ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ নূরুল আনোয়ার

ফেব্রুয়ারি মাস আসলে আমরা বাঙালিরা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো হঠাৎ জেগে উঠি বিস্ফোরণ ঘটাই, তপ্ত লাভা ছড়াই চতুর্দিকে। অবশিষ্ট মাসগুলোতে ধীরে ধীরে মিইয়ে যাই। ভাষার চেতনাটি মনের অতল গভীরে আবদ্ধ করে রাখি। বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার কথা আসলে আমরা আমাদের আলোচনাকে শুধু ১৯৪৮-১৯৫২ এর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে পছন্দ করি। কিন্তু এই সুললিত-সুমধূর ভাষাটি তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শত শত বছর পূর্ব হতে নানাভাবে, বিভিন্ন অপকৌশল, বহুমুখী বাধা ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে তার খতিয়ান আমরা খুঁজি না, আমাদের বহুশত বছরের অগ্রজরা তাদের সামর্থ্য ও সাধ্যমতো ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে নিতে কি না করেছেন।

খ্রিস্টিয় ৭০০ সাল হতে ১২০০ খ্রিঃ বাংলার প্রাচীন যুগ, খ্রিস্টিয় ১২০১-১৭৫৭ স্থুলভাবে ১৮০০ সাল পর্যন্ত মধ্যযুগ এর পর আধুনিক বা বর্তমান যুগ। চর্যাপদের হাত ধরে বাংলা ভাষার সুস্পষ্টতা এবং হাজার বছরের অধিক পুরানো এই বাংলা ভাষা। মধ্যযুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য বিকাশ ঘটে। ৩টি ধারায় মূলত রচিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য যেমন-বৈঞ্চব সাহিত্য, মঙ্গল সাহিত্য ও অনুবাদ সাহিত্য। শ্রী চৈতন্যদেব, কৃষ্ণদাশ কবিরাজ, চন্ডীদাশ, জ্ঞানদাশ, লোচনদাশ ও গোবিন্দ দাশেরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে মুসলমানদের মধ্যে শাহ মোহাম্মদ সগীর, কবি মুত্তালিব, সায়িদ সুলতান, কবি আব্দুল হকের নাম স্মরণযোগ্য। বাঙালি সাহিত্যিক আব্দুল হাকিম (সপ্তদশ শতাব্দী) আরবি হরফে বাংলা লিখেছিলেন- কারণ তার মতে এতে লেখাটি আল্লাহ পাকের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য হবে। মাতৃভাষাকে মর্যাদাদানের জন্য সাহিত্যচর্চার জন্য, ইসলামের বাণী প্রচারের জন্য বাঙালি মুসলমান লেখকগণও বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন লেখক ছিলেন শাহ মুহাম্মদ সগীর, তিনি ছিলেন সম্রাট গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯-১৪১৬ খ্রিঃ) এর সমসাময়িক। তার রচিত য়ুসুফ যুলেখার মহাকাব্যে উল্লেখ করেছেন যে লেখকগণ পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বাণী অনুবাদ করতে ভয় পান। অবশ্য তার মতে সেই ভয় অমূলক। তাহলে দেখা যাচ্ছে সে যুগেও বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চায় ইসলামের জুজুর ভয় খুবই প্রবল ছিল। বাংলায় মধ্যযুগে মুসলমান কবিদের বাংলা ভাষায় লেখার জন্য কৈফিয়তের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়। মুসলমান লেখকদের একটা ঘরানা বাংলা ভাষার ব্যবহারকে সময়ের দাবির ভিত্তিতে সমর্থনযোগ্য করার চেষ্টা করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুজাম্মিল বলেছেন মানুষজন আরবি বুঝে না বলেই তিনি বাংলায় লিখেছেন। সাহিত্যিক আব্দুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০ খ্রিঃ) মন্তব্য করেছেন ইসলামী শিক্ষার জন্য আরবীই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, যারা আরবি জানে না তাদের জন্য ফার্সি উত্তম। যারা এর কোনোটাই জানে না তাদের জন্য অন্তত স্বদেশি ভাষাতেই ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা উচিত। দ্বিতীয় একটি ঘরানা তুলনামূলক সুবিধার বিচারে বাংলার ব্যবহারকে সমর্থন করেন। এরা হলেন সায়িদ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮ খ্রিঃ) ও শেখ মুত্তালিব (১৫৯৫-১৬৬০ খ্রিঃ) শেখ মুত্তালিব লিখেছেন :

                        আরবীতে সকলে ন বুঝে ভালমন্দ

                        তে-কারণে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ॥

                        মুসলমানী শাস্ত্র করা বাঙ্গালী করিলু।

বহু পাপ হইল মোর নিশ্চয় জানিলু ।

মুমিনের আর্শীবাদ পূণ্য হইবেক।

অবশ্য গফুর আল্লা পাপ ক্ষমিবেক।

এতে বাংলার গোঁড়া মুসলমানেরা ঐ সমস্ত বাংলা লেখকদের মুনাফিক বলে সমালোচনা করে। তৃতীয় ঘরানাটি জোরে শোরে দাবি করে যে, আল্লাহ সকল ভাষাই বোঝেন, তাই বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দরকার নাই। সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আব্দুল হাকিম তাই যুক্তি দেখিয়েছেন:

                        যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

                        সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।

অন্য একস্থানে তিনি লিখেছেন:

                        যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

                        সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।

                        দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুরায়।

                        নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যায়।

এতে দেখা যায় ‘আশরাফী’ মুসলমানেরা অত্র অঞ্চলের আম মুসলমানদের উপর হিন্দী ও ফারসী ভাষার ২০০ বছরের (১২০০-১৪০০ খ্রিঃ) সংমিশ্রণে একটি শংকর ভাষা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রবল চেষ্টা বরাবরই করেছে এবং আমাদের শক্ত মেরুদন্ডের অধিকারী কবিগণ তা সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিয়েছেন। ভাষার উপর আক্রমণ বাঙালি সেই মধ্যযুগ থেকেই প্রতিরোধ করেছে। অথচ উর্দু একটি আজনবী শংকর ভাষা এটা কোনো আদি বা প্রাচীন ভাষা ত নয়ই, এর কোনো নিজস্ব হরফও নাই। আরবি হরফে লেখা হয়। তুর্কিরা সৈন্যরা উর্দু বলত, সম্রাট শাহজাহানের (১৬২৮-১৬৫৮ খ্রিঃ) প্রধান সেনানিবাসের নামছিল উর্দু-এ-মআল্লা কোনো কোনো ভাষাবিদগণের মতে সম্রাট শাহজাহানই এ ভাষাটির ‘উর্দু’ নামকরণ করেন। উর্দু ভাষাটি উচ্চবর্ণের মুসলমানদের সৃষ্টি, এবং আরবি হরফে লিখিত হত বিধায় মাদ্রাসার শিক্ষার মাধ্যমে, ফলে হাদিস, ফেকা তফসির প্রধানত উর্দুতে ব্যবহার এর আর একটি অন্যতম কারণ ছিল বৃটিশ শাসনের মধ্যভাগে ফার্সির বদলে ইংরেজি চালুর কারণে সুবিধাবাদী মুসলমানেরা ধর্মশিক্ষাকে উর্দুর দখলে নিয়ে আসে। এটা মূলত দিল্লি ও লক্ষেèৗ ঘরানার অভিজাত মুসলমানের ভাষায় পরিণত হয়। শরাফতীর আশায় অনেক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মুসলমানেরা এই ভাষার প্রতি ঝুঁকে পরে। সম্প্রতি আমাদের ভাষা বিকৃতির মহাউৎসব চলছে। এফ এম ব্যান্ড রেডিওর কল্যাণে, ইংরেজি-হিন্দি শব্দ ও উচ্চারণে বাংলা ভাষার প্রাণ ওষ্ঠাগত।

এবার দৃষ্টি দেয়া যাক ভারতে বৃটিশ শাসনের শেষ দিকের অবস্থার দিকে। মুসলিম লীগের মধ্যেও লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের আগে সর্বভারতীয় মুসলমানদের ভাষার প্রশ্নে বিতর্ক  দেখা দেয়। ১৯৩৬ সালে সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের লক্ষেèৗ অধিবেশনে মুসলিম ভারতের ভাষা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাব করা হয়। তখনই বাংলার প্রতিনিধিগণ এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের পরও এ বির্তক অব্যাহত থাকে। শরাফতিদের যুক্তি ছিল বাংলা ভাষা হিন্দু, মালাউন কাফেরের ভাষা হিন্দুয়ানি-চর্চিত এই জাবানকে ধারণ করা মানে কালে কালে মুসলমানিত্বের বিলোপ। কি চমৎকার আপাত মঙ্গলের আহ্বান, ধর্মচ্যুতির এমন আতঙ্কও সেদিন সরল জনগণের ভিতর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরও একটি বিষয় এরা অতি সুক্ষ্মভাবে ছড়িয়েছিল যে এ অঞ্চলের বাঙালি মুসলমানেরা নিম্নবর্ণের হিন্দু জনগোষ্ঠি হতে ধর্মান্তরিত এবং হিন্দুরা অতি কৌশলে বাংলা ভাষার মাধ্যমে এদের পুনরায় ধর্মান্তরিত করার গভীর ষড়যন্ত্র করছে। লক্ষণীয় হচ্ছে মুসলমানদের নিকট হতে বাংলা তথা ভারতের শাসন ক্ষমতা ইংরেজরা ছিনিয়ে নেয় ফলে মুসলমানেরা অভিমান করে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ থেকে দূরে থাকে এবং হিন্দুরা এই সুযোগ গ্রহণ করে মুসলমানদের চেয়ে ৫০ বৎসর পিছিয়ে পরে। একইভাবে উর্দু আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলে আমরা অন্তত শতবছর পিছিয়ে যেতাম।

যে জাতির ভাষার উন্মেষ ঘটেছে হাজার বছরের অধিককাল যে ভাষার সাহিত্যকর্ম এত সমৃদ্ধ যে আমাদের বিশ্বকবি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে সমগ্র বিশ্বে বাংলা ভাষাকে মহান সম্মানে ভূষিত করেছেন, দিয়েছেন বিশ্ব পরিচিত। বাঙালিকে পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে। উর্দুর সে রূপ বা খ্যাতির কথা অদ্যাবদি জানা নাই।

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক এক পোলিও আক্রান্ত রাষ্ট্রের জন্ম হয়, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। যদিও ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের পূর্বাঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা। ভাষা, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ঐতিহ্য সংস্কৃতি ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু, ইতিহাস খাদ্যাভ্যাসসহ সকল বিষয়ে ছিল শুধু বৈপরীত্য। তার ওপর ছিল ১২০০ মাইলের ব্যবধান। মজার ব্যাপার হচ্ছে ১৯৫১ সালের আদম শুমারিতে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০% বাঙালি, ২৮.০৪% পাঞ্জাবি, ৫.৪% সিন্ধি, ৭.১%, ৭.২% উর্দু এবং বাকি ১.১% ইংরেজী ও অন্য ভাষী। সে দেশের মানুষের মাত্র ৭.২% উর্দুতে (মোহাজের) কথা বলে তাদের ভাষাতেই ৫৪.৬০% শতাংশ জনগোষ্ঠীর বাঙালিকে কথা বলতে হবে উর্দুতে, এটা কি আদৌ চিন্তাতেও আনা যায়। এদিকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির আগে আগে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. জিয়াউদ্দিন আহম্মদ পাকিস্তান সৃষ্টি হলে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার আগাম দাবি করেন এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমান একই উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লা, সৈয়দ মুস্তফা আলী প্রমুখ এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এর পরের ইতিহাস খুবই পরিচিত এবং সকলের জানা। এর পর ১৯৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর। ২১ ও ২৪ মার্চ যথাক্রমে রেসকোর্সে নাগরিক সংবর্ধনায় এবং কার্জন হলে সংবর্ধনায় উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগের আগে রেডিও ভাষণে জিন্নাহ তার বক্তব্যের পুনর্লেøখ করেন। জিন্নার সে সময়ের একটি উদ্ধৃতি ভুলভাবে বহুদিন ব্যবহৃত হচ্ছে। তা হলো ‘উর্দু এন্ড উর্দু শ্যাল বি দা ষ্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান’। কিন্তু মূল ভাষণটি ছিল এরকম Let me tell you in the clearest Languange… ultimately it is for you the people of this province. But let me make it very clear to you that the state Language of Pakistan is going to be Urdu and no other Language. মজার ব্যাপারটি হচ্ছে জিন্নাহ সে

বক্তৃতাটি করেছিলেন ইংরেজিতে আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে জিন্নাহ একমাত্র মহাত্মাগান্ধী ছাড়া সকল ভারতীয় নেতাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতেন উর্দুতে নয়। এর পর ১৯৪৮ এর ১৪ জুলাই ঢাকায় পুলিশ বিদ্রোহ করে, সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্ট গুলি চালায় এবং ২জন পুলিশ নিহত হলে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী ঢাকা আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তৃতায় সুকৌশলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা প্রকাশ করেন। ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিন (উর্দুভাষী) উর্দুর পক্ষে ওকালতি করে গরম কড়াইতে ঘি ঢালেন, মওলানা আকরাম খাও একই পথে হাঁটেন। এরপর অনেক ষড়যন্ত্র, আন্দোলন এবং রক্তঝরার পর বাংলা ভাষার কাক্সিক্ষত মর্যাদা অর্জন। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। পাকিস্তানের সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান প্রবর্তিত সংবিধানের ২১৫(১) অনুচ্ছেদে লেখা হয় ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু; কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধক রূপে কাজে লাগানো যাবে না, বিশেষত ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই ভাষা সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে।’

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন রক্তপাত পর্যন্ত গড়ায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর হঠকারিতার কারণে। কিন্তু তার দায়-দায়িত্ব বর্তায় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের ওপর। যদিও নূরুল আমীন থেকে মুসলিম লীগের প্রায় সব নেতাই ছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে। নূরুল আমীন পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক সপ্তাহ আগেও কলকাতার এক আলোচনা সভায় পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা বাংলা করার পক্ষে মত দিয়ে বক্তৃতা করেন। নূরুল আমীন উর্দুর পক্ষে ওকালতি করেছেন এ ধরনের কোনো নথি তথ্য গোচরীভূত হয় নাই।

আজ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কৃতিত্ব নেওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু একটি বিষয়কে আমরা সামনে আনছি না বরং আড়াল করছি- বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য লেখক বুদ্ধিজীবীরা লেখালেখি ও আলোচনার মাধ্যমে অগ্রসরমান করেছিলেন সত্য কিন্তু আলোচনার বিষয়কে একটি আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন শ্রমজীবীরা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পোষ্ট অফিস, পাটকল শ্রমিক, ডাক-তার, সিমেন্ট শ্রমিক, রেলওয়েসহ বিভিন্ন নিম্নপদের কর্মচারীরা অফিসে বিভিন্ন কর্মে ইংরেজির সাথে উর্দু লেখার প্রচলন শুরু হলে আতংকিত হয়ে পড়েন এবং আশঙ্কা করেন যে উর্দু না জানলে তাদের চাকরি হারাতে হবে। সেই সাথে ভারত বিভাগের সাথে সাথে বহু সংখ্যক বাঙালি হিন্দু কর্মচারী ‘অপসন’ দিয়ে ভারতে চলে গেলে তাদের শূন্যস্থানগুলো ভারত হতে আগত উর্দু ভাষী মোহাজেরদের দ্বারা পূরণ করা হয়। ঢাকার ইডেন বিল্ডিং এর ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরাই প্রথম সরকারি কাগজে উর্দু ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন এবং সূচনা ঘটান ভাষা আন্দোলনের। তাদের সেই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, তাদের সাথে যোগদেন বাইরের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ। আন্দোলন একটা মিলিট্যান্ট রূপ নিতে থাকে। কেন বুদ্ধিজীবীরা নন, শ্রমজীবী ও ছাত্র-যুবসমাজ আন্দোলন শুরু করেন? কারণ বিষয়টি শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনীতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টও। শুধু উর্দু সরকারি ভাষা হলে অল্পশিক্ষিত বাঙালিরা সরকারি চাকরি পাবে না, সব চাকরি পাবে উর্দুভাষী মোহাজেরেরা। একুশের শহীদদের ও আহতদের শ্রেণীচরিত্র দেখলেই ভাষা আন্দোলনে তাদের সক্রিয় অবদানের সক্রিয় অবদান বোঝা যায়। এখনকার প্রজন্মের মানে ধারণা হচ্ছে ভাষা আন্দোলনে নাম জানা শহীদগণের সাথে কয়েকজন ভাষা সৈনিকই আসল ত্যাগী কিন্তু বাস্তবটা কিন্তু এর চেয়েও অনেক বড়।

আরও বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে পূর্ব বঙ্গের সে সময়কার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল সাংগঠনিক প্রস্তুতির অভাব এবং সরকার ঘোষিত ১৯৫৩ সালের সাধারণ নির্বাচন পিছিয়ে যাবে যা মূলত গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। শুধু পক্ষে জোড়ালো মত দেন আব্দুল মতিন ও অলি আহাদ।

প্রতি বছরই আমরা আড়ম্বর করে ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করি। একুশে দিনটি আসলে কি? শহীদ দিবস না ভাষা দিবস না কি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস? এর কোন কোন পরিচয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য।

এক কথায় এর উত্তর দেওয়া সম্ভব হবে না। তার কারণ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব ৬২ বছর ধরে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে ঠিকই, কিন্তু এদিনটির পরিচয় আগাগোড়া এক ছিল না বা এর তাৎপর্যও চিরদিন অভিন্ন ছিল না। নানা সময়ে দিনটিকে একেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকা শহরে রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছিল তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও নজীরবিহীন। তখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও বিশেষ একটি ভাষাকে সরকারি করার দাবিতে এরকম আবেগপূর্ণ আন্দোলন হয়নি। পরে হয়েছে ভারতের আসামের কাছার জেলায় বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষী ছাত্র জনতা প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে মর্যাদা দানের দাবিতে আন্দোলন করে এবং বুকের রক্ত দিয়ে তাদের দাবি আদায় করে।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তার গানে দিনটিকে ২১ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন পরের বছর হাসান হাফিজুর রহমান ও তার সংকলনের নাম দিয়েছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মূল গুলিবর্ষণের স্থানে নিজেরা যে ‘মিনার’ তৈরি করেছিলেন তার নাম তারা দিয়েছিলেন শহীদ মিনার। সেই থেকে ভাষা আন্দোলনে নিহতরা পরিচিত হন শহীদ হিসেবে এবং একুশে ফেব্রুয়ারির নামও হয় শহীদ দিবস। যদিও একুশে রাতে শহীদ মিনারে বর্তমান স্থানে প্রথম কাগজের শহীদ মিনার গড়া হয় যা পুলিশ ভেঙে দেয়। এখানে লক্ষণীয় যে ১৯৫২ এর পর বাঙালির চেতনা শুধুমাত্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার মধ্যেই মধ্যেই সীমাবন্ধ ছিল না। তখন তাদের সাধনা ছিল বাঙালিয়ানা অর্জনের। চিন্তায়, চেতনায়, মননে বলনে-চলনে পোশাকে-আশাকে খাদ্যে-গৃহসঞ্জায় ও সামাজিক উৎসবে সর্বত্রই কম-বেশি বাঙালিয়ানার ছাপ পড়তে আরম্ভ করেছিল। সেই সাথে যোগ হতে থাকল পূর্ববাংলার সমানাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের লড়াকু দাবি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত সংক্ষেপে এই ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি পরিচয়। বঙ্গবন্ধু উত্তর বাংলাদেশে বাঙালিপনায় দারুণ ভাটা পড়ে এবং শহীদ দিবসকে ভাষা দিবস নামে চালানোর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সেই সাথে সযত্নে প্রচেষ্টা চালানো হয় শহীদ দিবসের অসাম্প্রদায়িক বাঙালিয়ানার স্পিরিটকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র জিয়ার আমলে শুরু হয় এবং এরশাদের আমলে আরও বৃদ্ধি পায়। এদিকে একুশের নাম নিয়ে আরেকবার সংশয় দেখা দেয় নব্বইয়ের দশকের শেষে UNESCO যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বলে ঘোষণা দেয়। এর কর্তৃত্ব কানাডা প্রবাসী দুইজন বাংলাদেশির আব্দুস সালাম এবং রফিকুল ইছলামের- তারা একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার জন্য UNESCO এর নিকট প্রস্তাব দেন। এরপর বাংলাদেশ সরকার (শেখ হাসিনা সরকার) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলে, প্রস্তাবটি UNESCO গ্রহণ করে।

একুশের ভাষা আন্দোলনের চরিত্র মূলত চারটি স্লোগানের ভিত্তিতে প্রকাশ পেয়েছিল। সে চরিত্র ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিনির্ভর। স্লোগান ৪টি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তিচাই, শহীদ স্মৃতি অমর হোক। সে সময়কার পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক দু:শাসনে জেলখানাগুলো ভরে উঠেছিল গণতন্ত্রী ও প্রগতিবাদী রাজবন্দীদের দিয়ে, ভাষা সংগ্রামীরা এতসব বিচার বিশ্লেষণ না করে নানা মতের রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি করে এসেছে গণতন্ত্রের বিধান মেনে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিচয় বাধা হয়ে উঠেনি। আর সেই সূত্রে এবং একাধিক সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে তাদের অসম্প্রদায়িক চেতনা। জনগোষ্ঠীর দাবির ক্ষেত্রে সম্প্রদায়-বিভাজনের কোনো প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়নি। দাবিগুলোর প্রেক্ষাপটে ছিল ভাষিক বাঙালি জাতি তথা জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ, একুশের চেতনা বলতে আমরা এমনটাই বুঝি। নানা কারণে একুশের চেতনা আমাদের রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গ, সদার্থক প্রভাব রাখতে পারেনি। তার প্রমাণ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলি, যা ইতি ও নেতিতে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এর সুপ্রভাব দীর্ঘস্থায়ী অবদান রেখেছে। যেমন সাহিত্য সংস্কৃতিতে চর্চায় বাঁকফেরা প্রভাবে তেমন সেক্যুলার চেতনার আধুনিকতায়। বিষয়টা কেউ মানেন, কেউ এটাকে মানেন না কিছুটা গভীর অনুধাবনের অভাবে।

এখন তাই একুশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা ও উপরতলীয় প্রভাব ও প্রকাশই বড় হয়ে থাকে। আর তারুণ্যে বা অন্যত্র একুশ আমার গর্ব, একুশ আমার অহংকার এমন বাহ্যিক উচ্চারণই প্রধান হয়ে থাকে। চৈতন্যের গভীরে তার প্রভাবজারিত আলো জ্বলে না- যেমন তারুণ্যে, তেমনি বয়স্ক মননে। সম্ভবত সে কারণে একুশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবি এখনো অনর্জিত রয়ে গেছে রাজনীতি, শিক্ষা ও জাতীয় জীবনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

বরকত-সালাম-রফিক-জব্বার নিহত হয়েছিলেন অর্ধশতাব্দীরও আগে তা নিয়ে ৩ জুন ১৯৫২ তারিখে জাস্টিস টি এইচ এলিসকে দিয়ে তদন্ত কমিশন গঠিত হয় তার সেই রিপোর্টও হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিশেষ করে ১৯৭৫ উত্তর সময় হতে একুশের মূল লক্ষ্য হারিয়ে গেছে। বদলে গেছে একুশে পালনের ‘স্পিরিটও’। শহীদ দিবস এখন উৎসবের দিন। তাকে আমরা আনন্দ ও আড়ম্বরের সাথে স্মরণ ও উদ্যাপন করি, কিন্তু সে আর মত অনুপ্রাণিত বা উদ্দীপ্ত করে না। প্রতিজ্ঞা ও সংকল্প গ্রহণে প্রেরণা জোগায় না। শুধু তাই নয় একুশ পালনকারী তরুণদের অনেকেই জানে না একুশের ইতিহাস। অনেকে ভাষা শহীদদের সাথে স্বাধীনতা শহীদদের সাথে একাকার করে ফেলে, গুলিয়ে ফেলে। দুটি সম্পূর্ণ ঘটনা এবং বিষয়। তাদের নিকট এটা পরিষ্কার করতে হবে। একুশ মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে বাঙালির প্রথম, ভয়ংকর অপ্রতিরোধ্য জাগরণ এবং এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গীয় জাতীয়তার চেতনার সৃষ্টি, সেই চেতনা ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে স্বাধীনতায় রূপান্তরিত হয়। তাই বলা যায় একুশের চেতনাই আমাদের শক্তির আধার, শক্তির বহিঃপ্রকাশ, সেজন্য আমাদের সবসময় চেতনার স্থানকে সযত্নে লালন করতে হবে অনন্তকাল।

লেখক : সাবকে আইজিপি

বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *