ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

তানভীর সালেহীন ইমন, পিপিএম

[তৃতীয় পর্ব]

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবি সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অতর্কিতে হামলা চালায়, তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এসএএফ ক্যানটিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে সারা দিন পুলিশ লাইনসের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাংকের অবিরাম কানফাটা গর্জনে ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাঁপছিলাম।

২৬ মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বাঙালি পুলিশ বাহিনী বীরের মতো প্রতিরোধ করতে করতেও আর টিকে থাকতে পারেনি। সকালে ওরা পুলিশ লাইনসের এসএএফ ব্যারাকের চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে ঢুকে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের নাক, মুখ ও সারা দেহে বেয়নেট ও বেটন চার্জ করতে করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যানটিনের কামরা থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনে। আমাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। তারা আমার ওপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল। কুকুরের মতো আচরণ করে তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। আর সহ্য করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল মারা যাচ্ছি। আর কোনো উপায় না দেখে প্রাণ বাঁচানোর জন্য ওদের কাছে বারবার কাতর মিনতি জানাচ্ছিলাম। হাউমাউ করে কাঁদছিলাম আর বলছিলাম, ‘আমাকে মেরো না, আমি সুইপার। আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিষ্কার করার আর কেউ থাকবে না। তোমাদের পায়ে পড়ি, তোমরা আমাকে মেরো না, মেরো না, মেরো না। আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইনস রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।’ তখন এক পাঞ্জাবি কুকুরের মতোই আমার ওপর চড়াও হয়ে আমাকে ধর্ষণ করছিল। আমাকে মেরে ফেললে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস পরিষ্কার করার জন্য আর কেউ থাকবে না, হয়তো এ কথা ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দেয়। এক পাঞ্জাবি সেনা ধমক দিয়ে আমাকে বলে, ‘ঠিক হায়, তোমকো ছোড় দিয়া জায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলেগা, হারওয়াকত লাইনস পার হাজির রাহেগা।’ এ কথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।

পাঞ্জাবি সেনারা রাজাকার ও দালালের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বাঙালি যুবতী, রূপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জিপ ও মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনসের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। আমি ক্যানটিনের ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম, দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জিপ ও আর্মি ট্রাক থেকে লাইন করে বহু বালিকা, যুবতী ও মহিলাকে এসএফ ক্যানটিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হলো। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের ওপরতলার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো, অবশিষ্ট মেয়ে যাদের ব্যারাকের ভেতরে জায়গা দেওয়া গেল না, তাদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখলাম, অনেক রূপসী যুবতীর দেহে অলংকার দেখলাম, তাদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল।

এরপরই আরম্ভ হলো বাঙালি নারীদের ওপর বীভৎস নিপীড়ন। লাইনস থেকে পাঞ্জাবি সেনারা কুকুরের মতো জিব চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করতে লাগল। শোনা যেতে লাগল তাদের উন্মত্ত অট্টহাসি। ওরা ব্যারাকে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকাকে উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে রাখল। শুরু হলো ধর্ষণের নারকীয় মহোৎসব। পাকিস্তানিদের কেউ কেউ বালিকাদের দাঁড়ানো অবস্থায়ই ধর্ষণ করতে লাগল। আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিষ্কার করার অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উন্মত্ত উল্লাসের সামনে মেয়েরা কোনো শব্দ পর্যন্ত করেনি, করতে পারেনি। উন্মত্ত পাঞ্জাবি সেনারা এই নিরীহ বাঙালি মেয়েদের শুধু ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয়নি, দেখলাম, পাকিস্তানি সেনারা ধারালো দাঁত দিয়ে সেই মেয়েদের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। ওদের উদ্ধত ও উন্মত্ত কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তনসহ বক্ষের মাংস উঠে আসছিল। মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠ ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। যেসব বাঙালি যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করল, দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবি সেনারা ওদের চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকার ওপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুই পা দুদিকে টেনে ধরে ছিঁড়ে ফেলে দিল। আমি এসব দেখছিলাম আর ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম। পাঞ্জাবিরা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যখন-তখন মেয়েদের যাকে ইচ্ছা তাকে ধর্ষণ করছিল। শুধু সাধারণ পাঞ্জাবি সেনারাই এ পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয়নি, সব উচ্চপদস্থ পাঞ্জাবি সামরিক অফিসারই মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মতো দুহাত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙালি মহিলাদের নিপীড়ন করেছে। কোনো মেয়ে, মহিলা, যুবতীকে এক মুহূর্তের জন্য অবসর দেওয়া হয়নি। ওদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু বালিকা সেখানে কাতরাতে কাতরাতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছে। পরের দিন এসব মেয়ের লাশ অন্যান্য মেয়ের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুচিকুচি করে বস্তায় ভরে বাইরে ফেলে দিত। এসব মহিলা, বালিকা ও যুবতীর নির্মম পরিণতি দেখে অন্য মেয়েরা আরও ভীত ও সন্ত্রাসী হয়ে পড়ত এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করত। যারা প্রাণে বাঁচার জন্য ওদের সঙ্গে তাল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছে, তাদের পেছনে ঘুরে বেড়িয়েছে, তাদের হাসি তামাশায় দেহদান করেছে, তাদেরও ছাড়া হয়নি। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেসব মেয়েকে গণধর্ষণ করতে করতে খেয়ালের বশে ছুরি দিয়ে স্তন কেটে নিয়েছে। পশ্চাতের মাংস কেটে নিয়েছে। যোনি ও গুহ্যদারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছে।

উলঙ্গ মেয়েদের গরুর মতো লাথি মারতে মারতে, পশুর মতো পেটাতে পেটাতে ওপরে হেডকোয়ার্টার্সের দোতলা, তিনতলা ও চারতলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। পাঞ্জাবি সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদের লাথি মেরে আবার কামরার ভেতর ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে চলে যেত। এরপর বহু যুবতীকে হেডকোয়ার্টার্সের ওপরতলার বারান্দায় মোটা লোহার সাথে তাদের চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবিরা সেখানে যাতায়াত করত। কেউ এসে সেই ঝুলন্ত যুবতীদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেটন দিয়ে উন্মত্তভাবে আঘাত করতে থাকত, কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত, কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ উপভোগ করত, কেউ ধারালো চাকু দিয়ে কোনো যুবতীর উন্মুক্ত বক্ষে, মেয়েদের স্তনে মুখ লাগিয়ে ধারালো দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে অট্টহাসিতে মত্ত হতো। কোনো মেয়ে এসব অত্যাচারে কোনো রকম চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথে লোহার রড ঢুকিয়ে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো। প্রতিটি মেয়ের হাত পেছন দিকে বাঁধা অবস্থায় শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবি সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাতাড়ি বেদম প্রহর করত। প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস ফেটে রক্ত ঝরছিল, মেয়েদের কারও মুখের সম্মুখের দাঁত ছিল না, ঠোঁটের দুদিকের মাংস কামড়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল, লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙুল, হাতের তালু ভেঙে, থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এমন অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত মহিলাদের প্রস্রাব-পায়খানা করার জন্য হাত ও চুলের বাঁধন একমুহূর্তের জন্য খুলে দেওয়া হতো না। হেডকোয়ার্টাসের ওপরতলার বারান্দায় এই ঝুলন্ত মেয়েরা হাত বাঁধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে প্রস্রাব-পায়খানা করত। আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করতাম। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, অবিরাম ধর্ষণের কারণে অনেক মেয়ে ঝুলন্ত অবস্থায়ই নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাঁধন থেকে অনেক বাঙালি যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবি সেনাদের নামাতে দেখেছি। দিনের বেলায়ও সেখানে সেই বন্দী মহিলাদের প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করার জন্য সারা দিন উপস্থিত থাকতাম। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার্সের ওপরতলা থেকে ধর্ষণের শিকার বহু নারীর ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে টেনে নিয়ে যায়। তাদের স্থলে প্রতিদিন নতুন মেয়ে আসে। শহরের নানা জায়গা থেকে ধরে আনা হয় তাদের। এসব উলঙ্গ বাঙালি যুবতীকে সার্বক্ষণিক পাহারা দিত সশস্ত্র পাঞ্জাবি সেনারা। কোনো বাঙালিকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। আমি ছাড়া অন্য কোনো সুইপারকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।

ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মেয়েদের কাতর আহাজারিতেও তাদের বাঁচানোর জন্য কোনো ভূমিকা পালন করতে পারিনি আমি। এপ্রিল মাসের কোনো এক দিন সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে হেডকোয়ার্টার্সের ওপরতলায় মেয়েদের মলমূত্র পরিষ্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নম্বর বাসার রানু নামে এক কলেজছাত্রীর কাতর প্রার্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যথিত হই এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে তাকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনসের বাইরে নিরাপদে রেখে আসি। স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখিনি।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার আগ পর্যন্ত পাঞ্জাবি সেনারা এসব নিরীহ বাঙালি মহিলা, যুবতী ও বালিকার ওপর এভাবে নির্মম-পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল। বীভৎসভাবে তাদের ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমাবর্ষণের সাথে সাথে পাঞ্জাবি সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার্সের ওপর তলায়, সমস্ত কক্ষে এবং বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্ত জমাট হয়ে ছিল। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের সমস্ত পাঞ্জাবি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র

(মুক্তিযুদ্ধকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সুইপার হিসেবে কর্মরত রাবেয়া খাতুনের সাক্ষাৎকার, ডিআইজি হাবিবুর রহমানের সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গ্রন্থেও সন্নিবেশিত)

অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার, ডিএমপি ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *