ই-পেপার

নাসরিন সুলতানা

মানবজাতির ইতিহাসে বিভিন্ন সময় মহামারী দেখা দিয়েছে। কখনও প্লেগ, কখনও গুটিবসন্ত, কখনও বিভিন্ন রকম জ্বর, কখনও কলেরা, উদরাময়, ওলাওঠা ইত্যাদি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংস করেছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন। এমনকি বিভিন্ন সভ্যতাও ধ্বংস হয়ে গেছে মহামারীতে।

১৬৫ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতালীয় উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারী। আন্তোনিন প্লেগ নামে পরিচিত এই মহামারীতে পাঁচ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। এটি সম্ভবত ছিল গুটি বসন্ত। ২৫১-২৬৬ খ্রিস্টাব্দে এর দ্বিতীয় প্রকোপে রোমে প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান চলে ৫৪১ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এটি ছিল বিউবোনিক প্লেগের প্রথম নথিবদ্ধ প্রকাশ। এই ভয়ংকর প্লেগ শুরু হয়েছিল মিশর থেকে। ছড়িয়ে পড়েছিল কনস্তান্তিনোপল হয়ে পুরো ইউরোপে এবং বলা যায় সমগ্র বিশ্বে। ৪৩০ থেকে ৪২৬ খিস্ট পূর্বাব্দে অ্যাথেন্সে প্লেগ(মহামারী) ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল এক ধরণের টাইফয়েড জ্বর। অ্যাথেন্সের যুদ্ধফেরত সৈনিকদের মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়েছিল এবং পুরো দেশের জনগোষ্ঠির চারভাগের এক ভাগ মৃত্যুবরণ করেছিল। অ্যাথেন্স মহামারীতে মৃতদের গণকবরে প্রাপ্ত দাঁত থেকে বিজ্ঞানীরা এই মহামারীর জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াটি সনাক্ত করেছেন। বিশ্বের চারভাগের এক ভাগ থেকে অর্ধেক জনগোষ্ঠি এতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ৫০০ থেকে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায় এই মহামারীর কারণে। রোমান সভ্যতার পতনের জন্যও এই মহামারী দায়ী। একদিকে আতিলা দা হানসহ অন্যান্য যাযাবর গোষ্ঠির আক্রমণ অন্যদিকে মহামারী। রোমান সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়তে দেরি হয়নি।

ব্ল্যাক ডেথ ছিল ইতিহাসের এক ভয়ংকর মহামারীর নাম। ১৩৩১ থেকে ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত এর প্রথম পর্যায় চলে। এই প্লেগে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। ইউরোপে এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েকশ বছর পর পরই দেখা দিতে থাকে। এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার কারণ নিয়ে মতভেদ আছে। এশিয়া থেকে ক্রিমিয়ায় যুদ্ধফেরত সৈনিকদের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় এটা বলা হয়। আবার বলা হয় মোঙ্গল আক্রমণকারীরা ইউরোপে এই রোগ নিয়ে আসে। আবার অন্য ইতিহাসবিদরা মনে করেন এই প্লেগের ভয়েই মোঙ্গল আক্রমণকারীরা ইউরোপ থেকে পালায়। ১৬৬৫-৬৬ সালে দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামে পরিচিত মহামারীও ছিল এই ব্ল্যাক ডেথেরই আরেকটি আউটব্রেক। এতে লন্ডনে এক লাখ অধিবাসীর মৃত্যু হয়। বলা হয়ে থাকে জনপ্রিয় ইংরেজি ছড়া ‘রিং-আ রিং-আ রোজিস, পকেট ফুল অফ পোজিস, আ টিসু আ টিসু, উই অল ফল ডাউন’ এর কথাগুলো ব্ল্যাকডেথকে কেন্দ্র করে লেখা। ছড়াটি বিভিন্ন রূপে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও প্রচলিত রয়েছে। অবশ্য এটি ছিল বিংশ শতাব্দিতে প্রচলিত মত। বর্তমানের লোক সাহিত্য বিশ্লেষকরা অনেকে এই মতকে সমর্থন করেন না। সেসময় ইউরোপে প্লেগ ডাক্তারদের রমরমা ছিল। তারা সে সময় প্রচলিত নানা পদ্ধতিতে প্লেগের চিকিৎসা করতো। যদিও সেইসব পদ্ধতির বেশিরভাগই ছিল অতি অকার্যকর। প্লেগ ডাক্তারদের পোশাকও ছিল খুব ভয় ধরানো। মনে করা হতো এই পোশাক দেখে ভয়ে রোগ পালাবে। তবে পোশাকটির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল তা শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখতো। অনেকটা আজকের যুগের পিপিই-এর মতো।

বাংলাদেশে কলেরা ও গুটি বসন্তের প্রকোপ ছিল সবসময়েই। কলেরা বা ওলাওঠার জন্য ওলাবিবি এবং গুটি বসন্তের হাত থেকে বাঁচাতে শীতলা দেবীর পূজা হতো পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। এরা মূলত ছিলেন স্থানীয় দেবী। ১৮১৭ থেকে ১৮২৪ সালে বাংলা থেকে শুরু হয় কলেরা মহামারী। সেই মহামারী ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারত, চায়না, ইন্দোনেশিয়া, জাভা এবং কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়াতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১০ হাজার সৈন্য এবং বাংলার অসংখ্য মানুষ এই মহামারীতে প্রাণ হারায়। রাশিয়ায় ২ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। চায়না ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে ১ লাখের উপরে মানুষের মৃত্যু হয় কলেরায়। এই মহামারী ১৮২৬ থেকে ১৮৩৭ পর্যন্ত তা-ব চালায় ইউরোপে। রাশিয়া, হাংগেরি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা। ১৮৩২ থেকে ১৮৪৯ এর মধ্যে আমেরিকায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মহামারী ঘুরে ঘুরে আসতে থাকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত। স্পেন হয়ে এই মহামারী মক্কাতেও ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকাতেও এ সময় কলেরা মহামারী আকারে ছড়ায়। ১৮৬৬ সালে এই কলেরায় আমেরিকায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মক্কায় হাজীদের মধ্যে ৯০ হাজারের মৃত্যু হয় কলেরায়। তৃতীয় প্লেগ মহামারী শুরু হয় চায়নায় ১৮৫৫ সালে। সেখান থেকে এটি ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ১০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয় এ মহামারীতে। এই মহামারী যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়ায়। ১৯০০ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত সেখানে মহামারীর তা-ব চলে যা সানফ্রান্সিসকো প্লেগ নামে পরিচিত।

বিংশ শতাব্দির সবচেয়ে মারাত্মক মহামারীর নাম স্প্যানিশ ফ্লু। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালে এটি বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়ে। সারা বিশ্বে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ এতে আক্রান্ত হয়, মৃত্যু হয় ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়নের। বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষের মৃত্যু হয় তার চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় স্প্যানিশ ফ্লুর কারণে। কলেরা মহামারী বিংশ শতকেও সারা বিশ্বে বেশ কয়েকবার হানা দেয়। ১৯৬১ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে কলেরা মহামারী সারা বিশ্বে অসংখ্য প্রাণ হরণ করে।

মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় গুটিবসন্ত বয়ে নিয়ে গিয়েছিল ইউরোপীয় দখলদাররা। আর তাতে আজটেক সভ্যতার জনগোষ্ঠির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারী। ইউরোপীয়দের বয়ে আনা সর্দি জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত ইত্যাদি রোগ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায়। আজটেক, মায়া, ইনকা সভ্যতার পতন ঘটেছিল এই সব রোগে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায় তাদের কাছে অপরিচিত এইসব রোগের মহামারীতে। ১৭৭০ এর দশকে উত্তর পশ্চিম প্যাসিফিকের ৩০ শতাংশ স্থানীয় আমেরিকানের(রেড ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠি) মৃত্যু হয় গুটি বসন্তে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় জনগোষ্ঠির অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল গুটি বসন্ত এবং ইউরোপীয় দখলদারদের আনা বিভিন্ন অপরিচিত রোগে। কারণ নতুন পৃথিবীর অধিবাসীদের দেহে এইসব রোগের কোন প্রতিরোধক ছিল না।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে প্রায় মহামারীর মতোই ছড়িয়ে ছিল সিফিলিস। মূলত সৈনিকদের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ালেও এশিয়া, আফ্রিকায় বহু উপনিবেশকারীর মৃত্যু হয় সিফিলিসে।

গ্রিক চিকিৎসক হিপ্পোক্রেটিস ৪১২ খিস্ট পূর্বাব্দে প্রথম ইনফ্লুয়েঞ্জার বর্ণনা দেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশ্বে মহামারী হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার প্রথম নথিভুক্ত বর্ণনা পাওয়া যায় ১৫৮০ সালে। এর পর থেকে বিশ্বে প্রতি ১০ থেকে ৩০ বছর সময়ের ব্যবধানে মহামারী হিসেবে ইনফ্লুয়েঞ্জা দেখা দেয়। ১৮৮৯-৯০ সালে বিশ্বব্যপী রাশিয়ান ফ্লু নামে পরিচিত একটি ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিল যা প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ১৯৫৭-৫৮ সালের এশিয়ান ফ্লু নামে পরিচিত ভাইরাস জ্বরে বিশ্ব জুড়ে ২ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। হংকং ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, টাইফাস জ্বর, সার্স, মার্স, জিকা ভাইরাসও বিশ্বজুড়ে মহামারীর রূপ নিয়েছে দূর ও নিকট অতীতে।

ব্রিটিশ ভারতে প্লেগ দমনের নামে ভারতীয় জনগণের উপর চলে ব্যাপক নির্যাতন। মহারাষ্ট্রে প্রথম যে ইংরেজ বিরোধিতা দেখা দেয় এবং ইংরেজের উপর সশস্ত্র আক্রমণ ঘটে যা থেকে পুরো উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা ঘটে তারও কারণ ওই প্লেগ।

মহামারী অনেক জাতি ও সভ্যতাকে ধ্বংসের জন্য দায়ী। কয়েকজন ইতিহাসবিদের ধারণা মহেঞ্জদারো হরপ্পা সভ্যতারও পতন মহামারীর জন্য হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা মহামারী। শত বিপর্যয়ের মুখেও মানুষ আশাকে বর্জন করেনি। সুনীতি বা মানবতাও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে।

মহামারী চিরদিনই মানব সভ্যতায় মহাত্রাস নিয়ে এসেছে। জনজীবনকে করেছে বিপর্যস্ত। তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ চিরদিনই মানবতার পতাকাকে উর্ধে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

সাহিত্যে মহামারী

মহামারী প্রসঙ্গে আলবেয়ার কাম্যুর দ্য প্লেগ এর কথা মনে পড়বে অনেকেরই। মনে পড়বে মেরি শেলির ভয় জাগানো উপন্যাস ‘দ্য লাস্ট ম্যান’ এর কথাও। শেকসপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট-এও রয়েছে মহামারীর বিবরণ। রোমিওর কাছে বার্তা নিয়ে যাওয়া দূত আটকে পড়েছিল প্লেগ আক্রান্ত বাড়িতে। সে বাড়িতে একটি প্লেগ রোগী থাকায় সে বাড়ির দরজা জানালা আটকে দিয়েছিল ভীত জনতা। ফলে বার্তাবাহকটি রোমিওর কাছে জুলিয়েট বিষয়ক বার্তাটি পৌঁছাতে পারেনি। যে কারণে জুলিয়েটকে মৃত ভেবে আত্মহত্যা করে রোমিও। মঁপাশার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘বেড নম্বর টুয়েন্টি নাইনে’র নায়িকাও রুয়েন শহর দখলকারী প্রুশিয়ান সৈন্যদের হত্যার জন্য নিজেকে মানব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সিফিলিস ছড়িয়ে দিয়েছিল তাদের মধ্যে।

বাংলায় কলেরা, প্লেগ ও গুটিবসন্তের তা-বের কথা সাহিত্যের অনেক মাধ্যমেই উঠে এসেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসে রয়েছে রেঙ্গুন শহরে প্লেগ মহামারীর ভয়াল রূপ। শরৎচন্দ্রের স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মৃত্যুও হয়েছিল রেঙ্গুনের প্লেগে। প্লেগের উল্লেখ রয়েছে ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসেও। প্রতিনায়ক সুরেশের মৃত্যুও হয় প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়েই। কলেরা ও গুটিবসন্তের মহামারীর উল্লেখও রয়েছে শ্রীকান্ত উপন্যাসে। সাহসী ইন্দ্রনাথ মহামারীতে মৃত শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে সৎকার করতেও ভয় পায়নি। এমনি ইন্দ্রনাথের সেই স্মরণীয় উক্তি ‘মড়ার আবার জাত কি?’ উচ্চারিত হয়েছিল কলেরায় মৃত শিশুটির প্রসঙ্গেই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাসেও রয়েছে কলেরা মহামারীর প্রসঙ্গ। অরণ্য জনপদে ছড়িয়ে পড়া মহামারীতে সাধারণ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিয়ে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন উপন্যাসের কথক। হাসপাতাল নেই, ঔষধ নেই, চিকিৎসক নেই এমন একটি পরিস্থিতিতে অসংখ্য করুণ মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি। বিভূতিভূষণের ‘রঙ্কিনী দেবীর খাঁড়া’ গল্পেও রয়েছে গুটিবসন্তের পূর্বাভাস হিসেবে এক অতিপ্রকৃত ঘটনার বিবরণ।

মহামারীকে ঘিরে অ্যাডগার অ্যালান পো’র বিখ্যাত গল্প ‘মাস্ক অফ রেড ডেথ’ পড়ে ছোটবেলায় আতংকে শিহরিত হয়েছিলাম। পরে অবশ্য মনে হয়েছিল মৃত্যুকে এড়ানো অসম্ভব, ধনীর প্রাসাদে হোক আর দরিদ্র্যের কুটিরে মৃত্যুকে কে রুখতে পারে?

গুটি বসন্ত মহামারীতে এক সময় বাংলা তথা ভারতের গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিসার কবিতায় রাজ নর্তকী বাসবদত্তারও হয়েছিল গুটি বসন্ত। ‘নিদারুণ রোগ মারীগুটিকায় ভরে গেছে তার অঙ্গ/ রোগ মসীঢালা কালিতনু তার/ লয়ে প্রজাগণ পুরপরিখার/ বাহিরে ফেলিছে করি পরিহার/ বিষাক্ত তার সঙ্গ।’ সন্ন্যাসী উপগুপ্ত অবশ্য বাসবদত্তার এই ঘোর বিপদে তাকে সেবা ও সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতায় পুরাতন ভৃত্য কেষ্টার মৃত্যুও হয়েছিল গুটিবসন্তে আক্রান্ত মনিবকে সেবা যত্ন করে সারিয়ে তোলার পর।

প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, যক্ষা, জিকা ভাইরাস, ইবোলা, মেনিনজাইটিস, চিকুনগুনিয়া, গুটিবসন্ত, মের্স, কলেরা, ইয়েলো ফিভার, সার্স- একুশ শতকের শুরুর দুই দশকেই বিশ্বের ওপর দিয়ে ধেয়ে গেছে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতি এসব মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক জরিপে জানিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল, এই ৭ বছরেই গোটা দুনিয়ায় সব মিলিয়ে ১ হাজার ৩০৭টি মহামারি ঘটেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ঙ্কর ছিল উপরের নামগুলো।

সম্প্রতি চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনা ভাইরাসে কাঁপছে গোটা দুনিয়া। চীনসহ বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাসের সংক্রমণ। জন হপকিনম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ৭৯৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩ লাখ মানুষের। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবসৃষ্ট মহামারির প্রভাবে বহু সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, পাল্টে গেছে সমাজ সংগঠন-অর্থনীতি।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক রচনাতে আমরা এসব মহামারি ও মানব সভ্যতায় তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের নিদর্শন পাই। ওল্ড টেস্টামেন্টে যেমন ঈশ্বরের শাস্তি হিসেবে মহামারির নিদর্শন আমরা পাই, তেমনি প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাসবিদ থুসিসাইডিসের রচনাতেও মহামারির উল্লেখ পাওয়া যায়। থুসিসাইডিসের রচনা থেকে আমরা জানি, পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ যখন সংগঠিত হয়েছিলো গ্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে তখন টাইফাস মহামারিতে এথেন্সের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মারা যায়, যার কারণে স্পার্টার জয়লাভ সম্ভব হয়েছিলো। ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ১৬৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০ খ্রিষ্টাব্দে রোমে স্মল পক্স মহামারিতে বহু মানুষ মারা যায়, রাজপরিবারের সদস্যরাও এর প্রকোপ থেকে বাঁচেনি। বিখ্যাত রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের ভাই লুইসিয়াস ভেরাসের মারা গিয়েছিলেন। ২৫০ খ্রিষ্টাব্দে সাইপ্রিয়ানের প্লেগ মহামারী রোমান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। এর পর, পঞ্চম শতাব্দীতে একদিকে যুদ্ধ অন্যদিকে এই মহামারি পরাক্রমশালী পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যকেই শেষ করে দেয়। আবার ষষ্ঠ শতাব্দির প্রথমভাবে সালে রোমান সাম্রাজ্যেও পূর্ব অংশের সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওয়ান, রোমান সাম্রাজ্যকে আবার আগের মত প্রতাপশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন, বিউবনিক প্লেগ মহামারিতে তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনাকেও শেষ করে দেয়। পরবর্তী দুই শতাব্দিতে বিউবনিক প্লেগে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়, যা তৎকালীন জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ‘দি ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত প্লেগ মহামারি পৃথিবীর জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যুর কারণ হয়। এই রোগ সম্ভবত এশিয়ায় উৎপত্তি হয় এবং পরবর্তীতে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দেখেছি গোটা ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এটা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গোটা ব্রিটেনের সামন্ত ব্যবস্থা এই প্লেগের কারণে বিপর্যস্ত হয় এবং নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শর্ত তৈরি হয়। গ্রীনল্যান্ডের প্রতাপশালী ভাইকিং জলদস্যুরা এই মহামারির ফলে সমুদ্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। পঞ্চদশ শতাব্দির শেষভাগে, ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জে স্প্যানিশ বণিকেরা নিয়ে আসে ভয়ংকর স্মলপক্স, বিউবনিক প্লেগ ও হামের মত জীবাণু। ইউরোপিয়ানরা এইসব রোগ প্রতিরোধী হলেও ক্যারিবিয়ানের মানুষের শরীরে এই রোগের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিলো না।  মহামারির এরকম বহু নিদর্শন পাওয়া যায় ইতিহাসে, যা শুধু মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে এমন নয়, গোটা সমাজ-রাজনীতির সমীকরণকেই বদলে দিয়েছে। মহামারি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ডেমোগ্রাফিকে বদলে দিয়েছে, বদলে দিয়েছে তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও ফেলেছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

আজকের যুগে বিজ্ঞানীরা খুব কম সময়ের মধ্যে এখন মহামারির জন্য দায়ী অণুজীবকে সনাক্ত করতে পারেন। তবুও ক্রমবর্ধমান অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, ভাইরাসের জিন নকশা পরিবর্তন ইত্যাদি মানুষকে আজও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারির বিপদে ফেলছে। জীবাণুঘটিত মহামারিতে আগের মত এক ধাক্কায় লক্ষ কোটি মানুষের মৃত্যু বা একটা গোটা সভ্যতার পতন হয়ে যাওয়ার মত সম্ভাবনা আপাতত দেখা না গেলেও, আণুবীক্ষণিক অণুজীবেরা যে এই একবিংশ শতাব্দিতেও মানুষের জীবন সংহার করতে এবং জীবনযাত্রাকে স্থবির করতে সক্ষম তার প্রমাণ আমরা প্রায়শই দেখছি। এর সর্বশেষ উদাহরণ মহামারি সৃষ্টিকারী নভেল করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাস কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাসের নাম নয়, বরং এটি ভাইরাসদের এক ‘ফ্যামিলি’কে নির্দেশ করে। এই ভাইরাস একটি এক সূত্র বিশিষ্ট আরএনএ নিয়ে গঠিত, যে আরএনএ’র মিউটেশন-এর কারণে করোনাভাইরাস গোত্রের ভাইরাসগুলো প্রাণীদেহ থেকে মানবদেহে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে ঘটা এই মিউটেশনের কারণে ভাইরাস নিজেকে বদলে ফেলে, সে কারণেই নতুন নতুন মহামারি দেখা দেয় এবং নতুন করে যুদ্ধে নামতে হয়ে অণুজীববিজ্ঞানীদের। এর আগে ২০০২ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের জুলাইয়ের মাঝে এই করোনাভাইরাস গোত্রেরই আরেক সদস্য সার্স (সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম) ভাইরাস ১৭টি দেশে ৭৭৪ মানুষের প্রাণ সংহার করেছিলো। ২০১২ সালে সৌদি আরব থেকে উৎপন্ন এই গোত্রেরই আরেকটি ভাইরাস মার্স (মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম) মধ্যপ্রাচ্যে মহামারী সৃষ্টি করেছিলো। বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, সার্স ভাইরাসটি ছড়িয়েছিলো বাদুড় থেকে, আবার মার্স এসেছিলো উট থেকে। নভেল করোনাভাইরাসটি চীনের উহান প্রদেশে একটি পশুপাখির বাজার থেকে ছড়িয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।

এবছর কোভিড ১৯ বা নভেল করোনা নামে পরিচিত ভাইরাসটি মানব জাতিকে আরেকবার মহামারীর ঘোর বিপদে ফেলেছে। কিন্তু এরপরও মানবতার মহিমা ক্ষুণ্ন হবে না বলেই বিশ্বাস রাখতে পারি, রাখতে পারি আশা। কোভিড ১৯ আমাদের আবার বুঝিয়ে দিচ্ছে মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গ কত ভালোবাসে। আমরা ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা শুধু মোবাইল স্ক্রিন আর ল্যাপটপে চোখ রেখে চলতাম। পাশের মানুষটার সঙ্গেও কথা বলতে চাইতাম না। এখন যখন আমরা একা থাকতে বাধ্য হচ্ছি তখন বুঝতে পারছি একা একা বাঁচা কত কঠিন। স্মরণকালের মধ্যে এখনই যেন আমরা দুহাত মেলে আঁকড়ে ধরতে চাইছি মানুষকেই। এই সময়েই আমরা সংঘবদ্ধ হচ্ছি। আমরা মানুষের মৃত্যু সংবাদে উতলা হচ্ছি। আমরা অন্য মানুষের কথা ভাবছি। আমরা বুঝতে পারছি একসাথে বেঁচে থাকাটাই জীবন। এবার মৃত্যুই আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে জীবনের মহিমা। আমরা ইতালি, স্পেনের জনগণের দুঃখে কাতর হচ্ছি। আমরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে চীনের জয়ে উল্লসিত হচ্ছি। আমরা নিউইয়র্কের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত হচ্ছি। অনেক দিন পর আমরা অনুভব করছি মানব জাতি আসলে এক। আমরা সবাই মিলে একটাই যুদ্ধ চালাচ্ছি। সেটা ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এটাও একটা যুদ্ধ। কিন্তু এই প্রথম বারের মতো সবাই, সব দেশ, সব মানুষই মিত্র শক্তি। এবার হাসপাতাল আর বাড়িগুলোই বন্দীশিবির। তবে এবারও মানব জাতিরই জয় হবে সুনিশ্চিত।

লেখক : প্রভাষক। সূত্র : বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও ইন্টারনেট

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x