ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং পল্লি এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের দ্বিতীয় দফার প্রণোদনার আওতায় মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা এবং আগামী অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ১১টি ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। আপাতত পাঁচটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে। জানা গেছে, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ ছাড়ের বিষয়ে অনলাইনে নারী-উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশন ও চেম্বার নেতৃবৃন্দ এবং দেশের শীর্ষ নারী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এসএমই ফাউন্ডেশনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ২৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু ফাউন্ডেশন আশা করে, নারী উদ্যোক্তাদের ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হবে। এসএমই ফাউন্ডেশন বলছে, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তারা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের পরিমাণ হবে সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২৪টি সমান মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করা যাবে।

করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণের জন্য আবেদনও শুরু করেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন নেওয়া শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন (এসএমই) এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে তাঁরা মে মাসের সপ্তাহের মধ্যে ঋণ বিতরণ শুরু করেছেন। সে ক্ষেত্রে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রণোদনার ঋণ পেয়েছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাচ্ছেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্স- এই পাঁচ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এসব প্রতিষ্ঠানে একজন করে ফোকাল পয়েন্ট ঠিক করা হয়েছে, যাঁরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আবেদন সমন্বয় করবেন। মোট ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি নারী-উদ্যোক্তাদের দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, আইডিএলসি ফাইন্যান্স এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স থেকে উদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন ক্লাস্টারের সদস্য উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সারা দেশের নারী উদ্যোক্তা এবং এসএমই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সুপারিশকৃত এসএমই উপখাত, ট্রেডবডি ও গ্রুপের তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা এবং সিএমএসএমই খাতের জন্য সরকার ঘোষিত প্রথম দফার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ না পাওয়া পল্লি ও প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে।

এদিকে, করোনা ভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং পরিসেবার মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ০২ মে ঈদ উপহার হিসাবে সাড়ে ৩৬ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা পেয়েছেন। এজন্য ৯১২ দশমিক ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উদ্বোধনের দিনই ২২ হাজার ৮৯৫ জনের কাছে সহায়তার টাকা পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে নগদ সহায়তার দ্বিতীয় পর্বে তিন দিনের মধ্যে নগদ, বিকাশ, রকেট এবং শিউরক্যাশের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বিভিন্ন পেশার ক্ষতিগ্রস্ত ৩৬ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের কাছে আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে যাবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার প্রতি ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ও প্রদান করেছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ কৃষক পরিবারের মোবাইল ফোনে এই সাহায্য পৌঁছে গেছে।

উল্লেখ্য, গত ৪ এপ্রিল সংঘটিত ঝড়ো হাওয়া, শিলাবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ে দেশের ৩৬টি জেলার ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর ফসলি জমির মধ্যে ১০ হাজার ৩০১ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণ এবং ৫৯,৩২৬ হেক্টর ফসলি জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়। এতে ১ লাখ কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর করোনা মহামারির কারণে নিম্নআয়ের যারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কর্মহীন হয়ে পড়েছিল তাদের সহায়তার জন্য ‘নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫ লাখ পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ৮৮০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি এই অর্থ দেওয়া হয়েছিল।

একই সাথে, করোনা মহামারির দুর্যোগে আয়-রোজগার কমে যাওয়া নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদেরও স্বস্তি দিচ্ছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত রমজানে টিসিবির পণ্য বিক্রি বাড়ানো এবং মনিটরিং জোরদার করায় দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ায় দেশের দুর্যোগের এ সময়ে নিত্যপণ্য সাধারণ মানুষের জন্য যৌক্তিক মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে টিসিবির মাধ্যমে আরও পণ্য বিক্রি বাড়াতে নানা বাড়তি উদ্যোগ নিতে পরিকল্পনা করছে সরকার। ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি বাড়ানো হয়েছে। আমদানিনির্ভর পণ্যের আমদানিনির্ভর কমাতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিত্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার। ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক মাসে ১০৪ শতাংশ বেড়েছে। টিসিবি এ পণ্য মাত্র ২৫ শতাংশ বাড়তি দামে বিক্রি করছে। খুচরা বাজারের চেয়েও ৪০ শতাংশ কম দামে পাচ্ছেন ক্রেতারা। এ ছাড়া খুচরা বাজারের তুলনায় চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা ২৮ শতাংশ কম দামে দিচ্ছে টিসিবি। এতে টিসিবির পণ্য কিনে অনেকটা স্বস্তি পেয়েছেন বলে জানান ক্রেতারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বাজারের চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি ভোজ্যতেল বিক্রি করেছে টিসিবি। অন্যান্য পণ্যও চাহিদার ৫ থেকে ৭ শতাংশ হবে। টিসিবির পণ্য বিক্রি করায় পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। আগামীতে টিসিবির সক্ষমতা বাড়াতে গুদামসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর টিসিবি ২৩ হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করেছে। এবার ৭৮ হাজার টন বিক্রি করা হয়েছে। গত বছর ২৫ হাজার টন ভোজ্যতেল বিক্রি করা হয়। এবার তা বাড়িয়ে ৩৩ হাজার টন করা হয়েছে। বাজারে দাম বেশি থাকলে চাহিদা অনুযায়ী আরও বিক্রি বাড়ানো হচ্ছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। আপদকালীন সময়ে সাধারণ মানুষকে নিত্যপণ্যের বাজারে সহায়তা দেবে- এমনটা সবাই চান। এবার করোনা দুর্যোগে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। তবে স্বল্প আয়ের মানুষের নিরিখে এ কার্যক্রম ব্যাপকও হয়েছে। শহরের মানুষ পেলেও প্রত্যন্ত  গ্রামাঞ্চলে টিসিবির পণ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। টিসিবিকে সত্যিকারের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে আরও পরিকল্পিতভাবে এর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। বাজার চাহিদার অন্তত ২৫ শতাংশ পূরণ করতে হবে টিসিবির বিক্রি বাড়িয়ে। এ ছাড়া গুটিকয়েক পরিশোধন কোম্পানি ভোজ্যতেল ও চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। গবেষণা সংস্থা সানেমের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, খোলাবাজারের চেয়ে ন্যায্যমূল্যের পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এবার বাজারের এই বাস্তবতার খাতিরে পণ্য বিক্রি বাড়িয়েছে টিসিবি। যদিও টিসিবির বাজার অর্থনীতিতে তেমন কার্যক্রম থাকবে না। তবে দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যক্রম সারাদেশে সম্প্রসারণের কাজও চলছে।

টিসিবি সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে প্রতিদিন ৫০০ ট্রাকে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ১২০০ লিটার তেল, ৬০০ কেজি চিনি, ৩০০ কেজি মসুর ডাল ও ৪০০ কেজি ছোলা এখন বিক্রি করা হচ্ছে। এর আগে পেঁয়াজ ও খেজুরও বিক্রি করেছে। বাজারে এ পণ্য দুটির দামও যৌক্তিক পর্যায়ে রয়েছে। তাছাড়া এখন পেঁয়াজের মৌসুম চলছে। গত রমজান উপলক্ষ্যে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১০০ টাকা ও ৫৫ টাকা দরে চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা বিক্রি করছে সংস্থাটি। বর্তমানে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৪০ টাকা লিটার এবং চিনি ৭০ টাকা কেজি। ছোলা ও মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজিতে। এ হিসাবে টিসিবির কার্যক্রমে ভোক্তাদের ভোজ্যতেলে লিটারে ৪০ টাকা ও অন্য পণ্যে ১৫ থেকে ২০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। খোলা বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক থাকলে বিক্রিও বাড়ানো হয়।

অন্যদিকে, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ পরপর রেকর্ড উচ্চতায় প্রথমবারের মতো ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত ০৩ মে ২০২১ খ্রি. বাংলাদেশের রিজার্ভ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলার। এই পরিমাণ রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ১২ মাসের আমদানি দায় পরিশোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে প্রথম ৪ হাজার ৪০০ কোটি (৪৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়ায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি দায় পরিশোধের ফলে রিজার্ভ কিছুটা কমে গেলেও এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করে। করোনার মধ্যেও প্রবাসী আয় প্রবাহ ভালো রয়েছে। বাজারে ডলারের সরবরাহ বেশি। এ কারণে বাজার থেকে বেশ কিছু ডলারও কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে রিজার্ভ বেড়েছে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ বর্তমানে আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত ১ ও ২ মে তারিখেই ১৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এছাড়া গত এপ্রিলের পুরো মাসজুড়ে ২০৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ অঙ্ক গত বছর এপ্রিলে আসা রেমিট্যান্সের চেয়ে ৮৯ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দেশে ২ হাজার ৬৭ কোটি ২০ লাখ (২০.৬৭ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ অঙ্ক অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে আসা রেমিট্যান্সের চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের ডানায় ভর করে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। এতে বিদেশি অর্থায়ন সংস্থাগুলোর কাছে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিজার্ভ এখন বাড়বেই। কেননা, রেমিট্যান্স বাড়ছে। সেই তুলনায় আমদানি বাড়ছে না। ফলে দেশের মধ্যে প্রচুর ডলার থেকে যাচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নিচ্ছে ডলারের দর স্থিতিশীল রাখতে। এতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এই করোনার মধ্যে ভারতেও রিজার্ভ বেড়েছে। এর আগে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। ১৫ ডিসেম্বর ৪২ বিলিয়ন এবং ২৮ অক্টোবর ৪১ বিলিয়ন অতিক্রম করে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত এক বছর দুই মাসেই রিজার্ভ বেড়েছে ১৩ বিলিয়ন ডলার।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেও রপ্তানির পালেও হাওয়া লেগেছে। পণ্য রপ্তানিতে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। এক বছরের ব্যবধানে এপ্রিলে মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫০২ শতাংশের বেশি। করোনা সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে এপ্রিলে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩১৩ কোটি ডলার। করোনা বিপর্যয়ের প্রাথমিক ধাক্কায় গত বছর এপ্রিলে দেশের রপ্তানি আয় নেমে এসেছিল ৫২ কোটি ডলারে। পরে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রপ্তানি আয় কিছুটা স্বাভাবিকতায় ফিরলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ে রপ্তানি আয় নিয়ে আরও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও গত বছরের মতো ঢালাওভাবে রপ্তানি আদেশ বাতিলের ঘটনা এখনো দেখা যায়নি। সার্বিকভাবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৩ হাজার ২০৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এ আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।

যদিও, পোশাক রপ্তানিতে আয় বাড়লেও করোনাকালে ধারাবাহিকভাবে আয় কমছে ওভেন পণ্যে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে নিট পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে নিট পোশাকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে নিট ও ওভেন খাতে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি  হয়েছে হোম টেক্সটাইলে, ৫৪ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ রুখতে ৫ এপ্রিল থেকে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করলেও তৈরি পোশাকসহ সব শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখে। ফলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আগামীতেও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ৩০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। সেই তুলনায়ও রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৬২ শতাংশ। বিশ^ব্যাপী বিভিন্ন দেশে লকডাউনের মধ্যেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক পর্যায়ে আছে দেশ।

ইপিবির পরিসংখ্যান আরও বলছে, তৈরি পোশাক, পাট ও পাটপণ্য, চামড়া ও চামড়াপণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক পণ্য, রাসায়নিক পণ্য ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফেরার কারণেই সার্বিকভাবে পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে হিমায়িত খাদ্যের রপ্তানি কমেছে। সার্বিকভাবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৩ হাজার ২০৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দুই দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছিল তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি। অন্যদিকে হিমায়িত মাছসহ সব ধরনের হিমায়িত খাদ্যের রপ্তানি কমে ৯ শতাংশের মতো। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ৬ শতাংশের বেশি রপ্তানি কমেছে। ফার্নিচারের রপ্তানি কমে ১৩ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি কমেছে জাহাজ শিল্পে। এ খাতে রপ্তানি কমেছে ৯৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘করোনা প্রতিরোধের দ্বিতীয় বিধিনিষেধে আগের মতো সব বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, এটা ভালো দিক। যার ইতিবাচক প্রভাব এপ্রিলে পাওয়া গেল।’ অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ১০৩ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া ৯৫ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৫৪ শতাংশের বেশি। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৭৬ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়া পণ্য, ৪৩ কোটি ডলারের প্রকৌশল পণ্য, ৩৯ কোটি ডলারের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে চামড়া ও চামড়া পণ্যে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অবশ্য চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে আরও ৮৯৩ কোটি ডলার প্রয়োজন। মে ও জুন মাসে রপ্তানির মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি টার্গেটে পৌঁছানো যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করেছেন।

মহামারি সামাল দিতে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশে রপ্তানির গতি বাড়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি। সম্প্রতি প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরকারের দেওয়া প্রণোদনার সুফল মেলার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। আর বিশ্ব অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানির গতি বাড়লে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করেছে এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমিটেন্সের শক্তিশালী প্রবাহ অব্যাহত থাকায় ব্যক্তিখাতে ভোগব্যয় বাড়বে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও গতি আসবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও মহামারির বাস্তবতায় পরে তা ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। মহামারির ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ধীরে ধীরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ধারায় ফিরবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। 

  প্রতিবেদক : এআইজি

  (প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১)

  বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *