ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ডিটেকটিভ ডেস্ক

ঢাকার সেগুনবাগিচায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল সকাল গেলে দেখা মিলবে পরিচিত একটি মুখ। কোনো দিন সকাল নয়টায়, কোনো দিন আরো আগে, আটটা নাগাদ হাজির থাকেন তিনি। পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম। কখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন, কখনোবা ঘুরেঘুরে আশপাশ পর্যবেক্ষণ করছেন। চারপাশে নজর তাঁর। কে যাচ্ছেন, কে আসছেন, কে কী করছেন, বলছেন- আপনমনে এসব দেখছেন-শুনছেন তিনি। সচরাচর বসতে দেখা যায় না তাঁকে। যেন যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সদা প্রস্তুত।

বলছি পুলিশ ইন্সপেক্টর শেখ আবুল বাশারের কথা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে গণতন্ত্র, মানবতা এবং মানবাধিকারে বিশ্বাস রয়েছে এই সরকারি কর্মকর্তার। প্রতি দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নানান দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ লেগে থাকে। মিছিল-মিটিং এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। বিভিন্ন সময় নানান ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে প্রেস ক্লাবের সামনের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে। এসব কিছুই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন আবুল বাশার। পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখা, নিয়ন্ত্রণে রাখা তাঁর প্রধান দায়িত্ব।

বছরের পর বছর ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে যেসব জমায়েত হয়, প্রতিবাদ-আন্দোলন হয়, তার অন্যতম উদ্দেশ্য অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, ন্যায়বিচার পাওয়া ইত্যাদি। আর এসব চাওয়া পূরণ করতে হয় শান্তিপূর্ণ উপায়ে। এভাবেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে এই এলাকায় শান্তি রক্ষায় অবদান রাখেন শেখ আবুল বাশার।

পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে একদিকে শান্তি রক্ষা, অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ এবং বঞ্চিতদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং সেই অনুযায়ী তাঁদের সঙ্গে ব্যবহার করা- এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হয় শেখ আবুল বাশারকে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনেক গরিব, অসহায়, বৃদ্ধ আন্দোলন করেন, অনশনে বসেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে জড়ো হন। থাকেন নারী-শিশু, শ্রমিকেরা। অনেক সময় ধর্ষণের শিকার নারী ন্যায়বিচারের আশায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নেন। অনেক সময় শিশুর অভিভাবকত্বের দাবি নিয়ে আসেন কোনো নারী। বীর মুক্তিযোদ্ধারা আসেন স্বীকৃতির দাবি নিয়ে।

প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। কেউ অল্প সময়ের জন্য, কেউবা দীর্ঘদিনের জন্য অবস্থান ধর্মঘটে বসেন এখানে। যাঁরা দীর্ঘদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান করেন, তাঁরা একপর্যায়ে ভীষণ অসহায় বোধ করেন। অসহায় এসব মানুষকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন শেখ আবুল বাশার। দেখা যায় অনেক সময় শ্রমিকেরা তাঁদের নিজস্ব দাবি নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলন করছেন, একই সময় শিক্ষার্থীরাও তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে একই জায়গায় মিছিল নিয়ে এলেন কিংবা সভা শুরু করলেন। এমন পরিস্থিতিতে উত্তেজনা ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি প্রশমনে ভূমিকা রাখেন তিনি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশেই সচিবালয় ভবন। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। অনেক গ্রুপ তাঁদের দাবি আদায়ে সচিবালয় ভবন ঘেরাও করতে যায়। সচিবালয় ঘেরাও করতে যাওয়া উত্তেজিত মানুষদের ঠান্ডা মাথায় শান্ত করতে, সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে আনতে দক্ষতার সঙ্গে কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হয় শেখ আবুল বাশারকে।

সচরাচর হাতে ক্ষমতা থাকলে সেটার অপব্যবহার করেন অনেকেই। বিশেষত পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ হরহামেশা শোনা যায়। কিন্তু শেখ আবুল বাশার একেবারেই ভিন্ন ধরনের মানুষ। বিভিন্ন সময় তিনি উত্তেজিত আন্দোলনকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, আহত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কারো উপর আগে হামলা করেছেন, আহত করেছেন- এমন কথা কখনোই শোনা যায়নি। এই বিষয়ে রীতিমতো নজির স্থাপন করেছেন শেখ আবুল বাশার। আমরা ২১টি সংগঠনের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছি। এর মধ্যে বামপন্থী এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক দল, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন, শ্রমিক-নারী-শিক্ষার্থী-পেশাজীবীদের সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন বিভিন্ন সময়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেছে। সবাই আবুল বাশারের এই বিশেষ গুণের কথা জানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মহসিন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কোটা চালু রাখার দাবি নিয়ে আমরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলন করেছিলাম। তখন আবুল বাশার ভীষণ মানবিক আচরণ করেছিলেন আমাদের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলাম। তাঁর এমন মানবিক আচরণ পুলিশ সম্পর্কে ধারণা পাল্টে দিয়েছে। সাধারণত আমরা মনে করি, পুলিশ ধরপাকড় করে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তবে আবুল বাশার এই ধারণাটি বদলে দিয়েছেন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দীর্ঘদিন অনশন করেছেন আরেকজন বিশেষভাবে সক্ষম নারী চাঁদের কনা। তিনি আবুল বাশারের মানবিক আচরণ নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। বাশারের উদ্দেশে এই নারী লিখেছেন, ‘আমি হয়তো বেশিকিছু করতে পারবো না, তবে আপনার জন্য দোয়া করতে পারি। এবং আপনাকে দেওয়ার জন্য দোয়ার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। ভালো থাকবেন, দীর্ঘায়ু লাভ করুন শেখ আবুল বাশার।’

আরেকটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল পুরো এলাকাটি। পুলিশ ছিল প্রায় দেড়শ থেকে দুইশ। শিক্ষার্থী ছিল ৪০ থেকে ৫০ জন। উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশের উপর চড়াও হয়। চরম উত্তেজনার মধ্যে আবুল বাশার তাঁর অধস্তন পুলিশদের কঠোর হতে, শিক্ষার্থীদের পেটাতে মানা করে দেন। তাঁর এমন শান্ত এবং মানবিক আচরণ দেখে একপর্যায়ে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা শান্ত হয়ে যায়।

এই বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য শাখাওয়াত বলেন, আমরা দাবি আদায়ের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে আন্দোলন করছিলাম। এ সময় উত্তেজনা ছড়ালে পুলিশ আমাদের থামিয়ে দেয়। ইন্সপেক্টর আবুল বাশার অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামলে নেন। সংঘাতে যাননি তিনি। তাঁর নেতৃত্বে পুলিশ কারো গায়ে হাত তোলেনি।

শেখ আবুল বাশারের পেশাগত জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যে লকডাউনে সবাই ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছিলেন। ঢাকার হোটেল-রেস্তোঁরাগুলো বন্ধ ছিল। সেই সময় পথের পশুরা খাবারের অভাবে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। আবুল বাশার খাবার নিয়ে ক্ষুধার্ত পশুদের জন্য পথে হাজির ছিলেন।

গোপালগঞ্জের কাঁথি গ্রামে শেখ আবুল বাশারের জন্ম, ১৯৬৪ সালে। তাঁর বাবা শেখ আবুল কাসেম পেশায় পুলিশ ছিলেন। বাবার পথ ধরেই তাঁর পুলিশের চাকরিতে যোগদান। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৯ সালে আবুল বাশার পুলিশের সার্জেন্ট পদে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। বর্তমানে আবুল বাশার ঢাকার রমনা ডিভিশনের অধীনে শাহবাগ থানায় পেট্রল পুলিশ ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত আছেন। খুবই সাধারণ জীবনযাপন তাঁর। আবুল বাশার সুশিক্ষিত, স্পষ্টভাষী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগের দায়িত্বশীল এবং মানবিকতাসম্পন্ন এক রত্ন তিনি।

(নিউজিল্যান্ডের সুপরিচিত সাময়িকী দ্য ওয়েলিংটন ম্যাগাজিন থেকে অনূদিত)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *