ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ সুলাইমান পিপিএম

আমি স্বভাবতই, ঘুম থেকে একটু দেরি করে উঠি। কারণ প্রতি রাত্রেই অফিস থেকে ফিরতে প্রায় ১২ টা থেকে ১টা বেজে যায়। আর যদি কোনো অভিযানে যাই তাহলে তো অভিযান শেষে সকালে এসে ঘুমাতে হয়। আজ আরও একটু দেরি হল, সকাল ৮:৩০ মিনিট। জানালার পাশেই আমার ডাইনিংয়ের বেসিন। সেখানেই আমি রোজ ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করি। আজও তাই দাত ব্রাশ করছি। পাশেই কাকগুলো জানালার গ্রিলের উপর বসে কা কা শব্দে যেনো সকাল বেলার হাট বসিয়ে দিয়েছে। একটু বিরক্তিকরও লাগছে। হঠাৎ করে মোবাইল বেজে উঠলো। রিসিভ করতেই ঐপাশ থেকে এডিসি আসাদুজ্জামান স্যারের কন্ঠ

      সুলাইমান ঘুম থেকে উঠছেন?

      জি, স্যার।

     শ্যামলী রিং রোডে একটু যানতো। ঐখানে পায়রা হোটেলে একটি ডেড বডি পড়ে আছে। যার কোনো পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না।

     ঠিক আছে স্যার।

দাঁত ব্রাশ শেষে হালকা নাস্তা করে বের হলাম। শ্যামলী রিং বোডে পায়রা হোটেলের কক্ষের সাথে এটাস্টেড টয়লেটের মধ্যে একটি পরিচয়হীন মহিলার উলঙ্গ ডেড বডি পড়ে আছে। থানার পার্টিকে ডাকা হল। সেখান থেকে মহিলা কনস্টেবলের সহায়তায় যতটুকু শালীনতার সাথে ডেড বডির শরীরে আঘাতের চিহ্নগুলো দেখে একটি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করল থানার পুলিশ।

হোটেল ম্যানেজারকে ও রুম অ্যাসিস্ট্যান্টকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বলল গতকাল রাত ১০:৩০ মিনিট এই মহিলার সাথে একটি পুরুষসহ এই হোটেলে এসে উঠেছিল। এই

প্রথমবারের মতো তারা এই হোটেলে এসে উঠেছিল। তারা নিজেদেরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়েছিল হোটেল কর্তৃপক্ষের নিকট। কিন্তু কোনো নিকাহ্ নামার কপি ছিলনা তাদের নিকট। ঠিকানা যেটি দিয়েছিল তা সম্পূর্ণ ভূল। ছেলেটির একটি ছবি ছিল। ছবিটি ছিল কোট ও টাইপরা একটি পাসপোর্ট আকারের ছবি। মেয়েটির মোবাইল নম্বর ছিল। আর ছেলেটির কথার মধ্যে বরিশাল অঞ্চলের ভাষার একটু টান ছিল বলে তারা জানায়। রুম বয় এও জানান যে, সে নিচ থেকে তাদের জন্য বিরিয়ানি কিনে এনে দিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটি কখন বেরিয়ে যায় তারা তা দেখতে পায়নি। তাছাড়া সেখানে কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না। হোটেল ভাড়া প্রতি রাত্র মাত্র ৩০০/- টাকা। তাই এমন হোটেলে সিসি ক্যামেরা না থাকাটাই স্বাভাবিক।

এরকম ছবির লোক কোথায় পাওয়া যাবে? আর ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর বরিশাল অঞ্চলের লোক থাকে। কিভাবে পাওয়া যাবে? তাছাড়া যদি ভিকটিমের কোনো পরিচয় থাকত তাহলে হয়তো একটা দিক জানা যেত যে, তার সাথে ছেলেটির আসল সম্পর্ক কি? আবার মেয়েটি কি কোনো অন্ধকার জগতের কিনা তা সম্পর্কেও জানা যাচ্ছে না। যদি না হয় তাহলে বরিশাল এলাকা থেকে কেউ তাকে হোটেলে এনে খুন করে রেখে যাবার কথা নয় যেহেতু এই প্রথমবারের মতো এই হোটেলে এসেছে। মোবাইল নম্বরটি যা রেজিস্টারে দেওয়া তাও দেখা হল কিন্তু বন্ধ। অবশ্য থাকবারই কথা কারণ নম্বরটি যে মৃত মহিলারই নম্বর।

হোটেলের সকল রেজিস্টার পত্র নিয়ে আসা হল। পরীক্ষা করে দেখা হলো, যে ছবি এবং নাম দিয়েছে সে নামের বা যে মোবাইল নম্বরটি দিয়েছে সেগুলো পূর্বে কোনো এন্ট্রি আছে কিনা। কারণ হোটেল কর্তৃপক্ষ ভয়ে মিথ্যা কথাও বলতে পারে। কিন্তু রেজিস্টারে আর কোনো এন্ট্রি পাওয়া গেল না। তাই ধরে নেওয়া হল নামটি দিয়েছে তা মিথ্যা হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়তো সত্য যে ছবিটি দিয়েছে। কারণ হোটেল কর্তৃপক্ষ যখন ছবিটি নিয়েছে তখনতো ঐ পুরুষ ছেলেটির চেহারার সাথে মিলেছিল বলেই নিয়েছে। আর যদি তা নাই করে ধরে নেওয়া যাবে যে হোটেল কর্তৃপক্ষ তার সাথে জড়িত। তিনদিন পড় দেখা গেল হঠাৎ করে ভিকটিমের মোবাইলে একটি নতুন সিম ঢুকানো হয়েছে এবং তাতে একটিমাত্র মোবাইল কোম্পানির থেকে কোম্পানির নিজস্ব মেসেজ আসে। তারপর আবার মোবাইলটি বন্ধ। তার লোকেশন দেখায় মিরপুরের কালসী এলাকায়। তখন আর কি করা শুরু হল হাজার মন দুধের ভিতর এক ফোঁটা চনা খোজা। সম্বল একটিই ঐ ছবি। ছবি নিয়ে মিরপুরের কালসী এলাকায় চিরুনি অভিযান কেউ এই ছবির লোককে চিনে কিনা। কিন্তু অসম্ভব ঐ এলাকায় প্রত্যেক দরজায় দরজায় গিয়েও কোনো হদিস পাওয়া গেল না, এ দিকে ভিকটিমকে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের ব্যবস্থা করে থানা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে ভিকটিমের মুখের ছবি দিয়েও চেষ্টা করা হল যে, মেয়েটিকে ঐ এলাকায় কেউ চিনে কিনা। কারণ ভিকটিমের একটি পরিচয় পেলেও হয়তবা কোন ক্লু পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সে চেষ্টাও বৃথা।

আরও ২ দিন পর দেখা গেল যে সিমটি ০১ সেকেন্ডের জন্য মিরপুর কালসী এলাকায় ভিকটিমের মোবাইলে ব্যবহৃত হয়েছিল সেটি বরগুনা জেলার তালতলী থানা এলাকার একদম সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য একটি মোবাইলে যেটিতে আরো অন্য একটি সিম ব্যবহৃত হত। তখন একটি পয়েন্ট মনে পড়ল হোটেলের ম্যানেজার বলেছিল ছেলেটির ভাষার মধ্যে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার একটি টান ছিল। তাই আমাকে মিলাতে হল। কারণ ছেলেটির ভাষা বরিশালের। ছেলেটি আর মেয়েটি হোটেলে এক সাথে উঠলেও মেয়ের ডেড বডি হোটেলের বাথরুমে আর ছেলেটি লাপাত্তা। মেয়েটির মৃত্যুর পর তার মোবাইল ফোনটি ব্যবহৃত হওয়া। আবার, সেই সেটে ব্যবহৃত সীম বরিশালে চলে যাওয়া। সব মিলিয়ে পঁচানব্বই ভাগ নিশ্চিত এই ব্যক্তিই মেয়েটির হত্যাকারী সম্পর্কে কিছু জানতে পারে। এখন অভিযান পরিকল্পনার পালা।

১ম সারি, ২য় সারি ও ৩য় সারি পর্যন্ত লাইন আপ রেডি করে অভিযানিক পার্টি নিয়ে রওয়ানা হলাম বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থানা পার হয়ে যেতে হবে তালতলী ও তারপর আমতলী।

পাথরঘাটা ফেরি পার হবার সময় শুরু হল বৃষ্টি। এই বৃষ্টির মধ্যে ফেরি চলাচল বন্ধ। কিন্তু রাত্রের মধ্যেই তালতলী পৌঁছাতে হবে। তাই ফেরির লোকজন ডেকে এনে ফেরি চালানোর ব্যবস্থা করে ঐ পাড়ে গেলাম। কিন্তু বৃষ্টি থেমে নেই। আমতলী পার হয়ে গিয়ে তালতলীতে পৌঁছাতে রাত প্রায় ১২ টা। থানার ওসি সাব’কে বলে একটি ইউনিফর্ম পার্টিকে বেকআপ হিসাবে নেওয়া হল। আর কৌশলে ৩য় সারির একজনের এলাকা জেনে নেয়া হলো। কিন্তু তার নিকট যেতে হলে তার সহযোগিতা লাগবে। তার এলাকায় যাবার সময় কিছু দূর গিয়ে আর গাড়ি যাবে না, কিন্তু অঝোর ধারা ঝড়ছে বৃষ্টি। কিছুই করার নেই। রাত্র শেষ হয়ে গেলে যে আমার টার্গেটের আসামির নিকট যাওয়া যাবেনা। তাই এই বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হেঁটে রওনা হলাম। আমি দলনেতা এএসপি। আমি গেলে বাকিরা যেতে বাধ্য। কিন্তু তারপরও দু’একজন বলতে শুরু করল স্যার পাগল। তাও বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে। রাস্তার দু’পাশ্বের কাটাগাছ আর মাঝখানে গোবর ও কাদা উপর দিকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি তার মধ্য দিয়ে রাত্র ১:৩০ ঘটিকা সময় পথ চলা। দলের মধ্যে অনেকে আছে একটু বয়স্ক কনস্টেবল তারা হাপিয়ে উঠছে। সমস্যা হল তার এলাকার কাছাকাছি গিয়ে পাড় হতে হবে একটি বিশাল খাল। যার উপর একটি মাত্র বাশের তৈরি সাঁকো এবং একটি মাত্র বাঁশে ধরার জন্য। নিচে পাড় যাওয়ার ভয়ে অনেকেই যেতে চাইল না। কিন্তু আমিতো দল নেতা। পায়ে কেডস্, উপরে বৃষ্টি। ভয় বৃষ্টির কারণে এক বাঁশের সাঁকোতে পা স্লিপ কাটার। কিন্তু কিছু করার নেই। আল্লাহর উপরে ভরসা করে নদীর সাঁকোর উপরে উঠলাম। আস্তে আস্তে পাড় হলাম। সাথের তিন জনও। কিন্তু বাকিরা কেও গেল না। তারপর ভাবলাম যেহেতু ৩য় সারির লোককে ধরব সমস্যা নাই কারণ সে অপরাধী না। তাই সমস্যা হবে না। কিন্তু তার এলাকায় পৌঁছে যখন তাকে ফোন করলাম সে আর ফোন ধরে না। দীর্ঘ সময় যাবৎ আমি আর সাথের ইন্সপেক্টর মাহাবুব সাব বারবার চেষ্টা করলাম। পড়ে রাত ৩:১০ মিনিটে সে ফোন রিসিভ করল এবং তাকে যে চিনতে পারে তার নাম বললে। পাশের বাজারে গিয়ে সেই লোককে উঠিয়ে তাকে নিয়ে আমার সেই ৩য় সারির লোকের নিকট গেলাম। তার বাড়ির চার দিকেই গরুর গোবর আর বৃষ্টিতে কাঁদা। গিয়ে তাকে পাওয়া গেল। সেখান থেকে তাকে নিয়ে রওনা হলাম ২য় সারির লোকের নিকট। সেইখান থেকে দূরত্ব হল প্রায় বিশ কিলোমিটার। ২য় সারির লোকের বাড়িতে যেতেও প্রায় দুই কিলোমিটার আগে আর গাড়ি যায় না। তাই গাড়ি রেখে ৩য় সারির লোককে নিয়ে সমুদ্রের বাঁধের পাশ্বের ধান ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটা। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ভূত হয়ে গেছি। এক সময় ২য় সারির লোকের বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখতে পেলাম একটা লোক রাস্তার পাশ্বের পুরানো একটি ভাঙ্গা বেড়াহীন ঘরের মধ্যে কিছু ফার্নিচার গুছাচ্ছে। কিন্তু লোকটার চেহারা আমার নিকট হোটেল থেকে পাওয়া ছবির সাথে যেন মিলতে ছিল। কিন্তু আবার ভাবলাম সে এখানে ফার্নিচার গুছাবে কেন? তাছাড়া লোকটি ছিল লুঙ্গি পড়া যার কারণে সন্দেহ একটু কমে গেল। তখন দিনের ৮টা বাজে। যেহেতু প্রচুর বৃষ্টি বাড়ি ঘর থেকে লোকজন তেমন বের হয় নাই। তাই ভরসা ছিল আসামিকে পাব। আবার দেখলাম ২য় সারির লোক যার নাম জাকির, সে হল আসামির নিজের শ্যালক। এটি অবশ্য ৩য় সারির লোকটি আমাকে জানায় এবং এও জানান জাকির নদীতে নৌকা চালায়। জাকিরের বাড়িতে যাবার সময় সে জাকিরের নৌকাটিও আমাকে দেখায়। জাকিরের বাড়িতে গিয়ে ঘেড়াও দিলাম এবং নৌকায় পাঠালাম ০২ (দুই) জনকে এক সাথে ড্রাইভ দেব বলে। কিন্তু বাড়িতে জাকির নেই। নৌকায় একজন লোকছিল তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, জাকির কোথায়? সে বলল জাকির নাই। কোথায় গেছে সে জানেনা। তবে এটি জাকিরের নৌকা। খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম কারণ অভিযানগুলো একটি মুক্তার মালার মতো করে সাজানো যদি কোথাও গিয়ে মালাটি ছিড়ে যায় তাহলে সকল মুক্তা যেমন ঝড়ে পরে তেমনি অভিযানের চেইনের মধ্যে কোথাও ব্রেক হলে অভিযানটি ব্যর্থ হয়। হয়তবা আবার হবে কিন্তু ঢাকা থেকে আসলাম সাড়া রাত জেগে বৃষ্টির মধ্যে কি পরিশ্রম করলাম তারপরও যদি অভিযান ব্যর্থ হয় তাহলে কেমন কষ্ট লাগে। গাড়ি থেকে একটি সিগারেট নিলাম। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি আর মনে মনে ভাবছি এত কষ্ট করলাম তারপরও উপরওয়ালা অভিযানটি ব্যর্থ করল কেন? এতগুলো মানুষকে আমার সাথে ঘুরালাম। এরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা যে লোকটি জাকিরের নৌকায় আছে এবং বলল জাকির নাই সে কে? সে হয়তবা জাকির সম্পর্কে বলতে পারবে। তাকে ডাকি। সাব ইনপেক্টর মইনুলকে পাঠালাম তাকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য। মইনুল ব্রিজ পাড় হয়ে ঐ পাড়ে গিয়ে নৌকায় গিয়ে তাকে ডাকল। কিন্তু সে নৌকা থেকে বের হয়ে আসছে না। মইনুল আমাকে ফোনে বলল যে, স্যার লোকটি বলতেছে জাকির নাই। তবে যতই বলি স্যার ডাকছে আপনি আসেন। সে ততই নৌকার পেছন দিকে যাচ্ছে আর গামছা দিয়ে মুখ ঢাকছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না এই আমার টার্গেট। পার্টি নিয়ে ঐ পাড়ে নৌকার কাছে গেলাম। নৌকা তিন দিক নদীর পাড় থেকে কর্ডন করলাম। বললাম এবার তাকে টেনে নৌকা থেকে বের করে নিয়ে আসত। সে বের হল এবং পাশ কাটিয়ে দৌড় দেওয়ার চেষ্টার করার মতো অবস্থান নিচ্ছিল বুঝতে পেরেই আমি পিস্তল তাক করলাম আর সাউট করে বললাম হল্ট। অন্যথায় গুলি করব। তার সামনেই অস্ত্র কাক করাতে সে ভয় পেয়ে দুই হাত উপরে উঠিয়ে দিয়ে বলল স্যার আমাকে মারবেন না। আমি সকল সত্য কথা বলব।

আসামিকে হেন্ডকাপ লাগিয়ে গাড়িতে উঠলাম। তার নাম আরিফ। সে গাড়িতে বসেই আমাকে কিছুকথা বলে তার এই হত্যাকা-ের বিষয়ে। তাকে নিয়ে তার বাড়িতে গেলাম ভিকটিমের মোবাইলটিকে আলামত হিসাবে উদ্ধার করার জন্য। অবশ্য এখানে বলে রাখা ভাল ভিকটিম ছিল তার ২য় স্ত্রী। আসামীর বাড়ী গিয়ে তার দুটি ছোট বাচ্চাকে দেখে খুব খারাপ লাগল আমার। যাকে আসামি হিসাবে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছি সে একজন হাউজ ড্রাইভার। তাকে নিয়ে গেলে কিভাবে চলবে তার সংসার। কিন্তু কিছু করারও নেই আইন তার নিজস্বগতিতে চলবে। বাচ্চা দুটি হাতে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে আসামিকে বললাম তুমি তোমার স্ত্রী ও সন্তানদের নিকট থেকে বিদায় নাও।

মিন্টু রোডে ডিবি অফিসে আসার পর আসামি তার সকল অপরাধ স্বীকার করল। বলল স্যার আমি নিজ থেকে সবই বলব এবং বিজ্ঞ আদালতেও সব কিছুই স্বীকার করব। সে জানাল সে মিরপুরে এক ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করত। দেখতে শুনতে সে অনেক সুন্দর এবং হ্যান্ডসাম ছিল। তার পরিচিত অন্য এক ড্রাইভারের মাধ্যমে এক মহিলার সাথে পরিচয় হয়। মহিলাও দেখতে অনেক সুন্দরী। মহিলা চার পাঁচ বছর দুবাইতে চাকরি করত। সেখানে যাবার আগে বিয়ে হয়েছিল এবং তার দুটি সন্তানও ছিল। দুবাই থাকাকালীন তার স্বামী তাকে ডিভোর্স দেয়। দুবাই থেকে এসে সে বিয়ে নামক ছলনার খেলায় মেতে উঠে। তার সৌন্দর্যকে ব্যবহার করে কাউকে বিয়ে করে, তার নিকট থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে তাকে তালাক দিয়ে দেয়। এটি তার একটি পেশা বা ব্যবসায় রূপ নেয়। মহিলাটি আবার পর্দা করত সহজ সরল পুরুষ মানুষকে ভুলানোর জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় ড্রাইভার আরিফ তার খপ্পরে পড়ে। সে তাকে ড্রাইভার আরিফের নিকট অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করে। ড্রাইভার আরিফও তার স্ত্রী বরগুনায় থাকার কারণে সহজাত ভাবেই তাকে বিয়ে করে। পরে অবশ্য তার প্রথম স্ত্রী জানতে পারে এ বিয়ের কথা।

বিয়ের পর দ্বিতীয় স্ত্রী বরাবরের মতো তার ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। প্রথম স্ত্রীর নিকট থেকে তাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে। তাকে বলে ড্রাইভারি চাকরি করে সে কিভাবে সংসার চালাবে। তার সাথে অনেক লোকের পরিচয় আছে তাকে সে আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। সেও সাথে যাবে। এইভাবে ড্রাইভার আরিফের নিকট থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক দিন চলে গেলেও এই মহিলা কোনো সন্তান নিতে চায় না। প্রথম স্ত্রীকে কোনো টাকা পয়সা দিলে ড্রাইভার আরিফকে মারধর করে।

এক দিনের এক ঘটনা বর্ণনা করল ড্রাইভার। সে তার প্রথম স্ত্রীর ঘরের সন্তানের জন্য এক ডজন কলা কিনে দিয়েছিল। এটি দ্বিতীয় স্ত্রী জানতে পেরে তাকে ডেকে নিয়ে প্রচ- মারধর করে এবং গলায় রশি পেঁচিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আরিফ যখন দেখল মহিলাটির আসল ব্যবসা হল বিয়ে করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়া। তখন সে মহিলার নিকট তার পাওনা সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা ফেরত চাইলে তাকে লোকজন দিয়ে গুলি করে মেড়ে ফেলার হুমকি দেয়। আবার সুদে ধার করে এনে দেওয়া টাকা ফেরত দিতে না পাড়ায় মানুষ তাকে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এত কিছু সহ্য করতে না পেরে আরিফ তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

এ পরিকল্পনা মোতাবেক তাকে নিয়ে হোটেলে উঠে এবং হোটেল বয়কে দিয়ে বাহির থেকে বিরিয়ানি এনে দুজনে খায়। পরবর্তীতে দুজনেই শারীরিক সম্পর্কে যায়। তারপর ঘুমের ভান করে। আরিফ যখন দেখে তার স্ত্রী নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পরেছে তখনই বালিশ দিয়ে তার মুখে চাপা দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে। শারীরিক সম্পর্কের কারণে তার স্ত্রী বস্ত্রহীন ছিল। ঐ অবস্থায় তার স্ত্রীকে বাথরুমে টেনে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখে এবং বাথরুমের বাহির থেকে বন্ধ করে কক্ষটি তালা বন্ধ করে। এক ফাঁকে হোটেল কর্তৃপক্ষের অলক্ষ্যে আরিফ হোটেল থেকে বের হয়ে যায়। রাতের বেলায় খাবার না আনালেও রুমবয়কে না ডাকার কারণে তারা আর কেউ ঐ কক্ষের দিকে যায়নি। কিন্তু সকালে নাস্তা লাগবে কিনা জানার জন্য রুমবয় দরজায় নক করার পর কোনো শব্দ না পেয়ে রুমবয় ম্যানেজার’কে জানায়। ম্যানেজার এসে ডাকাডাকি করার পর শব্দ না পেয়ে সন্দেহ হয় এবং পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশের সহায়তায় ডুব্লিকেট চাবি দিয়ে তালা খুলে কাউকে না দেখে বাথরুমের দরজা খুলে আরিফের স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। তারপরই শুরু হয় আমাদের কার্যক্রম।

  লেখক : পুলিশ সুপার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, চট্টগ্রাম

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *