ই-পেপার

মোঃ আশরাফুল ইসলাম বিপিএম

আমাদের দেশে ইয়োগা বা যোগব্যায়াম বর্তমানে শরীরচর্চার উপায় হলেও এটা অতিপ্রাচীনকালে (আজ থেকে আনুমানিক ৫০০০ বছর আগে) আবিষ্কৃত হয় ইয়োগা বা যোগব্যায়াম সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক একটি মনোদৈহিক অনুশীলন যা যে কোন বয়সের মানুষ-ই কোন যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই অনুশীলন করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী ইয়োগার জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। ইয়োগা বা বাংলায় যোগ, গণিতে যেমন অংক যোগ করে আমরা সংখ্যা পাই, এ ক্ষেত্রেও যোগ করা হয়। দেহ, মন, আত্মা, মস্তিষ্ক, বিবেক, বুদ্ধি অর্থাৎ আমাদের যা কিছু আছে সব একসূত্রে গাঁথা বা যুক্ত করার নামই ইয়োগা বা যোগ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে সিন্ধু নদের তীরে এক বিশেষ সভ্যতা গড়ে ওঠে যাকে আমরা সিন্ধু সভ্যতা বলে জানি। ঐ সিন্ধু নদের তীরের মানুষদের মধ্যে উপপাদ্য বিষয় ছিল “নিজের উপর পর্যবেক্ষণ করা” যেমন-আমি কি খাচ্ছি, তার কি প্রভাব আমাদের শরীরে পড়ছে, আমরা কি চিন্তা করছি, সেই চিন্তার জন্য আমাদের কেমন অনুভূতি হচ্ছে প্রভৃতি,” এভাবে নিজেদের শরীর, মন ও জীবন-যাপনের জন্য যে বিদ্যার ভান্ডার লাভ করে মানুষ সেটাকেই আমরা কালক্রমে যোগ বা ইয়োগা বলে জানি, তবে এই যোগশিক্ষা বহুদিন ধরে মুখে মুখে শুনেও শ্রুতির মাধ্যমে অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কোন লিখিত রূপ ছিল না।

যোগব্যামের এই জ্ঞানকে সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধ করেন ঋষি পতঞ্জলী। ঋষি পতঞ্জলীর জন্ম খ্রীস্টের জন্মের আগে। তার সময়কাল ছিল খ্রীস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ২০০ সাল। পতঞ্জলীর লিপিবদ্ধ যোগ সূত্রের সংখ্যা ১৯৬ টি যার মধ্যে ১৯৩ টিই মন কেন্দ্রিক, এই যোগশিক্ষা ১৮০০ সাল পর্যন্ত আমাদের এই উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ ছিল। সর্বপ্রথম যিনি পশ্চিমা বিশ্বের সামনে ইয়োগাকে তুলে ধরেন তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ, ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপাস্থিতিতে যে ধর্মীয় সম্মেলন হয়েছিল যেখানে তিনি রাজযোগের বিষয়টি উপস্থাপন করেন, যেখান থেকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ইয়োগা।

অন্যান্য Exercie বা Sports বা Gym এর সাথে ইয়োগার পার্থক্য কোথায়

অন্যান্য Exercie বা Gym বা Sports শুধুমাত্র শরীর কেন্দ্রিক, যেমন আমরা যদি শক্ত সামর্থ মাংসপেশী গঠন করতে চাই এবং সুঠাম দেহ গঠন করতে চাই সেক্ষেত্রে জিম করা যেতে পারে। কিন্ত- Gym এর মাধ্যমে কিন্তু আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ যে অঙ্গগুলো যেমন- মস্তিষ্ক, হ্নদপিন্ড, ফুসফুস, কিডনী এগুলোর ব্যায়াম হয় না। Gym এর মাধ্যমে কিন্তু মনের যে প্রশান্তি বা মানসিক যত বৈশিষ্ট্যাবলী আছে সেগুলোর উৎকর্ষতা সাধন হয় না। আমরা যখন কোন খেলা যেমন ক্রিকেট, ফুটবল প্রভৃতি খেলি তখন খেলোয়াড়সহ সারা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ থাকে ঐ বলের দিকে, কিন্তু আমাদের হৃদপিন্ড যে এত জোরে জোরে স্পন্দিত হচ্ছে সেটা কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না, অন্যান্য সূক্ষ অনুভূতির কথা না হয় বললামই না। ইয়োগা বা যোগের মাধ্যমে আমাদের শরীর ও মন উভয়ের সুস্থ্যতা লাভ হয়। ইয়োগা আমাদের শরীরের ও মনের বিভিন্ন রোগ থেকে আরোগ্য দান করে।

ইয়োগা এর অঙ্গ/Limbs of Yoga

ইয়োগা ৮ টি অঙ্গ

১। যম  ২। নিয়ম  ৩। আসন প্রনায়ন   ৪। প্রানায়াম   ৫। প্রত্যাহার   ৬। ধারণা  ৭। ধ্যান   ৮। সমাধি

এর মধ্যে ৫ টি অনুশীলন করা সাধারণ মানুষদের জন্য একটু কঠিন কারণ কিছু কঠোর নিয়ম-কানুন রয়েছে।

যে ০৩ টি আমরা সবাই অনুশীলন করে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারি সে ০৩ টি হলঃ-

১। আসন (যোগাসন) 

২। প্রনায়াম (বিভিন্ন শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যয়াম)

৩। ধ্যান (Meditation)

সুতরাং যোগাসন, প্রানায়াম, মেডিটেশন সব-ই ইয়োগার অংশ।

ইয়োগা কিভাবে কভিড-১৯ এর সময় সবচেয়ে উপযোগী

কোন Gym বা Sports বা কেডিকেল ঔষুধের মাধ্যমে ফুসফুস শক্তিশালী করা যায় না। কিন্তু প্রানায়াম ও আসনের মাধ্যমে সহজেই আমরা ফুসফুসের পেশীপুলোকে স্ট্রং করতে পারি এবং অক্সিজেন গ্রহণ করার ক্ষমতাও বাড়াতে পারি।

অপর দিকে Immunity System অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বলতে আমরা জানি White Blood Cell বা শ্বেতরক্ত কনিকাই বাইরের জীবানু বা অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর বস্তুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। আমরা যখন নিয়মিত ব্যায়াম করি এবং মানসিক অবস্থা ভালো থাকে তখন White Blood Cell এর কার্যকারীতা সর্বাধিক থাকে এবং প্রোডাকশনও বৃদ্ধি পায়। সেক্ষেত্রে মানসিক অবস্থার উৎকর্ষ সাধনের মেডিটেশন বা ধ্যানের বিকল্প হয় না।

এজন্য যে কোন রোগের জন্য বিশেষ করে কভিড-১৯ এর সময় সুস্থ্য দেহ ও প্রশাস্ত মন ধরে রাখার জন্য যোগ ব্যায়াম-ই অন্যতম পন্থা।

করোনা ভাইরাস কোথায় আক্রমন করে?

সবাই জানেন যে ভাইরাসটি আমাদের ফুসফুসের আক্রমন করে। তারপর যাদের Immunity System দূর্বল তারাই  করোনা সাথে যুদ্ধে করে মারা যাচ্ছে। নিয়মিত যোগব্যায়াম করে আমরা আমাদের ফুসফুসকে অধিক কার্যকর করতে পারি এবং মানুষিক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারি। যোগ ব্যায়াম ঘরে বসে একা একা করা যায়। প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নিয়মিত চর্চা করলে শারিরিক ও মানসিক সক্ষমতা বাড়ানোর সহজতম কৌশল। করোনার সময়ে, Gym করা বা সাতার কাটা, খেলাধুলা করা যাচ্ছে না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়, তাই ঘরে বসে যোগব্যায়াম চর্চা করে শরীর সুস্থ্য রাখা যায়।

তাহলে আমাদের যে ০২ টি কাজ অবশ্যই করাতে হবে বা যেদিকে নজর দিতে হবে তাহলো

১। ফুসফুসকে শক্তিশালী রাখা।

২। Immunity System এর শক্তি বাড়ানো।

Yoga এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-কানুন

যোগব্যায়ামের উপযুক্ত সময়

খুব সকালে খালি পেটে যোগাভ্যাসের মাধ্যমে সর্বাধিক উপকারিতা পাওয়া যায়।

সময়কাল

যোগের সংক্ষিপ্ত অভ্যাস= ১৫ মিনিট। যোগের মধ্যম অভ্যাস = ৩০ মিনিট।

যোগের পূর্ণ অভ্যাস = ৬০ মিনিট।

সুতরাং পূর্ণ মাত্রায় লাভ পাওয়ার জন্য আমাদের প্রতিদিন ৬০ মিনিট যোগাভ্যাস করা উচিত।

বয়স

৭ বছরের উর্ধ্বে যে কেউ সর্বধরণের যোগভ্যাসের জন্য উপযুক্ত। তবে বয়স ও ঋতু অনুযায়ী অনুশীলনে ভিন্নতা থাকে।

বিদ্যুৎ ও তাপ কুপরিবাহী Mat ব্যবহার করা উচিত

খালি মাটিতে বা Floor এ যোগাভ্যাস নিষেধ। আমরা আগে প্রাথমিক বিজ্ঞান বইতে দেখেছি স্থির বিদ্যুতের পরীক্ষা, চিরুনি চুলে বার বার ঘষে কাগজের টুকরার কাছে ধরলে কাগজের টুকরাগুলোকে আকর্ষণ করে অর্থাৎ আমাদের শরীর থেকে কিন্তু বিদ্যুৎ তৈরি হয়েছে। দুটি বস্তুতে ঘর্ষন ঘটলে কম হোক বেশি হোক বিদ্যুৎ তৈরি হয়।

আমরা যখন আসনে থাকি বা প্রানায়াম করি তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের ঘষায় আমাদের শরীরে বিদ্যুৎ তৈরী হয়। এখন এই অবস্থায় যদি মাটিতে স্পর্শ করা হয় তাহলে আমাদের শরীরে উপকারী আয়ন নষ্ট হয় এব তাপও তাড়াতাড়ি প্রকৃতিতে চলে যায় যা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই খালি মাটিতে যোগভ্যাস নিষেধ করা হয়।

ভরা পেটে যোগাভ্যাস বা অন্যান্য

ভরা পেটে ইয়োগা করলে যে শক্তিটা হজমে ব্যায় হচ্ছিল তা দুইভাগে ভাগ হয় অর্থাৎ ইয়োগার জন্য খরচ হয়। ফলে খাবার ঠিক মত হজম হয় না। এখন খাবার হজম না হলে তা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ায়, শরীরে ও রক্তনালীতে চর্বি জমতে থাকে এবং শরীরে রোগ বাসা বাধতে থাকে। খাওয়ার অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘন্টা পরে যোগব্যায়াম করা হয়।

Surgery হলে কতদিন পর ইয়োগা করা যায় 

শরীরে গধলড়ৎ কোন সার্জারী হলে ৬ মাস অথ্যাৎ ১৮০ দিন পর থেকে ডাক্তারের পরামর্শক্রমে সবধরণের যোগব্যায়াম  করা যায়।

উপকারীতা

কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক শক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, চেহারায় উজ্জ্বলতা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণ ক্ষমতার প্রক্ষরতা। নিয়মিত ঘুম হওয়া, শরীরের রক্ত স্বাভাবিক রাখে, ব্যায়ামে ঘাম ঝরে বিধায় শরীরের দূষিত পদার্থ বাহির হয়ে যায়। হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়, খোলা আকাশের নিচে দিনের আলোতে যোগব্যায়াম করলে একই সাথে সূর্য রশ্মি থেকে ভিটামিন ‘‘ডি’’ সঞ্চিত হয়। সুতরাং নিয়মতি যোগব্যায়াম সমূহ সুরক্ষার সহজ পদ্ধতি।

আপনি যদি ধৈর্যশীল যোগব্যায়াম অনুশীলনকারী হন তবে অবশ্যই আপনি কিছু উপকারীতা লক্ষ্য করবেন।  আপনার ঘুম ভাল হবে, কফ কাশি দূর হবে। এছাড়াও নিয়মিত ইয়োগা করলে….

১। শরীরের নমনীয়তা (Flexibility)বৃদ্ধি করে। ২। শরীরে মাংসের (Muscle) শাক্তি বাড়ায়। ৩। শরীরের গঠন বা অঙ্গ বিন্যাস (Posture) সুন্দর করে। ৪। শরীরের তরুনাস্থি ও হাড়ের জয়েন্টের ভংগুড়তা হ্রাস করে।  ৫। মেরুদন্ডের সুরক্ষা করে। ৬। হাড়ের স্বাস্থ্য ভাল রাখে (Bore health)  ৭। রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে।  ৮। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়  (immunity)  ৯। আপনার হার্টের হাড় বাড়ায় ১০। আপনার রক্তচাপ সমন্বয় করে  ১১। মুত্র গ্রন্থি সমূহের নিয়ন্ত্রন বাড়ায়। ১২। মনের চঞ্চলতা বাড়ায়।

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিপ্লোঃসিকিঃ)

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x