ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতির ভুবনে ভাষা আন্দোলন অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী একটি ঘটনা। বস্তুত আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্ভুবনে ভাষা আন্দোলনের মতো প্রভাবসঞ্চারী কোনো অনুষঙ্গ নেই। উনিশ-শ বায়ান্ন সালে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হবার অব্যবহিত পরেই আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। বাংলাদেশে এমন কোনো লেখক পাওয়া যাবে না, যিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি কবিতা নাটক ছোটগল্প উপন্যাস কিংবা ছড়া লেখেননি। ভাষা আন্দোলনের মৌল চেতনা আমাদের লেখকদের সাহিত্যচর্চার উদ্বুদ্ধ করেছে; একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁদের শুনিয়েছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাভৈঃবাণী।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক প্রভাব পড়েছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সরাসরি যেমন গল্প বা উপন্যাস রচিত হয়েছে, তেমনি আবার ভাষা আন্দোলনের মৌল চেতনাকে মর্মে ধারণ করে আমাদের কথাসাহিত্য পালাবদলের পথে যাত্রা করেছে। বস্তুত ভাষা আন্দোলনই আমাদের সাহিত্যিকদের সামনে তুলে ধরে জাতিসত্তার মৌল পরিচয়, আমাদের গন্তব্যের সঠিক ঠিকানা। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও এ কথা সমান সত্য।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম উপন্যাস রচনা করেছেন জহির রায়হান। তাঁর ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৮) ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন যুগন্ধর সৃষ্টি তেমনি একই সঙ্গে যুগোত্তীর্ণ নির্মাণ। সামরিক শাসনের নিগ্রহের মধ্যে বাস করেও, একুশের মর্মকোষ-উৎসারিত ‘আরেক ফাল্গুন’ পাঠ করে আমরা হয়ে উঠি সাহসী মানুষ; আসাদ-মুনিম-রসুল-সালমার মতোই নির্ভীকচিত্তে আমরাও বলে উঠি-‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।’ জহির রায়হানের এই পূর্বাভাস-যে কত সত্য, ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশতম বার্ষিকী আসার পূর্বেই আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। ভাষা আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস আজ বিশ্বমানবের গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার। ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ভাষা আন্দোলনকে নতুন তাৎপর্যে অভিষিক্ত করেছে, যার পূর্বাভাস আমরা পেয়েছিলাম ‘আরেকফাল্গুন’-এ। ১৮৫৭ সালের রক্তাক্ত স্মৃতি উন্মোচনের মধ্যদিয়ে ‘আরেক ফাল্গুন’-এর সূত্রপাত। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ধারায় গৌরবোজ্জ্বল সব ইতিহাসকে স্মরণ করে লেখক এ উপন্যাসকে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আসন্ন প্রভাবে। ১৯৫৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের একটি কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে এ উপন্যাস। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। জাতীয়তাবাদী এই চেতনাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে। জহির রায়হান এ উপন্যাসে ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত উজ্জীবন এবং বাঙালি জাতিসত্তার অনিঃশেষ শক্তিউৎস নির্দেশ করেছেন।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শওকত ওসমান লিখেছেন ‘আর্তনাদ’ (১৯৮৫) উপন্যাস। আলোচ্য উপন্যাসেও মূলত শিল্পীত হয়েছে বাঙালি জাতিসত্তার উজ্জীবনের রক্তাক্ত আবেগ। ‘এত রক্ত জননী বাংলা ভাষা, এত রক্ত ছিল এ শীর্ণ শরীরে?’-এই জিজ্ঞাসাধর্মী শব্দগুচ্ছের পৌনঃপুনিক উচ্চারণের মাধ্যমে শিল্পীত হয়েছে বাঙালির দ্রোহ-বিদ্রোহ-আত্মসমীক্ষা ও আত্মজাগরণের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনে নিহত শহীদের পিতার নিঃশব্দ আর্তনাদ ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার সীমানা ছাড়িয়ে উপন্যাসের সমাপ্তিতে দেশমাতৃকার উজ্জীবনের সমগ্রতায় বিস্তার লাভ করেছে। উপন্যাসের ‘কোরাস’ অংশে পুত্রহারা পিতার দীর্ঘশ্বাস ও আর্তনাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের রক্তাক্ত ধারা। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও, এ উপন্যাসেও আমরা লক্ষ করি, যেমন লক্ষ করেছি ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসে, বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিবাদী চেতনা উন্মোচনই শওকত ওসমানের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য। ‘ওদের ভাষায় আমি মৃতদেহ, মূর্খ, মূর্খ পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল আমার আয়তন’-শহীদের আত্মবিস্তারধর্মী এই সংলাপের মধ্যেই প্রতিভাসিত হয়েছে আলোচ্য উপন্যাসের মৌল চেতনা। ‘আর্তনাদ’ উপন্যাসে শওকত ওসমানের ইতিহাসজ্ঞান, সমাজ অভিজ্ঞতা এবং প্রগতিশীল জীবনদৃষ্টির সুস্পষ্ট ছায়াপাত ঘটেছে। একটি বিশেষ ঘটনার সঙ্গে তিনি নির্বিশেষে মিলিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসের অকথিত অনেক ঘটনাকে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলি জাফর ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, কিন্তু তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্ব অভীপ্সা বাঙালির রক্তাক্ত উজ্জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনাধারায় তরঙ্গিত, স্পন্দিত ও বলয়িত। এভাবে একুশের এক কাহিনিকে বাঙালির সহস্র ‘একুশের’ সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে শওকত ওসমান নির্মাণ করেছেন বাঙালির অস্তিত্ব-উপলব্ধির এক অখ- ব্যঞ্জনা।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেলিনা হোসেন রচনা করেছেন দুটি উপন্যাসে-  ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১) এবং ‘নিরন্তন ঘণ্টাধ্বনি’ (১৯৮৭)। ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসে ১৯৪৭ সালে দেশ-বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত ঘটনাধারাকে ঔপন্যাসিক অবয়ব দান করা হয়েছে। উপর্যুক্ত সময়ের উন্মাতাল ইতিহাস ‘যাপিত জীবন’-এর শব্দস্রোতে বন্দি হয়ে আছে। এই উন্মাতাল সময় ব্যক্তি ও সমষ্টি-অস্তিত্বকে কীভাবে রূপান্তরকে করে দেয়, তারই শিল্প-স্বাক্ষর ‘যাপিত জীবন’। এ উপন্যাসে এই রূপান্তরকে ধারণ করে আছে কেন্দ্রীয় চরিত্র জাফর। পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলায় স্থানান্তরিত জাফর বছর-না-ঘুরতেই নতুন জিজ্ঞাসায় আলোড়িত হতে থাকে। ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক পুস্তিকা পাঠের পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে জাফরের মনোলোকে। এই প্রতিবাদী চেতনাই ভাষা আন্দোলনের মৌল প্রেরণা। এই প্রেরণাকে ধারণ করে আছে ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাস। বাঙালির সমষ্টিগত প্রতিবাদ চেতনা ও সঙ্ঘবদ্ধ সাহসের শিল্পরূপ সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাস। সেলিনা হোসেন তাঁর উপন্যাস সাহিত্যে পৌনঃপুনিকভাবে ইতিহাসের উৎস থেকে শিল্প উপাদান সংগ্রহ করে বর্তমান কালকে শিল্পিত করেছেন। আলোচ্য উপন্যাসেও উত্তাল চল্লিশের ঘটনাধারার প্রেক্ষাপটে সেলিনা হোসেন উপস্থাপন করেছেন তাঁর অবিনাশী প্রতিবাদী চেতনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত এ উপন্যাসের কাহিনি প্রসারিত। এ উপন্যাসে অসামান্য দক্ষতায় সেলিনা হোসেন সমকালকে, সমকালীন বেশকিছু মানুষকে চিরকালীন মহিমায় অভিষিক্ত করেছেন। সোমেন চন্দ্র, রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী-এসব পরিচিত মানুষ ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’-তে রূপান্তরিত হয়েছে উপন্যাসের নায়ককল্প চরিত্রে। এসব চরিত্র, এসব নায়ক আমাদের নিয়ত শোনায় ইতিহাসের অনিঃশেষ ঘণ্টাধ্বনি, তাঁরাই ভাষা আন্দোলনের রূপকার, ওদের প্রদর্শিত পথেই ইতিহাসের ক্রমধারায় আসে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান স্থপতিরা। এসব ইতিহাসকে ধারণ করে আছে বলে, ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ হয়ে উঠেছে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধ তথা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অমূল্য শৈল্পিক দলিল।

ভাষা আন্দোলনের অনুষঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ছোটগাল্পিক শিল্পসফল বহু ছোটগল্প রচনা করেছেন। প্রবীণ নবীন ছোটগাল্পিকদের রচনায় ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম উপন্যাস পেতে আমাদের ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও ছোটগল্পের জন্য আমাদের মোটেই অপেক্ষা করতে হয়নি। ভাষা আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ (১৯৫৩) গ্রন্থেই আমরা ভাষা আন্দোলনের ছোটগল্প পেয়েছি। অতঃপর আমাদের ছোটগাল্পিকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে ভাষা আন্দোলনের শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন। এসব ছোটগল্পে খন্ড খন্ড ঘটনার আধারে শিল্পীত হয়েছে বাঙালির রক্তাক্ত উজ্জীবনের অখন্ড ছবি।

ভাষা আন্দোলনের অনুষঙ্গে রচিত বেশকিছু ছোটগল্পের নাম আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। শওকত ওসমানের ‘ মৌন নয়’, সাইয়িদ আতীকুল্লাহর ‘হাসি’, আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি’, মিন্নাত আলীর ‘রুম বদলের ইতিকথা’, সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘খরস্রোত’, নূরউল আলমের ‘একালের রূপকথা’, মঈদ-উর-রহমানের ‘সিঁড়ি’, রাবেয়া খাতুনের ‘প্রথম বধ্যভূমি’; সেলিনা হোসেনের ‘দীপান্বিতা’, এবং জহির রায়হানের ‘একুশের গল্প’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘কয়েকটি সংলাপ’ ইত্যাদি ছোটগল্প ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক শিল্পভাষ্য হিসাবে ঐতিহাসিক নির্মাণ। এসব ছোটগল্প ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মানুষে জীবনের এক-একটি খন্ড ছবি অঙ্কিত হয়েছে, যে-খন্ড ছবির মৌল প্রত্যয় বাঙালির সত্তাগত রূপান্তর। এসব গল্পে যে মৌন প্রত্যয় শিল্পীত হয়েছে, জহির রায়হানের ‘কয়েকটি সংলাপ’ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করে আমরা তা এভাবে উপস্থাপন করতে পারি।

পদত্যাগ চাই।

ওদের পদত্যাগ চাই।

বরকতের খুন আমরা ভুলব না।

রফিক আর জব্বারের খুন আমরা ভুলব না।

বিচার চাই।

ফাঁসি চাই ওই খুনীদের।

ভাইসব। সামনে এগিয়ে চলুন।

ওদের গোলাগুলি আর বেয়নেটকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলুন।

-সঙ্ঘশক্তির প্রেরণায় শোষকের বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার আহবানই এসব গল্পের মৌলবাণী।

বাংলাদেশে আরো অনেক ঔপন্যাসিক ছোটগাল্পিক ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনা করেছেন। সেসব উপন্যাস ছোটগল্পে কখনো ভাষা আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত হয়েছে, কখনো বা তার উপস্থিতি ঘটেছে পরোক্ষভাবে। ওইসব উপন্যাস-ছোটগল্পের তালিকা না দিয়েও আমরা যে-কথা বলতে চাই, তা হল ভাষা আন্দোলনের প্রেরণায় রচিত সাহিত্যই নিঃসন্দেহে তৈরি করেছে আমাদের সাহিত্যের মূল স্রোত। সাহিত্যিকরা সম্মিলিত সাধনায় আমাদের সাহিত্যে বপন করেছে যে-মানবাধিকার বীজ, যে-প্রতিবাদী জীবনচেতনার বীজ, তা-ই আমাদের জাতিসত্তার মৌল পরিচয়।

ভাষা আন্দোলনের অপর নাম প্রতিবাদী চেতনা। ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে করেছে প্রতিবাদী। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতেই আছে সঙ্ঘশক্তির উত্তাপ আর আনন্দ। সাহসের সঙ্গে সবকিছু মোকাবিলা করা আর মাথা উঁচু করে সংগ্রামের অপর নাম ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন বাঙালির চেতনার সঞ্চার করেছে অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে করেছে রক্তমুখী, স্বপ্নমুখী, সূর্যমুখী। ভাষা আন্দোলনের সাফল্যে বাঙালি বিভোর হয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্নে। ১৯৫২ পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে আমরা যে প্রগতিচিন্তার ছায়াপাত লক্ষ করি, নিঃসন্দেহে তা ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবজাত। এখানেই ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী শিল্পপ্রেরণা।

১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনের যে-বীজ রোপিত হল, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পূর্বপর্যন্ত আমাদের সাহিত্যে তার প্রভাব ছিল অক্ষুণ্ন। মধ্যবিত্তশ্রেণি থেকে আগত অনেক লেখক-শিল্পীই তখন পাকিস্তান আন্দোলনের শিল্পকথা নির্মাণে ব্যস্ত। ভাষা আন্দোলনই এখানে প্রথম আঘাত হানল। ভাষা আন্দোলন আমাদের লেখকদের প্রথম বাঙালিত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে প্রেরণা সঞ্চার করে। ষাট সত্তরের নেতি আর নাস্তির উল্লাস কাটিয়ে ভাষা আন্দোলন আমাদের কথাসাহিত্যিকদের সঠিক পদচারণায় উদ্বুদ্ধ করেছে। অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক চেতনা, মৃত্তিকামূলসংলগ্নতা, মাতৃভাষাপ্রীতি, অন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, আন্তর্জাতিকতাবোধ-এসব প্রবণতা, যা আমরা লক্ষ করি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে, ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল। একটি উপন্যাস বা ছোটগল্পে যখনই আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ লক্ষ করি, একটি উপন্যাস যখনই মৃত্তিকামূলস্পর্শী হয়ে ওঠে, যখনই একটি ছোটগল্পের শরীরে ও সত্তায় প্রতিবাদের সুর ঝরে পড়ে, তখনই আমাদের স্মৃতিতে জেগে ওঠে ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল স্মৃতি।

অসীম সমুদ্রে ভাসমান দূরগামী জাহাজের নাবিকের কাছে বাতিঘরের আলোকস্তম্ভের মতো, ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে প্রতিনিয়ত শোনাবে আশা আর আকাক্সক্ষা আর সাহসের বাণী। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য রচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিগত পঞ্চাশ বছরে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যেমন সাহিত্য রচিত হয়েছে, ভবিষ্যতে তেমনি আরও অনেক সাহিত্যকর্ম নির্মিত হবে। মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাবার ফলে দেখা দিয়েছে নতুন দাবি। এ দাবির ফলে কেবল বাঙালি সাহিত্যিক নয়, হয়তো বিদেশি কোনো লেখকের সৃষ্টিতেও ভাষা আন্দোলন নতুন তাৎপর্যে অভিব্যঞ্জিত হয়ে উঠবে। ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে যে-কারণে সংঘটিত হয়েছিল সে-কারণগুলো এখনও দূরীভূত হয়নি। এ-কারণেই ভাষা আন্দোলন এখন আমাদের কাছে প্রতিদিনই প্রাসঙ্গিক। নিয়ত এই প্রাসঙ্গিকতাই ভাষা আন্দোলনের কালোত্তীর্ণতার প্রধান শক্তি-উৎস। আমাদের সৃষ্টিশীল সাহিত্যকদের রচনাকর্মে ভাষা আন্দোলনের এই অবিনাশী প্রাসঙ্গিকতা বাহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় কুসুমিত হয়ে উঠুক, পুষ্পিত হোক ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী চেতনা-এই ই আগন্তুককালের শিল্পীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখক : উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *