ই-পেপার

মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম

‘হিজড়া সম্প্রদায়’ বাংলাদেশের একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠির নাম। যুগ যুগ ধরে তারা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার। লিঙ্গ জটিলতার কারণে তাদেরকে সমাজ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে মনে করছে না। অথচ লিঙ্গ জটিলতার জন্য তারা কোনো ক্রমেই ব্যক্তিগতভাবে দায়ি নয়। প্রাকৃতিকভাবে তারা পৃথিবীতে লিঙ্গ জটিলতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। ছেলে শিশু হিসেবে জন্মানো একটি বাচ্চার শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে এসে দেখে তার শরীর দেখতে ছেলেদের মতো কিন্তু তার মনন এবং চিন্তা হচ্ছে মেয়েদের মতো। সে মেয়েদের মতো পোশাক পরতে চায় এবং মেয়েদের মতো আচরণ করে। অন্যদিকে মেয়ে শিশু হিসেবে জন্মানো একটি বাচ্চা শৈশব পেরিয়ে উপলদ্ধি করে তার শরীর মেয়েদের মত হলেও তার আচরণ, চিন্তা ও মননশীলতা ছেলেদের মতো। আবার কোন কোন শিশুর লিঙ্গ অসম্পূর্ণ থাকে। এই ধরনের অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের বাচ্চারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও সমাজে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্যের শিকার হয়। এমনকি কখনও কখনও পরিবার ওই বাচ্চাদের বাসা থেকে বের করে দেয়। এই ধরনের অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মানুষদের তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী বা হিজড়া সম্প্রদায় নামে আখ্যায়িত করা হয়। অনুমান করা হয়ে থাকে বাংলাদেশে কয়েক লাখ হিজড়া সম্প্রদয়ের জনগোষ্ঠী রয়েছে। যাদের অধিকাংশ সমাজের মূল স্রোতের বাহিরে মানুষের দয়া-দাক্ষিন্যের উপর বেঁচে আছে। তারা রয়ে গেছে উন্নয়নের মূল স্রোতের বাইরে। সময় এসেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের। দেশের সাগ্রিক উন্নয়নের জন্য হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

হিজড়া জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে মতবিনিময় কর্মশালা

রূপকল্প ২০৪১ কে সামনে রেখে বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। হিজড়া জনগোষ্ঠিকে এই উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১৪ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই অগ্রযাত্রা ও প্রচেষ্টায় হিজড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। এই মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহীর আয়োজনে ও দিনের আলো হিজড়া সংস্থা-এর সহযোগিতায় এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এন্ড গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স, কানাডা এর সমর্থনে ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহীতে ২৮ আগস্ট, ২০২২ ইং সকাল ১০.৩০ টা থেকে ১৪.০০ টা পর্যন্ত রাজশাহী জেলার ২০ পুলিশ কর্মকর্তা, হিজড়া কমিউনিটির ২০ সদস্য এবং দিনের আলো হিজড়া সংঘের চারজন নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ‘‘Leadership and Empowerment of Transgender Meeting With Law Enforcement Agencies” শীর্ষক মতিবিনিময় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই মতবিনিময় কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. আব্দুল বাতেন, বিপিএম, পিপিএম, ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ, বাংলাদেশ পুলিশ, রাজশাহী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. রশীদুল হাসান পিপিএম, অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও অর্থ), রাজশাহী রেঞ্জ। এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্), জনাব সনাতন চক্রবর্তী, রাজশাহী জেলা এবং “দিনের আলো হিজড়া সংঘ”, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এবং গ্লোবাল এ্যাফেয়ার্স, কানাডা এর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন জনাব মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার), ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহী।

কর্মশালার শুরুতেই হিজড়া জনগোষ্ঠির লিঙ্গ জটিলতা ও বৈষম্য (Sex complexity & discrimination) সংক্রান্তে “Understanding Transgender” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার), ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহী। তিনি তার উপস্থাপনায় উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তদের হিজড়া জনগোষ্ঠির লিঙ্গ জটিলতার বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা দেন। গবেষণায় পাওয়া যায় যে জেনেটিক ডিজঅর্ডার (Genetic disorder) এর কারণে ছেলে হিসেবে জন্মগ্রহণকারী একজন শিশুর ব্রেন মেয়েদের মতো কাজ করে যদিও ওই শিশুর শরীরের গঠন ছেলেদের মতন। অর্থাৎ ট্রান্সজেন্ডার (Transgender) শিশু জন্মের সময় যে লিঙ্গে জন্ম গ্রহণ করে কিন্তু তার আচরণ হয় বিপরিত লিঙ্গের মতো। ট্রান্সইউম্যান (Transwomen- born as male) অর্থাৎ যিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন ছেলে হিসেবে কিন্তু তার আচরণ মহিলাদের মতো এবং তার জেন্ডার এখন মহিলা। ট্রান্সম্যান (Transmen- born as female) অর্থাৎ যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন মেয়ে হিসেবে কিন্তু তার আচরণ পুরুষের মতো ফলে তার জেন্ডার পুরুষ। অতপর হিজড়া কমিউনিটির সদস্য মোহনা, বিজলী, সমনা, হানুফাসহ আরো অনেকেই কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার) এর উপস্থাপনায় আবেগ আপলুত হন এবং তারা তাদের জীবনে সংগঠিত পারিবারিক ও সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরেন। তারা সমাজে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় তুলে ধরেন ও পুলিশকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ জানান।

প্রধান অতিথি মো. আব্দুল বাতেন, বিপিএম, পিপিএম, ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ, বাংলাদেশ পুলিশ, রাজশাহী তাদের কথা মনোযোগসহ শোনেন এবং তাদের আইনানুগ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন হিজড়া জনগোষ্ঠি প্রাকৃতিকভাবেই বৈষম্যের শিকার। অতপর তারা পরিবারিক এবং সামাজিক অবহেলায় জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি হিজড়া জনগোষ্ঠির লোকজনের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে হিজড়া সম্প্রদায়কে মানুষের দয়ার উপর নির্ভর না করে তাদেরকে আত্মমর্যাদাশীল এবং কর্মমুখী হওয়ার আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দিনের আলো হিজড়া উন্নয়ন মহিলা সংস্থা এর পক্ষ থেকে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টশনের মাধ্যমে তাদের সংস্থার বিভিন্ন অর্জন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠির পারিবারিক বৈষম্য, সমাজে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে কর্মসংস্থানের প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা তুলে ধরেন।

ক. বৈষম্যগুলো

* পরিবারের সব সদস্যদের মতো সমান সম্মান নিয়ে বড় হতে না পারা।

* শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতার অভাব।

* কর্মসংস্থানে কর্মচারি মালিকের আন্তরিকতার অভাব।

* সমাজে সাধারণ মানুষের মতো গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়া।

* পরিবারে থাকতে না পারা।

* অর্থের অভাবে নিজ কর্মসংস্থান গড়তে না পারা।

* কোনো ব্যবসায় শুরু করার ক্ষেত্রে লাইসেন্স জটিলতা।

* বাসা ভাড়া না পাওয়া, ভাড়া পেলেও কয়েক গুণ বেশি দিতে হয়।

তারা আরো জানান, হিজড়ারা এলাকাভিত্তিক তাদের

তথাকথিত যেসব গুরু মা’র অধিনে বা ছত্রছায়ায় থাকে সেখানেও তারা সে গুরু মা কর্তৃক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। কতিপয় দুষ্টু ব্যক্তি ভুয়া হিজড়া সেজে সমাজের বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বড় অংকের চাঁদা দাবিসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সমাজের লোকজনের কাছে, প্রশাসনের কাছে তারা খারাপ হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছেন। এসব ভুয়া হিজড়াদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তারা অনুরোধ জানান।

খ.  দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে তাদেরকে চাকুরির বা ব্যবসার সুযোগ প্রদান প্রসঙ্গে

সমাজের অধিকাংশ মানুষ হিজড়াদের মানুষ হিসেবে গণ্য না তারা হিজড়াদের উপহাসের পাত্র মনে করে। আর এ কারণে তারা কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়। সাধারণত হিজড়ারা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত পেতে টাকা সংগ্রহ করে জীবন-ধারণ করে থাকে। কিন্ত এখন তারা এ কাজ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা স্বাধীন কোনো ব্যবসা বা চাকুরি করে সমাজে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে চায়। উক্ত মতবিনিময় সভায় তারা কিছু কর্মক্ষেত্র উল্লেখ করেন যে কাজগুলো করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। কিছু অর্থ সহায়তা পেলে নিজ উদ্যোগে তারা ফুচকা/চটপটির দোকান, পারলার, ফুলের দোকান, মুদির দোকান, কসমেটিক্স-এর ব্যবসা, কাপড়ের ব্যবসা, ডিমের ব্যবসা, হোটেলের ব্যবসা ইত্যাদি ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। এজন্য তাদের আর্থিক সহায়তা অথবা ব্যাংক লোন প্রয়োজন।

গ. আইনানুগ সহযোগিতার আহ্বান 

মুক্ত আলোচনায় হিজরা সংঘের সদস্যরা পুলিশ সদস্যদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান। তারা নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ে ঊর্র্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন-

প্রথমত, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাবুর্চি, ঝাড়–দার, সুইপার ইত্যাদি কাজ করতে হিজড়ারা আগ্রহ পোষণ করেন। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কিছুসংখ্যক লোক আউট সোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগ করা হয় সেসব ক্ষেত্রে হিজড়াদের বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ জানান।

দ্বিতীয়ত, হিজড়া জনগোষ্ঠি যেন পুলিশের চাকুরিতে আসতে পারে -এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পুলিশের অনেকে সদস্যরই ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। পুলিশের সকল সদস্যদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এবং

চতুর্থতঃ বিভিন্ন চেক পয়েন্টে তাদের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করা হয়। তাই তাদের চেক করার সময় শালীনতার সঙ্গে করার অনুরোধ করেন।

উপসংহার:

প্রাচীনকাল থেকেই হিজড়া সম্পদায় পরিবার সমাজ তথা রাষ্ট্রে বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। তারা স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে অন্য ১০ জনের মতো সমাজে বাঁচতে চায়। তারা তাদের মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন চায়। আর সেজন্য দরকার পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন। একবিংশ শতাব্দিতেও মানুষ এখনও তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দীর্ঘ কয়েক দশকে দাবি ও সমাজ পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ২৬ জানুয়ারি, ২০১৪ তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠিকে ‘হিজড়া লিঙ্গ (Hijra sex)’ নামে স্বীকৃতি দিয়েছে। হিজড়া জনগোষ্ঠির বহু কাক্সিক্ষত এই স্বীকৃতি তাদের সামাজিক ও মানবাধিকার বাস্তবায়নে একটি মাইল ফলক। অতএব দেশের সার্বিক উন্নয়ের স্বার্থে হিজড়া সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে।

লেখক : কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার)

ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহী।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)