ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বাকী বিল্লাহ

পেশার আড়ালে ওরা ভয়ংকর অপরাধী। দিনে ফেরিওয়ালা, প্রাইভেটকার চালক ও হোটেল কর্মচারী হিসেবে কাজ করলেও রাতে তারা অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের হাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নকল জ্যাকেট, ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাপ। এ নিয়ে তারা আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য সেজে রাস্তায় নামে। তাদের মধ্যে একজন অফিসার নিজেরা নিয়োগ দেয়। তার নেতৃত্বে ডাকাতি করা হয়। এ চক্র অভিজাত প্রাইভেটকার কিংবা মাইক্রোবাস ব্যবহার করে। সড়ক ও মহাসড়কে ডাকাতি করার জন্য তাদের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। তাদের সর্দার ওই গ্রুপ গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি গ্রুপে আছে ১০ থেকে ১২ ডাকাত।

পুলিশের র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটলিয়ন র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর এ অপরাধী গ্রুপের তথ্য। র‌্যাব-১ চৌকসদল রাজধানীর তুরাগ এলাকায় অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩ মার্চ -২০২০ গভীররাতে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের ৬ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, ডিবির নকল জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাপসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য মতে, পলাতক অপরাধীদেরকে ধরতে চলছে অভিযান।

র‌্যাব হেডকোয়াটার্স থেকে জানা গেছে, অপরাধী চক্রের সদস্যরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের আদালে পোশাক পরে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানাধরনের অপরাধ করছে। এই অপরাধী চক্রের সক্রিয় সদস্যরা নিজেদেরকে ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করতে ডিবির জ্যাকেটের ন্যায় নকল জ্যাকেট, ওয়াকিটকি ব্যবহার করছে। তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। নিজেদেরকে ডিবি পুলিশের ন্যায় বিশ্বাসযোগ্য করতে ডিবির স্টিকার তৈরী করে মাইক্রোবাসসহ তাদের ব্যবহৃত গাড়ীতে ব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধী দলের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশ কয়েকজন সম্প্রতি র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করে।

এরই ভিত্তিতে র‌্যাব-১ ছায়া তদন্ত  ও গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে। ৩ মার্চ মঙ্গলবার গভীররাতে র‌্যাব-১, উত্তরা, ঢাকার একটি টহল দল রাজধানীর তুরাগ এলাকায় নিয়মিত টহল ডিউটিতে থাকা অবস্থায় দেখতে পায় যে, রাজধানীর তুরাগ ধউর বেরিবাধ এলাকায় একটি মাইক্রোবাস থেকে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় ৮/১০ জনের একটি দল রাস্তায় গাড়ী থামানোর চেষ্টা করছে। র‌্যাব-১ এর টহল দলটি তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে উক্ত ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরিহিত দলটিকে চ্যালেঞ্জ করলে তাদের কয়েকজন দ্রুত মাইক্রোবাসটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তাৎক্ষনিক ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির সময় উক্ত স্থানে অভিযান চালিয়ে ডাকাত দলের সদস্য মোঃ মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন, মোঃ শাহাব উদ্দিন (৪২), মোঃ শফিকুল ইসলাম (২৯), মোঃ আলমগীর শেখ (৩৫) ও মোঃ শফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি, ৪টি চাপাতি, ৪ টি ওয়াকিটকি সেট, ২টি ডিবি জ্যাকেট, ১ টি হ্যান্ডকাপ, ২টি ডিবি পুলিশের ভুয়া আইডি কার্ড, ১২ টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য। এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটির স্থায়ী সদস্য ১০/১২ জন। এ ছাড়াও আরো একাধিক সদস্য রয়েছে। অভিযুক্ত আসামী মোঃ মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন ও মোঃ শাহাব উদ্দিন এই ডাকাত দলের মূল হোতা। এই দুইজন মিলে ডাকাত দলটিকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অপরাধী চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন যাবত নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তারা ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধ করে থাকে। এই অপরাধী চক্রটি নিজেদেরকে ডিবি পুলিশ হিসেবে পরিচয় দেয়ার জন্য ডিবি জ্যাকেট, ওয়াকিটকি ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে বলে ধৃত আসামীরা স্বীকার করে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানায়, এই চক্রটি সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাংকের গ্রাহকদের অপহরণ ও অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা কৌশল অবলম্বন করত। প্রথমত তাদের দলের ১/২ জন ছদ্মবেশে ব্যাংকের বাহিরে অবস্থানে থাকত। আর ২/৩ জন গ্রাহকের ছদ্মবেশে ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে। মূল দলটি মাইক্রোবাসসহ সুবিধাজনক স্থানে অপেক্ষা করতে থাকে। অতঃপর ভেতরের একজন ব্যাংক থেকে বের হয়ে এসে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেয়। কিংবা সরাসরি তারা মোবাইলের মাধ্যমে বাহিরে অবস্থানকারি দলকে অবহিত করে। অতঃপর মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে অথবা কখনও সামনে থেকে এসে সুবিধাজনক স্থানে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে গতিরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এরপর গাড়ীর ভিতরে নিয়ে চোখমুখ বেঁধে নির্যাতন করে সমস্ত টাকা ছিনিয়ে নিয়ে সুযোগ বুঝে রাস্তায় ফেলে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।  এই চক্রের সদস্যরা সাধারণ যাত্রীকে প্রথমে টার্গেট করে। তারপর টার্গেটকৃত ব্যক্তির কাছে নিজেদের ডিবি পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তিকে জোরপূর্বক প্রাইভেটকারে তোলে। প্রাইভেটকারে উঠানোর পর হাত-পা বেধে মারধর করে তার কাছ থেকে মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। আবার কাছে টাকা না থাকলে বিকাশের মাধ্যমে আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। অতঃপর গাড়ীর ভেতরে চোখমুখ বেঁধে নির্যাতন করে রাস্তায় ফেলে চলে যায়। এই চক্রটি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাইভেট কারে ও মাইক্রোবাসে করে ডাকাতির উদ্দেশ্যে প্রথমে টার্গেট নির্ধারণ করে যেমন স্বর্ণের দোকান, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ধরণের দোকান ইত্যাদি। পরবর্তীতে এই চক্রের ৪/৫ জন সদস্য নির্ধারিত টার্গেটে এসে ডাকাতির পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে এই চক্রের অন্যান্য সদস্যরা রাতে ডিবি পরিচয় দিয়ে ঘুরাঘুরি করে এলাকায় ভীতি প্রদর্শন করে এবং নাইটগার্ডকে ডিবি পরিচয় দিয়ে তাদের এখানে কাজ আছে বলে তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে ডাকাতি করে। রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) পরিচয়ে তাদের ১/২ জন সদস্য ছদ¥বেশে অবস্থান করে। বিদেশ ফেরত প্রবাসী যাত্রীদেরকে তারা বেশি টার্গেট করে। বিদেশ ফেরত প্রবাসী যাত্রীদের টার্গেট করে তাদেরকে অনুসরণ করে। অতঃপর ডাকাত দলের মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে অথবা কখনও সামনে থেকে এসে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে গতিরোধ করে পুলিশ পরিচয়ে ওই ব্যক্তিকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এরপর গাড়ীর ভিতরে চোখমুখ বেঁধে নির্যাতন করে সমস্ত টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।

এ দলের সদস্যরা অপরাধ করার সময় স্ব-স্ব নির্দিষ্ট দায়িত্ব আগ থেকে বন্টন করে দেয়। যেমন ডিবি অফিসারের ন্যায় ভূমিকায় কে থাকবে, কে সিজার লিস্ট তৈরী করবে, কে হ্যান্ডকাফ পরাবে, কে টার্গেট নির্ধারণ করবে, কে ড্রাইভারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে ইত্যাদি। যদি কোন সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসে তাদের সন্দেহ করে তাহলে তারা বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণে যাচ্ছে বলে উত্তর দেয়। অভিযুক্ত আসামী মোঃ মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন ও মোঃ শাহাব উদ্দিন এই চক্রের প্রধান হিসেবে সকল কিছু তদারকি করে থাকে। 

আসামী মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে উক্ত অপরাধী চক্রের মূল হোতা। সে ২০০৮ সাল থেকে এই ডাকাতি করে আসছে। সে ইতিপূর্বে একটি গার্মেন্টসে চাকুরি করত সে ধৃত আসামী শাহাব উদ্দিন’কে নিয়ে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটি গঠন করে। ডাকাতির জন্য সে টার্গেট নির্ধারণ করত এবং ডাকাতির সময় সে ডিবি অফিসার এর ন্যায় পোশাক পরত। ডাকাতি করে প্রাপ্ত টাকা সে নির্দিষ্ট হারে অন্যান্যদের মধ্যে বন্টন করত বলে জানায়। সে এখন পর্যন্ত ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ১৫০ টিরও বেশি ডাকাতি/চুরি করেছে বলে স্বীকার করে। রাজধানীরসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তার নামে ১২/১৪ টি ডাকাতি মামলা রয়েছে এবং পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে একাধিকবার কারা ভোগ করেছে বলে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামী শাহাব উদ্দিন র‌্যাবকে বলেছে, ইতিপূর্বে সে রাজধানীর মহাখালীতে একটি হোটেলে মেসিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিল। কর্মচারী (মেসিয়ার) হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তার সঙ্গে মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন এর পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তারা একত্রে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটি গঠন করে। তার নামে রাজধানীসহ বিভিন্ন থানায় ৫/৬টি ডাকাতির মামলা রয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে একাধিককার কারাগারে ছিল। সে এখন পর্যন্ত  ৫০টিরও বেশি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে।

আসামী শফিকুল ইসলাম’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে রাজধানীর আশপাশের এলাকায় ফেরীওয়ালা হিসেবে কাজ করত। ফেরীওয়ালা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সে দীর্ঘদিন যাবত এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সঙ্গে ডাকাতি করত। সে আসামী শাহাব উদ্দিন এর মাধ্যমে উক্ত ডাকাত দলে জড়িত হয়। দীর্ঘদিন যাবত সে উক্ত ডাকাত দলের সঙ্গে জড়িত হয়। সে প্রথমে টার্গেট নির্ধারণ করে ও পরে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে গাড়ীতে উঠায়। তার নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৪/৫টি ডাকাতির মামলা রয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে একাধিককার কারা ভোগ করেছে বলে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামী নাছির উদ্দিন জানায়, সে পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। সে রাজধানী ঢাকায় রেন্ট এ কারে গাড়ী চালাত। রেন্ট এ কারে গাড়ী চালানোর পাশাপাশি সে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের একজন সক্রিয় সদস্য। সে উক্ত ডাকাত দলের সঙ্গে জড়িত। সে ১০/১২টি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে। ডাকাতি করার পর ধৃত আসামী মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন তাকে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিত বলে জানায়।

আসামী আলমগীর শেখ’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে রাজধানীতে একটি বাসের কাউন্টারে কাজ করত। কাউন্টারে কাজ করার পাশাপাশি সে দীর্ঘদিন যাবত উক্ত সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের একজন সক্রিয় সদস্য। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় ৫০টিরও বেশি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে। তার নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৮/১০টি ডাকাতির মামলা রয়েছে এবং পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়ে একাধিকবার কারা ভোগ করেছে বলে জানা যায়।

আসামী মোঃ শফিকুল ইসলাম’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। সে দীর্ঘদিন যাবত রাজধানী ঢাকায় রেন্ট এ কারে গাড়ী চালাত। রেন্ট এ কারে গাড়ী চালানোর পাশাপাশি সে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের গাড়ীর চালক হিসেবে কাজ করে। ডাকাতি করার জন্য মাইক্রোবাসটি সে ভাড়ায় নিয়ে আসত এবং সে নিজে চালাত। সে  আসামী শাহাব উদ্দিন মাধ্যমে উক্ত ডাকাত দলের সাথে জড়িত হয়। সে উক্ত ডাকাত দলের সাথে এখন পর্যন্ত ১২/১৫টি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে। তার নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৪/৫ টি ডাকাতির মামলা রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *