ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

মধ্যবিত্তের আর কিছু না থাক স্মৃতি থাকে, তাদের মধ্যকার সংস্কার বা বোধগুলোও অপেক্ষাকৃত তীব্র হয়। মধ্যবিত্ত তার জীবনের যেকোন পর্যায়েই স্মৃতিকাতর, সে যাই করুক না কেন তার শৈশব, কৈশোর তার বেড়ে ওঠা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাদের মতো বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনে ঈদ এমনি একটি অনুভূতি। মিশনে ছুটির অভার নেই। কিন্তু জীবনের প্রথম মিশন তাই টাকা পয়সার হিসাবটা আমরা যাদের প্রথম মিশন তারা একটু বেশিই করতাম।

২০০৫  সালের অক্টোবরে মিশনে গেলাম, চলে আসলাম ২০০৬ এর অক্টোবরে। মিশনের বারো মাসকে এমনভাবে চার ভাগে ভাগ করলাম যাতে করে একটানা তিন মাসের বেশি সময় ধরে মিশন এলাকায় না থাকা লাগে। সেই হিসেবে জানুয়ারি এবং এপ্রিলে ছুটিতে আসলে একটানা তিন মাসের বেশি সময় মিশনে থাকতে হবেনা বুঝতে পারলাম। প্রথম ছুটিতে আসলাম জানুয়ারিতে। ঈদ ছিল সম্ভবত মার্চের শেষের দিকে। কাজেই ছুটিতে যাওয়ার জন্য ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা সইলোনা। আবার জানুয়ারিতে ছুটি গিয়ে এসে আবার মার্চ এপ্রিলে ছুটি কাটানো যৌক্তিক হবেনা ভেবে প্লান করলাম রোজার ঈদ কসোভোতে করব এবং সব ঠিক থাকলে কোরবানীর ঈদ দেশে গিয়ে করবো।

আমরা ব্যাচমেটরাসহ আরো অনেকে মিলে এমনি সিদ্ধান্ত নিলাম। কসোভো থেকে চলে এসেছি  ১৫/১৬ বছর আগে। অনেক স্মৃতিই ঝাঁপসা হয়ে গেছে। কিছু স্মৃতি এখনো অবিকল মনে আছে। কসোভোতে ঈদের স্মৃতি আমার আজো অমলিন। সে কথা অর্থাৎ কসোভোতে প্রথম ঈদ করার স্মৃতিচারণ করব বলেই আজ বসেছি।

তো যে কথা বলছিলাম সে কথাতে ফিরে আসি। ভিন দেশে ভিন্ন পরিবেশে রোজা এল। আশেপাশে কোন মসজিদ নাই, ইফতারি সেহ্রির কোন আয়োজন নেই। রোজা কি বিষয় তা অধিকাংশ মানুষ জানেও না। যতটুকু মনে পড়ে ফেব্রুয়ারিতে রোজা শুরু হল। তখন প্রচন্ড শীত। টেম্পারেচার মাইনাস পনেরো বা বিশ। সবচেয়ে কষ্টের ছিল এই ঠান্ডায় উঠে সেহ্রি করা। সত্যি বলতে কি শীতের দেশে একবার বিছানা গরম হওয়ার পর সেই বিছানা ছাড়া মোটামুটি বিরাট একটা ঈমানী পরীক্ষা। তখনো ওভেনের এতটা প্রচলন ছিল না। আমাদের বাসায় ওভেন ছিলনা। শীতের দিনে ঠান্ডা খাবার গলা দিয়ে নামতোনা। রাতে উঠে চুলা জ্বালিয়ে খাবার গরম করে তবেই খেতে হত। এভাবে ৫/৭ দিন থাকার পর ভাবলাম রোজার কয়েকদিন ছুটি নিই। তখন বেশ কেটেছিল রোজাগুলো।

খুব ছোট বেলায় কোরআন শরীফ পড়া শিখেছিলাম, পরে সেভাবে আর চর্চা করা হয়নি। কি ভেবে যেন প্লান করলাম এই সুযোগে কোরআন খতম করবো। রোজার মধ্যে ঠান্ডার দেশের মানুষ শুয়ে পড়তে দেরী করেনা। বেশীর ভাগ মানুষ রাত আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ শুয়ে পড়ে। শীতের দেশের গ্রামের রাত আমাদের দেশের গ্রামের দিকের বর্ষার রাত একই রকম নিস্তব্ধ। টেম্পারেচার বেশী কমলে মানুষ সাধারণত ঘরের বাইরে বের হয়না। ইফতারের পরপরই ডিনার, এরপর এশার নামাজের সময় হলেই কোন রকমে নামাজটা পড়ে শুয়ে পড়া। ছুটি নেওয়ার পর রুটিন চেঞ্জ করে ফেললাম। ইফতারের পর ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে নিতাম। এর পর উঠে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত আর ঘুমাতামনা। একবারে সেহ্রি করে ফজরের পর ঘুমোতাম। অফিস নাই তাই বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে তারপর এটা সেটা কাজ কর্ম, ইফতার বা রাতের খাবারের আয়োজন করতাম।

আমাদের বাড়িওয়ালা পিটার ও তার স্ত্রী মেরী দম্পতি। তাদের তিন ছেলে মেয়ের সবাই সার্বিয়াতে উদ্বাস্তু হয়ে চলে গিয়েছিল যুদ্ধের শুরুতেই। ওখানেই ওদের আত্মীয় স্বজন আছে। পিটার/মেরী এরা ছিল অর্থোডক্স খ্রীষ্টান। পিটারের বয়স ৬৫+, লম্বা, ফর্সা, সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী সদা হাস্যোজ্বল। মেরীর বয়সও কাছাকাছি তবে মেরীকেই আরো বয়স্ক দেখাতো একটু মোটাসোটা হওয়ার কারণে। পিটার ছিল খুব মিশুক প্রকৃতির। যুদ্ধও তার মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারেনি। সে তুলনায় মেরী একটু চুপ চাপ প্রকৃতির। স্বচ্ছল গৃহস্থ পিটার ও মেরী। তাদের বাড়িটার আয়তনই ছিল কয়েক একর। একপাশে পিটারের ফার্ম। অন্য প্রান্তের একটা দোতলা বিল্ডিং এ আমরা থাকতাম। মাঝখানে আপেল নাশপাতি আর পিচফলের বাগান। আমাদের দোতলা পুরানো ভবনটির উপরের দুটি রুমে আমরা দুজন থাকতাম। আমার রুমের জানালার পাশে এবং রুম সংলগ্ন বারান্দার পাশে আপেলের দুটি ডাল ছিল। আমাদের বিল্ডিংটিতে ঢোকার আলাদা গেট ছিল, গেট এবং আমাদের ভবনের মাঝখানের ১৫/২০ কাঠা জায়গাটি জুড়ে ছিল ফলের বাগান।

মেরী সারাদিন টুকটাক করে কাজ করতো। তার হাঁস মুরগীর ছোটখাটো একটা ফার্ম ছিল। সেগুলোর যতœ নেয়া, গাছের যত্ন নেয়া, ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করা, রান্না বান্না সব মেরী এক হাতে করতো। কসোভোতে একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল। ভাড়াটিয়ার বাসা বাড়ি ক্লিনিং, ভাড়াটেদের হাড়ি পাতিল, থালা বাটি, কাপড় চোপড় ক্লিনিং বাড়িওয়ালার দায়িত্ব। যদিও এজন্য আলাদা ভাবে পে করতে হত। এই কাজগুলো পিটার করতো আর বাজারে গিয়ে ফল, সবজি বিক্রি করতো। বাকী সব কাজ মেরী একাই করতো। পিটার ছিল খুবই খোশমেজাজী। দিনে কয়েক ক্যান বিয়ার তার চাই ই চাই। খাবার থাক বা না থাক তার এসব নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। পিটারকে আমি রবিবারেও চার্চে যেতে দেখিনি। সেই তুলনায় মেরী যথেষ্ট ধার্মিক। রবিবারে নিয়মিত চার্চে যেত। ঝুড়িতে করে, যত্নে ফল-ফলাদি, হাস মুরগীর ডিম বা বাড়িতে বানানো কেক নিয়ে যেত চার্চের পাদ্রীর জন্য।

কসোভো যুদ্ধটি ছিল প্রথমত আলবেনিয়ান মুসলিম জনগোষ্ঠী আর সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত খ্রীষ্টানদের মধ্যে। যুদ্ধের কারণে সব থেকেও এই দম্পতি আজ সর্বহারা। নিজেদের সন্তানদের ছাড়া এক ধরনের বন্দীদশা কাটছে তাদের। কিন্তু কখনোই আমরা পিটার বা মেরীর মধ্যে কোন মুসলিম বিদ্বেষ দেখিনি। বরং নানাভাবে তারা আমাদেরকে আপন করে নিয়েছিল। আমার রুম সংলগ্ন ডালটির আপেল কখনোই পিটার মেরী হারভেস্ট করতো না। বলতো আমরা যেন এগুলো নিজেরা পেড়ে খাই। প্রায়ই আমরা পিটারকে ইফতারে ডাকতাম। ইফতারে আমাদের একটা কমন আইটেম ছিল দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া ছোলার ঘুগনি আর চিকেন ফ্রাই। সঙ্গে থাকতো নানা রকমের সালাদ, ফল আর মুড়ি। এর মধ্যে ছোলামুড়ি ছিল পিটার এবং মেরীর সবচেয়ে পছন্দের। প্রতিদিন ইফতারের আগে আমি গাছ থেকে পছন্দের আপেল ছিড়েই ইফতার করতাম। আপেল ছিড়তাম ইফতারের ঠিক আগ দিয়েই। মেরী মাঝেমাঝেই ডিম আর আপেল দিয়ে বিশেষ একধরনের সু-স্বাদু কেক বানিয়ে নিয়ে আসতো। পিটার খুব ভাল চা বানাতে পারতো। ইফতারের পর আমরা যখন মাগরিবের নামাজের জন্য রুমে যেতাম সেই সুযোগে পিটার ঘন দুধের চা বা কফি বানাতো। আমার ইন্ডিয়ান কলিগ অশোক প্রায়ই দেশ থেকে নেয়া দার্জিলিং টি, তার্কিস কলিগ আকিফ তার্কিস টি কিংবা ব্রাজিলিয়ান কলিগ চ্যাপেল অরিজিন্যাল ব্রাজিলিয়ান কফি উপহার হিসাবে দিত। পিটার ইউ এন এর লোগো দেয়া ৫০০ এম এল মগ ভর্তি করে চা দিত। ঠান্ডার দেশের সেই গরম চায়ের স্বাদ মনে হয় এখনো জিভে লেগে আছে।

পিটার/মেরীর ফলমুল বিক্রি, হাঁস মুরগী বা ডিম বিক্রি, এবং আমাদের কাছ থেকে পাওয়া বাসা ভাড়া ছাড়া আর কোন রোজগার ছিলনা। যুদ্ধের বাজারে প্রায় পানির দামেই আমরা বাড়ি ভাড়া থাকতাম। তিন বেড রুমের দোতলা একটা ডুপ্লেক্স বিল্ডিং, সামনে বিঘা খানেক ফলের বাগান। চারদিকে প্রচুর খোলা মেলা জায়গা, আসবাবপত্র, হিটিং সিস্টেম, পানি বিদ্যুৎ, পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া ও লন্ড্রি, হাড়ি পাতিল থালা বাটি ক্লিনিং সবসহ আমরা মাত্র পাঁচশো ডলার ভাড়া দিতাম এবং ও পাড়ার এটাই সবচেয়ে বেশী ভাড়া। একতলা পুরোনো দু বেড রুমের বাড়ী তিনশ ডলারে ভাড়া পাওয়া যেত। অবশ্য এর বাইরে আমরা প্রায়শই পিটার মেরীকে নানাভাবে সাপোর্ট দিতাম। এ টাকা দিয়েই তাদের তিন সন্তানের সার্বিয়ার খরচও চালাতে হত।

আপেল কেটে, শুকিয়ে আপেলের গাদ থেকে ওয়াইন তৈরির জন্য মেরী বড় চুলায় আমাদের দেশের রস জ¦াল দেয়ার মত করে জ¦ালিয়ে পেস্ট তৈরি করতো। বেশ ভাল দামে ওয়াইন কোম্পানীর গাড়ি এসে বাড়ি থেকে সেইগুলো কিনে নিয়ে যেত। গ্রামের মাঠে ওদের বেশ কৃষি জমি ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ জমিতেই ওরা কোন ফসল করতোনা। বাড়ি সংলগ্ন জমিতে ভুট্টার আবাদ করতো, তাও মনে হয় হাস মুরগীর খাবার এবং ভুট্টা গাছকে আপেল পেস্ট তৈরির জন্য জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার জন্য। এর বাইরে বাড়ির সামনের এক খন্ড জমিতে ওরা ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শালগম, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো চাষ করতো। বিশেষ পদ্ধতিতে সবজি কেটে শুকিয়ে শীতের জন্য সংরক্ষণও করতো। আমি বাংলাদেশ থেকে দুবারেই তাদের জন্য মরিচ,পালংশাক, শসা, কুমড়ার বীচি নিয়ে গেছি। ওরা খুব অল্পতেই সন্তষ্ট থাকতো।

ভালই কাটছিল আমাদের রোজার দিনগুলো, রাত জেগে কোরআন খতম পড়তাম আর দিনের বেলা ঘরের কাজ করতাম, ঘুমোতাম, সিনেমা দেখতাম বা বই পড়তাম। ইফতারের পর কলিগরা মিলে ধুম আড্ডা দিতাম। আমরা যেহেতু ব্যাচেলর থাকতাম তাই আমাদের বাসা ছিল সবার আড্ডার জায়গা। বাংলাদেশি অফিসাররা হররোজ আমাদের বাসায় আসতো। মিশনে থাকতেই রান্নাকে আমি ভালবাসতে শুরু করি। সব সময় বিশেষ করে সন্ধ্যায় একটু বেশি করেই রান্না করতাম। যাতে করে দুয়েকজন মেহমানের জন্য আলাদা করে আর রান্না না করা লাগে। রোজার সময় সন্ধ্যার পর প্রায়ই বন্ধু বা সহকর্মীরা আসতো, চা খেতে খেতে আড্ডা দিতো। কসোভোতে আমাদের কয়েকজন কলিগ ফ্যামিলিসহ থাকতেন। তাদের প্রায় সকলেরই ছোট ছোট বাচ্চা ছিল। কাজের লোক ছাড়া ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা সামলে শীতের দেশে রান্না বান্না করা ভাবিদের জন্য সহজ ছিলনা। তাই মাঝে মাঝেই আমাদের এবং আমাদের মত এমন আরো দুয়েকটা ব্যাচেলর বাসায় গ্রুপে গ্রুপে আড্ডা জমতো। আড্ডা মানেই খাওয়া দাওয়া। প্রতি উইকএন্ডে একেক জনের বাসায় দাওয়াত থাকতো। কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ঠিক করে দিতেন কার বাসায় কবে দাওয়াত। বেশীর ভাগ বাসায় ৮/১০ জনের রান্নার মত পর্যাপ্ত হাড়িপাতিল ও ছিলনা। তাই দাওয়াত এক বাসায় হলেও রান্নাবান্না বিভিন্ন বাসায় হতো। একেক জন একেকটা রান্না করে নিয়ে দাওয়াতে যেতেন।

খিচুড়ি এবং গরুর মাংস ভুনা, ডিমের কারি এবং দুধের পায়েশ তৈরিতে আমার কিঞ্চিত নামযশ ছিল। ভাবিদের বাসায় দাওয়াত থাকলে উনারা গোপনে রান্নার রিকোয়েস্ট পাঠাতেন মান বাঁচানোর জন্য। আমি ও হাসি মুখে সেবা দিতাম। খিচুড়ি, পায়েস রান্না করে বা অন্য কোন আইটেম করে তাদের নামে চালানো হত। প্রায় প্রতিবারই রান্নাটা এমন ভাবে করতাম যাতে টেস্ট হুবহু এক রকম না হয়, ভাবিদের নকল ধরা না পড়ে। অবশ্য মিশন শেষে মেডেল প্যারেডে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কয়েকজন ভাবি হাসতে হাসতে আমাদের কীর্তি এবং তাদের এই নকল নিজেরাই বলে দেওয়ায় খুব হাসাহাসি হয়, যদিও কমবেশী সবাই একটু আধটু জানতো যে, আমি সহ আরো দুয়েকজন ব্যাচেলর বাবুর্চী ভাবিদেরকে এভাবে নকল সরবরাহ করে এসেছি।

দেখতে দেখতে ঈদ চলে আসল। আমাদের কন্টিনজেন্টে আমরা মোট বত্রিশ জন ছিলাম। তার মধ্যে আমরা ১৫/২০ জন প্রিস্টিনাতেই থাকতাম। দেখা গেল ছুটি ছাটা বাদ দিয়ে ফ্যামিলি মেম্বার বাচ্চা কাচ্চাসহ প্রায় ২০ জন বঙ্গসন্তান প্রিস্টিনাতে ঈদ করবেন। কন্টিনজেন্ট কমান্ডার চাচ্ছিলেন একটা ঈদ উৎসব করতে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে প্রয়োজনীয় হাড়িপাতিল এবং কাজের লোক ব্যতীত ২০/২৫ জনের রান্না বান্না করে খাওয়ানো সত্যিকার অর্থেই এক এলাহী কারবার। খবর পেয়ে প্রিস্টিনার বাইরে থেকেও কয়েকজন সহকর্মী প্রিস্টিনাতে আসলো ঈদ করার জন্য। আমরা ৪ ব্যাচমেট মিলে নিজেরাই দায়িত্ব নিলাম। আমাদেরকে সাপোর্ট দিলো সাব-ইন্সপেক্টর সার্জেন্ট পদমর্যাদার কয়েকজন কলিগ। ঠিক হলো ঈদের দিন সন্ধ্যায় হবে ঈদ পূর্নমিলনী। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল হাড়ি পাতিল যোগাড় করা। বাড়িওয়ালী মেরী এগিয়ে এল মুসকিল আসান হয়ে। সে তার ভাড়ার থেকে দুধ জ্বাল দেয়ার, স্যুপ রান্না করার হাড়িপাতিল বের করে দিল। ঈদের আগের রাত থেকেই আমাদের নব্য বাবুর্চিদের কারিশমা শুরু হল। দু তিন রকমের সেমাই, সুজি,পায়েশ রান্না হল ঈদের আগের রাতেই। উদ্দেশ্য হাড়ি পাতিলের সর্বোত্তম ব্যবহার। ঠান্ডা করে যেসব খাবার খাওয়া যায় বিশেষ করে সেমাই, মিষ্টি এগুলো ওয়ানটাইম পাত্রে ভরা হল যাতে করে ঐ পাতিলে অন্য খাবার রান্না করা যায়। প্রচন্ড ঠান্ডার দেশ, দুতিন দিন বাইরে থাকলেও খাবার একই রকম থাকে, ফলে অসুবিধা হলনা। ইমাম ভাই ছিল রুটি বানানোর ওস্তাদ। যদিও আমাদের রেডি পরোটার অপশন ছিল ইমাম ভাই খাটি বরিশাইল্যা ভাষায় বললো “তুই এত কিছু করছো, আর মুই কয়ডা পরাটা ভাইজা খাওয়াইতে পারুম না? মোগো বাড়ি কি বরিশাল না? সে রাত জেগে পরোটার খামি বানালো, অনেকগুলো পরটা একাই বেললো। ঈদের দিন দুপুরের আগে থেকেই মুল রান্নাবান্না শুরু হল। সার্জেন্ট গাজী আবুল হোসেন আগে থেকেই বুচারের সাথে যোগাযোগ করে রেখেছিল। সে গিয়ে সদ্য জবাই করা আলবেনিয়ান মুসলিম বুচারশপ থেকে গরুর মাংস নিয়ে আসলো ৫/৬ কেজি, আলাদা করে কলিজা। গরুর মাংস ভুনা হল, মুরগীর রোস্ট হল, পোলাও, সাদা ভাত, খিচুড়ি, পরোটা, মুরগীর ঝালফ্রাই, আলুরদম, ছোলারডাল, মিকসড ভেজিটেবল, মিক্সড সালাদ, কলিজা ভুনা, দুধ সেমাই, লাচ্ছা সেমাই মেরীর বানানো আপেল কেক আর নাশপাতি ও পিচের মিক্সড জুস, সব মিলিয়ে এলাহী কারবার।

সন্ধ্যা থেকে শুধু পরোটা ভাজা চলতে লাগল আর সব কমপ্লিট। খাবারের  প্রাচুর্য্য দেখে ভিন দেশী কলিগদের কজনকেও আমরা দাওয়াত দিলাম। যে যার মত করে খেলো, সব মিলিয়ে ২০টির বেশী আইটেম ছিল। খাওয়ার পরও যাবার সময় সবার বাটি ভরে ভরে খাবার দিতে পারলাম যাতে পরের দিনও কারো রান্না বান্না না করা লাগে। কলিগদের কয়েকজনও কয়েকটা আইটেম বাসা থেকে করে নিয়ে এসেছিলেন। পুডিং, ঘরে পাতা দই, ঘরে বানানো স্পঞ্জ রসগোল্লা, ভেজিটেবল বারবিকিউ, এসবই আসল বিভিন্ন ভাবিদের ঘর থেকে। দুর্দান্ত একটা ঈদ আয়োজন হল। যে যা পারে সবাইকে পারফর্ম করা লাগলো। বড় কেটলিতে চা কফি বানানোই ছিল। ঈদের উত্তাপ, চায়ের উত্তাপ আর সেই ভিন দেশে সহকর্মীদের আত্মিক উষ্ণতায় স্মৃতির পাতায় এখনো ভাস্বর হয়ে আছে সেই আয়োজন।

সব আয়োজনই এক সময় ফুরোয়, থাকে শুধু অন্ধকার। মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেনও কাছে নেই। অগত্যা সব ক্লান্তি, অভিমান ভুলে নিজেই নিজের আর অন্ধকারের মুখোমুখি হয়ে বসলাম এক মগ চা নিয়ে। কসোভোর মার্চেও বাংলাদেশের মাঘের শীত, সেই শীতের আমেজ, মশলা চায়ের চমৎকার গন্ধ বেনসন এন্ড হেজেজের ঝাঁঝ সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হল। বরাবরই গান শুনলে আমার মন ভাল হয়ে যায়। গান শুনতে শুরু করলাম। ঈদ মানে খুশি, খুশির দিনে খুশির আয়োজনে মন খারাপ করা ঠিক হবেনা। মন ভাল করার মত গান ল্যাপটপে খোঁজা শুরু করলাম। ব্রাউজ করছি তো করছি। কোন গান আর পছন্দ হয়না। তখন কসোভোর সেই ফার্ম হাউজে রাতের নীরবতা ভেঙ্গে বারান্দায় এসে পড়তে লাগল ঝকঝকে চাঁদের রূপালী আলো। ল্যাপটপে তখন বেজে চলেছে “যারে ঘর দিলা, সংসার দিলারে, তারে বৈরাগী মন কেন দিলারে! বৈরাগী মন কেন দিলারে!”

সব সুরই এক সময় থামে আমার সুর, গানও থামলো। সারাদিনের ক্লান্তি, অবসাদ একথালা খিচুড়ি আর ঝাল গরুর মাংস খেয়ে ভারী হয়ে আসা শরীর ঘুমে অচেতন হয়ে আসল। ঘুম জড়ানো শরীরটাকে নিয়ে বিছানায় নিজেকে মেলে দিলাম। তখন গির্জার ঘড়িতে রাত তিনটার ঘন্টা বেজেছে তার কিছুক্ষণ আগে। ঘুম ভাঙ্গল বেশ বেলা করেই। পূর্ব দিকের জানালার গ্লাস ভেদ করে একফালি রোদ আমার পায়ের উপর এসে পড়েছে। ঘুম ভেঙ্গেই বারান্দায় গেলাম। চারিদিকে ঝলমলে রোদ, বইছে মৃদুমন্দ বাতাস, থোকায় থোকায় দুলছে আপেল, নাশপাতি, পিচফল। মন ভাল হয়ে গেল। আসলে প্রকৃতির মাঝেই শান্তি, প্রকৃতির মাঝেই সুখ। এজন্যই বোধহয় পবিত্র গ্রন্থে জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, কুলু কুলু ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া নহরের কথাই বলা হয়েছে। দোতলার বারান্দা থেকেই দেখলাম পিটার সবজির ক্ষেতে কাজ করছে। আমাকে দেখেই মিষ্টি করে হাসলো উচ্চস্বরে ডাকলো, বললো ‘‘দোবরো ইয়োত্রো’’ মানে শুভ সকাল। আমিও ওকে দেখে হাসলাম। দুঃখ নয় হাসিই সংক্রামক। ভাবলাম দুঃখের সাথে নয় আনন্দের সাথেই সন্ধি করি। পিটারকে ডাকলাম, বললাম চা বানাচ্ছি এসো চা খাই। সকালের সোনা রোদে দূরদেশী এই প্রবীণের সাথে বসে চায়ে চুমুক নিতেই মন ভাল হয়ে গেল। পৃথিবীটা আসলেই অনেক সুন্দর, তার চেয়েও সুন্দর আমাদের জীবনটা। ভাবলাম যুদ্ধদেশে সব হারানো পিটার কেমন সুখে আছে আমি কেন দুঃখকে সঙ্গী করবো। কসোভোর হিসাবে তখন বসন্তকাল। ল্যাপটপে গান ছাড়লাম “আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে, এত পাখি গায়”।

লেখক : অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন)

অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *