ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ ফরহাদ হায়দার

‘বাংলাদেশ পুলিশ’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিশাল ভূমিকা পালন করার মধ্যে দিয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য বহন করে চলেছে অদ্যাবধি। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সম্মুখযুদ্ধ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ-ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই যেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আর এই পুলিশ বাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য হতে গেলে স্বভাবতই একটু ব্যতিক্রমি ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ যা নিসঃন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। অনেক স্বচ্ছ ধাপ একটির পর একটি নক আউট পদ্ধতিতে পেরিয়ে আসতে হচ্ছে প্রত্যেক প্রতিযোগীকে।

পুলিশের ক্যাডেট সাব ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদে নিয়োগের লক্ষ্যে গত ৮-১০ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত লিখিত ও মনস্তত্ত্ব পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইং তারিখে। মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তিন হাজার ৪৩৬ জন। লিখিত ও মনস্তত্ত্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৪৩৬ জন প্রার্থীর কম্পিউটার দক্ষতা পরীক্ষা (Computer Competency Test) আগামী ৫-১৫ মার্চ ২০২২ তারিখে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। যারা এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সাব-ইন্সপেক্টরের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। নতুন নিয়োগবিধি অনুযায়ী এবার লিখিত ও মনস্তত্ত্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নির্ধারিত স্থান, তারিখ ও সময়সূচি অনুযায়ী কম্পিউটার-দক্ষতা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এ পরীক্ষায় মাইক্রোসফট অফিস, ওয়েব ব্রাউজিং, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট এবং ট্রাবলস্যুটিং বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। কম্পিউটার দক্ষতা পরীক্ষা যাচাইয়ের পর পরবর্তী ধাপ ভাইভা।

প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার্থীদের মধ্য থেকে যারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তারা এখনি আনন্দে ভাসলে হবে না। পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ভাইভার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে জোড়ালোভাবে। লিখিত পরীক্ষা দিয়ে জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করা হয়। আর ভাইভা পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে প্রতিযোগীকে যে চাকরিটা দেওয়া হবে, সেটার জন্য প্রতিযোগী ব্যক্তি কতটা যোগ্য সেটা সামনাসামনি যাচাই করার নিমিত্তে। মূলত চাকরিটার জন্য আপনি মানসিকভাবে কতটুকু যোগ্য তা যাচাই করা ভাইভার প্রধান উদ্দেশ্য। ভাইভায় আপনি কতগুলো প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারছেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনি কতটা সাহস ও কনফিডেন্সের সঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। আপনি কোনো একটি দুটি প্রশ্নের উত্তর না পারতেই পারেন, কিন্তু সেটা সুন্দরভবে বিনয়ের সঙ্গে না বলাটার মধ্যেও একটা শিল্প থাকা উচিত বলে মনে করা হয়।

ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতিটা ভালোমতো হওয়া দরকার। এই লেখাতে ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা করা হলো। ভাইভা মূলত একটি ইংরেজি শব্দ। ভাইভার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে মৌখিক পরীক্ষা। আর মৌখিক পরীক্ষার ইংরেজি প্রতিরূপ ‘Vivavoce’ যার adjective form হচ্ছে Vivacious’. এর অর্থই হচ্ছে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া বা প্রাণবন্ত হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করা। লিখিত পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব যাচাই করা যায় না বা পুরোপুরিভাবে পরিস্ফূটিত হয় না। তবে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত বুদ্ধিজ্ঞান, মার্জিত রুচিমান, ভদ্রতাব্যঞ্জক কথা বলার ভঙ্গি, আচার-আচরণ এর শালীনতা এ- সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। ভাইভা বোর্ডে পাঠ্য বই জ্ঞান যতটা না জিজ্ঞেস করা হয়, তারচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা হয় বাকি বিষয়গুলোর প্রতি। এ জন্য পাঠ্যজ্ঞান ছাড়াও নিতে হবে সার্বিক প্রস্তুতি। সর্বোপরি একটা কথা মনে রাখতে হবে, সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। তাই আপনার যতটুকু সাহস ও মনোবল থাকবে, ততটুকু দিয়েই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভাইবা ফেস করার চেষ্টা করা। মনে রাখতে হবে, প্রতিযোগির কনফিডেন্স প্রতিযোগিকে তার সফলতার কাছে নিয়ে যাবে।

ভাইভা-পর্যালোচনা

এসআই ও সার্জেন্ট এর নতুন নিয়োগবিধি অনুযায়ী এবার পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদের ভাইভা নম্বর ৫০ করা হয়েছে যা অতীতে ১০০ নম্বর ছিলো।

প্রশ্নের ধরন : বিষয়ভিত্তিক, মুক্তিযুদ্ধ, অনুবাদ, নিজ জেলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাম্প্রতিক বিষয় ও অন্যান্য। আপনাকে বর্তমান সরকারের অর্জন, মুক্তিযুদ্ধে আপনার জেলা-থানা

প্রভৃতি বিষয় ভালো করে জেনে নিতে হবে। আপনার জেলার সবকিছু খুঁটিনাটি জানতে হবে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাওয়ার আগে যেসব আন্দোলন হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা অতীব জরুরি।

বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন : ভাইভা ভালো করতে হলে প্রতিযোগীকে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের স্পেসিফিক উত্তর দিতে হবে। এই অংশে ভালো করার উপর বোর্ডের পরবর্তী মুভমেন্ট অনেকাংশে নির্ভর করে। প্রতিযোগীর সাব্জেক্টিভ বিষয়ের উপর প্রথমেই দুই-তিন প্রশ্ন করতেই পারে, তাই প্রতিযোগীর পঠিত নিজ বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা বাঞ্ছনীয়।

মুক্তিযুদ্ধ : এসআই ভাইভার জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধ অংশ’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছোট ছোট প্রশ্ন করা হয়, পারলেই শতভাগ নম্বর পাওয়া সহজ। এই অংশে সাধারণত একটু গভীর থেকে প্রশ্ন করা হয়, অনেক সময় বাজারের একটি বইতে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না তাই একটি বইয়ের উপর নির্ভর না করে দুই বা ততোধিক বইয়ের সাহায্য নিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে, অর্থাৎ তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ও তাঁর সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে জানতে হবে। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক রচিত কিংবা সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ (যেমন : অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়া চীন, শেখ মুজিব আমার পিতা ইত্যাদি) মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত কয়েকটি বই ভালোভাবে পড়তে হবে। এসব বইয়ের ভেতর থেকে প্রশ্ন করা হতে পারে ভাইভা বোর্ডে। এর সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিব হত্যার বিচার, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন বইয়ের নাম, ঘটনা, উল্লেখযোগ্য দিবস জেনে নেওয়াটা জরুরী।

অনুবাদ : যুগটাই এখন এমন, ইংরেজি ছাড়া কোন কিছু চিন্তাও করা যায় না। কী চাকরি, কী পড়াশোনা সব জায়গায়ই ইংরেজিতে দক্ষতা এখন প্রাথমিক চাহিদা। দক্ষতা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তাদের ভেতরে ইংরেজিতে বলার দক্ষতা এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা। এসআই ভাইভাতে প্রায় সবাইকে এক-দুটি অনুবাদ জিজ্ঞেস করা হতেই পারে। সে ক্ষেত্রে যেকোনো গ্রামার বইয়ের এ সংক্রান্ত অংশটি দেখে নেওয়া যেতে পারে। এই অংশে ভালো করার জন্য ইংরেজি প্রবাদ বাক্য পড়তে পারেন। অনলাইনে বিভিন্ন ইংরেজি কথোপকথন দেখ অনুশীলন করলে বিষয়টি সহজেই আয়ত্বে আসতে পারে।

বর্তমানে আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা নিয়ে যাবেন। যেমন : মুজিবশতবর্ষ,স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী,পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, রূপকল্প ২০৪১, ডেল্টা প্লান, করোনা ভাইরাস, করোনা ভ্যাক্সিন, ইউক্রেন সংকট, ন্যাটো, রোহিঙ্গা সমস্যা ও এর সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব। এছাড়া সাম্প্রতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে পড়ে নেওয়াটা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়।

উপরিউক্ত বিষয়ের উপর মূলত প্রশ্ন করা হলেও আপনার নামের অর্থ, নামের সঙ্গে বিখ্যাত ব্যক্তি ও কোনো ঘটনা থাকলে তা জেনে রাখা ভালো। প্রতিযোগির জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিখ্যাত ব্যক্তি এবং শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নিবেন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আপডেট নিউজ সংগ্রহে রাখতে হবে। সর্বশেষ প্রতিযোগীর কম্পিউটার বিষয়ে ব্যাসিক নলেজ থাকতেই হবে। এবারের নিয়োগে এটার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এসআই নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা প্রতিযোগি যতই ভালো দেন না কেন তার কোনো মূল্য নেই যদি না প্রতিযোগী ভাইভা ভালো দেন। সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আশানুরূপ নম্বরই পাবেন। পুলিশের চলমান সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে নিয়োগ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহলের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। কোনোভাবেই সুযোগ নেই অস্বচ্ছ কোন ব্যক্তির সাথে অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চাকরির সুযোগ নেবার। সেজন্য প্রতারক বা দালালের খপ্পরে না পড়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি)।

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন পুলিশকে গণমূখী করার জন্য ‘দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সৎ, মেধাবী, কর্তব্যপরায়ণ এবং দিন-রাত মানুষের সেবা দেওয়ার মতো পরিশ্রমী অফিসার একান্ত প্রয়োজন। তাই এসআই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। কারো দ্বারা প্রলুব্ধ না হবার জন্য তিনি সব চাকরি প্রত্যাশীকে আহ্বান জানান। সময় এখন নিজেকে শানিত করে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে ভাইভা বোর্ডে যাওয়ার। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সবার ভাইভা ভালো হোক, মনের ইচ্ছে পূরণ হোক। বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে আমার পক্ষ থেকে প্রতিযোগি সবার জন্য অগ্রিম শুভ কামনা।

লেখক : পুলিশ পরিদর্শক, ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *