ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান

বর্তমান বিশ্বে এখন সবচেয়ে অলোচিত একটি শব্দ কোভিড-১৯। এটি শুধু একটি শব্দ নয়, যেন মূর্তিমান এক আতংকের নাম। অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে এই করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি সূদূর চীন দেশের উহানে হলেও ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন মহাদেশকে কাবু করে এখন আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে তার করাল থাবা বসিয়েছে। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৮৮৬৩ জন করোনা পজিটিভ সনাক্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ২৮৩ জন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এসব রোগীদের হাসপাতালে সামনের সাড়িতে থেকে সেবা দিচ্ছেন সম্মানিত চিকিতসকবৃন্দ এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। আর বাইরে বিদেশ ফেরতদের খুঁজে বের করে হোম কোয়ারেন্টিন করা, সনাক্তকৃত করোনা রোগীদের কোয়ারেন্টিন কিংবা আইসোলেশন ও চিকিৎসায় সহায়তা করা, কোন কোন ক্ষেত্রে অত্মীয়-স্বজন কর্তৃক ফেলে যাওয়া রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, এমনকি করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজার ব্যবস্থা করাতো অলিখিতভাবে পুলিশের দায়িত্বই হয়ে গেছে। করোনা মোকাবেলায় সামনের সাঁড়িতে থেকে স্বাভাবিক পুলিশিং এর পাশাপাশি এসব কাজ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০০ (দুই হাজার) পুলিশ সদস্য কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছেন, শাহাদত বরণও করেছেন বেশ কয়েকজন (মহান আল্লাহতায়ালা তাদের জান্নাতবাসি করুন)।

বেশীরভাগ পুলিশ সদস্যই তাদের পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করেন। প্রায় দুই মাস ধরে সকল ধরণের ছুটি বন্ধ। করোনা ভাইরাসের সংক্রমন মোকাবেলায় পুলিশ সদস্যদের একেবারে সামনের সাঁড়িতে থেকে কাজ করতে হচ্ছে।  মজার ব্যপার হল এত কাজ, ছুটি নেই। প্রতিদিন এত এত সহকর্মী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হচ্ছেন তারপরও এখন পর্যন্ত কোন পুলিশ সদস্যকে আমি কোনরুপ বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখি নাই। কেন জানি সকল সদস্যই পুলিশের স্বাভাবিক কাজের পাশাপাশি এই আনইউজুয়াল কাজটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে অতি আনন্দের সাথে করে যাচ্ছে। ঠিক যেমনিভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ডাকে সাঁড়া দিয়ে ৭১ এর ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরেই ঝাপিয়ে পড়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিল ঐ পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে।

বর্তমান এই করোনা মহামারীর সময় মানুষও সবকিছুতেই পুলিশের কাছে ছুটে আসছেন, এমনকি পুলিশের এখতিয়ারের নয় এমন বিষয়েও। পুলিশের সীমাবদ্ধতার কথা জানালে তারা জবাব দেন ঐ অফিস তো খোলা নেই, তারা কি করবেন? প্রতিবেশি কারও সর্দি-কাঁশির সংবাদ পেলেও নিজে একবার দেখতে না গিয়ে আমাদের সংবাদ দেন। সর্দি-কাশির রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, গ্রামের কোন ভ্যান/অটো রিক্সা হাসপাতালে নিতে রাজি হচ্ছেনা তখনও আস্থা পুলিশেই। যার পাশে যখন কেউ নেই তখন তার পাশে পুলিশ অবশ্যই আছে। কিভাবে যেন মানুষের শেষ এবং শতভাগ বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এটা কিভাবে সম্ভব হল? করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবে তো আর নতুন করে আলাদা পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। সেই আগের পুলিশই তো এখনও কাজ করছে। আমি মনে করি এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের সকলের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে। আর সে পরিবর্তন হয়েছে সেবাদাতা এবং সেবা গ্রহীতা উভয়েরই মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে।

আমরা পুলিশ সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনেরে পাশাপাশি কোভিড-১৯ মোকাবেলায় অতিরিক্ত যে কাজগুলো করছি, তা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কোন ধরণের অশ্বস্তি নেই বা জোর করেও কারও উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। যেমন কোন করোনা রোগী হ্যান্ডেলিং বা করোনায় মৃতের দাফনের কাজে কোন পুলিশকে জোর করে পাঠাতে হয়না, বরং চাহিদার চেয়ে জনবল সবসময় বেশীই পাওয়া যায়। মহান সৃষ্টিকর্তাই বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে এই শক্তি নিজের হাতে প্রদান করেছেন, না হলে অপ্রতুল নিরাপত্তা কিটস্ এবং করোনা রোগী হ্যান্ডেলিং এর কোনরুপ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই আমরা কোন ওজর আপত্তি ব্যতিরেকেই ঝাপিয়ে পড়েছি এই করোনা যুদ্ধে। আমার মনে হয় বাংলাদেশ পুলিশের কোন সদস্যের মনেই একবারের জন্যও মনে হয় নাই, এটা নাই-সেটা নাই, আমি কেন কাজে যাব, কিংবা এটা-ওটা না দেওয়া হলে আমরা কাজে যাব কেন? আমরা বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য মনে করি শুধু করোনা সংক্রমন কেন, জাতির যেকোন দূর্যোগে বা প্রয়োজনে কোনরুপ শর্ত ছাড়াই মানুষের পাশে থাকব আর এটাই স্বাভাবিক। আমাদের তো এটাই কাজ, আমি প্রজাতন্ত্রেই কর্মচারি, আর আমার প্রধান এবং একমাত্র কাজ হল প্রজাতন্ত্রের মানুষকে সেবা দেওয়া এবং সেটা অবশ্যই কোনরুপ শর্ত ব্যতিরেকে।

আমি লোক প্রশাসনের ছাত্র। লোকপ্রশানে খুব সহজভাবেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীকে সঙ্গায়িত করা হয়েছে যে, “A proud public servant is defined as someone who works honorable, conscientiously, and with dedication.”

আমরা বোধহয় বলতেই পারি, বাংলাদেশ পুলিশ এই করোনা সংক্রমনের সময় নিজেদের কাজের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর উল্লিখিত সঙ্গাকে পরিপূর্ণতা দিতে পেরেছে।

এবার আসি নিজের কথায়। আমি করোনা পজিটিভ। বর্তমানে থানা কোয়ার্টারে আমি রুম আইসোলেশানে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছি। ৫/০৫/২০২০ খ্রি. তারিখে অতি সামান্য উপসর্গ অনুভব করায় একজন সহকর্মীসহ কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা প্রদান করি। ০৭/০৫/২০২০ খ্রি. তারিখ সকালে গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তা আলীম আল রাজী যখন ফোনে আমাকে জানালেন আমার করোনা পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ। মানসিকভাবে বিরাট একটি ধাক্কা খেলেও ভেঙ্গে পরিনি একবারের জন্য কিংবা মনোবল এতটুকু পরিমান কমেনি । তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সুপার স্যারসহ জেলার সকল উর্ধতন কর্মকর্তা এবং সকল সহকর্মীরা যেভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাতে আরো বড়ো কোন অসুখেও প্রাথমিক ধাক্কা খুব সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রথম ২/৩ ঘন্টা একটু ঘোড়ের মধ্যে কাটলেও আমার অসুস্থতার কথা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপালপুর তথা টাঙ্গাইল এবং আমার নিজ এলাকা হান্ডিয়ালের মানুষসহ পুলিশ বিভাগের সকল সহকর্মী, গোপালপুরের UHFPO মহোদয় সহ অন্যান্য বিভাগের সকল সহকর্মীবৃন্দ, পরিচিত সিনিয়র, জুনিয়র এবং আত্মীয়-স্বজন আমার প্রতি ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন তা আমাকে সুস্থ হওয়ার টনিক দিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের আইকন ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) স্যারও ফোন করে স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছেন, যা আমার মনোবলকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। মানুষের দোয়া এবং ভালোবাসা পেলে মৃত্যুকেও বরণ করে নেওয়া যায় খুব সহজেই।

১৪/০৫/২০২০ খ্রি. বিকালের একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করব। বিকালে সহকর্মী এসআই সোহাগ আমাকে ফোনে জানান এক বয়স্ক ভদ্র মহিলা আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন এবং তিনি তার বাড়ির কিছু জিনিস আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। সোহাগ বিভিন্নভাবে বুঝিয়েও যখন ভদ্র মহিলাকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি তখন আমাকে ফোন দিযেছে। ভদ্র মহিলা দূর থেকে হলেও আমাকে একবার দেখবেন, তারপর চলে যাবেন। বাধ্য হয়েই একবার বাসার বারান্দার দাড়িয়ে তাকে দেখা দিতে হল এবং তার আনা জিনিসপত্রগুলোও গ্রহণ করতে হল। বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা, ভদ্র মহিলার স্বামী তার সাথে থাকেন না এবং তার ছেলে তার কথা শুনেন না। এরুপ অভিযোগের ভিত্তিতে একদিন তার ছেলেকে ডেকে আমি একটু বুঝিয়েছিলাম এবং তার পর থেকে তার ছেলে ভদ্র মহিলার কথা শোনেন। উপকার বলতে এটুকুই। লোকমুখে আমার অসুস্থতার কথা শুনেই আমাকে একবার দেখার জন্য থানায় ছুটে এসেছেন। কিন্ত এতটুকু কাজেই ভদ্র মহিলা যে আমাকে এভাবে মনে রাখবেন, তা আমার কল্পনাতেও আসেনি কোনদিন। তবে এটাই প্রাপ্তি এবং এটা করতে পেরেছি শুধুমাত্র পুলিশে চাকুরী করার জন্য। আজ সত্যিই আমি গর্বিত বাংলাদেশের মানুষের অস্থার জায়গার থাকা বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হতে পেরে।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি সবার দোয়ার বদৌলতে যেন এ যাত্রায় যুস্থ হয়ে আবার মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারি।

সবশেষে আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, নিতান্ত জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরে থাকুন, নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন। পুলিশ সদস্যরা বাহিরে আছেন আপনাদের নিরাপত্তার জন্য।

লেখক : অফিসার ইনচার্জ

গোপালপুর থানা, টাঙ্গাইল।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *