ই-পেপার

পিবিআই। সাধারণ জনগণের কাছে ইতোমধ্যে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আর অপরাধীদের কাছে এক মূর্তিমান আতংক হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে। যখনই কোন মামলা পিবিআই-এর কাছে তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয়, তখনই অপরাধীদের হৃদকম্প শুরু হয়ে যায়। পিবিআই-এর প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। ফলে পিবিআই মামলা তদন্ত, অনুসন্ধান ও উদঘাটনের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

বিভিন্ন আলোচিত ও ক্লুলেস হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসে পিবিআই। মামলার তদন্তেও নিয়ে আসে নতুন ধারা। বিভিন্ন আলোচিত মামলার মধ্যে রয়েছে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা ও রাজধানীতে ৩০ বছর পূর্বে সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন। সগিরা মোর্শেদ ছিনতাইকারীর হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে এত বছর যে ধারণা ছিল পিবিআই-এর তদন্তে তা ভুল প্রমাণিত হয়। কর্ণফুলিতে ডাকাতিসহ চারজন নারীকে গণধর্ষণের ঘটনা, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহকারী সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত হত্যাকান্ডের ঘটনা, ময়মনসিংহের ত্রিশালের সাহেরা আক্তার মিতুকে (২৫) গণধর্ষণসহ হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং একই জেলার কোতয়ালী থানা এলাকার সাইফুল ইসলাম (২৮) হত্যাকান্ডের ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই-এর চৌকস কর্মকর্তাগণ। সাইফুল ইসলাম হত্যাকান্ডের পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে যে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল তারা নির্দোষ প্রমাণিত হন। অন্যদিকে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসে পিবিআই।

দেশে ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু করে পিবিআই। বর্তমানে পিবিআই-এর সব ইউনিট এই পদ্ধতির সফল ব্যবহার করছে। এ সুবিধার মাধ্যমে খুলনা মহানগরের চাঞ্চল্যকর মস্তকবিহীন ছড়ানো ছিটানো ১১ টুকরা লাশের পরিচয় উদ্ধারসহ ও বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, খুন অন্য কোনও কারণে নিহত বেওয়ারিশ হিসেবে মর্গে রক্ষিত মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম (বার), পিপিএম পিবিআই-এর তদন্ত তৎসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও সফলতা সম্পর্কে নানা বিষয় নিয়ে ডিটেকটিভ সম্পাদক হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো-

ডিটেকটিভঃ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পিবিআই কতগুলো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে?  

উত্তরঃ পিবিআই-এর বিধিমালা পাস হওয়ার পর পিবিআই কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সাল থেকে মামলা তদন্ত শুরু করে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আলোচিত ৪৮ হাজার ৪৪৬ টি মামলা তদন্ত শেষ করে চার্জশীটসহ আদালতে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে কোনটিতে চার্জশীট আবার কোনটিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এখন তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি মামলা। পিবিআই যেকোন অপরাধের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত থানায় করা (জিআর) মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭১, কোর্টে করা ৩৮ হাজার ৬৭৫ (সিআর) মামলাসহ মোট (৪৮,৪৪৬) টি মামলা তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত পর্যায়ে আছে জিআর (থানায় করা) মামলা ২ হাজার ২৯৪ টি ও কোর্টের মামলা (সিআর) ৩ হাজার ৭৫৭ টি এখনও তদন্ত পর্যায়ে আছে। এভাবে পিবিআই ৪৮ হাজারেরও বেশি মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে। প্রতিদিন মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই কোন কোন মামলা তদন্ত করে জনমনে আস্থার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ পিবিআই গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর কিছু মামলা তদন্ত করে বিজ্ঞ আদালতে পুলিশ রিপোর্ট প্রদান করেছে, যা সর্ব মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হল সগীরা মোর্শেদ হত্যা মামলা, নুসরাত জাহান হত্যা মামলা, বন্ধু কর্তৃক এলিট সিকিউরিটি ফোর্স শামীম হত্যা মামলাসহ আরও বহু মামলা। এ প্রসঙ্গে বলতে চাই প্রায় প্রতিটি জেলায় আমরা একাধিক জটিল মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। যেমন- ত্রিশালের মোনায়েম মেম্বার, বগুড়ার শেরপুরের ছবের আলী, রংপুরের আল-আমিন @ নয়ন হত্যা মামলা। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল এসব হত্যাকান্ডের কোনদিনই সুরাহা হবে না।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই-এর তদন্তে সাধারণ মানুষ, আদালত এবং বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের এই আস্থা কিভাবে ধরে রাখবেন?

উত্তরঃ পিবিআই-এর তদন্তকৃত সকল মামলা যেমন- থানায় রুজুকৃত মামলা, আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ফৌজধারী মামলা ও দেওয়ানী মতামত দেওয়া সংক্রান্ত প্রতিটি মামলা আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে থাকি। মামলার পক্ষের বা বিপক্ষের যে কোন পেশা বা শ্রেণীর মানুষ খুব সহজেই প্রটোকল মেনে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্স এর যে কোন কর্মকর্তার সাথে দেখা করে তার বক্তব্য বলতে পারেন। ফলে তদন্তাধীন মামলাগুলোর প্রতি যেমন ইচ্ছে করলেই অবহেলা করা যায় না, তেমনি ঝুলিয়ে রাখাও যায় না। এ কারণে ভিকটিমের প্রতি অবিচার করার সুযোগ কমে আসে। হয়ত এ কারণেই বিভিন্ন পেশার মানুষ ও আদালত পিবিআই-এর ওপর কিছুটা আস্থা রাখতে পেরেছে। আমরা সবসময় চেষ্টা করি কিভাবে তদন্ত করলে আরো সঠিক তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা যায়। এজন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স নিয়মিত পিবিআই অফিসারদের দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। এটি রপ্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে পিবিআই-এর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। আমরা সবসময় চেষ্টা করি Women Friendly এবং Technology Based Investigation শেখার এবং শেখানোর।

ডিটেকটিভঃ ইতোপূর্বে আত্মহত্যার ঘটনা বলে চিহ্নিত কিছু মামলা পিবিআই-এর তদন্তে হত্যাকান্ড বলে প্রমাণিত হয়েছে, এটি কিভাবে সম্ভব হ’ল?

উত্তরঃ আমাদের কাছে পূনঃ তদন্তে আসা প্রায় ০২(দুই) ডজন খুন মামলায় দেখা গেছে- ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে “আত্মহত্যা” উল্লেখ থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ খুব দ্রুত মামলাগুলোতে “চুড়ান্ত প্রতিবেদন- ঘটনার ভুল বুঝাবুঝি” দাখিল করেছেন। কিন্তু দেখা গেছে প্রতিটি মামলার বাদী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন তার মামলার ভিকটিম খুন হয়েছেন। আমরা বাদীকে খুনের বিষয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কিছু তথ্য পাওয়া যায়-যেগুলোতে কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা সে সুযোগগুলো ধরে আগানোর চেষ্টা করে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি-ভিকটিম আত্মহত্যা করে নাই, খুন হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে খুনিরা নাটক সাজিয়েছে এবং বিজ্ঞ আদালতে কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আমরা এখনো জানি না-সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনগুলো খুনের বিপরীতে থাকার কারণে আদালতে আসামীপক্ষ কতটুকু সুবিধা পাবে।

এ কারণে আমরা ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে আরো ভালো কিছু করা যায় কি-না এ বিষয়ে একটি সুপারিশমালা তৈরী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট দিয়েছি। তিনি এটি মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট হস্তান্তর করেছেন।

ডিটেকটিভঃ আপনি পুলিশ বিভাগে দীর্ঘদিন যাবত মাঠ পর্যায়ে থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন। পূর্বের কাজের সহিত বর্তমানে পিবিআই-এর কাজের পরিধি এবং কাজ করার ক্ষেত্রসমূহ কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তরঃ মাঠ পর্যায়ের কাজের কিছু সুবিধা আছে। জটিল রহস্যের তথ্য কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। চেষ্টা থাকলে নিজেই কিছু করা সম্ভব। কিন্তু পিবিআই-এর কাজের ধরণ আলাদা। প্রতিটি কাজ অন্যকে দিয়ে করিয়ে আনতে হয়। যেহেতু পিবিআই সারাদেশের কিছু না কিছু মামলা তদন্ত করে সেহেতু আমার মনে হয়েছে, এক অঞ্চলের মামলার রহস্যের জট খোলার ধরণ অন্য অঞ্চলের একই কারণে মামলার ক্ষেত্রে সংস্কৃতিজনিত কারণে আলাদা। এ কারণে প্রতিটি জেলায় ক্লু-লেস মামলা সমূহের অগ্রগতি মনে রাখতে হয় যা বেশ কঠিন ও শ্রম সাপেক্ষ। তবে এর সুবিধা এই যে-যে অপরাধগুলিতে বিভিন্ন জেলার লোকজন জড়িত তা তদন্ত করতে আমরা মাঠ পর্যায়ের থেকে আমাদের সুবিধা বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলি- একদিন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় দেখি, গোপালগঞ্জে একটি মস্তকবিহীন লাশ পাওয়া যায়। পত্রিকায় লাশের কাপড়-চোপড় দেখে ময়মনসিংহ থেকে তার ভাই সনাক্ত করেন। পত্রিকায় লিখেছে ভিকটিমের ভাই বলছে-ভিকটিম ট্রাক কেনার জন্য খুলনা গিয়েছিল। আমি তাৎক্ষণিকভাবে পিবিআই ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ ও খুলনাকে সক্রিয় করি। আমাদের ০৩ ইউনিট অক্লান্ত পরিশ্রম করে এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার রহস্য উন্মোচন করে এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে অপরাধীরা আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়।

ডিটেকটিভঃ স্বল্প সময়ে চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে চার্জশীট দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল একাজে?

উত্তরঃ নুসরাতের শরীরে আগুন লাগানোর ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি বিদেশে ছিলাম। ০২(দুই) দিন পর অফিসে এসে পত্রিকা পড়ে একটু ধারণা পাই। ঐ দিনই শ্রদ্ধেয় আইজিপি স্যার আমাকে ঐ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নিতে বলেন। শুনি তখনো মামলা দায়ের হয় নাই। এর মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘটনায় জড়িত সকল অপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। সাধারণত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন ফৌজধারী মামলা নিয়ে মন্তব্য করেন না। ইতোমধ্যে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগার ঘটনাটি নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য আসতে থাকায় শুরুতে একটু দ্বিধায় পড়ে যাই। নুসরাতের মৃত্যুর পর জনমনে ক্ষোভও বাড়তে থাকে। অনেক যাচাই-বাছাই শেষে সোশ্যাল  মিডিয়ায় প্রচারিত নুসরাতের বক্তব্যটি সত্য হতে পারে ধরে নিয়ে আমরা অগ্রসর হই। এই বক্তব্যটি আমার স্ত্রী ডাঃ জয়া মল্লিক আমার নজরে এনেছিলেন। আমরা পিবিআই হেডকোয়ার্টার্স মামলা সমন্বয়ের দায়িত্ব নিই। ১লা বৈশাখ মূল ০২(দুই) জন আসামী আদালতে দোষ স্বীকার করে প্রায় ৪৫ (পয়ঁতাল্লিশ) পাতার বক্তব্য দেয়ায় ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়। দেখা যায়, বহু লোক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। এই লোকগুলোর মধ্যে কেউ যদি বিদেশ চলে যায় অথবা গ্রেফতার এড়াতে পারে তাহলে মামলা ঝুলে যাবে। তখন আমরা পিবিআই-এর ০৯টি ইউনিটকে সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় করি। মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমরা সকল আসামী গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। এরপর চিন্তায় আসে আদালতে মামলাটি যথাসম্ভব নিখুঁত ও শক্তভাবে উপস্থাপন করা। এর জন্য আমরা এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করার জন্য পিবিআই-এর চৌকস কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করি। এরকম একটি বড় মামলা তদন্তকালে ভিতর-বাইরে অনেক সমস্যা থাকে। আমি প্রতিনিয়ত শ্রদ্ধেয় আইজিপি স্যারের পরামর্শ এবং নির্দেশনা নিয়েছি। কয়েকবার স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয়ের সাথেও কথা বলেছি। ফলে কোন চ্যালেঞ্জকেই আমরা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে থাকতে দেইনি।

ডিটেকটিভঃ ৩০ বছর পর সগীরা মোর্শেদ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

উত্তরঃ ১৯৮৯ সালের ২৫শে জুলাই ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলের সামনে সগীরা মোর্শেদ খুন হন। তিনি ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী তার মেয়েকে আনতে রিকশায় যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেলে আসা ০২ (দুই) জন লোক তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই-তে মামলাটি আসে। ৩০ বছর আগের মামলা কোথা দিয়ে শুরু করব- রাস্তা খোঁজার কাজ শুরু হয়। এটা ওটার পর দেখা যায়, যে ব্যক্তি মামলাটির তদন্ত বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি একজন সাংবাদিক। বেইলী রোডের বাসিন্দা ব্যক্তিটি এই মামলার কোন পক্ষই নয়। তাহলে তার স্বার্থ কি? খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভদ্রলোকের ছেলের নাম মারুফ রেজা এবং সে ৩০ বছর আগে পাড়ায় সুবিধার লোক ছিল না। বর্তমানে তার সামাজিক পরিচিতির কারণে ইচ্ছে করলেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছিল না। খুনের এক জন মাত্র সাক্ষী সে সময় রিক্সাচালক ছিল। তাকে পাওয়া যেতেও পারে আবার নাও পারে। ভাগ্যক্রমে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। তার কাছ থেকে খুনিদের বর্ণনা নিয়ে মারুফ রেজার ব্যবসায়ীক কার্যালয়ে দর্শণার্থী হিসাবে তদন্ত কর্মকর্তারা যান এবং তার চেহারার সাথে মিলিয়ে তাকে সনাক্ত করা হয়। ২য় আসামী ছিল সগীরা মোর্শেদের পরিচিত। কারণ রিক্সা চালকের কাছ থেকে জানা যায় – ভিকটিম সগীরা মোর্শেদ আঙ্গুল দিয়ে একজনকে বলেছিল, “তুমি এখানে কেন? তোমাকে তো চিনি।” তদন্ত টিম সগীরা মোর্শেদের স্বামী হাসান আলী চৌধুরীর কাছে যায় এবং তার কাছে জানতে চায় কে এরকম হতে পারে। রিক্সাচালকের দেয়া চেহারার বর্ণনা শুনে তিনি ধারণা দেন- এ ব্যক্তি তার ভাইয়ের শ্যালক আনাছ মাহমুদ রেজওয়ান হতে পারে। খুঁজে বের করা হয় তার কার্যালয়। তিনি একটি এনজিও-র বড় কর্মকর্তা। তার চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তদন্ত দল তিনবার তার অফিস কার্যালয়ে যায় ভিন্ন পরিচয়ে এবং বর্ণনা শুনায় রিক্সাচালককে। এক সময় ধরে নিয়ে আসা হয় মারুফ রেজা ও আনাস মাহমুদকে। তারা বলেন মূল পরিকল্পনাকারী আনাস মাহমুদের বোন ও ভগ্নিপতি। এরা সগিরা মোর্শেদের ভাসুরের স্ত্রী ও ভাসুর। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন। কোন জটিল মামলার রহস্যজট উদঘাটনে যেমন পরিশ্রম, মেধা ও অধ্যবসায় দরকার তেমনি ভাগ্যও যে একটি বিষয় সেটি প্রমাণিত হয়েছে এ মামলার রিক্সা চালককে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে।

ডিটেকটিভঃ ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে সহায়তা করেছেন। তিনি যেহেতু বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্য তাই এ কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিলো কি-না?

উত্তরঃ ওসি মোয়াজ্জেম পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সেই পদে থেকে তিনি ভিডিও করতে পারবেন কি-না এ রকম একটি প্রশ্ন আমাদেরও ছিল। আমরা পুলিশ বিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবশ্যই ভিডিও করতে পারেন কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় তিনি ভিডিওটি ধারণ করেছেন এবং ভিকটিম তথা একজন কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদকালে যে সব “Inappropriate” শব্দ ব্যবহার করেছেন তা একেবারেই শোভনীয় নয়। তদূপরি তিনি এটি শেয়ারও করেছেন। এটি সমগ্র পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুন্ন করেছে। ফলে আমরা ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি নাই। আমরা প্রমাণ করেছি, কেউ-ই আইনের উর্দ্ধে নয়।

ডিটেকটিভঃ এটা ডিজিটাল যুগ। অপরাধীরা আধুনিক ডিভাইস ব্যবহার করছে। আপনারা ইতোমধ্যে কতটা আধুনিক হতে পেরেছেন?

উত্তরঃ অপরাধীরা শুধু আধুনিক ডিভাইস ব্যবহার করে না, বিদেশী ক্রাইম ডিটেকশন সংক্রান্ত অনুষ্ঠানগুলো দেখে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে কিভাবে ডিভাইস ব্যবহার করতে হয়, তাও রপ্ত করে। ফলে এদের সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস এবং সফট্ওয়্যার সংগ্রহ করতে হয় এবং এগুলো ব্যবহারের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিতে ও দিতে হয়। আমাদের পিবিআই ফরেনসিক ল্যাবটি অত্যন্ত আধুনিক এবং আমরা নিয়মিত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ল্যাবের দক্ষতা ও সুবিধা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। পিবিআই-এর পাশাপাশি পুলিশের অন্যান্য ইউনিটগুলোও এখন আদালতের অনুমতি নিয়ে এ ল্যাব ব্যবহার করে থাকে।

ডিটেকটিভঃ আপনারা বহু চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন করেছেন। এসব মামলার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে কি ধরণের বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন?

উত্তরঃ আমরা জানা এবং অজানা বহু পুরনো চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। এই মামলাগুলোর যখন আমরা তদন্ত শুরু করেছিলাম তখন অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তন হয়েছে, সাক্ষী ও আসামীরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে, ডিজিটাল কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি ইত্যাদি। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে ভরসা করেছি মামলার ডকেট, মামলার প্রথম ও সর্বশেষ আইও এবং টিমভিত্তিক পরিশ্রমের উপরে। এছাড়া পিবিআই-এর একটি ইউনিট কর্তৃক অপর ইউনিটকে গ্রেফতারসহ সকল ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার একটি সংস্কৃতি চালু করেছে। ফলে কোন বাধাই আমাদেরকে মামলার রহস্য উদঘাটনে শেষ পর্যন্ত আটকাতে পারেনি।

ডিটেকটিভঃ অজ্ঞাতনামা লাশ সনাক্তকরণে পিবিআই-এর তথ্য প্রযুক্তি ও এনআইডি ডাটার তথ্য সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

উত্তরঃ বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই মৃতদেহগুলির অধিকাংশেরই পুলিশের বিভিন্ন বিদ্যমান প্রক্রিয়া প্রয়োগ করার পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের নাম পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ফলে সনাক্তবিহীন মৃতদেহগুলির স্থান হয় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম-এ। অথচ যে ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেল না তার পরিবার-পরিজন সারাজীবন অপেক্ষা করে থাকে, হারানো ব্যক্তিটি তাদের কাছে কোন একদিন ফিরে আসবে। বিষয়টি ভুক্তভোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

এই অজ্ঞাতনামা মৃত ব্যক্তিদের কেউ কেউ খুন হয়েছেন। মূলতঃ খুনিরা নিজেদের অপরাধ গোপন করা এবং পুলিশকে জটিল ধাঁধায় ফেলার জন্য ভিকটিমকে তার নিজ এলাকা হতে দেশের অন্য কোন এলাকায় নিয়ে খুন করে। ফলে এই খুন মামলাটি পুলিশের কাছে ক্লু-লেস বা সূত্রহীন থেকে যায়। যদি ভিকটিমের পরিচয় সনাক্ত করা যেত তাহলে মামলাটির রহস্য উদঘাটন ৯০% ক্ষেত্রেই সফল হতো। আবার অসনাক্তকৃত মৃতদেহটির মৃত্যু দূর্ঘটনার কারণেও হতে পারে। মূলতঃ এদের সংখ্যাই বেশি। এরা ব্যক্তি জীবনে কারো না কারো ভালবাসার মানুষ। তদন্তের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে দীর্ঘ চেষ্টার ফলে আমরা একটি সমাধান বের করেছি- যাকে আমরা বলি FIVeS বা Fingerprint Identification & Verification System। আমাদের উদ্ভাবিত এ FIVeS ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ১৫৯ টি মৃতদেহ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ১৩০ টি পুরুষ এবং ২৯ টি মহিলা। এর মধ্যে খুন হয়েছেন ৩৭ জন। এর মধ্যে খুলনার সদর থানায় ছড়ানো-ছিটানো ১১ টুকরা লাশ, কক্সবাজারের সদর থানায় ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বন বিভাগের পাহাড়ী টিলায় অগ্নিদগ্ধ লাশ, গাজীপুর ন্যাশনাল পার্কের ৩নং গেটের কাছের পুকুরে আধাপঁচা গলিত লাশ ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, প্রায় প্রতিটি খুনের মামলায় মৃতদেহ শনাক্তের পর দ্রুত খুনের রহস্য উদঘাটন হয়েছে। FIVeS অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ সনাক্তকরণ সহ আরো ৪টি কাজে পিবিআই সফলতার সাথে ব্যবহার করছে যেমন- (২) গ্রেফকারকৃত আসামীদের “অনুসন্ধান স্লীপ” এর পাশাপাশি নাম-ঠিকানা যাচাই (৩) অস্থায়ী ঠিকানায় বসবাসকারী মামলার সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা যাচাই (৪) অপরাধ ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাক্ষীগণ/ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক পরিচয় উদ্ধার এবং (৫) ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বহনকারীদের সনাক্তকরণ। 

ডিটেকটিভঃ পিবিআই সদস্যদের কিভাবে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয়, যার কারণে এত সহজেই কঠিন এবং চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে?

উত্তরঃ পিবিআই-এর তদন্ত এবং তদন্ত তদারকী কর্মকর্তাদের শুরুতেই ০৫(পাঁচ) দিনের ০১টি প্রারম্ভিক কোর্স করিয়ে বিভিন্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়। এর পাশাপাশি পিবিআই যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর ও জটিল মামলার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে মেধা ও বুদ্ধি অধিক খাটিয়েছে সেইসব মামলাগুলির অঞ্চল ভিত্তিক কেইস স্টাডি করানো হয় যাতে সবার মধ্যে জটিল মামলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সক্ষমতা তৈরি হয়। অধিকন্তু পিবিআই বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালুর পাশাপাশি পুলিশ স্টাফ কলেজ ও সিআইডি’র এফটিআই-তে অফিসারদের প্রশিক্ষণে পাঠায়, যা মামলার রহস্য উদঘাটনে সহায়তা করে থাকে।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই সদস্যদের টিম স্পিরিট কিভাবে নিশ্চিত করা হয়?

উত্তরঃ পিবিআই-এর বিধিমালা অনুযায়ী আমরা প্রতিটি সূত্রহীন মামলায় আইও-কে সহযোগিতা করার জন্য একটি টিম তৈরি করে দেই। এই টিমের সকল সুযোগ-সুবিধা এবং লজিষ্টিকস্ সাপোর্ট আমরা নিশ্চিত করি। এই টিমকে অন্যান্য ইউনিটগুলি চাহিদা অনুযায়ী সকল ধরনের সহযোগিতা করে ফলে পিবিআই-এর সদস্যগণ কখনোই একাকিত্বে ভোগেন না।

ডিটেকটিভঃ সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে পিবিআই স্কেচ ম্যাপের পাশাপাশি আদালতে “সচিত্র ঘটনা প্রবাহ” প্রদান করেছে যা বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। মামলা তদন্তে এই নতুন ধারার উদ্ভাবনী চিন্তা কিভাবে এলো?

উত্তরঃ আমরা পিবিআই শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর ক্ষেত্রে একটি সঠিক স্কেচ ম্যাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছি। পিবিআই মনে করে আদালতে মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি সঠিক স্কেচ ম্যাপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর ঘটনাটি তার আগের ১১ (এগারো) দিনের বিভিন্ন ঘটনার সম্পৃক্ততায় সৃষ্ট। আবার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানো হলেও মানুষ অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে দেখেছে সাইক্লোন শেল্টারের নিচে। একইসাথে ঘটনা ঘটানোর জন্য একদল ছিল মাদ্রাসার গেইট পাহারায় আর একদল ছিল সাইক্লোন শেল্টারের সিঁড়ি পাহারায়। আবার নাটের গুরু ছিল জেলখানায়। একই সময়ে ঘটা এতোগুলো অপরাধ ও ঘটনাস্থলের স্কেচ ম্যাপ বা খসড়া মানচিত্র অনেকগুলো-যা একটির সাথে একটি মিলানো বেশ জটিল এবং যারা ঘটনা সম্পর্কে পুরোটা জ্ঞাত নয় তাদের জন্য কিছুটা বিভ্রান্তিকর। এ সমস্যা সমাধানে আমরা ড্রোন দিয়ে ছবি তোলারও চিন্তা করি। এক সময় মাঠ পর্যায় থেকে রং-তুলি দিয়ে স্কেচ করা যায় কি-না প্রস্তাব উঠানো হয়। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর “সচিত্র ঘটনা প্রবাহ” অংকনের ধারণা আমাদের মাথায় আসে। এটি অংকনের পর দেখা যায়, যে ঘটনাগুলি সত্যিকার অর্থে ঘটেছে এবং ঘটনার সময় সাক্ষীদের, ভিকটিমের ও আসামীদের অবস্থান কোথায়, কিভাবে, কখন ছিল তা শুরু থেকে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। তবে একটি প্রশ্ন ছিল- এটি আদালতের কাছে প্রাসঙ্গিক কি-না ! আমরা অত্যন্ত আনন্দিত- আদালতে আসামী পক্ষের যারা বিজ্ঞ কৌসুলী ছিলেন তারা কেউই এটির বিরুদ্ধে আইনি প্রশ্ন তোলেন নাই। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই “সচিত্র ঘটনা প্রবাহ” কিসের জন্য। বিজ্ঞ পাবলিক প্রসিকিউটর বলেছেন- এটি ঘটনার খসড়া মানচিত্রের সহজ ব্যাখ্যা। বিজ্ঞ বিচারিক আদালত এ “সচিত্র ঘটনা প্রবাহ” -এর বিষয়টি তাঁর রায়েও উল্লেখ করেছেন। নুসরাতের মামলাটি দিয়ে শুরু করা এ “সচিত্র ঘটনা প্রবাহ ” ইতোমধ্যে সগীরা মোর্শেদ ও ডিএমপি’র তদন্ত করা আবরার হত্যাকান্ড এবং চিত্রনায়ক সালমান শাহ্র অপমৃত্যু মামলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে যা সকল মহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে সকল গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালতে মামলা প্রমাণের স্বার্থে এ ধারার ব্যবহার অব্যাহত থাকবে।

ডিটেকটিভঃ সিআর মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে পিবিআই ইতিমধ্যে আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলে প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এটি কিভাবে সম্ভব হ’ল?

উত্তরঃ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে (সিআর) গ্রহণ করা ৪৭ হাজার ৯৭৬ টি মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪ হাজার ৫১৩ টি মামলা এবং তদন্তাধীন আছে ৩ হাজার ৪৬৩ টি মামলা। আমরা পিবিআই প্রতিটি সিআর মামলা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করি এবং এ তদন্তে আমরা প্রমাণ করতে যা যা করণীয় তা করার চেষ্টা করি। এতে যেমন মৌখিক সাক্ষ্য আছে তেমনি দালিলিক প্রমাণও থাকে। সম্ভবতঃ এ কারণে পিবিআই-এর সিআর মামলার প্রতিবেদন বিজ্ঞ আদালতসহ সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই কর্তৃক তদন্তকৃত সিআর মামলাসমূহে বিচারিক আদালত কর্তৃক সাজা প্রদান করা হয়েছে কি-না?

উত্তরঃ আমার জানা মতে বেশ কিছু সিআর মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার একটি মানব পাচারের মামলায় সম্প্রতি আদালত ০৫ জন আসামীকে যাবজ্জীবন প্রদানসহ প্রত্যেকেকে ০৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে। ফেণীর সোনাগাজী থানার প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম সাহেবের বিরুদ্ধে মামলাটিও ছিল সিআর মামলা। যেটিতে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা হয়।

ডিটেকটিভঃ মামলা তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতার ফলে জনগণের ভোগান্তি কিভাবে নিরসণ করা যায়?

উত্তরঃ তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা হলে ফলাফল কি রকম হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিই- চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানায় আইয়ুব (আইয়ুব বাহিনীর প্রধান) নামে একজন সন্ত্রাসীর দাপট ছিল। তার বিরুদ্ধে ৮০ ও ৯০ দশকের শুরুতে ১২টি খুনের মামলা ছিল। যার বিরুদ্ধে ১৯৯১ সালে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান হত্যাসহ তার দুই ছেলের চোখ উপড়ানো মামলাও আছে। এই আইয়ুব ১৯৮৭ সালে জনৈক আব্দুস সাত্তারকে খুন করে। আবার আইয়ুব নিজেই কয়েকমাস আগে তার এলাকায় খুন হন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই-এর কাছে আসে। এ খুনের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে দেখা যায়, আব্দুস সাত্তার এর দুই পুত্র ৩২ বছর ধরে পিতার খুনের বিচার না পেয়ে ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে ০৬ জন খুনি ভাড়া করে আইয়ুবকে খুন করে। খুনের মামলায় জড়িত ০৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই দুই ছেলে এখনো বুঝতে পারছেন না- তারা কি অপরাধ করেছে। 

ডিটেকটিভঃ তদন্ত কাজের স্বার্থে আপনার ডিপার্টমেন্ট ও সরকারের কাছ থেকে কি ধরনের সহযোগিতা আশা করেন?

উত্তরঃ সারাদেশে আমাদের কোন নিজস্ব ভবন নাই। আশার কথা যে, আমরা খুব স্বল্প সময়ে ২৮টি জায়গা বুঝে নিয়েছি এবং আরো প্রায় ২০টি জায়গা অধিগ্রহনের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এগুলোতে পিবিআই-এর নিজস্ব ভবন তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পিবিআই-এর জনবল বৃদ্ধির জন্য একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন আছে। লজিস্টিকস সাপোর্টসহ জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাবনা ও ভবন তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে পিবিআই একটি পরিপূর্ণ তদন্ত সংস্থা হিসেবে জনগণের পাশে থাকতে পারবে।

ডিটেকটিভঃ আপনি কি মনে করেন মামলা তদন্তে সফলতা সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল করেছে?

উত্তরঃ নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের আইজিপি স্যারকে পিবিআই-এর প্রশংসা করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আইজিপি স্যার পিবিআই-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা জানিয়েছেন। আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় প্রায়শই পিবিআই-এর প্রশংসা করে থাকেন। এতে আমার মনে হয়, আমরা পিবিআই কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জল করতে পেরেছি।

ডিটেকটিভঃ মামলা তদন্তে পিবিআই’কে আস্থার জায়গায় আনতে আপনি দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এতোটা অনুপ্রেরণা কিভাবে পান?

উত্তরঃ পিবিআই-এর সকলস্তরের অফিসার ও ফোর্স প্রতিটি মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রচন্ড পরিশ্রম করে থাকেন। আমি শুধু সবকিছু সমন্বয় করে থাকি। তাদের পরিশ্রম ও সর্বাত্মক সহযোগিতায় যখন এক একটি মামলার রহস্য উদঘাটিত হয় তখন আমার মনে হয় আমি সত্যের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছি। এই আনন্দই আমার পরবর্তী মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হয়ে অন্যদের কাজে লাগানোর উৎসাহ সৃষ্টি করে। সর্বোপরি আমার পরিবারের অকুন্ঠ সমর্থন ও গঠনমূলক সমালোচনা, সাফল্যের পরে সকলস্তরের মানুষের নির্ভেজাল প্রশংসা এবং সাধারণ মানুষের চোখে আস্থার ছায়া আমাকে প্রচন্ড অনুপ্রাণিত করে।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই সদস্যদের দেশে-বিদেশে আধুনিক ট্রেনিং সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

উত্তরঃ আমরা অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে দেখেছি পুলিশের হাজতখানাগুলি একজন হাজতির অধিকার রক্ষার উপযোগী। আমরা পিবিআই ভবিষ্যতে নিজস্ব ভবনগুলিতে এ ধরনের মডেল অনুসরণ করতে চাই এবং ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা চলছে। আমরা উন্নত দেশগুলিতে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে দেখেছি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের সংখ্যা অত্যন্ত কম, কিন্তু গ্রেফতারগুলো যৌক্তিক ও মূল্যবান। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আগামী ২০ বছর পর মানুষের আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পুলিশ চাইলেই যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না। এই বিষয়টি মাথায় রেখে পিবিআই সকল ক্ষেত্রে অত্যন্ত যাচাই-বাছাই করে গ্রেফতার করে, যাতে আগামীতে কোন সমস্যার সৃষ্টি না হয়।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই থানা পুলিশকে ঘটনাস্থলে আলামত সংগ্রহ এবং আলামত সনাক্তকরণে কিভাবে সহায়তা করে থাকে?

উত্তরঃ পিবিআই-এর প্রত্যেকটি অপারেশনাল ইউনিটে প্রতিদিন ৭-৮ সদস্যের ইমার্জেন্সী টিম দায়িত্ব পালন করে। কোন ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের খবর যেমন-হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মত সংবাদ আসলে, পিবিআই ইমার্জেন্সী টিম দ্রুততম সময়ে ক্রাইমসিন ইকুইপমেন্ট সহ ঘটনাস্থলে গিয়ে আপরাধের আলামত সংগ্রহ করে থাকে এবং থানাগুলোর সাথে তদন্তে সহযোগিতা করে থাকে।

ডিটেকটিভঃ পিবিআই এর পক্ষ থেকে প্রায়শঃই সীমিত আকারে গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন। এই গবেষণা কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হয়। মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে এই সকল গবেষণা কি সুফল বয়ে আনবে?

উত্তরঃ প্রমাণ থাকার পরও খুনের মামলায় কেন আসামীরা খালাস পায়, ডাকাতি মামলায় কেন ডাকাতরা খালাস পায় ইত্যাদি জানার জন্য আমরা বিচারিক আদালত হতে শত শত রায় সংগ্রহ করে বিচার বিশ্লেষণ করেছি। আমরা খোঁজার চেষ্টা করেছি- তদন্তের সময় তদন্তকারী কর্মকর্তার কি কি ত্রুটি ছিল যা অপরাধ করার পরও আদালতে আসামীদের নির্দোষ প্রমাণ করতে সাহায্য করেছে। গবেষণা করে আমরা এ ত্রুটিগুলো সনাক্ত করে বই আকারে প্রকাশ করেছি। যারা এ গবেষণায় সম্পৃক্ত ছিলেন তারা সকলেই পিবিআই-এর কর্মকর্তা। আমরা এগুলো পিবিআই-এর নিজস্ব প্রশিক্ষণসূচীতে সংযোজন করেছি। তদন্তকারী ও তদন্ত তদারকী কর্মকর্তারা যখন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তখন তাদের এ ত্রুটি সমূহের বিষয়ে হাতে-কলমে ধারণা দেয়া হয়, যাতে তাদের তদন্তাধীন মামলাগুলোতে ভবিষ্যতে এ ত্রুটিগুলো না থাকে।  আমরা মনে করি- এর ফলে পিবিআই-এর তদন্তের সামগ্রিক গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে যার সুবিধা ভিকটিম পরিবারগুলো আদালতে কোন না কোনভাবে পাবেন।

পিবিআই কর্তৃক তদন্তকৃত মামলা সমূহের মধ্যে অল্প কিছু সংখ্যক মামলার ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত পুনঃ/অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই অথবা অন্য সংস্থার নিকট প্রদান করেছেন এবং অধিকাংশ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বিজ্ঞ আদালত আমলে নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মামলায় বিচারিক আদালত কর্তৃক রায় প্রদানের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিও প্রদান করা হয়েছে।

তদন্ত সম্পন্ন হওয়া মামলা সমূহের মধ্যে পিবিআই অনেক পুরনো ও চাঞ্চল্যকর মামলার সফল তদন্ত সম্পন্ন করে অপরাধের মূল রহস্য উদঘাটন ও মামলার প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে পিবিআই-এর ইউনিট সমূহের অন্য অফিসারগণের সার্বিক সহযোগিতা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কর্তৃক সরেজমিনে তদারকি, বিভাগীয় পুলিশ সুপারগণ কর্তৃক সার্বিক তদারকি ও নির্দেশনা প্রদান, পিবিআই সদর দপ্তরের এলআইসি ও ফরেনসিক শাখা কর্তৃক প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সর্বোপরি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা (ডিআইজি পিবিআই কর্তৃক) নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকি এবং তদন্ত কাজে সব ধরনের সাপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক মামলাগুলোর সফল তদন্ত সমাপ্তির পর বিচারের নিমিত্তে বিজ্ঞ আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয় অপরাধমূলক ঘটনার তদন্ত করে অপরাধীকে গ্রেপ্তার, ভিকটিম উদ্ধার, মাদক কারবারি, প্রতারকচক্র ও মানব পাচারচক্রকে চিহ্নিতকরণ ও আটকসহ মামলার গ্রহণযোগ্য তদন্ত সম্পন্ন করে বিজ্ঞ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে সক্ষম হয়, যা বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন।

এছাড়াও পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম (বার), পিপিএম এর প্রত্যক্ষ তদারকিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ সংগৃহীত ও আসামী গ্রেফতার এবং মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করছে। পিবিআই-এর গুরুত্বপূর্ণ জেলা মহানগরগুলোর বিভিন্ন আদালত থেকে হত্যা ডাকাতি ও ধর্ষণ মামলার আসামী খালাস পাওয়ার কারণ উদঘাটন, তদন্তে ত্রুটি-বিচ্যুতি শুনান্তে সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে রায়ের অনুলিপি উঠিয়ে সেসব বিশ্লেষণ করে বই আকারে প্রকাশ এবং পিবিআই-এর প্রশিক্ষণ সূচিতে সংযুক্ত করে যুগোপযুগী তদন্ত সংস্থা হিসেবে পিবিআই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের আস্থার কেন্দ্রস্থল হিসেবে আবিভূর্ত হচ্ছে।

ডিটেকটিভঃ মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে পিবিআই-এর সীমাবদ্ধতা সমূহ কি?

উত্তরঃ চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটনে পিবিআই গুরুত্বপূর্ণ সফলতা পেয়েছে। এখানে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে তার মধ্যে অন্যতম- দক্ষ জনবল, যারা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। যেকোন মামলার রহস্য উদঘাটনে দ্রুত সময়ে সফলতা পাওয়ার জন্য আমরা অফিসারদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x