ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

অজয় দাশগুপ্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার আদলে বাংলাদেশে কতটি শহীদ মিনার গড়ে উঠেছে? এ নিয়ে কোনো জরিপ হয়েছে কি না, জানা নেই। হাতের কাছে তথ্য না থাকলেও কেউ যদি বলেন এ সংখ্যা শত শত, তাতে কেউ আপত্তি করবে না। ‘হাজার হাজার’ বললেও তাতে আপত্তি করা যাবে না। তবে সংখ্যা যাই হোক না কেন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে একটি ডিজাইনের হুবহু না হোক- অন্তত আংশিক অনুসরণ এত বেশি সংখ্যায় হওয়ার নজির বিশ্বে না মেলারই কথা (বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হতেই পারে) শহীদ মিনারের ডিজাইনার শিল্পী হামিদুর রহমান তাঁর সৃষ্টিকর্মের পুনঃপুনঃ ব্যবহার দেখে গর্বিত হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। এমন নকশার জন্য তাঁকে আমরা কৃতিত্ব দিতেই পারি। আবার অনেকেই বলবেন যে মূল বিষয় হচ্ছে একুশের চেতনা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘ঢাকা শহর রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছিল’ যে ছাত্র-তরুণরা তাদের স্মরণে যে ডিজাইন বা নকশাতেই ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ নির্মিত হতো, সেটাই অনুকরণ-অনুসরণ হতো বাংলাদেশের সর্বত্র। কারণ এতেই যে স্থান পেয়েছে আমাদের সবার অন্তরের কথা। বাংলা ভাষার মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হতে দেব না- এটাই ছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সূচনার দিনগুলোতে এ ভূখন্ডের মানুষের শপথ। ওই বছরের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ঠিক চার মাস পর ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান সরকারের কর্মচারীরা ধর্মঘট করে ডাকটিকিটে কেবল উর্দু শব্দ রাখা এবং সরকারি নির্দেশ-সার্কুলারে কেবল উর্দু ভাষা রাখার প্রতিবাদে। এ ঘটনার তিন মাস পর ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। কিন্তু তাঁকে বিস্মিত ও স্তম্ভিত করে ছাত্ররা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। এমনটি তিনি যে ভাবেননি বা আশা করেননি, সেটা নিশ্চিত বলা যায়।

২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণ-পরবর্তী ঢাকা শহর ছিল উত্তপ্ত। সরকার পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী নামিয়েছিল আন্দোলন দমনের জন্য। তার মধ্যেই কিন্তু গড়ে উঠেছিল শহীদ মিনার। মুসলিম লীগ সরকার সে শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু ‘ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক, ভয় কী বন্ধু, আমরা যে আছি চার কোটি পরিবার’- এ চেতনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সাধ্য তো কারও ছিল না, এখনও নেই। শহীদ মিনারের নকশা যাই থাকুক, বাংলাদেশের মানুষ আনন্দ-কষ্টে, শোকে-উচ্ছ্বাসে, সুসময়ে-দুঃসময়ে ছুটে যায় শহীদ মিনারে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে কোনো একসময়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় একটি ছবি তোলা হয়েছিল। ছবিটি তুলেছিলেন আনোয়ার হোসেন। তিনি একাত্তরে ছিলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের করায়ত্ত ঢাকা শহরেই তিনি ক্যামেরাকে পরিণত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ারে। যদি ধরা পড়তেন, মৃত্যু অবধারিত ছিল। কারণ হানাদার বাহিনী কোনোভাবেই চায়নি যে তাদের নারকীয় অপরাধকর্ম ক্যামেরাবন্দি হয়ে থাকুক। এমনকি তারা কোনো সাক্ষীও রাখতে চাইত না।

২৫শে মার্চ অভিশপ্ত রাতের দুই-তিন দিন পর রাতের আঁধারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হানাদাররা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যার উৎসাহী সমর্থক ও সহযোগী মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের এ পরিণতি দেখে যারপরনাই খুশি হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এসব দল উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে প্রবল জোশে সওয়াল করেছে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ফুল দেওয়া- এসবে ছিল তাদের ঘোরতর আপত্তি। তাদের কাছে এটা ছিল ‘ইসলামবিরোধী’ ও ‘নাস্তিকতাবাদী’ কর্মকান্ডের শামিল। শহীদ মিনার ভাঙার পর তারা খুশিতে এতটাই ডগমগ হয় যে তাদেরই কেউ গিয়ে মিনারের অবশিষ্ট বেদিতে লিখে দিয়ে আসে- ‘মসজিদ’। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে তখনো লাখ লাখ বাঙালি বসবাস করছেন। তারা প্রতি মুহূর্তে শঙ্কিত থেকেছেন- কখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কিংবা তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকাররা গুলিতে শরীর ঝাঁঝরা করে দেবে কিংবা বেয়নেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারবে। এজন্য কোনো ব্যাখ্যার দরকার নেই। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটছিল তাদের জীবন। এর মধ্যেই তাদের বাজারে যেতে হয়েছে। হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। মাজারে গিয়েছেন। অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভগ্নাবশেষে (দুষ্টুবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়ে। যে বা যারা মসজিদ লিখে রেখেছিল, গিয়ে কেউ নামাজ আদায় করেছেন কিংবা মিলাদ পড়েছেন- এমনটি নিশ্চিতভাবেই ঘটেনি। বরং তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাঙায় তারা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। কিন্তু ক্ষোভের আগুন যে জ্বলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। ‘মসজিদ’ লেখা তাদের ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে। আর তারই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি শহীদ মিনারে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ লিখে একটি পোস্টার টানিয়ে দেওয়ার ঘটনায়। একাত্তরে ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশ ছিল মৃত্যুপুরী। তার মধ্যেই এমন দুঃসাহসী কাজ কে করল? পোস্টারটি লেখা হয়েছে একটি পুরনো সংবাদপত্রের পাতায়। আনোয়ার হোসেনের সাদা-কালো আলোকচিত্র থেকে বোঝার উপায় নেই যে, লেখার জন্য কী রং ব্যবহার করা হয়েছে। হতে পারে এ কাজ যে দুঃসাহসী তরুণ কিংবা আরো বেশি বয়সী ব্যক্তির, তিনি তার স্ত্রী বা বোনের পায়ের আলতা ব্যবহার করেছেন। এমনও হতে পারে যে তিনি এমনকি পরিবারের কাউকেও বিষয়টি জানাননি। কারণ তাতে আপত্তি বা বাধা আসার শঙ্কা ছিল। কোনো নারীও এ কাজ করতে পারেন। চিরকালের জন্য অজ্ঞাত থেকে যাওয়া এমন কত ঘটনাই না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রয়েছে! বাংলাদেশে যে একটি নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ চলছে এবং এ যুদ্ধে জয় যে অবশ্যম্ভাবী সে প্রত্যয় ব্যক্ত রয়েছে এ পোস্টারে। তিনি শুধু পোস্টার লিখেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তার পক্ষে নতুন শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব নয়। সে পরিবেশ ছিল না। কিন্তু তিনি তো জানেন যে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। একুশ মানেই গর্বে উন্নত শির। একুশ মানেই ২৬শে মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের পরাজিত করা। এরই প্রতীক হিসেবে স্থাপন করেছেন শহীদ মিনারের ধ্বংসাবশেষে দুটি ইট। এ পোস্টার এবং ‘প্রাণহীন দুটি ইট’ যে বেশিদিন (এমনকি বেশিক্ষণ) স্থায়ী হয়নি, সেটা বলাই যায়। উর্দুভাষী পাকসেনারা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জিন্দাবাদ’ পড়তে না পারলেও রাজাকাররা তা পেরেছে এবং ‘মুক্তি’ বা ‘দুষ্কৃতকারীদের’ দুঃসাহস দেখে রাগে-ক্ষোভে জ্বলেছে। এ ঘটনা যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কিংবা ডিআইটি ভবনে বোমা ফাটানোর মতোই ভয়ংকর। সংগত কারণেই নতুন শহীদ মিনার ও বাংলাদেশ সরকারের জয়ধ্বনি লেখা পোস্টার তারা দ্রুত গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে ছুটে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। মুক্ত স্বদেশকে গড়ে তোলার শপথ-সংকল্প গ্রহণের এটাই যে উপযুক্ত স্থান।

একাত্তরে বিজয়ের পর শহীদ মিনারের ওপর হামলা-আক্রমণ যে থেমে গেছে, সেটা বলা যাবে না। আশির দশকের শুরুতে অস্ত্রের জোরে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ ঘোষণা করেন, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ও আলপনা আঁকা ইসলামবিরোধী কাজ। অতএব পরিত্যাজ্য। আবার প্রবল প্রতিবাদ- ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করার সঙ্গে তো পবিত্র ইসলাম ধর্মের কোনো বিরোধ নেই। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখেছি বক্তৃতা-বিবৃতিতে এবং পরের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে জমায়েত আরো বড়ো করে। এইচ এম এরশাদ ভেবেছিলেন, সামরিক শাসনের ভয় দেখিয়ে একুশের চেতনাকে মুছে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু ইতিহাস আরো অনেক দাম্ভিক শাসকের মতো তাকেও কিছু শেখায়নি। তার আমলেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বর্তমান আদল পেয়েছে। কিন্তু ছাত্র-তরুণরা তাকে কখনো এ স্থানে আসতে দেয়নি।

পাকিস্তানি শাসনামলে যে অপশক্তি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং দেশের আরো অনেক স্থানে গড়ে ওঠা শহীদ মিনারকে সহ্য করেনি, তাদের অনুসারী এখনো আমাদের সমাজে রয়েছে। এরই বহিঃপ্রকাশ দেখি বিভিন্ন স্থানে মানবতাবিরোধী অপশক্তির বিচারের দাবিতে সক্রিয় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ওপর হামলার পাশাপাশি একুশের শহীদ মিনারকেও আক্রমণের টার্গেট করার ঘটনায়। কেন এটা করছে, সে প্রশ্নের উত্তর সহজ- ছয় দশক পরও ‘একুশ’ তাদের গায়ে জ্বালা ধরায়! আরো গাত্রদাহ এ কারণে যে তরুণ প্রজন্ম এ চেতনার স্বতঃপ্রণোদিত অনুসারী হয়ে পড়ে। কোনো অপপ্রচার কিংবা ভয়ভীতি তাদের বিরত রাখতে পারে না। এখনো স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে। কোথাও কোথাও নিজের গায়ের রক্ত বিক্রি করে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শহীদদের রক্তঋণ স্মরণ করা হয়।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মূল ডিজাইন বা নকশা অনুযায়ী হুবহু নির্মিত হয়নি। নির্মাণকাজ চলাকালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটেছে। এ নিয়ে এখনো অনেকের ক্ষোভ। জেলা-উপজেলা-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে, তার সবগুলোও অভিন্ন নকশার নয়। একুশের শহীদদের স্মরণে যেসব শহীদ মিনার আগামীতে গড়ে উঠবে, তাতে অভিন্নতা আসবে কি না, সেটা বলার উপায় নেই। এর প্রয়োজনই বা কী, এ প্রশ্নও কিন্তু করা যায়। একুশের চেতনা জাগরূক রাখাই আসল কথা। সংকটে বা উৎসবে, মন্দ বা ভালো সময়ে আলোকবর্তিকা হয়ে চলছে একুশ এবং তার অন্যতম প্রতীক শহীদ মিনার। আদল বা রূপ এ ক্ষেত্রে বড়ো কথা নয়। একুশের প্রভাতফেরিতে ঝলমলে শহীদ মিনার যেমন আমাদের প্রেরণা, তেমনি উজ্জ্বল ধ্রুবতারা ঊনিশশ একাত্তর সালের কোনো একদিনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের গুঁড়িয়ে দেওয়া মিনারের পাদদেশের ভিতের ওপর কোনো অজানা নারী বা পুরুষের রেখে যাওয়া দুটি ইট এবং একটি পোস্টার! এ প্রেরণা অবিনাশী। কেউ তা গুঁড়িয়ে দিতে পারবে না।

আমাদের এই একুশ এখন বিশ্বের। রফিক ও সালাম- নাম দুটি যেমন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে গেঁথে আছে, তেমনই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গেও রফিক-সালামের নাম মিশে আছে। রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম নামের দুই বাঙালি এ দিবসটির বীজ বপন করেছিলেন।

১৯৯৮ সালের ৯ই জানুয়ারি রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে ১৯৫২ সালে ভাষা শহীদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রস্তাব করা হয় যে, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে যেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রফিকুল ইসলাম এরপর আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে ‘এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী এবং একজন কাচ্চিভাষী সদস্য ছিলেন। তারা আবারো কফি আনানকে ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’-এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লিখেন এবং চিঠির একটি কপি ইউএনও’র ক্যানাডিয়ান অ্যাম্বাসাডর ডেভিড ফাওলারের কাছেও প্রেরণ করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাঁদের এই উদ্যোগ ও চিঠি প্রেরণের প্রয়োজনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।

১৭ই নভেম্বর, ১৯৯৯। এক ঐতিহাসিক দিন। ইউনেস্কোর সভায় প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো। ১৮৮টি দেশ এতে সমর্থন জানালো। কোনো দেশই এর বিরোধিতা করল না। সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গৃহীত হলো ইউনেস্কোর সভায়। এভাবেই আমাদের একান্ত দিনটি ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ একটি আন্তর্জাতিক দিনে পরিণত হলো। এখন বিশ্বের দেশে দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়।

বিশ্বে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অনেক ভাষা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ আছে। বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভাষাকে বিপন্ন হতে দেয়নি। বিশ্বের শত শত ভাষার শত শত কোটি মানুষের কাছে এ বিষয়টি অনন্য অনুপ্রেরণা হবে, তাতে আর বিস্ময় কী। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকেই স্বীকৃতি দেয়নি, অমর একুশের শহীদদের আত্মদান থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনকেও মর্যাদা দিয়েছে। জাতি হিসেবে আমাদের মহিমান্বিত করেছে। বিশ্বের প্রায় দুইশ দেশে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপিত হচ্ছে। ওই সব দেশের মানুষ জানছে ঢাকার বুকে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল, কী কারণে রফিক, সালাম, বরকতরা প্রাণ দিয়েছিল। তারা আরো জানছে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনল যাঁরা। এটাও জানছে বিভিন্ন দেশের নতুন নতুন প্রজন্ম। তারা জানছে, যে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি আদায় করার মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য যাকে পাকিস্তানের শাসকরা কারারুদ্ধ করে রেখেছিল- কিন্তু তিনি জেলে বসেই আন্দোলনকারীদের সমর্থনে অনশন শুরু করেন, তিনিই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। এ দেশটির রাষ্ট্রভাষা বাংলা, যা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে আপামর জনগণের অনন্য আত্মত্যাগ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *