ই-পেপার

প্রান্ত সেলিম

বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাস এর থাবা থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। সব শ্রেণিপেশা কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিষেধক বা টিকাবিহীন এই ভাইরাসের থাবা থেকে রক্ষা পেতে সবারই যখন নাভিশ্বাস অবস্থা; তখনই আমরা একদল সম্মুখযোদ্ধার দেখা পেয়েছি; যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা আমাদের অহঙ্কার, বাংলাদেশের গৌরব, দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য। পুলিশ সদস্যগণ তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। দ্বিধাহীন চিত্তে দাঁড়িয়েছে সাধারণ নাগরিকদের পাশে। কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করছে, আইসোলেশনের ব্যবস্থা করছে। সবচেয়ে বেশি করছে মানবিক দায়িত্ব পালন। একজন করোনা আক্রান্ত মৃত মানুষের জানাজা ও কবরের জন্য যখন আপনজন, নিকটাত্মীয় বন্ধুস্বজন কেউই আসে নি, মৃতদেহ রাস্তায়, হাসপাতালের মর্গে রেখে কিংবা বন-জঙ্গলে ফেলে চলে গেছে; সেই মৃতদেহ বহন করে নিয়ে গ্রামে কিংবা কবরস্থানে নিয়ে নিজেরাই জানাযা পড়ে কবরের ব্যবস্থা করেছে।

কঠোর লকডাউন, যানবাহন বিহীন সুনশান রাস্তায় একজন সন্তান সম্ভবা নারীর যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদে যখন পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে; তখন সেই নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করছে পুলিশ সদস্যরা। বাসায় বাচ্চার দুধ নেই, পরিবারের তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা নেই এমন অসংখ্য পরিবারের একটিমাত্র মোবাইল কল পেয়ে তার বাসায় খাবার নিয়ে ছুটে গেছে পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের বেতনের অর্থ থেকে জমানো টাকা বা রেশন থেকে চাল ডাল নিয়ে অসহায় মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে আমাদের পুলিশ সদস্যগণ। সব সময় যাদেরকে দেখে ভয়ে মানুষ দূরে চলে যেতো সেই তারাই এখন আমাদের পরম বন্ধু আপনজন। তারা বীর, তারা মানবিক পুলিশ, জনতার পুলিশ, তারাই সম্মুখযোদ্ধা। ১৯৭১ সালেও মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এই পুলিশ সদস্যরাই। সেদিনের সেই সাহসিকতা এবং প্রতিরোধযোদ্ধাদের বহুদিন পর আবারো দেখা গেল করোনা যুদ্ধে সম্মুখযোদ্ধা হিসাবে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের এই যুদ্ধে সম্মুখযোদ্ধা হিসাবে (এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত) নয় হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে শহীদ হয়েছেন ২৮ জন।

নিজেদের সুরক্ষা, সুচিকিৎসায় এবং চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় এ পর্যন্ত এক হাজারের অধিক পুলিশ সদস্য কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশন শেষে ছাড়পত্র নিয়ে পুনরায় দেশ সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে, অনেকেই অপেক্ষায় রয়েছেন পুনরায় কর্মস্থলে যোগদান করতে। করোনা যুদ্ধে পুলিশের দৃঢ় মনোবল, সাহসিকতা, মানবিক সহায়তা সর্বোপরি জনতার পুলিশ কিংবা সম্মুখযোদ্ধা হয়ে ওঠার পেছনে একজন কর্মনিষ্ঠ সৎ এবং দেশপ্রেমিক যোদ্ধার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, প্রেরণা এবং আন্তরিক দিক নির্দেশনা ও বলিষ্ঠ কার্যকরি সময়োপযোগি পদক্ষেপের কথা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগিরকের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছে। তিনি হলেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার)। তাঁর প্রতিটি দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শ, পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে এবং করোনা যুদ্ধে আত্মনিয়োগ করতে প্রেরণা যুগিয়েছে। কিভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশের সম্মুখযোদ্ধারা করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন এবং পুনরায় কাজে যোগদান করেছেন, তাদের সেই কথকথা নিয়েই এই আয়োজন- ‘করোনাজয়ীদের কথা’। এ পর্যায়ে ১২ জন করোনাজয়ীর কথা তুলে ধরা হলো। পর্যায়ক্রমে সকল করোনাজয়ীদের কথাই তুলে ধরা হবে।

এস আই (ইউবি) হাফিজুর রহমান

প্রথমে কিছুটা অসুস্থতা অনুভব করি ২৩ এপ্রিল ২০২০। সহকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন এটা দেখে ২৫ এপ্রিল ২০২০ করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে যাই। ২৭ এপ্রিল ২০২০ রাতে ফোনে স্যারদের মাধ্যমে জানতে পারি করোনা পজিটিভ। খবরটি শোনার পর থেকে মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত ছিলাম। খুব খারাপ লাগছিলো, মনের অবস্থা কেমন হয়েছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। জানুয়ারিতে কেবল বিয়ে করেছি। পরিবারের চিন্তা বাবা মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছিলো। কিন্তু সবাইকে তো আর আক্রান্তের খবরটি জানাতে পারি নি। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ঠিক সেই সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি স্যার ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন। তখন মনটা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পরবর্তীকালে আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র স্যার, আলফা ২ স্যার, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারস্যারসহ সিনিয়র সব স্যারদের আন্তরিকতা, সব সময় তাঁদের ফোন, খোঁজ নিয়ে দিক নির্দেশনা দেয়ায় মানসিক অবস্থাটা পুনরায় স্বাভাবিক হয়। স্যারদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালো ব্যবহার পেয়েছি। হোম কোয়ারেন্টিনে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে কুসুম কুসুম গরম পানি দিয়ে গড়গড়া এবং একই সাথে খাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। স্যাররা খাবারের কোন অভাব অনুভব করতে দেন নি। এছাড়া ভিটামিন সি জাতীয় ফল তো খেয়েছিই প্রতিদিন। এরপর ৮ মে ২০২০ এ দ্বিতীয় এবং ১৯ মে ২০২০ তারিখে পুনরায় নমুনা পরীক্ষায় আমার করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে এবং আমি বতর্মানে সুস্থ এবং ভালো আছি ইনশাল্লাহ।

কনস্টেবল-১২০২ প্রিয়াংকা সাহা

করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরে এসে খুবই আনন্দিত আমি। পরিবার এবং প্রিয় সন্তানের কাছে ফিরতে পেরে খুব খুশি, আনন্দ প্রকাশের ভাষা নেই। চারদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলাম। প্রায় ১৮ দিন আইসোলেশনে থাকার পর অবস্থা বেশি খারাপ হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিলো। বাঁচার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম। তারপরও সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছি এটাই খুব ভালো লাগছে।

কনস্টেবল- ৫২১ মজিবর রহমান

পুলিশ লাইনস্ –এ থাকা অবস্থায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আগে থেকেই ডায়বেটিস ছিলো। ১৬ দিন আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে এখন তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। সুস্থ হয়ে খুব খুশি তিনি। কনস্টেবল মজিবর রহমান বলেন, রাজারবাগ যখন ছিলাম তখন অফিসার থেকে শুরু করে সবাই এতো যত্ন নিয়েছেন যে জীবনে কখনো ভুলবো না। পুলিশ সুপার স্যার যে এতো ভালো ব্যবহার করেন তা আমার জানা ছিলো না। তাদের সবার সহযোগিতায় আমি সুস্থ হতে পেরেছি।

কনস্টেবল-৬০১ সিরাজুল ইসলাম

আমি ডিউটিতে থাকা অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। এখন মোটামুটি ভালো আছি। করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পেছনে ডাক্তারদের সহযোগিতা ছিলো। পাশাপাশি আমাদের সিনিয়র অফিসারদের এতো এতো সাহস সহযোগিতা খুব কাজে দিয়েছে। তাঁদের এ সহযোগিতা পেয়ে এবং করোনা থেকে সুস্থ হয়ে অনেক ভালো লাগছে।

এস আই (ইউবি) রাফিউদ্দৌলা

প্রথমে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথাই বলি। কারণটা হচ্ছে এমন বন্দী জীবন এবং মুহুর্ত জীবনে কখনো কাটাতে হয় নি। করোনা ভাইরাসের কারণে সেই অভিজ্ঞতাটা হয়েছে। এটা একটা অনুভূতি। আর আমি যেহেতু একা ছিলাম না অন্য সহকর্মীরা পাশে ছিলো সেই কারণে একাকীত্বটা অনুভব করি নাই। যদি একাকী থাকতে হতো তবে বোধ হয় ভয়েই আর জীবিত ফেরা হতো না। কিছুটা ভয়ে ভয়ে গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করতে দেই এবং ২৭ এপ্রিল ২০২০ রাতে আমাকে ফোন করে জানানো হয় আমি করোনা পজিটিভ। শুরু হয় আইসোলেশনে থাকা। আমাদের সিনিয়র স্যাররা নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন কখনো ফোনে কখনো প্রতিনিধি পাঠিয়ে। যার কারণে মনের অবস্থাটা ভালো ছিলো। প্রচুর ফল খেয়েছি, মালটা খেয়েছি। গরম পানির গড়গড়া আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ পালন করেছি যথারীতি। স্যারদের আন্তিরক সেবার ব্যবস্থা আর দিকনির্দেশনায় কোন কষ্ট অনুভব করি নি। ৮ মে ২০২০ নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট আসলে হোম কোয়ারেন্টিনে ছিলাম । তিনবার পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ হই এবং বর্তমানে সুস্থ আছি ইনশাল্লাহ।

পিএসআই পরেশ বাগচি

আমার ক্ষেত্রে মহামারি করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি নিরবেই ঘটেছে। কারণ আমার কোন লক্ষণ দেখা যায় নি। কনট্যাক্ট হিস্টোরির জন্য করোনা ভাইরাসের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় নি এবং আমি অতোটা শারীরিক সমস্যা অনুভব করি নি। আমি ২৫ এপ্রিল ২০২০ নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়েছিলাম এবং আমার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে ২৭ এপ্রিল ২০২০। এরপর পুলিশ লাইনস্ স্কুলে আইসোলেশনে ছিলাম। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি আমরা যারা আক্রান্ত হয়েছিলাম তাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করা হয়েছিলো। এই গ্রুপ থেকে আমাদের পুলিশ সুপার স্যার থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সব নির্দেশনা পেতাম, কখন কি লাগবে কার কি প্রয়োজন হচ্ছে, কার খাবার লাগবে ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ এবং সহযোগিতা পেয়েছি। আর একজন পিএসআই হিসাবে বলবো পুলিশ নিয়ে আগে অনেক কথা শুনেছিলাম কিন্তু আমার সব ধারণা পাল্টে দিয়েছে স্যারদের আন্তরিকতা এবং সহযোগিতা। এটাই খুব ভালো লেগেছে। পুলিশ লাইনস্ েকোয়ারেন্টিনে থেকে পুনরায় ৮ মে ২০২০ এবং ১৭ মে ২০২০ এ নমুনা পরীক্ষা করাই এবং আমার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো আছি।

এস আই (এবি) ২০ মো. রফিকুল ইসলাম

আলহামদুলিল্লাহ বর্তমানে ভালো আছি। করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার অনুভূতিটা একটু ভিন্নরকম। আমার যখন ২৫ এপ্রিল ২০২০ করোনা টেস্ট হয় এবং ২ মে ২০২০ পজিটিভ রিপোর্ট আসে। সেইসময় আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দিয়েছিলো। নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারছিলাম না। পুলিশ লাইনস্ হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে নিরাপদ থাকতে পুলিশ সুপার স্যারের অনুমতি নিয়ে আমি বাসায়ই আইসোলেশনে থাকি। সেই সময় খুব খারাপ লেগেছিলো। পরিবারে আমার সাথে স্ত্রীও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলো। পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো। এখন আমার স্ত্রীও সুস্থ হয়ে উঠেছে। বাসায় লবঙ্গ, মশলা, আদা দিয়ে কুসুম কুসুম গরম পানি করে নিয়মিত নাক দিয়ে ভাপ নিয়েছি আমারা দু’জন আলাদা আলাদা রুমে। মনের মধ্যে কিছুটা সাহস পাই স্যারদের ফোন পেয়ে। স্যাররা ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়ে সব ধরণের সহযোগিতা করেছেন। ডাক্তারদের পরামর্শ পাই। এরপর ১৩ মে ২০২০ এবং ১৮ মে ২০২০ আরেকবার টেস্ট করালে দুইবারই করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। তারপর পুলিশ লাইনে কিছুদিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকি। বর্তমানে ভালো আছি।

কনস্টেবল-১৯২৩ রিমন

আলহামদুলিল্লাহ। অনেক অনেক ভালো লাগছে। সিনিয়র অফিসারদের সার্বিক দিক নির্দেশনা পেয়ে মনোবল বেড়ে গিয়েছিলো। তাদের অভাবনীয় সহযোগিতায় অভিভূত এবং সুস্থ হতে কাজ করেছে।

এস আই (ইউবি) সাদ্দাম হোসেন খান

করোনা ভাইরাস নিরব ঘাতক বলতে পারেন। কারণ প্রথমে আমার কোন ভাইরাসের লক্ষণই প্রকাশ পায় নি। কিছুটা অসুস্থ অনুভব করি ২৩ এপ্রিল ২০২০। সহকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন এটা দেখে ২৫ এপ্রিল ২০২০ করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে যাই। ২৭ এপ্রিল ২০২০ রাতে ফোনে স্যারদের মাধ্যমে জানতে পারি তিনি করোনা পজিটিভ। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনস্ হাসপাতালে জায়গা ছিলো না বলে আমাকে পুলিশ লাইন স্কুলের ক্লাশরুমে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে আমিসহ আরো আক্রান্ত অন্য সহকর্মীরাও ছিলো। তবে একটা বিষয় ছিলো আমার মানসিক অবস্থাটা কখনোই দুর্বল হতে দেই নি। মনটা খুব শক্ত রেখেছিলাম কারণ জানি মৃত্যু একদিন হবে। তবে মৃত্যু ভয় সবার থাকে আমারও ভয় লেগেছিলো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো পুলিশ সুপারস্যারদের ব্যবস্থাপনা। এতো সুন্দর ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার তারা করেছেন মনটা ভালো হয়েছিলো সাথে সাথে। আর ডিআইজি স্যার পুলিশ সুপার স্যার, নিয়মিত প্রতিদিন ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন, কখনো প্রতিনিধি পাঠিয়ে খোঁজ নিতেন। চিকিৎসার পরামর্শ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি। ডাক্তাররা আন্তিরক ছিলেন তাই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠি। এরপর ৮ মে ২০২০, ১৭ মে ২০২০ এবং ১৯ মে ২০২০ পুনরায় নমুনা পরীক্ষা করাই এবং আমি করোনা নেগেটিভ হই। বতর্মানে আমি সুস্থ আছি এবং কাজে যোগদান করেছি।

কনস্টেবল- ১৯১৪ নাহিদ

করোনা ভাইরাসের সব লক্ষণ না থাকলেও পজেটিভ ছিলেন এবং দীর্ঘ ২৮ দিন নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনস্ েআইসোলেশনে ছিলেন। সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে যোগদান করেছেন এটাই তার আনন্দ।

কনস্টেবল-৭৮৪ মো. আজিজুর রহমান

প্রথমে জ্বর এবং কাশি অনুভব করেন ৭ এপ্রিল ২০২০। এরপর স্যারদের জানাই এবং থানায় চলে যাই হোমকোয়ারেন্টিনে। ১৪দিন পর ২০ এপ্রিল ২০২০ পরীক্ষা করাই এবং ২২ এপ্রিল ২০২০ রিপোর্ট দিয়ে জানায় করোনা পজিটিভ। তারপর আমাকে নিয়ে যায় পুলিশ লাইনস্ স্কুলে আইসোলেশনে। খবরটি শোনার পর থেকে খুব বিপর্যস্ত ছিলাম। খুব খারাপ লাগছিলো। পরিবারের লোকজন কান্না করতো। সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটতো। বন্দী জীবন শুরু। কারো সাথে যোগাযোগ করার উপায় নেই। তখন শুধুমাত্র কুসুম কুসুম গরম পানির ভাপ নিতাম, গরম পানি খাইতাম। মনে হয় প্রায় এক মণ মালটাই খাইছি। প্রচুর ফলমূলের ব্যবস্থা ছিলো। স্যাররা খাবারের কোন অভাব অনুভব করতে দেন নি। পরবর্তীকালে আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র স্যার, আলফা ২ স্যার, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার স্যারসহ সিনিয়র সব স্যারদের আন্তরিকতা, সব সময় তাদের ফোন করে খোঁজ নিয়ে দিক নির্দেশনা পেয়ে মানসিক অবস্থাটা পুনরায় স্বাভাবিক হয়। এরপর ৮ মে ২০২০ এ দ্বিতীয় এবং ১৯ মে ২০২০ তারিখে পুনরায় নমুনা পরীক্ষায় আমার করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে এবং আমি বতর্মানে সুস্থ এবং ভালো   আছি ইনশাল্লাহ।

কনস্টেবল-৮৪৭ মো. লুৎফর রহমান

পুলিশ লাইনস্-এ এক রুমে ৫-৬ জন থাকতাম। হঠাৎ ১৯ এপ্রিল ২০২০ শারীরিকভাবে খুব দুর্বলতা অনুভব করি এবং পরবর্তীকালে নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ আসে। রাত একটার সময় আমাকে যখন ফোনে করোনা পজিটিভ রেজাল্ট জানায় এটা শুনে তখন আরো মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তবে এখন সুস্থ হয়ে মানসিকভাবে বেশ সবল এবং খুব ভালো আছি।

কনস্টেবল-৮১৩ শাহাজাহান মোড়ল

আমার ২৮ এপ্রিল ২০২০ করোনা টেস্ট হয় এবং ২মে ২০২০ পজিটিভ রিপোর্ট আসে। আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ফতুল্লা থানার ৬ তলায় আইসোলেশনে ৬ দিন থাকি। তারপর পৌর স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেই সময় খুব খারাপ লেগেছিলো। পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো। মৃত্যু ভয় কাজ করতো। লবঙ্গ, মশলা, আদা দিয়ে কুসুম কুসুম গরম পানি করে নিয়মিত নাক দিয়ে ভাপ নিয়েছি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ হাসপাতালেও টেস্ট করিয়েছেন। কিছুটা সাহস পাই স্যারদের ফোন পেয়ে। স্যাররা ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়ে সব ধরণের সহযোগিতা করেছেন। আমি তো ট্রাফিকে ছিলাম তো ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট থেকে খুব সহযোগিতা পেয়েছি। স্যাররা নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এটা খুব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে আলফা- ২ স্যার খুব চেষ্টা করেছেন যেন আমাদের কোন সমস্যা না হয়। স্যারকে ধন্যবাদ জানাই। এরপর ১৩ মে ২০২০ টেস্ট করালে ১৬ মে ২০২০ করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। ১৮ মে ২০২০ আরেকবার টেস্ট করালে দুইবারই করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। তারপর পুলিশ লাইনে কিছুদিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকি। বর্তমানে ভালো আছি।

কনস্টেবল-১৪০১ সানোয়ার

আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে ফিরেছি এজন্য আনন্দিত। এখন শারীরিকভাবে ভালো আছি। স্যারদের কাছে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সবাই খুব সাহস দিয়েছেন মনোবল ধরে রাখতে এটা কাজে দিয়েছে।

কনস্টেবল-৯৯১ শামসুজ্জোহা

আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থ হয়ে দারুণ খুশি লাগছে। নতুন এক পৃথিবীতে ফিরে আসলাম মনে হচ্ছে । আমি মনে করি সিনিয়র অফিসারদের উৎসাহ প্রেরণা এবং সাহস বিশেষ করে সার্বিক সহযোগিতা পেয়ে দারুণ খুশি। তাদের সহযোগিতার কারণেই দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরেছি। কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের প্রতি।

গ্রন্থনা : সাংবাদিক, নাট্যকার ও পরিচালক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x