ই-পেপার

আহমদ সেলিম রেজা

এক.

বিশ্বে নানা ধর্ম ও জাতির বসবাস। সব ধর্মেরই নিজস্ব উৎসব আছে। আবার সব জাতিরও নিজস্ব উৎসব আছে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতীয় উৎসব ও সামাজিক উৎসব রয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব জাতীয় ও সামাজিক রীতি-নীতি অনুযায়ী এসব উৎসব পালন করে থাকে। আধুনিক বিশ্বে বহু জাতিগোষ্ঠীর ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াশ হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবসও রয়েছে, যা উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। 

বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মীয় উৎসবগুলো সব ধর্মের নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে পালিত হয়। মুসলমানদের দুই ঈদ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বা কোরবানীর ঈদ। খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস ডে ও ইস্টার সানডে। বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা ও কঠিন চিবরদান। হিন্দুদের দুর্গা পূজা, কালীপূজা, স্বরসতি পূজা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় উৎসব। এছাড়া শিখ, জৈন, পার্সিসহ আরো নানা জাতির নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব রয়েছে।

মুসলিম সমাজে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বা কোরবানীর ঈদ ছাড়াও আশুরা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), শবে বরাত, শবে মেরাজ, শবে কদর, বিশ্ব ইজতেমা, ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এসব উৎসবের সব রীতি-রেওয়াজ, খানা-পিনা, পোশাক-আশাক এক নয়। প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ুর প্রভাব ইত্যাদি নানা কারণে স্থান-কাল ভেদে উৎসবে প্রকৃতি বিভিন্ন রকম হয়। ইরাক ও ইরান পাশাপাশি দেশ হলেও উৎসবের ধরন এক নয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্থান, শ্রীলঙ্কা বা মিয়ানমারের উৎসবের প্রকৃতিও এক নয়।

বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও বহু ধর্মের মিলিত সংস্কৃতির দেশ। এদেশের মানুষ সব ধর্মের উৎসবগুলোর সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবের কারণে এদেশের মানুষ কোমল প্রকৃতির, মিশুক, অতিথিপরায়ণ ও হাসি-আনন্দে সমানভাবে মুখর ও বেদনায় সমভাবেই কাতর। বাংলাদেশের মানুষ জাতিগতভাবে বাঙালি। আর বাঙালিরা জাতিগতভাবেই উৎসব প্রিয়। নৃগোষ্ঠীর ইতিহাসে দেখা যায়, নদীপ্রধান, কৃষিপ্রধান, অঞ্চলপ্রধান, পাহাড়ি, ভাওয়ালী ও মুশুরদী অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশের নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। তাই এ দেশের রয়েছে নানা লোকজ ও সামাজিক উৎসব। পাহাড়ে বৈসাবি, নদী ও হাওর এলাকায় নৌকা বাইচ, কৃষিপ্রধান এলাকায় গ্রামীণ নবান্ন উৎসব, বর্ষাবরণ উৎসব, পয়লা ফাল্গুনে বসন্তবরণ উৎসব, পৌষমেলা-পিঠা উৎসব, বাউল উৎসব, হাসনরাজা উৎসব, বর্ষবরণ বা পয়লা বৈশাখ উৎসব এখন গ্রাম থেকে নগরেও ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। এসবই বাঙালির সামাজিক ও লোকজ বা গোত্রীয় উৎসব।

প্রাচীন সভ্যতা নির্ভর যে কোনো দেশ ও সমাজে রয়েছে এমন বহুমাত্রিক উৎসবের নানা দৃষ্টান্ত। আরবের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে এমন নানা বৈচিত্র্যময় লোকজ ও সামাজিক উৎসবের ইতিহাস। প্রাচীন আরবের মক্কার ‘ওকাজ মেলা’ এবং ইয়াসরেবের (মদিনার) ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ তেমনি ছিল তাদের লোকজ উৎসব। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ধর্মীয় অনুশাসন প্রায় এক হলেও মাজহাব ও আকিদার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবের কারণে পারিবারিক ও সমাজ কাঠামো একই রকম নয়। এমনকি বর্তমান সৌদি আরবের মক্কাবাসী ও মদিনাবাসীর ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবণাচারণে লক্ষ্য করা যায় ব্যাপক পার্থক্য। আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর সময় থেকেই এই ভিন্নতা স্পষ্ট। মরুভূমির রুক্ষ জলবায়ুর কারণে মক্কার মানুষ জীবনাচরণে কঠোর প্রকৃতির। প্রাচীনকাল থেকেই কাবা গৃহের খেদমত ও ব্যবসা-বাণিজ্যই তাদের উপার্জনের একমাত্র পথ। ঐতিহাসিক ওকাজের মেলা ও কবিতা উৎসবে আমোদ-প্রমোদে মত্ত হওয়া ছিল প্রাচীন আরবদের প্রকৃতি। ফলে সেখানে নবীজীর মানবিক ইসলামের দাওয়াত কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি একসময় আল্লাহর নির্দেশে নবীজীকে রিক্ত ও নিস্ব অবস্থায় রাতের অন্ধকারে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছে।

পক্ষান্তরে মদিনার মানুষ ছিলো কৃষিনির্ভর সমাজের বাসিন্দা। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবের কারণে তারা কোমল হৃদয়, অতিথিপরায়ণ, হাসি-আনন্দে মুখর, বেদনায় সমভাবে কাতর। সফর ক্লান্ত নবীজী যখন মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছলেন, তিনি বিস্ময়াবিভূত হয়ে গেলেন। দেখলেন, সমবেত লোকেরা দফ বাজিয়ে, গান গেয়ে, খেজুর গাছের শাখা নেড়ে, উলুধ্বনি দিয়ে আল্লাহর নবী মুহম্মদ (সা.) কে বরণ করার জন্য উৎসব করছে। তারা গাইছে, ‘তালাআল বদরু আলাইনা/মিনছানিয়া আল ওয়াদা/ওয়াজাবাস শুকরু আলাইনা/মাদাআ লিল্লাহি দাআ।’

যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘ওয়াদা উপত্যকা থেকে আমাদের মাঝে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের কর্তব্য হয়ে গেছে’। ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীন নাশিদ বা নাতে রসূল হিসেবে এর উল্লেখ রয়েছে। অনেক মুসলিম সমাজে আজও তা সমানভাবে সমাদৃত। এই নাতের পরবর্তি পঙতিগুলোর অর্থ, ‘যতদিন আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ থাকবে, আমাদের পথ প্রদর্শক- আজকে আমাদের মাঝে উপদেশবাণী নিয়ে এসেছেন যিনি, তাঁর প্রতি আমাদের আনুগত্য করতে হবে। (হে নবী) আপনি আমাদের জন্য মর্যাদা বয়ে নিয়ে এসেছেন, স্বাগত আপনাকে, যিনি আমাদের সঠিক পথ দেখাবেন’।

তাই আমাদেরকে কোনো ধর্মের কোনো উৎসবের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে সেই ধর্ম সেই সমাজের মানুষের আবেগ, অনুভূতির প্রকাশ ও সামাজিকতাকে উপলব্ধি করতে হবে। এখানে মনে রাখতে হবে উপরোক্ত ঘটনা সব হাদিস শাস্ত্রেই উল্লেখ আছে। তবে এটা উল্লেখ নেই যে, তাদের এমন সংবর্ধনায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বা তাদের কোনোরূপ ভর্ৎসনা করেছিলেন। বরং নবীজী যে তাদের এমন সম্বর্ধনায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন, তাদের আতিথেয়তা ও সামাজিকতায় মুগ্ধ ছিলেন তার প্রমাণ ইতিহাস ও হাদিস শাস্ত্রে রয়েছে। যেমন দেখতে পাই, মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনায়। ওইসময় নবীজী মক্কাবাসীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেলেন। তাদেরকে বেশি বেশি সময় দেওয়া, গণিমতের মাল বণ্টনে তাদের প্রধান্য দেওয়া ইত্যাদি ঘটনায় মদিনাবাসী শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা এই ভেবে সংশয়ে পড়ে যান যে, নবীজী হয়তো শেষ পর্যন্ত জন্মভূমি মক্কাতেই রয়ে যাবেন। মদিনায় আর ফিরে যাবেন না। নবীজী ওহীর মাধ্যমে মদিনাবাসীর এমন মনোভাবের বিষয়ে অবগত হন। পরে তিনি মদিনাবাসীকে সমবেত করে জানতে চাইলেন, তোমারা কি আমাকে চাও, না গণিমতের মাল। মদিনাবাসী সমস্বরে বলে উঠলো, আপনাকে। তখন তিনি বললেন, মক্কাবাসী ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ ভালোবাসে, তাই ওরা গুরুত্ব পাচ্ছে। মদিনায় হবে আমার শেষ আবাস। এই হলো নবীজীর সামাজিকতার শিক্ষা।

দুই.

ঈদ মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। একইসঙ্গে ঈদ মুসলিম সমাজের সামাজিক উৎসবও বটে। কারণ এই ঈদ শব্দটির সঙ্গেই আনন্দ ও উৎসবের বিষয় জড়িয়ে আছে। ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। ভাষাবিদরা বলেছেন, ঈদ শব্দের উৎপত্তি আরবি আওদ শব্দ থেকে যার অর্থ বারবার ফিরে আসা। লিসানুল আরব অভিধানে রয়েছে, ঈদ বলা হয় এমন সময়কে, যে সময় আনন্দ ও দুঃখ ফিরে আসে। এছাড়া যেদিন লোকজনের ব্যাপক সমাগম হয় বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তি অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার স্মৃতিচারণা করা হয়, সেদিনকেও আরব সমাজে ঈদ বলা হয়।

পবিত্র কোরআনেও এমন ঘটনার বিবরণ রয়েছে। যেমন, ‘মরিয়ম তনয় ঈসা বললেন, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন, তা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য হবে ঈদ-আনন্দোৎসব এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১১৪)। এই আয়াতে আসমানি খাদ্য নাজিল হওয়ার দিনটি পরবর্তীদের জন্য স্মৃতিচারণার দিন হওয়ায় তাকে ঈদ বলা হয়েছে। খ্রিস্টান সমাজ ইস্টার সানডে হিসেবে, যা আজো পালন করে থাকে।

বাংলা ভাষায় উৎসব বলতেও বোঝায় আনন্দপূর্ণ বা জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ভাষাবিদরা বলেছেন, এটা সংস্কৃতিজাত শব্দ।

আমরা দেখছি, সব ধর্মে, সব সমাজেরই রয়েছে নানা আচার-অনুষ্ঠান রীতি-নীতি ও উৎসব। প্রাচীন আরবে নবীজী দেখলেন, মক্কা নগরের বিখ্যাত ‘ওকাজ মেলা’। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে যাওয়ার পর সেখানে দেখলেন, ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে বছরে তারা দু’টি উৎসব পালন করছে। জানলেন, মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা নানা আয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করে থাকে। নও মুসলিমরাও সামজিক ঐতিহ্য হিসেবে তা পালন করছে। তখনও মুসলমানদের কোনো উৎসব ছিল না। বলাবাহুল্য উৎসব আয়োজন ও পালনের জন্য সমাজ বিজ্ঞানের প্রাথমিক শর্ত একটি সমাজ গঠন। সেই সমাজের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি-নীতি অনুযায়ী পালিত হয় উৎসব। আদিকাল থেকে উৎসবের প্রকৃতি এভাবেই গড়ে উঠেছে। কৃষি নির্ভর সমাজে এক ধরনের উৎসব আবার নগর সমাজে ভিন্ন ধরনের উৎসব। তাই দেশে দেশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সভ্যতায় রয়েছে উৎসবের বিভিন্নতা।

ঈদের প্রর্বতন

মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার এক বছর পর দ্বিতীয় হিজরীতে ঈদের প্রবর্তন হয়। ততোদিনে মদিনায় মসজিদে নববী কেন্দ্রিক একটি সমাজ গড়ে উঠেছে। মুহাজির ও আনসার মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ-আনন্দ-বেদনা পরস্পর ভাগাভাগি করে নিতে শিখেছে। মদিনা সনদ গৃহীত হয়েছে। ঠিক এসময় মুসলমানদের ওপর এক মাস সিয়াম সাধনার বিধান নাজিল হয়। সেটা দ্বিতীয় হিজরি সনের কথা। তখন রমজানুল মোবারকের রোজা ফরজ হয়। আর পয়লা শাওয়াল পালন করা হয় ঈদুল ফিতর। ইসলামের ইতিহাস বলে, মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়া হয় দ্বিতীয় হিজরির পয়লা শাওয়াল মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ বা ৩১ মার্চ। একই হিজরিতে ঈদুল আজহার নামাজ ও কোরবানির বিধানও নাজিল হয়। আর ১০ জিলহজ পালন করা হয় ঈদুল আজহা।

তখনকার ঈদ আর বর্তমান ঈদ অবশ্যই তুলনীয় নয়। কারণ অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও রুচি বদলে যায়। সেদিনের মুসলিম সমাজে ধনী ছিলো খুবই কম। ফলে সেদিন মিষ্টান্ন বলে যে ‘শারিদ’ তৈরি হতো, আমাদের গ্রামীণ মুসলিম সমাজে একদা তারই একটি সংস্করণ ‘মিঠুরী’ নামে খাওয়া ও বিতরণের প্রচলন ছিল। আজকের নাগরিক সমাজে মিষ্টান্ন পরিবর্তিত হয়েছে হালুয়া, সেমাই, লাচ্ছি সেমাইতে। এছাড়া পারস্যের মোগলদের প্রবর্তিত নানা স্বাদ ও পদের মুখরোচক মিষ্টিতে বদলে গেছে মিষ্টান্নের সামাজিক রুচি। একই দৃষ্টান্ত জামা-কাপড়ের বেলায়ও প্রযোজ্য। তখনও নতুন জামা-কাপড় পরতো সার্মথ্যবানরা, এখনো তাই। তখন বাড়ির পাশে মার্কেট বা বাজার ছিল না। ঘরে ঘরে কেনাকাটার ধুমধামও ছিল না। তবে আনন্দ-খুশি কম ছিল না। তবে দারিদ্র্যের কারণে নবীজীর (সা.) পরিবারে যাতে আনন্দের ঘাটতি না হয়, সেজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বেহেশত থেকে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দুই নাতির জন্য জামার কাপড় পাঠিয়ে উৎসবের আনন্দ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আমরা হাদিসের বিবরণ পাই। একইসঙ্গে মদিনার ছোট ছোট শিশু-কিশোরের সঙ্গে নবীজীর (সা.) আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার খবর পাই।

নবীজীকে (সা.) মদিনাবাসীর সর্ম্বধনার খবর থেকেই আমরা জানতে পারি মদিনার ‘আনসার’ সম্প্রদায় গান-বাদ্য পছন্দ করতেন। তো ‘এক ঈদের দিনে আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর ঘরে প্রবেশ করে দেখেন, আয়েশা রা. সামনে বসে দু’টি আনসারী মেয়ে দফ বাজিয়ে বুআ’স (যুদ্ধ সঙ্গীত, আনসার যোদ্ধাদের প্রশংসা ও বিজয় গাঁথা) পরিবেশন করছে। নবীজী (সা.) চাদরে মুখ ঢেকে পাশের খাঁটিয়ায় শুয়ে আছেন। আবু বকর (রা.) আয়শা (রা.) কা- দেখে খুব রেগে গেলেন এবং এসব শয়তানী বাদ্য বন্ধ করতে বললেন। এ সময় চাদর সরিয়ে হুজুর সা. বললেন, ছেড়ে দাও আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্যই ঈদ রয়েছে। আর এ হচ্ছে আমাদের ঈদ’। সহীহ বোখারী।

বাঙালি মুসলিম তরুন সমাজের মনে ঈদের এমন আনন্দ প্রথম ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে/ এলো খুশির ঈদ/আপনাকে আজ বিলিয়ে দে তুই/শোন আসমানী তাগিদ/ও মন রমজানেরই রোজার শেষে/এলো খুশীর ঈদ।’ ১৯৩৯ সাল থেকে আজ অবধি এই গজল বাঙালি মুসলিম সমাজে ঈদ আনন্দের প্রতিক হয়ে আছে। খুশীর এমন উদ্বেল প্রকাশ, ঢেউয়ের মতো আনন্দ ছড়িয়ে পরার এমন আকুলতা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। যে মুহূর্তে এই গজলের সুর বেজে উঠে এক অপার আনন্দ ছুঁয়ে যায় হৃদয়, সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রাম ও মহল্লায়। ব্যস! শুরু হয়ে যায় শিশু, বাচ্চা ও তরুণীদের তুমুল চিৎকার, হৈ হুল্লার..ঈদ মোবারক। ঈদ মোবারক।

ঈদের দিনের আরেক ঘটনার বিবরণে পাওয়া যায়, রাসুল (সা.) বালিকা বধূ আয়েশার (রা.) মনের বাসনাও পূরণ করেছেন। ‘আয়েশা (রা.) বলেন, একদা ঈদের দিন মসজিদে নবীর সামনে আবিসিনিয়ার কিছু লোক লাঠি নিয়ে খেলা করছে। মহানবী (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করেন, হে আয়েশা! তুমি কি লাঠিখেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি তখন আমাকে তাঁর পেছনে দাঁড় করান, আমি আমার গাল তাঁর গালের ওপর রেখে লাঠিখেলা দেখতে লাগলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, হে বনি আরফের দল! লাঠি শক্ত করে ধরো। আমি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তিনি তখন বলেন, তোমার দেখা হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তাহলে এবার যাও’। সহীহ বোখারী।

অন্য এক হাদিসে আছে, ‘আয়শা রা. বলেছেন, নবী করিম সা. দৌড়ে আমার সাথে প্রতিযোগিতা করলেন। তখন আমি আগে বেরিয়ে গেলাম। পরে যখন আমার শরীর ভারী হয়ে গেল তখনও আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আমাকে হারিয়ে দিলেন এবং বললেন, এবার সেবারের বদলা নিলাম’। আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ।

রাসূলুল্লাহ সা. তীরান্দাজী ও বল্লম খেলাকেও উৎসাহিত করেছেন। ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার তীর মারো, আমি তোমাদের সাথে আছি। জেনে রাখ তীরান্দাজী একটি শক্তি। তীর নিক্ষেপন একটা শক্তি। তিনি আরো বলেন, তীরান্দাজী শিক্ষা লাভ করা তোমাদের কর্তব্য। কেননা তা তোমাদের জন্য একটা উত্তম খেলা-ও’। সহীহ বোখারী

তবে নবী সা. কোন জীবিত বা প্রাণবন্ত জিনিসকে তীর নিক্ষেপনের লক্ষ্য নির্ধারণকারীর ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। কোন জীব জন্তুকে উত্তেজিত করে পারস্পারিক লড়াইয়ে লিপ্ত করতেও নিষেধ করেছেন। জামে তিরমিযী, আবু দাউদ।

‘রাসূলুল্লাহ সা. নিজে একবার রুকানা নামক এক কুস্তিগীরের সাথে কুস্তি লড়েছিলেন। একাধিকবার তিনি তাকে আছাড় দিয়ে পরাস্ত করেছিলেন’। আবু দাউদ।

‘হজরত ওমর রা. বলেছেন রাসূলুল্লাহ সা. ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। যেটি জিতেছে সেটিকে পুরস্কৃতও করেছেন’। মুসনাদে আহমদ।

‘রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে কাজে আল্লাহর জিকির নেই, তা নিতান্তই খেলা এবং নিরর্থক। চারটি কাজ এর ব্যতিক্রম, তা হলো, দুই লক্ষস্থলের মাঝখানে দৌড়ানো, ঘোড়া প্রশিক্ষণ, নিজ স্ত্রী পরিজনের সাথে খেলা করা ও সাঁতার কাটা শেখানো’। জামে তিরমিযী, আবু দাউদ।

এসব হাদিস ও মদিনায় ঈদের নানা ঘটনাবলির বিবরণ থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক. ঈদের ধর্মীয় অনুশাসন বা বিধান। দুই. ঈদের সামজিক অনুশাসন ও বিধান।

ঈদের ধর্মীয় অনুশাসন বা বিধান হলো মহানবী (সা.) আদেশ ও নিষেধ। দ্বিতীয় হিজরীতে ঈদের প্রবর্তন হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের ইহুদীদের দুটি উৎসব পালন করতে নিষেধ করেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তাদের দুটি দিন ছিল, যাতে তারা উৎসব পালন করত। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এ দুটি কিসের দিন? তারা বলল, আমরা জাহেলি যুগে এ দুই দিন খেলাধুলা ইত্যাদি উৎসব পালন করতাম। এ নিয়মই চলে আসছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দুটির পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৩৬; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১৩৬৪৭)

ঈদের দিনে মহানবী (সা.)-এর আমল

রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে উত্তম পোশাক পরতেন। ঈদুল ফিতরে কিছু মিষ্টি দ্রব্য খেতেন। ঈদুল আজহায় কিছু খেতেন না। কোরবানির গোশত দিয়ে দিবসের প্রথম আহার করতেন। ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যেতেন, অন্য রাস্তা দিয়ে আসতেন। আসা-যাওয়ার পথে ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ পাঠ করতেন। ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাতেন। গরিব-দুঃখীদের ফিৎরা বিতরণ করতেন। ঈদগাহে গিয়ে অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে খুতবা দিতেন। খুতবায় ঈদের করণীয় কাজ এবং ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব বর্ণনা করতেন।

দুই. ঈদের সামাজিক অনুশাসন ও বিধান।

ঈদ আনন্দের অন্যতম উপাদান হলো নতুন কাপড় পরা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘বল, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র রিজিকসমূহের ব্যবস্থা করেছেন, তাকে কে হারাম করল?’ সূরা আল আরাফ, আয়াত-৩২

আল্লাহর এভাবেই নতুন কাপড় পড়ে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করার বিধান ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে খাদ্য ও পানীয়ের কথা। হালাল খাদ্য ও পানীয় নিজে খাওয়ার ব্যাপারে ও অপরকে খাওয়ানোর ব্যাপারে পবিত্র কোরআন আমাদেরকে কার্পণ্য করা থেকে নিষেধ করেছে। আতিথেয়তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

গরিব মানুষ যাতে ঈদে নতুন জামা-কাপড় কিনে পরতে পারে এজন্য নবীজী আমাদের পবিত্র রমাজানে অধিক পরিমাণে দান-খয়রাত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, সেরা দান হলো তা যা রমজান মাসে দেওয়া হয়’। কানজুল উম্মাল

নবী করিম সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন তোমাকে ধন-মাল দিয়েছেন, তখন আল্লাহর নিয়ামত ও তাঁর অনুগ্রহের পরিচয় তোমার উপর থেকে প্রকাশ পাওয়া যাওয়া বাঞ্ছনীয়’। আন-নেসায়ী।

অর্থাৎ উৎসব বা আনন্দ দিনে কারো গরিবানা প্রকাশ তার অকৃতজ্ঞতা ও না-শোকরিয়া প্রকাশের শামিল। নিজে নতুন জামা কাপড় পরা বা অপরকে দান করার মাধ্যমে ধন-মালের শোভা উপর থেকে প্রকাশ পায়। ঈদে আতিথেয়তা একটি প্রধান ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য।

রাসূলুল্লাহ সা. মেহমানদারী ও আতিথ্য পছন্দ করতেন। তিনি মেহমানকে আপ্যায়ন করতে খুব ভালোবাসতেন। মেহমানকে খওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতেন। বারবার বলতেন আরেকটু খান। ঈদ উপলক্ষে মেহমানদারী তাই আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষঙ্গ।

ঈদ উৎসবের রীতি-রেওয়াজ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও সমাজে ঈদের নানা রীতি ও রেওয়াজ প্রচলিত আছে। কিছুটা ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজ; কিছু সামাজিক। বিশ্বের দেশে দেশে মুসলমানরা যেখানে বসবাস করেন, চাই সে মুসলিম রাষ্ট্রই হোক কিংবা অমুসলিম রাষ্ট্র- ঈদের বার্তা ও আনন্দের উপলব্ধি প্রায় একই রকম। ঈদের আগে ফিত্রা দেওয়া, জাকাত দেওয়া, দল বেঁধে ঈদের চাঁদ দেখা, চাঁদ রাতের কেনাকাটা সব দেশে এমনকি প্রতিটি মুসলিম সমাজে প্রচলিত আছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এবং রাজধানীর পুরান ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় দল বেঁধে চাঁদ দেখার রেওয়াজ এখনও টিকে আছে।

ঈদে নতুন জামা-কাপড় পরা, উপহার দেওয়া-নেওয়া করা, ঈদ মোবারক বলা, কোলাকোলি করা, খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা, সুগন্ধি লাগানো, ঈদুল ফিতরের দিনে মিষ্টিমুখ করে ঈদগাহে যাওয়া, ঈদগাহ থেকে ফিরে তৃপ্তি ভরে নিজে খাওয়া ও আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের খাওয়ানো এখন সামাজিক রেওয়াজ হিসেবে সব দেশেই তা প্রায় অভিন্নভাবে প্রতিপালিত হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x