আবাস ধ্বংস করে প্রকৃতিকে কোণঠাসা করে আকাশ-বাতাস, সাগর-পাহাড় জয় করা মানুষ করোনাভাইরাসের মৃত্যুগ্রাসে অসহায় আর বন্দি। বিশ্বায়নের নামে লাগামহীনভাবে প্রকৃতির প্রতি অবিচার, বৃক্ষনিধন, অবৈধ নগরায়ন, প্রকৃতি বিরোধী কল-কারখানা স্থাপনের ফলে প্রকৃতি হারিয়েছে তার নিজস্ব রূপ; হয়ে উঠেছে রুষ্ট। বিজ্ঞানীরা বলছেন করোনার সংক্রমণ আসলে নাকি প্রকৃতির প্রতিশোধ। হাজার বছর ধরে সহ্য করা বঞ্চনার প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি। বিবর্তনের ধারায় এবং মানুষের সচেতনতার অভাবে প্রকৃতি বদলে ভাইরাসরা অনেক আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। নিজেদের প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন উৎস খুঁজে নিচ্ছে। মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধের শক্ত দেয়াল ভেঙে ফেলার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বদলও ঘটিয়ে ফেলছে। এই রোগকে থামানোর প্রতিষেধক তৈরির আগেই তাকে প্রতিরোধ করার কৌশল আয়ত্ত করে নিচ্ছে ভাইরাস।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টর্ণেডো, হারিকেন, সুনামি, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে করেছে অসহায়। আদিমকাল থেকেই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি কখনও। বড়জোর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো কিছুদিন ঠেকিয়ে রেখেছে মাত্র। যেমন-প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর পরিণতি সামলে ওঠার মাঝেই বিশ্বজুড়ে মহামারি হয়ে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ফ্লু। মৃত্যু হয় প্রায় দশ কোটির কাছাকাছি মানুষের। সেই ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল বিশ্ববাসীকে। ১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অর্থোমিক্সোভিরিডি পরিবারের একটি প্রাণঘাতী ভাইরাল স্ট্রেন দাপট দেখিয়েছিল গোটা বিশ্বে। সেই সংক্রমণ থামলেও কিন্তু শেষ হয়নি। ১৯৫৭-৫৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস (টাইপ-এ, এইচ২এন২)-এর প্রভাবে এশিয়াতে ১০-১৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই মহামারীর নাম ছিল ‘এশীয় ফ্লু’। সুনামির সময়েও বড় বিপর্যয় হয়েছিল পৃথিবীতে। প্রকৃতির সেই রোষও সামলে ওঠা গিয়েছিল। তবে তার প্রভাব রেখে গিয়েছিল বিশ্বে। কোথাও একটা ভিত নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। সেই সুনামি কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কোভিড-১৯। বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা এখনও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উৎসের কিংবা এর টিকা অর্থাৎ প্রতিষেধক তৈরির কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। অন্যদিকে আমরা জানি ১৯২০ সালে স্কটল্যান্ডের উইলিয়াম ওগিলভি কারম্যাক ও আন্ডারসন গ্রে ম্যাককেন্ড্রিক মহামারীর চরিত্র বোঝাতে একটা মডেল তৈরি করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, ‘যে কোনও মারণ রোগজনিত মহামারীকে থামানো গেলেও শেষ করে ফেলা যায় না। কারণ মানুষের শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে যায় সেই জীবাণু। হয়তো তার প্রভাব কমে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী মানুষ। তাদের অসচেতনতা এবং অসংযমী জীবনযাত্রা। কিছু বছরের জন্য সেই রোগের প্রভাব থেমে গেলেও একটা সময় সে ফের মাথা চাড়া দেয়। তখন তার প্রভাব হয় আরও বেশি প্রাণঘাতী। কারণ ততদিনে বিবর্তনের সেই চরম পর্যায়ে চলে যায় জীবাণুরা।’ এবিষয়ে ফ্রান্সের বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ফ্রাঙ্কোসিস ব্রিকেয়ার বলেন, ‘সংক্রমণ থামে না, একটা বিরতি নেয় মাত্র। যদি মানুষ রোগ পুষে রাখে তাহলে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর বাদে ফের সেটা মাথা চাড়া দেয়। সেই সময় আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে ভাইরাসের সংক্রমণ।’ অস্ট্রেলিয়ার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ শ্যারন লেউইন বলেন, ‘ভাইরাস ফের মাথাচাড়া দেবে কিনা সেটা বলা যাচ্ছে না। সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ডোম) ভাইরাসের সংক্রমণও ঠেকানো গিয়েছিল, কিন্তু রোখা গেল কি? সার্সও বিটা-করোনারই এক পরিবারের সদস্য। সেই পরিবারেরই অন্য সদস্য সার্স-কোভি-২।’ সেক্ষেত্রে বলতেই হচ্ছে করোনাভাইরাস, অনবরত জেরার মুখে অতীত খুঁড়ে বের করে আনা শত ব্যাথার প্রতিচ্ছবি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘চীন যদি প্রথমেই ভাইরাসের সংক্রমণের কথা বিশ্বকে জানিয়ে দিত, তাহলে এত বড় বিপর্যয় হত না। এতদিনে হয়তো সেই ভাইরাসকে দমন করার উপায় আয়ত্ত করে ফেলা যেত।’ আর বিশ্বজীবনকেও পার করতে হতো না এমন গৃহাবদ্ধ অবস্থা। সত্যিই এ যেনো অন্ধকারের অতল গহ্বরে বিবর্ণ মৃত্যুর অপেক্ষায় বেঁচে থাকা।

জেনেভা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল হেলথ বিজ্ঞানী ফ্লহল্ট বলছেন, ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সকলের সমান হয় না। যাকে হার্ড ইমিউনিটি বলে অর্থাৎ এক শ্রেণির লোক ঠিক সময় ভ্যাকসিন বা ড্রাগ নিয়ে নিজেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ফেলেন। কিন্তু সেই সংখ্যা সীমিত। সংক্রমণ তখনই মহামারীর চেহারা নেয় যখন একজন আক্রান্তের থেকে আরও অনেকে সংক্রামিত হন। একজন রোগীর থেকে যদি পাঁচজন সুস্থ মানুষ আক্রান্ত হন তাহলে সেই অনুপাত বাড়তে বাড়তে বিশাল চেহারা নেয়। চীনের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে। সেখানকার বিপুল জনসংখ্যা, তাদের খাবারের ধরণ, একগুঁয়ে মনোভাব এবং সংক্রমণ চেপে রাখার মানসিকতার কারণেই এখন বিশ্বে মহামারি হয়ে গেছে কোভিড-১৯। সংক্রমণ তখনই কমবে যখন সঠিক কোয়ারেন্টিন চলবে, সংক্রমণ রোখার ভ্যাকসিন আসবে ও সামাজিক মেলামেশায় লাগাম পরানো যাবে। একজন আক্রান্তের থেকে যদি মাত্র একজনই সংক্রামিত হন, তাহলে বিপুল হারে সংক্রমণ থামানো সম্ভব হবে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এমার্জেন্সি এক্সপার্ট মাইক রায়ানের মতে, ‘লকডাউন ভালো কিন্তু কার্যকরী নয়। গণজমায়েত বন্ধ করে পরস্পরকে দূরে রেখে সংক্রমণ ঠেকানো সব সময় সম্ভব হয় না। কারণ এমনও হতে পারে ভাইরাসের উপসর্গ কারও মধ্যে ধরা পড়েনি অর্থাৎ তিনি ভাইরাসমুক্ত। লকডাউনের কারণে তিনি পরিবারের বাকিদের সঙ্গে একই বাড়িতে বন্দি রইলেন। পরে দেখা গেল সেই পরিবারের সবার মধ্যেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। সেখান থেকে আরও অনেকের মধ্যে। একটা সময় দেখা যাবে, মানুষের মধ্যেই সুপ্ত হয়ে থাকা ভাইরাসের সংক্রমণ ফের মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। সেই সংক্রমণ ফের মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে।’ চীনে এই মুহূর্তে সংক্রমণ কমলেও, ফের সেটা বড় আকার নেবে কি-না প্রতিষেধক তৈরীর পাশাপাশি এবিষয়টিও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের ‘পরিস্থিতি প্রতিবেদন’ প্রথম প্রকাশ করে ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি। তখন হুবেইসহ চীনের চারটি প্রদেশ এবং জাপান, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৮২ জন। মাত্র সাত দিন পর ভাইরাসটি ২৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৩১ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে। গবেষণার ভিত্তিতে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কিছু ব্যবস্থার পরামর্শ দেন বিজ্ঞানীরা। তার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের অফিসে না যাওয়ার উৎসাহ দেয় এবং বাসায় বসে কাজের সিদ্ধান্ত নেয় অনেকেই। আর কোয়ারেন্টিন শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে।

কোভিড-১৯ ভাইরাস প্রতিরোধে কোয়ারেন্টিন, হোম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন শব্দগুলো বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। কেউ বা শব্দগুলোতে স্বস্তি পাচ্ছেন আবার কেউ ব্যাবহারিক দিকটি বুঝতে না পেরে আক্ষরিক অর্থেই নিরব থাকছেন। এক্ষেত্রে শব্দগুলোর বিশদ জেনে নেয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত রাইস ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং আন্তর্জাতিক বক্তা ড. ক্রেইগ কন্সিডাইন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও সংবাদভিত্তিক ম্যাগাজিন নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন-‘কোয়ারেন্টিনের কথা সর্বপ্রথম যিনি বলেছিলেন তিনি হলেন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইমিউনোলজিস্ট ডা. অ্যান্থনি ফসি এবং মেডিকেল রিপোর্টার ডা. সঞ্জয় গুপ্তের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে। একই সঙ্গে সুস্থ লোকদের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, এসব উপায়ই করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।’ ড. ক্রেইগ কন্সিডাইন তার রিপোর্টে লিখেন, আজ থেকে প্রায় ১৩শ বছর আগে ইসলাম ধর্মের নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোয়ারেন্টাইনের ধারণা দেন। যদিও তার সময়ে সংক্রামক রোগের কোনো বিশেষজ্ঞ ছিলো না। তারপরেও তিনি এসব রোগব্যাধিতে তার অনুসারীদের যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা ছিল কভিড-১৯ এর মতো প্রাণঘাতী রোগ মোকাবেলায় দুর্দান্ত পরামর্শ। তাঁর সেই পরামর্শ মানলেই করোনার মতো যেকোনো মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি মুহাম্মাদ (সা.)-এর একটি বাণী উল্লেখ করেন। তিনি লিখেন- ‘মুহাম্মাদ বলেছেন, যখন তুমি কোনো ভূখন্ডে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার খবর শুনতে পাও তখন সেখানে প্রবেশ করো না। পক্ষান্তরে প্লেগ যদি তোমার অবস্থানস্থল পর্যন্ত পৌঁছে যায় তাহলে ওই জায়গা ত্যাগ করো না।’ এছাড়া বিভিন্ন সময়ে মানব জাতিকে সংক্রামণ থেকে রক্ষা করতে মোহাম্মাদ (সা.) রোগব্যাধিতে আক্রান্ত লোকদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও উদ্বুদ্ধ করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর অমূল্য বাণীগুলো হচ্ছে- ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।’ ‘ঘুম থেকে ওঠার পরে হাত ধৌত করো। কেননা ঘুমের সময় তোমার হাত কোথায় স্পর্শ করেছে তা তুমি জান না।’ ‘খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে।’ ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা মুহাম্মাদ (সা.) এটা বলেননি যে, শুধু তুমি প্রার্থনা করে বসে থাকবে। বরং তুমি প্রার্থনার পাশাপাশি চিকিৎসা নেবে। সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পেতে মৌলিক নিয়মগুলি মেনে চলবে। কোয়ারেন্টিন বলতে গৃহে থাকা বা সঙ্গনিরোধকে বোঝায়। যেসব ব্যক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হয় কিন্তু তিনি সুস্থ হতে পারেন, আবার নাও পারেন, তার মধ্যে হয়তো জীবাণু আছে কিন্তু কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়নি-এমন ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে একজন মানুষকে প্রাথমিকভাবে ১৪ দিন এভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়। ১৪ দিন পর্যন্ত কাউকে কোয়ারেন্টিনে রাখলে যদি তার ভেতরে জীবাণু থাকে তাহলে উপসর্গ দেখা দেবে। কোয়ারেন্টিন থেকে লক্ষণ প্রকাশ না হলে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলা যায়। কোয়ারেন্টিনে রাখা অবস্থায় উপসর্গ দেখা দিলে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। আইসোলেশন হচ্ছে কারো মধ্যে যখন জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়ে বা ধরা না পড়লেও উপসর্গ থাকে তখন তাকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বিশেষ এই পদ্ধতিতে কোনো রোগীর হাঁচি-কাশি, মল-মূত্র অন্য কারো সংস্পর্শে যাবে না। জীবাণু যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, এজন্য রোগীকে যত রকম ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব, আইসোলেশনে তা দেয়া হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আইসোলেশন হচ্ছে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য, আর কোয়ারেন্টিন হচ্ছে সুস্থ বা আপাত সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য। আইসোলেশনে কতদিন রাখা হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত আইসোলেশনে রাখা হয়। হোম কোয়ারেন্টিন বলতে কোনো ব্যক্তি যখন বাড়িতেই কোয়ারেন্টিনের সব নিয়ম মেনে, বাইরের লোকজনের সাথে ওঠাবসা বন্ধ করে আলাদা থাকেন, তখন সেটিকে হোম কোয়ারেন্টিন বলা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশ থেকে ফেরেন তাকে হোম কোয়রান্টিনে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। এক্ষেত্রেও কমপক্ষে ১৪ দিন তিনি কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মেনে চলবেন। লকডাউন-এর শাব্দিক অর্থ তালাবদ্ধ করে দেয়া কিংবা অবরুদ্ধ। কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়া।

প্রকৃতি মানুষের অবাধ বিচরণে তিক্ত হয়েই আজ হয়তো লকডাউনের কম্পন ছড়িয়েছে ক্ষুদ্র এক অনুজীবের মাধ্যমে। কোভিড-১৯ পাল্টে দিচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় খেড়োখাতা। দেশে দেশে চলছে লকডাউন, জরুরি অবস্থা, কারফিউ। জনবহুল এলাকাগুলো ফাঁকা, যান চলাচল বন্ধ আর জনশূন্য জনপ্রিয় সব পর্যটনকেন্দ্র। সমগ্র বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদী লকডাউনে হু হু করে কমছে বায়ুদূষণের মাত্রা! চীন, ইটালী বা ব্রিটেনের আকাশে অবিশ্বাস্য গতিতে কমছে নাট্রোজেন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড আর কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা! পরিবেশবিদদের হতবাক করে নিউইয়র্কের আকাশে দূষণের মাত্রা কমেছে ৫০% ও বেশী! কেবল উপগ্রহের ছবিতে নয়, ঘরবন্দী ইউরোপের মানুষ খালি চোখেও দেখতে পাচ্ছে ঝকঝকে নির্মল আকাশ! স্মরণকালের মধ্যে যা কখনো দেখেনি তারা! কয়েক মাস আগেও ধুলোময় ছিল ঢাকা, দিল্লী আর বেইজিংসহ বহু বড় শহরের আকাশ। মারাত্মক বায়ু দূষণে পূর্ণ ছিলো বায়ুম-ল। কলকারাখানাগুলো বন্ধ থাকায় বাতাসে ধূলিকণাসহ বিষাক্ত সব পদার্থের উপস্থিতি কমেছে। চীন একাই ২০ শতাংশ কম গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে। বায়ু দূষণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা আইকিউ এয়ার ভিজ্যুয়াল-এর রাংকিং অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকার অবস্থান ১০৫ পয়েন্ট নিয়ে ১৯তম। যেখানে আগে বরাবরই থাকতো প্রথম পাঁচের মধ্যে। এরইমধ্যে স্বচ্ছ হয়েছে ভেনিসের খালগুলো, ফিরে এসেছে মাছ। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের কলাতলী পয়েন্টে খেলা করছে ডলফিন। দল বেঁধে ফিরে আসছে পরিযায়ী পাখির দল। হ্রাস পড়েছে বিশ্ব ঊষ্ণায়নের হারে। পেঙ্গুইনরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেরাচ্ছে। পর্যটকের ভিড় না থাকায় মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা বক আর পাতি হাঁসও। অর্থাৎ মহামারি করোনার আতঙ্কে মানুষ যখন ঘরে বন্দি তখন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে প্রকৃতি, কমছে দূষণ। আমরা আমাদের ইমিউন সিস্টেমের কথা জানি। কিন্তু এই পৃথিবীরও যে একটা ইমিউন সিস্টেম আছে, তা ভুলেই গিয়েছি বেমালুম! তাই হয়তো তিক্ত পৃথিবী আর সইতে না পেরে সেই সিস্টেমকে নিজ দায়িত্বেই সচল করে দিয়েছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে সাগর-নদী, বন আর পাহাড়। প্রকৃতির রক্ষক হওয়ার বদলে আমরা যখন তার ভক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছি, তখন তার ফল কী পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে, কোভিড-১৯ তা দেখিয়ে দিয়েছে।

লকডাউন বা শাটডাউন আসলে চলতে পারে কতদিন ধরে? কী হবে এই লকডাউন পরিস্থিতিতে? আর এগুলো কী করোনাভাইরাস প্রার্দুভাব ঠেকাতে পারবে? এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস এক প্রেস বিফ্রিংয়ে বলেন, ‘আমরাও বুঝি যে এসব দেশ আসলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে যে কখন এবং কীভাবে এসব পদক্ষেপগুলো শিথিল করা যায়। মানুষকে ঘরে থাকতে বলা এবং তাদের চলাচল বন্ধ করার অর্থ হচ্ছে সময় নেওয়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমানো।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ‘লকডাউন বা শাটডাউন পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে ছয়টি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। এগুলো হলো-১. যতটা সম্ভব পারা যায় স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে, তাদের প্রশিক্ষণ ও সেবা কাজে নিয়োগ করতে হবে। ২. কম্যুনিটি লেভেলে সংক্রমণ হতে পারে-এমন প্রতিটি ঘটনা খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. টেস্ট করার জন্য সব ধরণের ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করতে হবে। ৪. রোগীদের চিকিৎসা এবং তাদের আইসোলেট করার জন্য পর্যাপ্ত সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. রোগীদের সংস্পর্শে আসা প্রত্যেকের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ৬. ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য গৃহীত সরকারি পদক্ষেপগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।’

পৃথিবী তার অমিমাংসিত শত সালিশী ফাঁদে আমাদের সঙ্গ দিয়েছে বারংবার। ঝড়-জলোচ্ছাস-বন্যা-খড়া-মহামারী সহ প্রাকৃতিক সব বিপর্যয়ে-শরীরে কাঁপন ধরিয়ে কামড় বসিয়েছে তীক্ষ্ণ দাঁতে। তবে সে দাঁতে কখনোই ছিলো না বোধহীন অশুভের পূর্ণতা। তাই হয়তো ক্ষুদ্র এই ভাইরাস পৃথিবীর নিয়ম পাল্টে দিচ্ছে। পাল্টে দিচ্ছে আমাদের মানসিকতা, আমাদের জীবনযাত্রা। সীমান্ত মুছে গিয়ে গোটা পৃথিবী দাঁড়িয়েছে এক আকাশের নীচে, অজানা অচেনা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে একজোট হয়ে। এরপর ঘরবন্দী হয়ে যাওয়া মানুষ প্রাথমিক ধাক্কাটুকু সামলে নিশ্চয়ই মানবতার হাত বাড়িয়ে দেবে প্রতিবেশীর দিকে। মদ্যপান, জুয়া বা ক্যাসিনোর মতো অনৈতিক কর্মকান্ডে চারপাশের পরিবেশ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার আগে ভাববে আত্মীয়, বন্ধু, পড়শীদের কথা। এ পড়শী কেবল মানুষ নয়, এখানে রয়েছে সহস্র প্রজাতির প্রাণি, পশু-পাখি, গাছপালা, বায়ু, পানি, মাটি সহ প্রকৃতির সব উপাদান। প্রকৃতি একসময় প্রতিশোধ নেবে, এমন এক সম্ভাবনার কথা প্রায় দেড় শ বছর আগে ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলস তাঁর অসম্পূর্ণ ডায়ালেক্টিকস অব নেচার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রকৃতির বিরুদ্ধে ধাবমান মানুষকে সাবধান করে বলেছিলেন, ‘এতটা বাড়াবাড়ি করো না। মনে রাখবে, তোমাদের প্রতিটি বিজয় প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে তোমাদের কাছেই ফিরে আসবে। মেসোপটেমিয়া, গ্রিস ও রোম সাম্রাজ্য যেভাবে অরণ্য ধ্বংস করে নগর নির্মাণ করেছে, তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ।’ আমরা আমাদের আপন উদাসীনতায় পৃথিবীর গলা চেপে ধরেছি। বন কেটে বানিয়েছি নগর, ভূগর্ভ থেকে হরণ করেছি গ্যাস, তেল ও কয়লা, নদীপথ পরিবর্তন করে নির্মাণ করেছি বাঁধ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন গৃহস্থালির ময়লা আবর্জনা এবং বিষাক্ত শিল্প বর্জ্য আমাদের পরিবেশেকে ক্রমশ: বিষিয়ে তুলেছে। ইট ভাটা, রাস্তা মেরামত, রান্না, গাড়ির পেট্রল-ডিজেল সব মিলিয়ে পৃথিবীকে করেছি ধোয়ার কু-লি। প্রতিদিনই পৃথিবীতে প্রাণি বৈচিত্রের সংকট দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সংবাদ বিশ্বকর্তাদের টনক নাড়িয়েছে। তাই শুরু হয়েছে পরিবেশের বিপর্যয় রক্ষা কর আর মানুষ বাঁচাও যজ্ঞ; কোটি টাকাও খরচ হচ্ছে তাতে। সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশ পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার ভেতর দিয়ে নিজের ক্রোধের প্রকাশ ঘটিয়েছে প্রকৃতি।

মানব মনের বদ্ধ দুয়ার প্রকৃতির বোধের কুঠারাঘাতে শাণিত ধারায় উন্মিলিত না করলেও স্রষ্টা পৃথিবীর অনুভবের উত্তরে আমাদের দিয়েছেন ভরসা আর ভলোবাসার মেলবন্ধন। তাইতো প্রতিটি প্রলয় শেষে প্রকৃতি আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়ে উজ্জীবিত করেছে। প্রকৃতির ওপর করোনার এই প্রভাবও হয়তো ক্ষণস্থায়ী। হয়তো বছর খানেকের মধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে। বিজ্ঞানীদের মতে আগামী একবছরে করোনা-বিপর্যস্ত মানুষ, দফায় দফায় ঘরবন্দী থাকা মানুষ পৃথিবীর দূষণ কমিয়ে ফেলবে প্রায় ৪৫%! পরিবেশ ফিরে যাবে প্রায় ৫০০ বছর আগে, বিশুদ্ধতার নিরিখে। মাস’ছয়েকের মধ্যে কমতে থাকবে হিমবাহের গলন, বন্ধ হয়ে যাবে বছরখানেকের মধ্যে। কমবে ক্যানসার, কিডনী, শ্বাসযন্ত্র ও অন্যান্য দূষণজনিত রোগ। ধূলো-ধোঁয়া-অন্ধকার পেরিয়ে অনাগত পৃথিবীর সোনালী আলোর রেখা হয়ত দেখা যাচ্ছে এখন থেকেই! আর নতুন সেই পৃথিবীতে নতুনভাবে নামবে মানুষ, ভাঙাচোরা অর্থনীতি, থমকে যাওয়া শিল্প, আমূল বদলে যাওয়া জীবনকে নতুন করে বাঁধতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এখনই সচেতন না হলে মানবজাতিকে আরও চড়া মাসুল দিতে হবে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান না করে আগ্রাসন চালালে মানুষও যে টিকতে পারবে না সেই বার্তাই যেনো দিয়ে যাচ্ছে কোভিড-১৯। মানুষও তাই প্রকৃতির শত বছরের এই গঞ্জনা মুছতে স্বীয় ভাগ্যলিপিতে যোগ করেছে নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন। আর সুদ, হিংসা, বিবাদ, লোভ, ক্ষমতাকে দূরে ঠেলে স্রষ্টার অপার মহিমা ঘোষণায় নিজেকে করেছে ব্যস্ত। কারণ আমরা মানুষ কখনও কোনো পরিস্থিতিকেই দুর্ভাগ্য হিসেবে বহন করে সামনে এগোতে শিখিনি। দুর্ভাগ্যের প্রতিটি বুনো ঝোঁপ থেকে আমরা ছিনিয়ে এনেছি অমূল্য সম্পদ। কোভিড-১৯ এর তা-বলীলায় প্রকৃতির যতটা অশ্রু এসে মিশেছে আমাদের মধ্যরাতের বালিশে, কুহেলিকার প্রচ্ছন্নতায় শিশিরভেজা ঘাসের উপর আমাদের হলদে সকাল ঠিক ততটাই সজীবতার আলপনা এঁকে যাবে। জয় হবে আমাদের এই প্রত্যাশার, জয় হবে মানবের শুভ যতো কর্মের।

লেখক : কথাসাহিত্যক, সাংবাদিক ও নারীনেত্রী।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *