ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

আল আসাদ মোঃ মাহফুজুল ইসলাম

১. পুলিশ প্রেক্ষাপটঃ

জামাল খাশোগীর হত্যাকান্ড তথ্য উদঘাটনে তার ব্যবহৃত হাতঘড়ির মাধ্যমে তার অবস্থান, কার্যক্রম, হৃদস্পন্দন পুলিশী তদন্তে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। এরকম আরো অনেক অপরাধ উদঘাটনে স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচসহ নানাবিধ অ্যাপস সহায়কের ভূমিকা আজ সর্বজনবিদিত।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফেই ফেই লি’য়ের ইমেজনেট প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে যে, আপনার হাতে পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে মেশিং লার্নিং-এর সহায়তায় মানুষের চেয়ে  অধিকতর নির্ভুলভাবে অনেক কার্যসম্পাদন সম্ভব। যেমন ভয়েস রিকগনিশন, ল্যাংগুয়েজ ট্রান্সলেশন, রোবট অপারেটিং, অটোনোমাস ভেহিকল চালনা এসব হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে।

সম্প্রতি চায়নার কিছু শহরে অপরাধী ধরতে পুলিশ ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। প্রাইভেসির কিছু বিতর্ক থাকলেও, এই প্রযুক্তি  বেশ নির্ভুলভাবেই অপরাধী শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে কিছু শহরে পুলিশের বডি ক্যামেরায় এবং স্টপ অ্যান্ড সার্চ কার্যক্রমে ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ এআই  প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশিং এ ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষে।

দুবাইতে পুলিশ রাস্তায় এআইনির্ভর রোবট নামিয়েছে, যারা  ছয়টি ভাষায় মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে রিপোর্ট করে।

এলগোরিদমের সহায়তায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো সময়ে কোনো জায়গায় কী কী অপরাধ ঘটতে পারে এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার কার্যক্রমও গ্রহণ করেছে তারা।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যুগের এক অনন্য অনুষঙ্গ আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই)। সমাজের সর্বত্র এআই-এর দোর্দ- প্রতাপ আজ বিরাজমান। এরকম অভাবনীয় পরিস্থিতিতে যে কোনো দেশের পুলিশের কার্যক্রমে এআই-এর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। এই অপরিহার্যতা আমাদের মেনে নিতেই হবে। সেক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

এক. পুলিশের কার্যক্রমে এআই ইন্সটল করার জন্য নীতি প্রণয়ন। রাষ্ট্রের আদর্শ, চেতনা, মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বয় করে অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন অগ্রযাত্রা নিরাপদ, নিশ্চিত ও নান্দনিক করতে পুলিশের জন্য ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তির ব্যবহারে নীতি বিধি প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের নীতি প্রণয়নের লক্ষে যে কৌশলপত্র; তা বিবেচনা করা যেতে পারে, ‘ডাচ পুলিশ : এআই  এথিকস এট পুলিশ:টুওয়ার্ডস রেস্পন্সিবল ইউজ অফ আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইন দ্য ডাচ পুলিশ’। 

দুই. পুলিশ বিভাগ উল্লিখিত নীতি-কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এসওপি, ব্যবহার-কার্যক্রম কৌশল প্রণয়নের ব্যবস্থা করতে পারে। ইন্টারপোলের’ রিপোর্ট অন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ফর ল এনফোর্সমেন্ট’ একটি অনুকরণীয় নির্দেশনা হতে পারে।

তিন.  পুলিশে এআই-এর টেকসই ও যথাযথ ব্যবহারের জন্য স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠান-এর সঙ্গে সমন্বয় ও কার্যকরী শিক্ষণ সুনিশ্চিতকরণ।

বিশালায়তন বিশ্বব্রহ্মান্ডের সর্বক্ষেত্রে এআই-এর সর্বব্যাপী যাত্রা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ কোনো কোনো বিষয়ে এআই-এর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। ডিএনএ, ফরেনসিক, গানফায়ার, রেইপ, বায়োলজিকাল ক্রাইমসহ সব বিষয়ে এর উপযুক্ততা আছে। ‘টেকনিক্যাল নো হাউ’ দ্বারাই-এর কার্যপরিধি নির্ধারণ করা সম্ভব। তবে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা এআই-এর সর্বোচ্চ উপযোগিতা তখনই নিশ্চিত হয় যখন হিউম্যান ইনজেনিইটু বা এইচআই বক্ষ অবারিত করে দেয়।

২. নাগরিক প্রেক্ষাপট

শুরুতেই কি অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, সে কী আনন্দ!  আমারও একটা আছে, কতজনকেই যে বুক চেতিয়ে বলেছি। এক দশক যেতে না যেতেই, তুমি আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে হাই বিপি, ডিপ্রেশন, হতাশার গভীর সাগরে নিমজ্জিত করে, এখন তুমিই দোর্দ- প্রতাপে শাসন করছ সব।

এক যুগ আগে কোনো একদিন আমার বন্ধু শ্যাসিকে গর্ব করেই বলেছিলাম দেখ, আমারও একটা ফেইসবুক ও একটা ই-মেইল অ্যকাউন্ট আছে। সে বলেছিল, এতো গর্ব করিস না, একদিন ঠিকই বুঝবি যে, এসব যন্ত্রণা বৈ কিচ্ছু না।  এই সোস্যাল মিডিয়া (ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টুইটার, ইমো, টিকটক ইত্যাদি) শুধু ব্যক্তি মানুষকেই নয়, পুরো সভ্যতাকে আজ হুমকির সম্মুখীন করেছে। বিশ্বাসযোগ্য ও তথ্যনির্ভর কয়েকটি গবেষণা সে ইশারাই দিচ্ছে।

এক.) Harverd Business Review তে Nicholas A. Christakis এর লিখা “A new, more rigorous study confirms: The more you use facebook, the worse you feel.” দুই.) প্রযুক্তিবিষয়ক পেইজ Vox এ Shirin Ghaffary এর লিখা “Why some biologists and ecologists think social media is a risk to humanity.” তিন.) THE BYTE G  Jon Christian এর লেখা “Scientists warn that social media could be a threat to civilization.” চার.) The Atlantic এর হেডলাইন “Have Smartphones Destrozed a Generation”. পাচ.) Bloomberg Businessweek এর “Social Media Can Steal Childhood”. ছয়.) মার্ক মেনসনের “Smartphones are the new Cigarettes’ এবং; সাত.) সেই সাথে Jaron Lanier এর বই “Ten Arguments for Deleting Your Social Media Accounts Right Now.’’

এইসব কিছুর মূল উপজীব্য হচ্ছে, দিন দিন আমরা সত্যিকার পৃথিবী থেকে ফেইক পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মর্ত্যের মানব-মানবীরা অন্তর্যালের খপ্পরে পরে প্রদর্শনী মানব-মানবীতে পরিণত হতে যাচ্ছি। হতাশা, উদ্বিগ্নতা, একাকীত্ব, অশান্তি, অস্থিরতা, অনিদ্রা যাপিত জীবনের নিত্যকার অনুষঙ্গ হচ্ছে। বিষয়গুলো এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আপনি আমি সব কিছু ছাড়তে পারলেও হাতের স্মার্টফোনটি ছাড়তে পারবো না। এটি অন্যরকম এক অ্যাডিকশন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইয়াবার চেয়েও মারাত্মক। এই নেশার কারনে মস্তকে ডোপামিন নামে এক ধরনের হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়, যার ফলে মানুষ অস্থির, অসহনীয়, অমানবিক হয়ে যায়। হিউম্যান এ্যাটেনশন ইজ অলরেডি সোল্ড-আউট। জর্জটাউন প্রফেসর কাল নিউপোর্ট তার উরমরঃধষ গরহরসধষরংস বইতে বলেই দিয়েছেন “Big Tech Companies are Tobacco Farmers in T-shirts selling an addictive product to kids.” নেটফ্লিক্স ফিল্ম The Social Dilemma দেখিয়েছে অধিকাংশ আমেরিকান পরিবার কীভাবে সোস্যাল মিডিয়ার কারণে ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেশ বিদেশে এরকম খবর হরহামেশা পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই বলে থাকেন,  আমাদের দেশে অধিকাংশ মামলা জমিজমার দ্বন্দ্বের কারণে হয়, সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন অনেক মামলা হবে সোস্যাল মিডিয়ার কারণে।

ব্যক্তি মানুষ ইতিমধ্যেই স্মার্টফোনের দাসে পরিণত হয়েছে, সভ্যতাও কি তবে সেদিকে যাচ্ছে। মানুষে-মানুষে স্থান কাল আর ক্ষণে ক্ষণে সভ্যতার যে নিবিড় নিলয়, যে নিখাদ গাঁথুনি, তা যেন স্ক্রিনের আলোয় আজ নিভু নিভু করছে,  উপরের গবেষণাগুলো অন্তত তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। শ্যাসি-ই সত্যি।

তবে তুমি কি বদলাবে না? মেশিন লার্নিং, ডিপ ডাটা, ডিপমাইন্ড, এআই-এর মাধ্যমে পরিচালিত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সভ্যতার এই সংকট উত্তরণ শুধুমাত্র পলিসি প্রণয়নেই সম্ভব নয়, সিলিকন ভ্যালির টেকজায়ান্টদের মেশিন সুপার এলগোরিদমের মাধ্যমেই তা সম্ভব। এই একবিংশ শতাব্দীতে যদি মার্টিন লুথার কিং বেঁচে থাকতেন, তবে তার have a dream বক্তৃতার ধরণ পরিবর্তন করে হয়তো বলতেন, আমরা উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্বে-পশ্চিমে এইসব স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়ার দাসত্ব থেকে সব থেকে মুক্তি চাই। মুক্তি চাই। মুক্তি চাই।

লেখক : পুলিশ সুপার, র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন, বাংলাদেশ পুলিশ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *