ই-পেপার

রক্তিম ফাগুন

কড়া রোদ। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথার চান্দি ফেটে যাচ্ছে। তাই আতাউর সাহেব দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। রমজান মাস, ঈদ এখনও চার দিন পরে। এরকম সময়ে আতাউরের ভালো লাগে। ঢাকা শহরের ব্যস্ততম দিনগুলোর মধ্যে এই দিনগুলো একটি। এখন ঢাকা শহরে চনমনে ভাব বিরাজ করছে। ফুটপাতে মানুষের সমাগম, মার্কেটগুলোয় জামা-কাপড়ের উপর বিশেষ ছাড়, মাংসের মশলা ও লাচ্ছা সেমাইয়ে ভর্তি দোকানগুলো যেন বলছে ঈদ চলে এসেছে! অফিসের ব্রেক টাইমে আতাউর রহমান তিনটি করে সিগারেট খান কিন্তু আজকে তার মেজাজ ভালো বলে তিনি পাঁচটি সিগারেট খাবেন। অফিসের কাছেই একটি দোকানে বসে আতাউর সাহেব খুবই ভাবুক ভঙ্গিতে চার নম্বর সিগারেটে টান দিচ্ছেন। দোকানের সামনে বেঞ্চে বসলে মেইন রোড ও ফুটপাত দেখা যায়। আতাউর এখন সামনের বেঞ্চে বসে বাইরে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ আগেই তিনি দেখলেন ফুটপাত দিয়ে এক মেয়ে তার মা’র হাত ধরে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তারা ঈদের কাপড় কিনেছে। কত যে সুন্দর হাসি ছিল মেয়েটার মুখে এবং মা হাসি দেখে তৃপ্তি পাচ্ছেন। আতাউর নিজেও তার ছেলের হাসি দেখে তৃপ্তি পাবেন। ঈদের কেনাকাটা শেষ হয়ে গেলে বাসে করে চুয়াডাঙ্গা রওনা দেবেন। সেখান থেকে জীবননগর যাবেন। পৌছাবেন ভোরে। তারপর ছেলে এসে ‘বাবা বাবা’ বলে চিৎকার করতে করতে এসে জড়িয়ে ধরবে। কত দিন হয়ে গেল গ্রামে যাওয়া হয় না। আতাউরের বাড়ির পাশে একটি বড় আম গাছ আছে। প্রতিদিন সকালে তিনি আম গাছের নিচে চেয়ারে বসে পেপার পড়তেন। আবার কোনো দিন আম গাছের নিচে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডা হতো। তখন মনে হয় গাছ এদের অনেক যতেœ আগলে রেখেছে। কাটানো এই দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। তারপরও আতাউরের ভাবতে ভাবতে সময় নষ্ট করতে ভালো লাগে। কখন যে সিগারেট শেষ হয়ে গেল আতাউর খেয়ালই করেননি, তাই তিনি পাঁচ নম্বর সিগারেটও টানা শুরু করলেন। তার মনে হচ্ছে ধোঁয়া টানার সময় ধোঁয়াগুলো ভেতরে ঢুকে সব দুঃখ, কষ্টকে নাক দিয়ে বের করে ফেলছে। আতাউর সাহেবের অফিস শেষ হলো রাত আটটায়। বের হওয়ার আগে বস ঘোষণা করলেন ঈদের ছুটি এক সপ্তাহ। আতাউরের চোখে পানি এসে গেল, এক সপ্তাহ গ্রামে থাকার সৌভাগ্য তার হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ বসের সাথে হ্যান্ডশেক করে বললেন, “ঈদ মোবারক”। কালকে ভোরেই রওনা দিতে হবে সুতরাং, ঈদের কাপড় কিনতে হবে, রাস্তায় বসে থাকা ফকিরদের বোনাস দিতে হবে, বাসের টিকিট কাটতে হবে ইত্যাদি অনেক কাজ আছে আতাউরের। বস যেহেতু কিছু বোনাস টাকা দিয়েছে কাজেই ভালো কাপড় কিনেই বাড়ি রওনা দিতে হবে। তার স্ত্রীর জন্য কমলা রঙয়ের শাড়ি কিনলেন এবং কল্পনা করলেন কেমন লাগবে তাকে। সবার জামা কেনার পর চায়ের দোকানে বসে ফোন করলেন তার ছেলেকে,

‘কেমন আছিস বাবা তুই?’

‘বাবা আমি ভালো আছি তুমি কেমন আছ?’

‘আমিও ভালো আছি, কালকে আমি গ্রামে আসছি। তোর জন্য লালা পাঞ্জাবি কিনেছি।’

‘তুমি নিজের জন্য কী কিনেছো বাবা?’

হায় হায়! আতাউর ভুলেই গেলেন নিজের জন্য কেনার কথা। পরিবারের খুশি দেখতে পারলেই তো নিজেকে তখন সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়, ছেলের হাসি দেখার জন্য সব বাবারাই নিজের কথা ভুলে যায়।

লেখক : একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী

শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x