ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ শহীদুল ইসলাম পিপিএম-সেবা

জাতি হিসেবে বাঙালি আবেগপ্রবণ এবং সামাজিকভাবে জীবন-যাপন করতে পছন্দ করে। সম্প্রতি বাঙালির আবেগ ও সামাজিক বোধ বিবেচনা পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাবে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। বাঙালি একান্নবর্তি পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গঠনেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যখন বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম ছিলোনা। পিতা-মাতা বা পরিবারের বৃদ্ধ লোকজন পরিবারের সাহচর্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতো। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মত বৃদ্ধাশ্রম দেখা যায় আর এই বৃদ্ধাশ্রমগুলো যে ফাঁকা পড়ে থাকে তাও নয়। জীবন-যাপনের সংজ্ঞা আজ অনেকটাই মডিফাইড হয়েছে। পরিবার বলতে এখন নিজেকে আর স্ত্রী সন্তান এর বাইরের কোন কিছুকে বুঝায় না। যার ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিবারের সংজ্ঞা অনেকটাই পাল্টে গেছে। দিন শেষে তারাও নিজের স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকাকেই জীবনের লক্ষ মনে করছে।  আর এ ভাবেই আমরা দিন দিন একান্নবর্তী পারিবারের বন্ধন থেকে ছিটকে পড়ছি। এ কথা আমরা নির্দিধায় বলতে পারি যে, আমরা ধীরে ধীরে অসামাজিকতা ও অমানবিকতার সংস্কৃতির দিকেই এগুচ্ছি। এই অপসংস্কৃতি সমাজকে গ্রাস করলেও এর ভয়াবহ রূপ এতদিন লক্ষ করা যায়নি। করোনা ভাইরাস নামক মহামারির কারণে আজ আমরা আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা অমানবিক রূপটি দেখতে পাচ্ছি।

কথায় আছে ‘বিপদে মানুষ চেনা যায়’। করোনা আমাদের মুখোশটা পুরোপুরি উন্মোচিত করে দিয়েছে। করোনার মতো এমন মহামারি আমাদের সামনে না আসলে আমরা হয়তো জানতামই না আমরা আসলে কতোটা স্বার্থপর! আপনজনদের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ, দরদ বা ভালোবাসার ধরণটা কতোটা বদলেছে! আপন মা’কে জঙ্গলে ফেলে আসা, পিতাকে রাস্তায় ফেলে পালানো, স্বামীকে ফেলে বউ এর সংসার ত্যাগ এমন অসংখ্য ঘটনার সাক্ষি এখন আমরা। ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস এর গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা যায়, এ দিবসগুলো আসলে সামাজিক মাধ্যমে ‘দেখানো ভালোবাসার’ ফিরিস্তি ছাড়া আর কিছু নয়।

করোনা মহামারিতে মৃতদের ফেলে যখন স্বজন-পরিজনরা পালাচ্ছে, সংক্রমনের আতংকে একে অপরের কাছে যাচ্ছেনা, চিকিৎসকসহ অন্যান্য সম্মুখসারির যোদ্ধাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। মানুষ সাধারণ চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে করোনা আতংকে। তেমনি সময়ে সব ভয়-আতংক অতিক্রম করে এই দুর্যোগে সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। যা অনুকরণীয়। বলা যায় করোনা ভাইরাসের আক্রমনে বিপর্যস্ত জনপদে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানবিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজ করছে পুলিশ সদস্যরা। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস পরম আপনজনকে দূরে সরিয়ে দিলেও দূরে সরে যায়নি পুলিশ।

অপরদিকে মরদেহ নিয়ে স্বজনদের ছোটাছুটি, করোনা ভাইরাস সংক্রমনের শংকায় সাধারণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষজনের হাহাকার, হাসপাতালের দরজায় দরজায় চিকিৎসার জন্য ঘুরে অবশেষে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু! লাশের জানাজায় পাশে স্বজনের অনুপস্থিতি, এমনিসব ভয়াবহ অবস্থা ও অমানবিক আচরণের পাশাপাশি মানবিক পুলিশিং এর খন্ড চিত্র এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।

দায় কি শুধু ডাক্তার-পুলিশদের!

লকডাউন নিশ্চিত করার জন্য ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় ডিউটি করছে পুলিশ। মুখে মাস্ক, শরীরে পিপিই জড়িয়ে মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা, আর অন্যান্য অপরাধ দমন তো আছেই। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পুলিশের পরিশ্রম এবং দায়িত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত (৩১ মে, ২০২০) প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ষোল জন। তবুও পুলিশ সদস্যরা সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরতে চাইছেন, মানুষের সেবা করতে চাইছেন!

এবার স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা। করোনার জন্য স্পেশালাইজ্ড যে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে সেখানকার ডাক্তার-নার্সরা দম ফেলার সময় পাাচ্ছেন না। অবিরত সেবা দিয়ে চলেছেন, রোগীর দেখভাল করছেন, তাদেরও গায়ের ওপর পিপিই’র ভারী আস্তরণ, মুখে মাস্ক, পুরো শরীর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। তবুও ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না তারা।

আর যারা এখনও সুস্থ আছেন, তারা পরিবার থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন। বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তান সবাইকে ফেলে পরে আছেন হাসপাতালে, বা অন্য কোথাও। যারা বাসা থেকে যাওয়া-আসা করছেন, তারাও নিজেদের আলাদা করে রেখেছেন, সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারছেন না, স্বামী-স্ত্রীকে একটাবার জড়িয়ে ধরতে পারছেন না। এই যে আত্মত্যাগ, এসবের প্রতিদানে তারা পাচ্ছেন বাসা ছেড়ে দেওয়ার হুমকি, প্রতিবেশীদের বাজে ব্যবহার। আর এসবের বিনিময়ে জনগণ, মানে আমরা কি করছি?

লকডাউনটাকে জ্বলজ্যান্ত কৌতুকে পরিণত করেছি। নিয়মিত ভীড় জমাচ্ছি হাট-বাজারে, দরকার না থাকলেও। ঈদের শপিং করতে মার্কেটে যাচ্ছি, করোনা ঠেকানোর চেয়ে লিপস্টিক আই শ্যাডো কিংবা পাঞ্জাবী কেনাটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে! গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের কয়েক দফা ঢাকা-বাড়ি-ঢাকা করালেন, তাতে করোনা ছড়ালো। ঈদে আমরা নিজেরাই পা বাড়িয়েছি বাড়ির দিকে, করোনা থাকুক আর যাই থাকুক, মরলে মরব, তাও ঈদ তো গ্রামের বাড়িতে গিয়ে করতেই হবে!

ঘরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, বোঝানো হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে, জরিমানা হয়েছে- আমরা কথা শুনিনি, লকডাউন মানিনি, সামান্য জিলাপি কেনার জন্যেও লম্বা লাইন ধরেছি! দল বেঁধে ঢাকা ছেড়েছে মানুষ, বাড়িতে ঈদ করার জন্য! ফেরিঘাটে উপচে পড়া ভিড়, ঢাকা থেকে বের হবার রাস্তাগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। স্বপ্নের বদলে সঙ্গে করে যে করোনাভাইরাস বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি আমরা, সেটা কেউ বুঝতে পারছে না, পারলেও পাত্তা দিচ্ছে না। আমরা কবে কোন জিনিসটাকে পাত্তা দিয়েছি?

‘ঘুষখোর’ পুলিশ মরছে আমাদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ‘কসাই’ ডাক্তার প্রাণ হারাচ্ছে আমাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে আর আমরা প্রত্যেকে আকাশ থেকে নেমে আসা ফেরেশতা! আমরা বাড়ি যাচ্ছি, আমাদের কোন দোষ নেই! আমাদের কাছে এই বিপদের মধ্যেও আত্মীয়ের বাড়িতে দুটো কাঁঠাল নিয়ে বেড়াতে যাওয়াটা দরকারী কাজ, নতুন জামা সেলাইয়ের জন্যে দর্জির দোকানে লাইন দেওয়াটা অবশ্য কর্তব্য, ছয় মাসের শিশু কিংবা কবুতরের খাঁচা মাথায় নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে ভীড়ের মধ্যে ফেরী পার হয়ে বাড়ি যাওয়াটা ফরজ! এরপরেও আমরা নির্লজ্জের মতো অন্য পেশাজীবীদের সমালোচনা করি, অন্য দেশের মানুষের নিন্দা করি!

ঘরমুখি নারী-পুরুষ

বিপদ যত ঘনিভূত হচ্ছে আমাদের অবহেলা আর খাম খেয়ালিপনাও বাড়ছে তত বেশি। সরকার যতই জনসচেতনা বৃদ্ধি করুক না কেন? বিধি নিষেধ না মেনে আমরা আজ এই আত্মহননের কঠিন খেলায় মগ্ন। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় করোনা ভাইরাস এ পর্যন্ত তিন শতাধিক বার তার জৈবিক চরিত্র পরিবর্তন করেছে এবং কোন প্রকার উল্লেখ করার মতো কোন লক্ষণ ছাড়াই করোনা পজেটিভ হচ্ছে, সেহেতু আমি আপনি অনেক সচেতন থাকলেও কি করে জানবো যে, খুব যতেœ লালন করে একটি মারাত্মক ভাইরাস নিজেই বহন করে নিয়ে যাচ্ছি আমাদের প্রিয় পরিবারের মানুষগুলোর জন্য। হয়তো আমরা এই যুদ্ধেও কোন একসময় জয়ী হবো তখন হয়তো আমি/আপনি বা আমাদের পরিবারের অনেক প্রিয় মানুষগুলো এই পৃথিবীতে আর থাকবো না। তারপরও বলবো আসুন আমরা আরো সচেতন হই। সবাই সুস্থ্য ও সুন্দর থাকি। সবাইকে আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।।

কে বোঝাবে লকডাউন ও ছুটি কী?

করোনায় আক্রান্ত হয়ে পলাশ নামের এক যুবক রাজধানী ছেড়ে চলে যান লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তি গ্রাম ধবলসুতিতে। তিনি ঢাকায় পুলিশের চেকপোস্ট ফাঁকি দিতে পারলেও ধরা পড়েন পাটগ্রাম পুলিশের কাছে। এরপর তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। ধরা পড়ার পর পলাশ পুলিশকে জানান, একটি মাইক্রোবাসে করে কয়েক বন্ধুর সঙ্গে ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। একইভাবে করোনা উপসর্গ নিয়ে ঢাকা থেকে শ্বশুরবাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে গিয়ে মারা গেছেন শুকুর আলী। করোনার উপসর্গ নিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে যান পারভীন বেগম নামের এক নারী। সেখানে তাঁকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকেও তিনি পালিয়ে যান। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এভাবে ঢাকার প্রবেশ পথ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিনই ঢাকা ছাড়ছে মানুষজন। মালবাহী ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন পরিবহনে গাদাগাদি করে তারা ছুটছে বাড়িতে। তাতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছাড়াও পিকআপ, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঢাকা থেকে পুলিশের চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে অবাধে প্রবেশ ও বের হচ্ছে মানুষ। পরিবহন ও ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার কাছাকাছি গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকায় মানুষজন যাওয়া-আসা করছে বেশি। ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যে যাচ্ছে তারা। অনেকে মোটরসাইকেলেও যাতায়াত করছে। তবে কাউকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে না।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দেড় মাস আগে ঢাকায় প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ২৬ মার্চ থেকে বাস, লঞ্চ, ট্রেনসহ সব ধরণের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ আছে। ঢাকার চারটি প্রবেশপথে ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি করছে পুলিশ। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কেউ যাতে ঢাকায় প্রবেশ ও ঢাকা থেকে বের হতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রয়েছে। ঢাকায় প্রবেশের সব পথেই বাধা থাকা সত্ত্বেও মানুষ ও যানবাহন ঢুকছে ও বের হচ্ছে। কৃষি ও জরুরী পণ্য পরিবহনের অনুমতি থাকলেও সাভার থেকে ইট, বালুবাহী ট্রাক বিভিন্ন অজুহাতে প্রবেশ করছে ঢাকায়। সেই সঙ্গে খোলা পিকআপে করে ঢাকার বাইরে থেকে মানুষ ঢুকছে ঢাকায়।

আমরা নিজেরাই এক একটা ভাইরাস,

যারা সংক্রমিত করছি অপরকে

করোনা টেস্ট করানো একটি জটিল অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। টেস্ট করার ক্যাপাবিলিটির তুলনায় অনেক বেশী সন্দেহজনক রোগী, যারা টেস্ট করানোর জন্য দীর্ঘ লাইনে দাড়াচ্ছে। এ কারণেই করোনা টেস্টের জন্যে রেফারেন্স (মামা/চাচা) লাগছে, অসুস্থ রোগীকে নিজে যেতে হচ্ছে টেস্ট করাতে এমনকি পজিটিভ রোগীকে আবার যেতে হচ্ছে পরবর্তীতে ১৪ দিন পর অবস্থা জানতে। এই আসা-যাওয়ার মাঝে করোনা ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। করোনা টেষ্টের প্রতিটি ধাপ জটিল এবং বিপজ্জনক। অনেক উচ্চশ্রেণীর মানুষের জন্যেও কঠিন কাজ। নিম্নশ্রেণীর পক্ষে এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে রোগ নির্ণয় করানো প্রায় অসম্ভব, তাই তাদের বেশীর ভাগ সম্ভবতঃ কোন টেস্টে অংশগ্রহণ করছে না অথবা করতে পারছে না। করোনা আক্রান্ত  হলেও চিকিৎসা করছে না এবং কষ্ট হলেও সময়ের ব্যবধানে সুস্থ হয়ে উঠছে।

রোগীকে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের জন্যে এবং পরবর্তীতে রোগমুক্তি নিশ্চিত হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় টেস্টের জন্যে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সংক্রমনের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। রোগীর অবস্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা গেলে রোগীর হোম আইসোলেশন সুনিশ্চিত হবে এবং অন্যদের সংক্রমনের সম্ভাবনা কমবে।

স্বামীর মরদেহ নিয়ে একজন স্ত্রীর কিংবা

বাবার মরদেহ নিয়ে সন্তানের রাতভর ছুটোছুটি

আবদুল হাই (৬৫) অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। তার মরদেহ নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো অ্যাম্বুলেন্স। তখন রাত ১১টা। অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ শুনে হাইয়ের আপন ভাই, চাচাতো-জেঠাতো ভাইয়েরা বেরিয়ে আসেন। প্রতিবেশীরাও হাজির।

না, তারা কেউ লাশ নামাতে আসেনি। এসেছে যেন কেউ লাশটি নামাতে না পারে! সবাই একবাক্যে বলে দিলো, আবদুল হাই করোনায় মারা গেছে। তার লাশ গ্রামে দাফন করা যাবে না। হাইয়ের স্ত্রী ফিরোজা এবং ছেলে শাহজাহান বারবার চেষ্টা করেও বোঝাতে পারেন না। লাশ নামাতে উদ্যত হলে উপস্থিত লোকজন তাদের ওপর চড়াও হয়। ফিরোজা কান্নাকাটি শুরু করলেন। আকুতি জানালেন, গ্রামের  কবরস্থানে  জায়গা না হলে নিজের ভিটেমাটিতে স্বামীকে কবর দেবেন। ফিরোজার কান্নায় কারও মন গললো না। উল্টো উত্তেজিত লোকজন মা-ছেলেকে এসে মারপিট শুরু করলো। এই ‘বীরপুরুষের’ দল গ্রাম রক্ষা করতে চায়। সাফ জানিয়ে দেয়, মরদেহ এখানে দাফন হবে না!

মা-ছেলে অ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে চলে যান আরেক গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি। সেখানেও প্রত্যাখাত হন। এভাবে রাত ২টা বেজে যায়। একটি ভ্যানগাড়ি জোগাড় করেন শাহজাহান। অ্যাম্বুলেন্স থেকে বাবার লাশ নামিয়ে ভ্যানে তোলেন। ছেলে ভ্যান টানছেন, বাবার মরদেহের পাশে মা বসে আছেন। ঘটনাটি ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। আবদুল হাইয়ের বাড়ি পৌরসভার সাতুতি গ্রামে। নানা গ্রাম ঘুরে হাইয়ের মরদেহ নিয়ে ভ্যানটি থামে থানার সামনে।

গভীর রাতে থানায় এ খবর গেলে পুলিশ ছুটে আসে। থানার ওসি বোরহান উদ্দিন তার টিম নিয়ে আবদুল হাইয়ের মরদেহ নিয়ে সাতুতি গ্রামে যান। ততক্ষণে ফজরের আযান হয়ে গেছে। পূবে ভোরের আলো ফোটার আগে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উপস্থিতিতে পৌরসভার পশ্চিম দাপুনিয়ার কবরস্থানে কবর খনন করা হয়। পুলিশ জানাজা পরিয়ে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করে।

সাবাশ পুলিশ। জয় হোক মানবতার। করোনার মহামারীতে পুলিশ তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবিক পুলিশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামীর মরদেহ নিয়ে একজন স্ত্রীর কিংবা বাবার মরদেহ নিয়ে সন্তানেরা রাতভর ছুটোছুটির এই ছবি কল্পনা করলেই শিউরে উঠি। সাতুতি গ্রামের এই কাপুরুষেরা কোনোদিন মরবে না? সামনে আরও কত ভয়ংকর অমানবিকতা অপেক্ষা করছে কে জানে!

অমানবিক, অন্যায় আচরণ

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি চাহিদা হচ্ছে চিকিৎসা। একটি দেশের অর্থনৈতিক বা শিক্ষার দিক দিয়ে যতই সফল হোক না কেন চিকিৎসা ব্যবস্থা যদি ভঙ্গুর হয় তাহলে সে দেশের প্রতিটি জনগণই হুমকির মুখে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও চিকিৎসক যেকোন একটির অনুপস্থিতিই চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। একটি আরেকটির পরিপুরক। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্ভব। চিকিৎসা সরঞ্জামাদি যেমন থাকতে হবে তেমনি দক্ষ চিকিৎসকও থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসক যখন নিজের জীবন বাজি রেখে, নিজের সদ্যজাত সন্তান অথবা সন্তান সম্ভবা হয়েও নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে, নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে আমাদের জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে অবতীর্ণ ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁদের প্রতি আমরা অমানবিক আচরণের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ।  

অসংখ্য ঘটনার মাঝ থেকে এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো এ পর্যায়ে।

ঘটনা-১

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় এক নারী চিকিৎসককে বাসা থেকে বের করে দিয়েছেন বাড়ির মালিক। ভুক্তভোগী ওই নারী চিকিৎসক আসমা আক্তার সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে গাইনি বিভাগে কর্মরত আছেন। তার স্বামীর বাড়ি কুমিল্লায়। ডা. আসমা আক্তার বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার নির্দেশিত সব নিয়ম কানুন মেনে সার্বক্ষণিক রোগীদের সেবা দিয়ে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে সোনাইমুড়ী উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে রফিক মাস্টারের বাড়ির মোহাম্মদ আলীর বাসায় তার ছোট বোনের পরিবারের সঙ্গে তিনি থাকেন।

১৪ এপ্রিল বিকেলে আমার ছোট বোন আমাকে বলে, আমি যেন আর তাদের বাড়িতে না যাই। ওইদিন সন্ধ্যার সময় আমি বোনের বাড়িতে যাওয়ার পথে বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আলী আমাকে অপমানজনক কথা বলেন এবং ওই বাসায় যেতে নিষেধ করেন। বাড়ির মালিকের ধারণা তার বাইরে যাওয়া-আসার কারণে তারা করোনা আক্রান্ত হবেন। তিনি আরো জানান, যানবাহন বন্ধ থাকার কারণে কুমিল্লায় গিয়ে স্বামীর সঙ্গে থাকার সুযোগ নেই। তাই বর্তমানে সোনাইমুড়ীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের একটি কক্ষে কোনো রকমে থাকছি। ওই চিকিৎসকের স্বামী জাহিদুল হাসান কুমিল্লা ডায়বেটিক হাসপাতালের জুনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি জানান, বিষয়টি অমানবিক। এ সংকট মূহুর্তে চিকিৎসকরা নিজের জীবন বাজি রেখে আক্রান্ত মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় একজন বাড়ির মালিকের এমন অমানবিক আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।

ঘটনা-২

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করেন সাবিহা সুলতানা। রমনার একটি বাসায় তিনি ভাড়া থাকতেন। দুদিন আগে ওই হাসপাতালের দুজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এরপর কম্পিউটার অপারেটর সাবিহা সুলতানাকে ডেকে নিয়ে বাসা ছেড়ে দিতে বলেন বাড়িওয়ালা।

সাবিহা সুলতানা বলেন, ‘রমনা এলাকার একটি বাসায় আমি এবং আরেকজন নারী ভাড়া থাকতাম। দুদিন আগে আমাদের হাসপাতালের দুজন ডাক্তারের করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। কাজ শেষে রাতে আমি বাসায় ফিরি। তখন বাড়িওয়ালা আমাকে ডেকে নেন এবং বলেন, আজ রাতেই যেন আমি বাসা ছেড়ে দিই। তখন আমি বললাম, সকালেই আমি বাসা ছেড়ে চলে যাব। পরে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় আমি চলে এসেছি।’

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সিরাজউদ্দিন। তিন দিন আগে জানতে পারেন, তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। বর্তমানে একটি হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন। সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘রাজধানীর শান্তিগর এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে আমি বসবাস করি। পেশাগত কাজে আমাকে প্রতিদিন বাড়ির বাইরে আসতে হয়। হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দিতে হয়। রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমার করোনা ভাইরাস পজিটিভ। আমার স্ত্রী, আর দুই সন্তান ফ্ল্যাটে অবস্থান করছে। ঘর থেকে তাঁরা বের হয় না। তবুও আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা অন্য ফ্ল্যাট মালিকদের চরম দুর্ব্যবহারের শিকার।’

কেবল এই দুজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের বহু চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ জরুরী সেবায় নিয়োজিত পেশার মানুষ অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার আতঙ্কে বাড়িওয়ালা, ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা তাঁদের বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য চাপ তৈরি করছেন। নানা প্রকারের কটূক্তিও করছেন।

ময়মনসিংহে এক নারী চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্তের পর অনেক জোর করেই তাঁদের বাসা থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। হাসান নামের একজন চিকিৎসক ফেসকুকে লিখেছেন, তাঁকে বাড়িওয়ালা বাসা ছাড়তে বলেছেন। এমন ঘটনা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। কেউ জানাচ্ছে কেউ বা চুপ করে আছেন। ‘চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়িওয়ালারা বাসায় রাখতে চাইছেন না। সারা দিন চিকিৎসা সেবা দিয়ে যখন একজন স্বাস্থ্যকর্মী বাসায় যাচ্ছেন, তখন বাড়িওয়ালা হুমকি দিচ্ছেন, বাসায় থাকতে পারবেন না। অনেকে থাকতে পারছেন না বাসায়। অনেক বাড়িওয়ালা বলছেন, আপনি করোনাভাইরাসের টেস্ট করে আসেন। আপনার করোনা হয়েছে কি না নিশ্চিত হন, ইত্যাদি নানা কথা বলছেন।

ঘটনা-৩

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) একজন চিকিৎসকের দেহে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এই খবর পাওয়ার পর তাঁর ভাড়া বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন স্থানীয় লোকজন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা যে ভবনে থাকি, সেই ভবনের আমাদের একজন সহকর্মীর করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। ওই ভবনে আরও কয়েকজন চিকিৎসক থাকেন। স্থানীয় লোকজন তখন ওই বাসায় তালা ঝুলিয়ে দিতে উদ্যোগী হন, খুবই খারাপ আচরণ করেন। পরে প্রশাসনের লোকজন বাসাটি লকডাউন ঘোষণা করে।’

‘চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কোনো কোনো স্বাস্থ্যকর্মী বাসা থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, রূঢ় আচরণের শিকার হচ্ছেন। একসময় মানুষ মনে করতেন, ফ্ল্যাটে একজন ডাক্তার থাকলে অনেক সহায় হবে। কিন্তু তাঁরাই আবার মনে করছেন, ফ্ল্যাটে একটা ডাক্তার থাকা মানে ঝুঁকি। এই মনোভাবের কারণ, করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের কুসংস্কার বা স্টিগমা। সেখান থেকে এই রূঢ় আচরণ করছেন বাড়িওয়ালা কিংবা ফ্ল্যাটের অন্য লোকজন। আমরা জানি, কীভাবে করোনাভাইরাস ছড়ায়। তারপরও আমাদের অনেকে অন্যায় আচরণ করছেন।’

রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালের ল্যাব টেকনোলোজিস্ট জুয়েল হোসেনকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় ভাড়া থাকতেন তিনি। জুয়েল হোসেন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি যে হাসপাতালের ল্যাবটেকনোলোজিস্ট, সেই হাসপাতালের চার-পাঁচজনের করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়েছে। এই খবর শুনে বাড়িওয়ালা আমাকে আর বাসায় ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে আমি এখন অন্যত্র বসবাস করছি।’

স্বাস্থ্যকর্মীসহ জরুরী সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যেসব লোকজন এই ধরণের অন্যায় আচরণ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘কাউকে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করা যাবে না। কেউ যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন, তখন তিনি আইসোলেশনে থাকবেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীসহ কাউকে যদি চলে যেতে বলা হয়, রূঢ় আচরণ করা হয়, সেটা বেআইনি। ডাক্তার, নার্স, পুলিশসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা তো আর শখে বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। তাঁরা তো মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনায় কাজ করছেন। এসব মানুষকে যাঁরা হয়রানি করছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ করছেন।’

চিকিৎসাসেবাসহ জরুরি সেবায় যাঁরা নিয়োজিত, যাঁরা রূঢ় ও অন্যায় আচরণের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের কথা শোনার হটলাইন নম্বর চালুর পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘এই বিশেষ পরিস্থিতিতে এ অন্যায় আচরণ প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট আইনি সুযোগ রয়েছে। সংক্রামক আইনে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনা-৪

এই ঘটনাটি ডাক্তার সম্পর্কিত না হলেও একই ধরণেরই বটে। আমরা কতটা অমানবিক হলে এ ধরণের কাজ করতে পারি তা বলে বুঝানো অসম্ভব।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নাজমুল নামে করোনায় আক্রান্ত এক যুবককে মধ্যরাতে মারধর করে রাস্তায় বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বাড়ির মালিকসহ স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার রূপসী বাগবাড়ি এলাকায় মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। মারধর করে তাড়িয়ে দেয়ার পর নাজমুল একটি মসজিদের সামনে থাকা একটি রিকশায় বসে কান্নাকাটি করতে থাকেন। এসময় তার পরনে ছিল পিপিই গাউন। এ অবস্থাতেই রাস্তায় বের করে দেয়া হয় তাকে। পরে তাকে উদ্ধারে তৎপরতা চালায় থানা পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসন। নির্যাতনের শিকার করোনা রোগী নাজমুল ময়মিনসিংহের বাসিন্দা আবু সিদ্দিকের ছেলে।

রুপগঞ্জের রূপসী বাগবাড়ি এলাকার নূর হোসেন নূরার বাড়িতে ভাড়া থেকে তিনি স্থানীয় সিটি গ্রুপে চাকরি করার পাশাপাশি লেখাপড়া করছেন। নাজমুলের জ্বর, সর্দিসহ করোনার নানা উপসর্গ দেখা দিলে ৩ মে উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগে তার নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। কিন্তু তার কোনো উপসর্গ ছিল না। তারপরও চিকিৎসকের পরামর্শে বাসাতেই ছিল। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রাতে বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু লোকজন এসে জোর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এই অবস্থায় সে মীরবাড়ি মসজিদের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এটা খুবই অমানবিক একটি কাজ।

এখানেই শেষ নয়। এতো গেল একটি বিষয়ের কিছুটা বর্ণনা। আমাদের সমাজের প্রতিটা স্তরে আমরা কতটা অমানবিক হতে পারি তরই বাস্তব চিত্র দেখবো আমরা আরো। প্রতিটা স্তরেই রয়েঝে বুক ফাটা আর্তনাদ। রয়েছে বিবেকহীনতা আর মনুষত্বের পরাজয়। আমরা যে কেবল রক্তে মাংসে মানুষ তার আরো কিছু উদাহরণ দেখবো।

করোনায় যেভাবে উপেক্ষিত বাবা মাসহ নিকটাত্মীয়

আগেই বলেছিলাম করোনাই বাবা মা-সহ নিকটাত্বিয়দের সাথে কেমন আচরণ করছি আমরা। কিছুটা দূরের আত্মিয়দের কথা নাইবা বললাম, নিজের বাবা মা? ‘র্নির্মমতা কতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে, ভেবে অবাক হতে হয়। 

আমরা কি এক অভিশপ্ত প্রজন্ম!

আমাদের মা-বাবারা নিজেদের যতটুকু সম্পদ ছিল তা বিক্রি করে আমাদের ডজন খানিক ভাই বোনের পড়ালেখার খরচ যুগিয়েছেন। জমি বিক্রি শেষে মা তাঁর বিয়ের গহনাটুকুও বিক্রি করতে কার্পণ্য করেননি।

তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সন্তানরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে। আলহামদুলিল্লাহ্, তাই হয়েছে; আমরা সবাই কম-বেশী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি। আমার মনে হয় আমার সমসাময়িক বেশীরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এ বক্তব্যটি প্রযোজ্য। আলহামদুলিল্লাহ্, আমাদের মা-বাবারা আমাদেরকে একটা ভালো/সন্তোষজনক অবস্থানেই দেখে গেছেন।

এখন আমরা কি করছি? আমরা আমাদের এক বা দুই সন্তানেরা ভবিষ্যৎ ইস্পাত দিয়ে নির্মাণের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছি। পড়ালেখা করানোর পর এমন পরিমাণ সম্পদ রেখে যেতে চাচ্ছি যাতে ওদের ৩/৪ জেনারেশনের কোন সমস্যা না হয়!!! এজন্য চুরি-ডাকাতি, প্রতারণা, শোষণ, জুলুম, নির্যাতন যা প্রয়োজন তাই করছি!

ফলাফল কি দেখছি? সিংহভাগ ক্ষেত্রে (বিশেষ করে অবৈধ উপার্জনকারীদের) ঐ সন্তানরা হচ্ছে অমানুষ, কুলাংগার! মা-বাবাকে প্রয়োজনে লাঞ্ছিত করে নেশার টাকা নিচ্ছে, চোখের সামনে মাতলামি করছে, ব্যাভিচারী হয়ে উঠছে, ব্ল্যাকমেইলিং করছে, খুন-ধর্ষণের সাথে জড়িয়ে পড়ছে! মা-বাবারা বুক চাপড়াচ্ছেন!

এহেন ঘটনা এখন ঘরে ঘরে! তাই জীবন যাপনের ধরণ নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ; তা না হলে এই ধরণই একদিন আমাকে/আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সম্পদ উপার্জন কোন অপরাধ নয়, কিন্তু শুধু সম্পদের জন্য নৈতিকতা বিসর্জন! মানুষকে ঠকানো! মানুষকে কষ্ট দেয়া! মানুষকে শোষণ! কোনদিন ভালো ফল দিবে না, শতভাগ নিশ্চিত।

করোনায় ভালো নেই পরিবারহীন বাবা-মায়েরা

হাড়-মাংস পানি করে সন্তানের জন্ম দেন মা। সন্তানের জন্য সহ্য করেন অমানুষিক কষ্ট। বাবার ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়। সন্তানকে মানুষ করতে বিসর্জন দেন নিজের জীবনের সব আরাম-আয়েশ। কিন্তু বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পর সেই সন্তানের কাছেই মা-বাবা হয়ে পড়েন অচ্ছুৎ, বোঝা। অনেকে জন্মদাতা পিতা-মাতাকে বোঝা মনে করে রাস্তায় ফেলে যায়। ফলে, শেষ বয়সে এসব মানুষ পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে।

শুধু গরিব-অসহায় পরিবার না সমাজের সচেতন ও উচ্চবিত্তের সন্তানরাও করছেন এই ধরণের কাজ। সম্পত্তির লোভে কিংবা রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেক সন্তান বা আত্মীয়রা বয়োজ্যেষ্ঠ এসব মানুষকে রাস্তায় রেখে যায়। এমন ঘটনা গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসে।

গত বছর প্যারালাইজড আক্রান্ত এক বৃদ্ধকে ধানমন্ডিতে ফেলে যায় পরিবার। ডেমরায় তিনি নিজে দুটি বাড়ির মালিক ছিলেন। এছাড়া দূর আত্মীয় পরিচয়ে এক বৃদ্ধাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায় তার মেয়ে। তার আগে এক নারীর ব্যাংকে ৪০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত কুক্ষিগত করতে তাকে রাস্তায় ফেলে যায় পরিবার।

এমন অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত চারপাশে ঘটছে। এসব অসহায় মানুষের চিকিৎসা ও ভরণপোষণ করে রাজধানীর কল্যাণপুরে অবস্থিত চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার (বৃদ্ধ বৃদ্ধা ও প্রতিবন্ধী শিশু আশ্রয় কেন্দ্র) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সেখানে ৬৬ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও ছয়জন প্রতিবন্ধী শিশু আছে। আগে সাধারণ মানুষের সহায়তা পেলেও করানোভাইরাসে সেটা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে বৃদ্ধাশ্রমের অসহায় মানুষগুলো।

প্রতিষ্ঠানটিতে যারা থাকছে তাদের বেশিরভাগ পরিবারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার। কাউকে রাস্তায় ফেলে রাখার পরে সেখানে ঠাঁই হয়েছে। আবার কাউকে পরিচয় গোপন করে পরিবারের সদস্যরা রেখে গেছেন। কাউকে আবার মানবিক কারণে বাড়ির কুঁড়ে ঘরে থেকে এখানে এনে রাখা হয়েছে। বয়সের ভারে সবাই বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এসব মানুষকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার। এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক অসহায় মানুষ এখানে থেকেছে। অনেকে মারা গেছে আবার অনেক সুস্থ করে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। আবার প্রশাসনের মাধ্যমেও অনেকে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ফেলে যাওয়া বাবা-মাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মিলটন সমাদ্দার বলেন, সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য নিজের উদ্যোগে ছয় বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলাম। এখানে যারা আছে সবাই অসহায়, অসুস্থ ও বৃদ্ধ। নিজের পরিবারের মতোই তাদের যত্ন করি। আমার স্ত্রীও সব সময় তাদের তত্ত্বাবধান করে। বর্তমানে ৬৬ জন অসহায় অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও ছয়জন প্রতিবন্ধী শিশু এখানে রয়েছে। এসব মানুষের নিরাপদ বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, বিনোদনসহ সকল সুযোগ সুবিধা আমরা দিয়ে থাকি। অনেকে আমাদের সেবামূলক এই কাজে এগিয়ে আসেন।

ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুভুতি ছাড়া কেউ সুশিক্ষিত হতে পাড়েনা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া সবচেয়ে বড় স্মার্টনেস। কারণ মৃত্যুর পরে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে। বাবা মায়ের হক, আত্মীয় স্বজনের হক, প্রতিবেশির হক আদায়ের বিষয়গুলি তথাকথিত উচ্চ শিক্ষার বইতে থাকেনা। এ বিষয়গুলি পাওয়া যায় পবিত্র কোরআনে। কিন্তু ঐ সব শিক্ষিত লোকের কোরআনকে জানার ও বোঝার সময় হয়না। উচ্চশিক্ষার নামে আমাদেরকে পৃথিবীর গোলাম বানিয়ে ফেলা হয়। টাকার গোলাম বানিয়ে ফেলা হয়। আট ঘন্টার পরিবর্তে বার থেকে চৌদ্দ ঘন্টা পরিশ্রম করে থাকি সাকসেস নামক বস্তুটিকে পাওয়ার জন্য। বলা হয়ে থাকে “টাইম ইজ মানি”। কোথায় পরিবার, কোথায় আত্মীয় স্বজন খোঁজ নেয়ারও সময় নেই। এমন একটা ব্যবস্থার মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি যেখানে পারিবারিক বন্ধন ঠুনকো একটা ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানবিক মূল্যবোধ উধাও হয়ে গেছে। টাকার জন্য সবই করা সম্ভব। ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে টাকার প্রয়োজনটা খুবই সীমিত। তবুও আমরা সবাই শুধু টাকার পিছনেই ছুটছি।

করোনা কালের নিষ্ঠুরতা

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খাজুরা গ্রামে করোনার উপসর্গ নিয়ে ১১ এপ্রিল একজন ব্যক্তি মারা যায়। মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবী সংঘঠনের লোকজন কবর খননের কাজ করলো। বাঁশ কাটা ও লাশ বহন করলো পুলিশের ঝিনাইদহ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার, ওসি সাহেব ও পুলিশের সদস্যরা। জানাজায় কোনো মাওলানা না পেয়ে সদর উপজেলার ইউএনও মহোদয় জানাজা পড়ালেন। মুসুল্লি বলতে ঐ দায়িত্বরত পুলিশের কর্মকর্তা ও লাশ নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা। স্বেচ্ছাসেবীরা যখন দায়িত্ব পালন করে চলে যাবে, সম্মানিত এলাকাবাসী তাদের বাধা দিল, যেন তাদের গ্রাম দিয়ে তারা না যায়, কারণ যে গ্রাম দিয়ে তারা যাবে সেখানে নাকি ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। পরে পুলিশের  সহায়তায়  তাদের  নিরাপদে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বিদায় বেলা মরহুমের এক ভাই ব্যতীত কোন আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী বা কোন হুজুর ছিল না। মৃত্যু আমাদের সবার হবে কিন্তু অমানুষ হয়ে যেন মৃত্যু বরণ না করি। এই মৃত্যু আমরা চাই না।

চট্টগ্রামে বাবার লাশ হাসপাতালে ফেলে পালালো ছেলেরা

মাত্র তিনদিন আগেই মা দিবস ঘিরে ফেসবুকে কতোই না আবেগী স্ট্যাটাস দেখেছি সবার! আর সামনের মাসেই বাবা দিবস। তখনও হয়ত বাবাকে দিয়ে সবাই স্ট্যাটাসের ঝড় তুলবেন। কিন্তু মা দিবস-বাবা দিবস এলেই ফেসবুকে অহরহ স্ট্যাটাস দিলেও এমনও সন্তান আছে যারা হাসপাতালে বাবার লাশ ফেলে পালিয়ে যায়। এমনই ঘটনা ঘটলো চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে। শুধু মৃত ব্যক্তির ছেলে নয়, এমনকি তার স্বজনেরাও পালিয়ে গেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এটিএম রেজাউল করিম। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. এনামুল কবির তানভীরের কাছে মৃত ব্যক্তির ছেলে এসে জানালেন তার বাবার অবস্থা শংকটাপন্ন। তখন ডা. তানভীর আমাদের আরেক মেডিকেল অফিসার ডা. রিয়াস মুনতাসির ও নার্সরা মিলে রোগীর হিস্ট্রি নিয়েছেন। হিস্ট্রি নিয়ে চিকিৎসকরা মৃত ব্যক্তির ছেলেকে জানালেন তার পিতা মৃত। তখন তারা কনফার্ম হতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী ইসিজি করানোর জন্য তাকে ইসিজি কক্ষে নিয়ে ইজিসি করলেন। মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যে ইসিজি রিপোর্ট নিয়ে দরজার বাইরে এসে ডা. তানভীর দেখেন স্বজনেরা কেউ নেই। যাওয়ার সময় বৃদ্ধকে বহনকারী হুইল চেয়ারও নিয়ে গেছে তারা। পরে আমরা বিষয়টি থানাকে জানাই। এরপর এক পুলিশ কর্মকর্তা লাশটি তার মামার বলে শনাক্ত করে গ্রামের বাড়ি পটিয়া নিয়ে যান।

পার্কভিউ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. এনামুল কবির তানভীর তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘গোটা বিশ্বের এই ক্রান্তিলগ্নে যখন ডাক্তারদের ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা বলা হচ্ছে, সুপার হিরোর তকমা দেওয়া হচ্ছে, অথচ বলা বাহুল্য, দেশের প্রতিটি সন্তানে কাছে তাদের বাবারা সুপার হিরো, একটি পরিবারের প্রধান সেনাপতি যখন ঐ বাবাটার নিথর দেহ স্ট্রেচারে পড়ে আছে, অবাক দৃষ্টিতে একটিবার যখন ঐদিক তাকিয়ে দেখি, তখন বুকের ভেতর বড্ড ফাঁকা মনে হয়। গলার কাছে কান্নার দমক এসে গলাটা ভারী হয়ে উঠে।’

‘আমাদের চলার পথে যে মানুষটার অবদান থাকে নীরবে, অব্যক্ত, অকৃত্রিম ভালোবাসায় ভরা, একজন সত্যিকারের সুপার হিরোর মতো তিনিই আমাদের বাবা। পৃথিবীর সকল বাবারা অনেক ভালো থাকুক। লা-ওয়ারিশ হয়ে হাসপাতালে স্ট্রেচারে পড়ে না থাকুক। সন্তানের প্রচন্ড ভালোবাসায় সিক্ত থাকুক বারো মাস বাবাদের নরম দয়াদ্র হৃদয়.. লিখেছেন তরুণ ওই চিকিৎসক।

ভয়ে স্বামীর মরদেহ থেকে দূরে স্ত্রী, এগিয়ে এল পুলিশ

তখন গভীর রাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা। রাজধানীর গুলিস্তান মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের মূল গেটের সামনে পড়ে আছে একটি নিথর দেহ। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন লোকটার স্ত্রী। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয়ে কাছে যাচ্ছেন না। অশ্রুমাখা চোখে অসহায় নারীটি এদিক ওদিক তাকিয়ে আছেন।

সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুর রউফ বাহাদুরের নজরে পড়ে ঘটনাটি। যারা করোনা নিয়ে কাজ করছে- এমন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ফোন করেন তিনি। তবে  তাদের কোনো  সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে নিজেই উদ্যোগী হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জানা যায় লোকটির করোনা পজিটিভ।

ওই লোটির নাম মো. ইসরাফিল (৫২)। বাড়ি বরিশালের আগোইলঝাড়া থানায়। বাবা আইয়ুব আলী। পল্টন মডেল থানার সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের (পুলিশ ফাড়ি) এসআই মো. আব্দুর রউফ বাহাদুর ও এসআই সোলায়মান গাজী তাকে মেডিকেলে নেন। এসআই আবদুর রউফ বাহাদুর  বলেন, ‘লোকটাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে আমি অনেক জায়গায় ফোন করি, যারা করোনা নিয়ে কাজ করছে তাদের সঙ্গে। তবে অনেক রাত হওয়ায় কোনো সাহায্য পাইনি। পরবর্তীতে আমার সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে নিজের আর্থিক ব্যবস্থায় লাশ ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার ব্যবস্থা করি। রিপোর্ট পাই তিনি করোনায় মারা গেছেন।’

এ বিষয়ে মৃত ব্যক্তির ভাই রাসেল বলেন, ‘আমার ভাই অনেকক্ষণ রাস্তায় পড়েছিল। কেউ ভয়ে কাছে যায়নি। পুলিশ স্যার তাকে হাসপাতালে নেয়। আমাদের খবর দেয়। এখন লাশ দেশে নিয়ে যাওয়ার মতো টাকা নেই আমাদের। তাই মেডিকেলে বসে আছি। শুনলাম, সরকারই দাফনের ব্যবস্থা করবে।’

ফরিদপুরে লাশের কাছে কেউ আসেনি দাফন করল পুলিশ

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ফরিদপুরের আইভি আক্তারের (২২) লাশ দাফন নিয়ে চলে নানা বিপত্তি। স্বামীরবাড়ি রাজবাড়ীতে লাশটি নিয়ে যাওয়া হলে স্থানীয়রা লাশ দাফনে বাধা প্রদান করে। পরে আইভির বাবার বাড়িতে লাশ আনা হলে সেখানেও ঘটে একই ঘটনা। স্থানীয়রা প্রবল আপত্তি জানায় তাদের এলাকায় লাশ দাফনে। স্থানীয় এলাকাবাসী তো নয়ই, লাশের কাছে আসেনি আইভির স্বজনরাও। কিন্তু লাশ দাফনে কেউ এগিয়ে না এলেও খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক এগিয়ে আসে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ। থানার ওসি মোর্শেদুল আলমের নেতৃত্বে আইভির লাশ দাফন করা হয়। জানা গেছে, ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার মাচ্চর ইউনিয়নের দয়ারামপুর গ্রামের আদেল মিয়ার কন্যা আইভি আক্তারের বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী জেলায়। গত এপ্রিল মাসে রাজবাড়ীতে স্বামীর বাড়িতে অবস্থানকালে করোনায় আক্রান্ত হয় আইভি। ২০ এপ্রিল আইভির স্বামী বাবুল শেখ ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে তাকে ভর্তি করান। এরপর আইভি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। গত ৩ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আইভি। তাকে দাফনের জন্য স্বামীর বাড়ি রাজবাড়ী জেলায় নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার লোকজন লাশ দাফনে বাধা প্রদান করে। স্থানীয়দের প্রবল বাধার মুখে বাধ্য হয়ে আইভির লাশ তার বাবার বাড়ি ফরিদপুরের দয়ারামপুর গ্রামে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এখানেও স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে লাশটি দাফনে। আইভির লাশটি দ্রুত নিয়ে যাওয়ার জন্য স্থানীয়রা চাপ সৃষ্টি করলে বেশ অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয় আইভির স্বজনদের। এ সময় কোতোয়ালি থানা পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। কোতোয়ালি থানার ওসি মোর্শেদুল আলম স্থানীয়দের বুঝিয়ে লাশটি দাফনের ব্যবস্থা করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয়রা কেউই লাশটি দাফনে এগিয়ে আসেনি। পরে ওসির নেতৃত্বে একজন এসআই ও ৪ কনস্টেবল আইভির লাশটি রবিবার রাতে দাফন সম্পন্ন করেন। কোতোয়ালি থানার ওসি মোর্শেদুল আলম জানান, আইভি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে থাকা তার স্বামী ও তার দেবর-ননদেরা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি। রাজবাড়ীর লোকজন তাদের বাড়িতে উঠতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে তারা আইভির বাবার বাড়িতে চলে আসে। সেখানেই তারা ছিলেন। যদিও আইভির বাবা আদেল মিয়ার বাড়িটি লকডাউন করা হয়। সেই সময় থেকে তাদের খাদ্য সামগ্রীসহ সব ধরণের সহায়তা করে পুলিশ।

অ্যাম্বুলেন্সে ১৬ ঘণ্টায় ৬ হাসপাতালে ছোটাছুটি

অতঃপর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু

কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল মো. আলমাছ উদ্দিনের। আগেও একবার মাস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসকদের কাছে ছবি পাঠানোর পর তাঁরা জানিয়েছিলেন লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে আবারও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। সকাল ৮টা থেকে বাবা আলমাছ উদ্দিনকে নিয়ে সন্তানেরা পাঁচটি হাসপাতালে ঘুরেছেন। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের চিকিৎসা ছাড়াই মারা যান তিনি।

আলমাছ উদ্দিনের মেয়ের সঙ্গে কথা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওই নারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সকাল ৮টায় বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় আমাদের বাসাবোর বাসা থেকে। অনেকগুলো হাসপাতাল ঘুরে রাত ১২টার দিকে অনেক দেনদরবারের পর একটি হাসপাতাল নিল। কিন্তু বাবাকে বাঁচানো গেল না। আমার বাবা একরকম বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। কী যে কষ্ট!’

মেয়ে জানালেন, বাবা আলমাছ উদ্দিনের পেটের পুরোনো রোগ। ভীষণ ডায়রিয়া, সঙ্গে জ্বর। কিছুক্ষণ পর কথা জড়িয়ে যেতে থাকে তাঁর। তখনই পরিবারের লোকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন। এমনিতে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা করাতেন তিনি। জ্বর-ডায়রিয়া শুনে তাঁরা নিতে চাননি। পরদিন শাহবাগের একটি বড় হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। সেখানে বুকের এক্স-রে করে নিউমোনিয়ার মতো মনে হচ্ছিল। করোনাভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে দেখে তারা রাখেনি। সেখান থেকে তাঁরা ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেন। তাঁদের আইসোলেশন ওয়ার্ড আছে। রোগী ভর্তি করা যাবে এই আশ্বাস পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় আলমাছ উদ্দিনকে। কর্তৃপক্ষ রাখতে রাজি হলেও চিকিৎসকেরা আসেননি। ওই হাসপাতাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। ভর্তি নেয় তারা। কিন্তু জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে পাঠানোর সময় চিকিৎসকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। করোনাভাইরাসের ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য না পেলে রোগী রাখবেন না বলে জানান। তাঁরা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যান। পৌঁছানোর আগে আইইডিসিআরে যোগাযোগ করেন। সন্ধ্যার পর আলমাছ উদ্দিনের অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় কুয়েত মৈত্রীর গেটে। তাঁরা লক্ষণ দেখে বলেন, রোগী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁকে আইসোলেশনে থাকতে হবে। সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা থাকলে বিপদ।

এভাবে ছয় হাসপাতালে গিয়েও বাবাকে ভর্তি করাতে পারেননি সন্তানেরা।

এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যখন এভাবে ছুটছেন আলমাছ উদ্দিন, তখন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে আসেন। আলমাছ উদ্দিনের মেয়ে বলেন, ‘বাবা মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এই পরিচয় দিয়ে কখনো কোনো সুবিধা নেওয়া পছন্দ করতেন না। আমরাও তাই কোনো হাসপাতালে গিয়ে এই পরিচয় দিইনি।’ মুগদা জেনারেল হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড আছে। মুক্তিযোদ্ধারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। হাসপাতালের সিটিস্ক্যান, এমআরআই মেশিন নষ্ট। পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।

আলমাছ উদ্দিনের মেয়ে বলেন, বাবাকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল শুধু। বাকি পরীক্ষার পর চিকিৎসা শুরু হবে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। সেই সুযোগ আর হয়নি। সকাল সোয়া ৭টায় মারা যান তিনি।

কাছে গেল না কেউ, লাশ নিয়ে রিকশাভ্যান চালালেন কনস্টেবল

করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে গাজীপুর মহানগরীর সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পাশে পড়ে থাকা লাশটির কাছে যায়নি কেউ। অবশেষে মরদেহ রিকশাভ্যানে তুলে এক পুলিশ সদস্য চালিয়ে থানায় নিয়ে যান। আনুমানিক ৫০-৬০ বছর বয়সী মৃত ওই বৃদ্ধের পরনে সাদা রংয়ের হাফ শার্ট, লুঙ্গি ও মাথায় সাদা রঙের টুপি ছিল। মৃতের পরিচয় পাওয়া যায়নি জানিয়ে গাছা থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বলেন, লাশ ময়না তদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার বিবরণ দিয়ে গাছা থানার পুলিশ কনস্টেবল রুবেল মিয়া জানান, রাত ২টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকার ডিউটি করছিলেন। এমন সময় তিনি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর ৫০-৬০ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক বৃদ্ধ অচেতন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন বলে খবর পান। “অনেকক্ষণ ধরে তার নিথর দেহ রাস্তার পাশে পড়ে থাকলেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সন্দেহে কেউ তার পাশে যায়নি। তবে কনস্টেবল রুবেল মিয়া গিয়ে দেখতে পান বৃদ্ধের দেহ রক্তাক্ত। তার ধারণা অজ্ঞাত কোনো গাড়ি ওই ব্যক্তিকে চাপা দিয়েছে।

রাত গভীর হওয়ায় বৃদ্ধের দেহটি বহন করার জন্য কোনো গাড়ি পাচ্ছিলেন না তিনি। এ সময় এক রিকশা-ভ্যান চালককে লাশটি থানায় নেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে “সেই চালকও তার ভ্যানে লাশটি না তুলতে আমাদের হাতে-পায়ে ধরেন।

পরে নিজেই ভ্যানটিতে লাশটি তুলে চালিয়ে থানায় নিয়ে যাই।

মানবতা যেন আজ মুখ ঠুকরে কাঁদছে

ছবিতে পিপিই পড়া যাকে দেখতে পাচ্ছেন তিনি রাজধানীর মিডফোর্ড হাসপাতালের একজন সিনিয়ার নার্স। করোনা (কভিড-১৯) রোগী তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে এ্যাম্বুলেন্সে তাকে মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য নিয়ে আসা হয়। সাথে আসেনি পরিবার কিংবা সহকর্মীদের কেউ। হাসাপাতালে আসার পরও তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। অবশেষে হাসপাতাল থেকে কষ্ট করে ট্রলি নিয়ে এসে জিনিসপত্র নিজেই উঠিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। একজন নার্স যিনি মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনিই আজ থেকে বঞ্চিত। একজন সিনিয়র নার্সের যদি চিকিৎসাসেবা পেতে এমন অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ মানুষ যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের কি অবস্থা-একবার ভাবুন। এই রোগে মৃত্যু হলে লাশ দেখতেও কেউ আসবে না কিংবা সেই সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। এমন শেষ বিদায় সৃষ্টির সেরা জীবের জন্য কাম্য নয়। হে আল্লাহ, তুমি আর কাউকে এই রোগ দিও না। আমাদের সবাইকে তুমি হেফাজত করো।

আপনার জানাজায় কেউ আসবে?

আগামীকাল বেঁচে থাকবো কিনা আমরা কেউ জানি না। ধরুন, আমাদের মধ্যে কেউ যদি কাল করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, আপনার কি ধারণা… আপনার জানাজায় কেউ আসবে? পরিবারের সদস্য? আত্মীয় স্বজন? বন্ধু বান্ধব? কিংবা পাড়া প্রতিবেশী? নিজের জীবনের মায়ায় পড়তে একান্ত বাধ্য না হলে কোন মানুষই যে আসবে না, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। হ্যা..আসতে পারে। কে জানেন? সারাজীবন ‘জানোয়ারের বাচ্চা’ বলে যাদেরকে গালি দিয়েছেন সেই পুলিশ। এই পুলিশই হবে পৃথিবী থেকে আপনার বিদায়ের শেষ মূহুর্তে সঙ্গী। তারা মানুষ নয়। রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বাহাদুর পুর ইউনিয়নের সেনগ্রামের ট্রাক চালক রুহুল  আমিন (৩৫) ৬ এপ্রিল দুপুর ২ ঘটিকার সময় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার করোনা ভাইরাসের সকল উপসর্গই ছিল। তার শরীরে করোনা ভাইরাস ছিল কিনা তা পরীক্ষার নিমিত্তে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন করোনা রোগী হওয়ার কারণে তার জানাজায় কেউ এলো না। হায়রে মানুষ! শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ১০ টায় স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ পাঁচ জন মানুষকে নিয়ে ৬ জন পুলিশ সদস্যকেই জানাজা এবং দাফনের কাজ সম্পন্ন করতে হলো। নিজের সুরক্ষার জন্য যাদের নেই কোন পিপিই, নেই কোন ছুটি। বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান, পরিবার পরিজন কোথায় পড়ে আছে খোঁজ নেয়ারও সময় নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারেই টর্চের আলোয় কবর খনন করা হলো। পাংশা সার্কেলের এএসপি লাবীব আব্দুল্লাহ এবং পাংশা থানার ওসি আহসান উল্লাহসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য রুহল আমিনের জানাজা সম্পন্ন করলো। আগামীকাল হয়ত পত্রিকায় নিউজ হবে… রুহুল আমিনের জানাজায় অংশ নিলো ৬ জন পুলিশ এবং ৫ জন মানুষ….।

লাশ ফেলে স্বজনদের পলায়ন, দাফন করল পুলিশ

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া এক যুবকের জানাজা শেষে দাফন করলো পুলিশ। এর আগে মেহেন্দিগঞ্জের বেঁদে সম্প্রদায়ের ওই যুবকের (৩২) মৃত্যুর পর স্বজনরা পালিয়ে যায়। পরে বার বার খবর দেয়ার পরও কেউ লাশ নিতে না আসায় ঘটনার একদিন পর তার লাশ দাফন করে পুলিশ।

মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে ঐ যুবকের জানাজা ও দাফনে সহযোগিতা করেছে আঞ্জুমান-ই হেমায়েত-ই ইসলাম। নগরীর রূপাতলী মুসলিম গোরস্থানে তার জানাজা এবং দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। জানা গেছে, বেঁদে বহরের ওই যুবক করোনার উপসর্গ নিয়ে ১৩ এপ্রিল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। সেখানে ৪ দিন চিকিৎসা নেয়ার পর ১৭ এপ্রিল উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেলে প্রেরণ করা হলে জরুরী বিভাগ থেকে তাকে করোনা ওয়ার্ডে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।  বরিশাল মেট্রোপলিটনের কোতয়ালী মডেল থানার ওসি মো. নুরুল ইসলাম জানান, ওই যুবকের  মৃত্যুর খবর শুনে তার স্বজনরা লাশ ফেলে বরিশাল থেকে পালিয়ে যায়। বারবার খবর দেয়ার পরও তার লাশ নিতে আসেনি কোনও স্বজন। একদিন করোনা ওয়ার্ডে লাশটি পড়ে থাকার পর পুলিশ ওই যুবকের লাশ দাফনের দায়িত্ব নেয়। আঞ্জুমান-ই হেমায়েত-ই ইসলামের সহায়তায় পুলিশ নিরাপত্তা পোশাক পরে তার লাশ উদ্ধার করে সংক্ষিপ্ত জানাজা শেষে নগরীর রূপাতলী মুসলিম গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করে।

সারাদিন রাস্তায় পড়ে থাকা লাশটি

অবশেষে পুলিশ উদ্ধার করল

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় পয়সার হাট ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তার পাশ থেকে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১০ এপ্রিল ভোর থেকে স্থানীয়রা ওই স্থানে লাশটি পড়ে থাকতে দেখলেও করোনাভাইরাসের আতঙ্কে কেউ কাছে যায়নি। পরে স্থানীয় চৌকিদারের মাধ্যমে খবর পেয়ে দুপুর ৩টার দিকে লাশটি উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন ধরে ওই বৃদ্ধাকে অসুস্থ অবস্থায় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন তারা। তবে তার নাম-পরিচয় কেউ জানেন না। তার চলাফেরা দেখে ভবঘুরে মানসিক রোগী মনে হয়েছে। ভোরে কয়েকজন লোক রাস্তায় বের হলে ওই স্থানে বৃদ্ধার লাশটি পড়ে থাকতে দেখেন। করোনাভাইরাসের এ সংকটময় পরিস্থিতিতে লাশটি পড়ে থাকতে দেখে তারা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ কারণে কেউ লাশের কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি।

আগৈলঝাড়া থানা পুলিশের ওসি মো. আফজাল হোসেন জানান, স্থানীয় চৌকিদার দুপুর আড়াইটার দিকে থানায় ফোন করে জানান, রাস্তার পাশে একটি লাশ পড়ে আছে। তবে করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ওই বৃদ্ধের লাশের পাশে কেউ ভিড়ছে না। খবর পেয়ে তিনি (ওসি আফজাল হোসেন) পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ওই বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠান।

তিনি আরও জানান, রাতের যে কোনো সময় তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশের পরিচয় শনাক্তে বিভিন্ন থানায় বেতারবার্তা পাঠানো হয়েছে। আপাতত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশটি রাখা হয়েছে।

করোনাভাইরাস: ঢাকার ফুটপাতজুড়ে

সারি বেধে বসে থাকা মানুষগুলো কারা!

ফুটপাতজুড়ে বসে আছেন সারি সারি মানুষ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা নিম্নবিত্ত। প্রায় ফাঁকা সড়ক ধরে ছুটে আসা কোন গাড়ি যদি কোন কারণে গতি কমায়, তখনই দলে দলে গাড়িটির দিকে ছুটে আসছে মানুষগুলো। আশা কিছু একটা সাহায্য হয়তো জুটবে। লকডাউনের মধ্যে জরুরী প্রয়োজনে ঢাকার যেসব মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে হয়, তাদের হয়তো চোখে পড়ে থাকবে এমন দৃশ্য।

এমন ঘটনাও ঘটতে দেখা যাচ্ছে, হয়তো সত্যিই গাড়িতে করে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছেন কেউ, কিন্তু একেবারেই সামাজিক দূরত্ব না মানা এই মানুষগুলোর ধাক্কাধাক্কি সামাল দিতে না পেরে ত্রাণ বিতরণ বন্ধ রেখেই চলে যেতে হচ্ছে দাতাকে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর দুই মাস পেরিয়ে গেছে। এরমধ্যে এক মাসেরও বেশি সময় কার্যত অচল ছিল পুরো দেশ। এই সময়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি এই দৃশ্যটিও আজকাল আকছার চোখে পড়ছে। এ ধরণের জমায়েতের খুব বেশি দেখা যায়, সুপারশপ বা দোকানের সামনে, কিংবা রাস্তার মোড়গুলোতে।

সরেজমিন জাহাঙ্গীর গেট

মিরপুর থেকে গুলশানে অফিস যেতে আমাকে অতিক্রম করতে হয় ঢাকা সেনানিবাসের মূল ফটক, যেটি জাহাঙ্গীর গেট নামে ঢাকাবাসী চেনেন। অনতিদূরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং স্থাপনা আছে এই এলাকায়। সড়কটি ভিআইপি, অর্থাৎ যন্ত্রচালিত যানবাহনই শুধু চলতে পারবে। রিকশা-ভ্যানের মতো যানবাহন চলবার সুযোগ নেই। প্রতিদিন অফিস যাওয়া এবং বাসায় ফেরার পথে আমি দেখি এখানকার ফুটপাতে এমন মানুষের জটলা। যারা বসে আছেন তাদের সবাই নারী। দেখে কাউকেই ভিখিরি বলে মনে হলো না। করোনাভাইরাসের কারণে মাস্কও পড়েছেন বেশিরভাগ। তবে চোখে সাহায্যের আকুতি নজর এড়িয়ে যাওয়ার মতো না। কড়া রোদ উপেক্ষা করে রাস্তার ধারের দেওয়াল ঘেঁষে বসে আছেন তারা। কৌতূহল থেকেই সিদ্ধান্ত নেই, গাড়ি থামিয়ে নামবো। তাদের সাথে কথা বলবো। তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, গাড়ি দেখলেই এরা সাহায্য দাতা মনে করে সামাজিক দূরত্বের কথা ভুলে ছুটে আসেন। তাই একটু দূর থেকে নেমে হেঁটেই এগোলাম।

বেঁচে গেল তিনটি জীবন

২৪ বছর বয়সী ঝুমা প্রসব বেদনা নিয়ে স্বামী সুজনের গায়ে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। ঢাকা শহীদ মিনারের কাছে ভোর পাঁচ টার ঘটনা এটা। গাজীপুর থেকে প্রসব বেদনা নিয়ে ঢাকায় আসে এই পরিবার। ঘন্টার পর ঘন্টা হাসপাতালে-হাসপাতালে ঘুরে বেড়িয়েছে, কেউ ভর্তি করেনি। কারণ ঝুমার জ্বর।

এই সময় পাশ দিয়ে একটি খালি এম্বুলেন্স যাচ্ছিলো। ড্রাইভারের দেখে দয়া হলে তাদের নিয়ে যায় গাজীপুরে। সেখানে ছোট একটি ক্লিনিকে ভর্তি করে তাকে। দুপুর ১২:৪০ এ সিজারিয়ানে তার জমজ বাচ্চা হয়। এই এম্বুলেন্স ড্রাইভারের দয়া না হলে আজ হয়ত তিনটি জীবনের শেষ হত এই ফুটপাতেই।

নিষ্ঠুরতার আলামত!

করোনা আক্রান্ত হয়ে ঘরে ফেরার পথে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তার পথে মারা যান। গ্রামে লাশ দাফনে বাধা আসে চেয়ারম্যান ও গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে নিরূপায় বাবা গোলাম মোস্তফা চুক্তি করেন এম্বুলেন্স চালকের সাথে লাশ দাফনের জন্য, ৫ হাজার টাকাও পরিশোধ করেন। অ্যাম্বুলেন্সের চালক কোথাও দাফন না করতে পারায় ফেলে দেয় তিস্তা নদীতে। দুই দিন পর মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্দ্ধন গ্রামের স্থানীয় জনতা তিস্তা নদীতে লাশ সন্দেহে ভাসমান বস্তু দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিলে আদিতমারী থানা পুলিশ সরকারি ব্যাগে মোড়ানো মৌসুমির আধপঁচা লাশ পুনরায় উদ্ধার করে। পুলিশ মৌসুমির বাবাকে লাশ পুনরায় হস্তান্তর করে। পরে আদিতমারী থানা পুলিশ মৌসুমির বাবার কাছ থেকে লাশ নিয়ে এত কাহিনী হবার কথা শুনে নিজ দায়িত্বে মরদেহের নিজ বাড়িতেই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে।

করোনার সংক্রমণ আরো বাড়তে থাকলে অনেকের হয়তো ভবিতব্য এমনটাই হবে। আমরা একটু মানবিক হই- একদিন তো মরেই যাবো !!!

এদেশে কি পরিমাণ হায়েনার গোষ্ঠি জম্মে আছে! চেয়ারম্যান মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন। বাবা ৫ হাজার টাকা যাদের দিলেন লাশ দাফন করতে সেই দল লাশ দাফন না করে নদীতে বাসিয়ে দিলো।

জ্বর নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবককে হাসপাতালে নিল পুলিশ

সাতক্ষীরার আলীপুর ইউনিয়নের মাহমুদনগর এলাকায় প্রচন্ড জ্বর নিয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এক যুবককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। ওই যুবককে উদ্ধার করে প্রথমে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, করোনার উপসর্গ নিয়ে খুব অসুস্থ অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়েছিল ওই যুবক। পরে পুলিশের নজরে আসলে তাকে উদ্ধার করে ভ্যানযোগে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ সদস্য ও গ্রাম পুলিশের যৌথ সহযোগিতায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক মানস কুমার বলেন, যুবকের শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি। করোনার উপসর্গ রয়েছে তার। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। রতিনি বলেন, ওই যুবক ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। নাম সিরাজ ও বাড়ি খুলনার হরিণটানা থানায় এইটুকু জানিয়েছে। কিভাবে এখানে আসলো সে ব্যাপারে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি। তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হয়েছে।

সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. হুসাইন সাফায়াত বলেন, রোগীকে ভ্যানযোগে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার শরীরে তাপমাত্রা অধিক। সম্ভবত করোনার উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় ভ্রমণ করেছে এই যুবক। পরীক্ষার পর করোনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

১৬ ঘণ্টা বিছানাতেই ছিল লাশটি

করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা পর পুলিশের হস্তক্ষেপে এক প্রতিবন্ধী যুবকের লাশ ঘর থেকে বের করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বাসা থেকে ওই যুবকের লাশ দাফনের জন্য বের করা হয়। এর আগে তাঁর লাশ কেউ ছুঁয়ে দেখার সাহস পাননি।

করোনা উপসর্গ নিয়ে প্রতিবন্ধী যুবক রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মারা যান বলে পরিবারের লোকজনের ধারণা। ভোরে বাড়ির লোকজন তাঁর নিথর শরীর বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে। এই যুবকের বাবা করোনার উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে মারা যান। পরে নমুনা পরীক্ষায় তাঁর বাবার শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মেলে। এ কারণে বাসার সব সদস্য আইসোলেশনে চলে যান।

করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা পর পুলিশের হস্তক্ষেপে এক প্রতিবন্ধী যুবকের লাশ ঘর থেকে বের করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বাসা থেকে ওই যুবকের লাশ দাফনের জন্য বের করা হয়। এর আগে তাঁর লাশ কেউ ছুঁয়ে দেখার সাহস পাননি।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, মৃত্যু হওয়ার ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা একটি লাশ ঘরে বিছানাতেই ছিল। করোনা-উপসর্গ নিয়ে নাকি যুবকটি মারা যান। কেউ লাশ সরানো ও দাফনের ব্যবস্থা করার সাহস পাননি। তিনি আরও বলেন, ‘আমি দেরিতে খবর পেয়ে লাশ সরিয়ে দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।’

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ঘটনাটি জানার পর চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারকে বার্তা দেন। তাঁর ফোন কল পেয়ে পুলিশ কমিশনার লাশ সরানোর ব্যবস্থা করেন।

জাহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিবন্ধী যুবক মারা যাওয়ার পর কেউ তাঁর লাশের কাছে ঘেঁষতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এই দাবদাহের মধ্যে ১৬ ঘণ্টা লাশ বিছানাতেই ছিল। আমি পুলিশ কমিশনারকে বার্তা পাঠাই।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মৃত যুবক পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন। মেজ ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বাবা ও ভাইকে হারিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী এখন দিশেহারা। তাঁদের পাশে আমাদের সবার দাঁড়ানো উচিত।’

বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী। মা ও বোনকে নিজের গ্রামের বাড়িতে রেখে আসতে গেলে বাধার সম্মুখীন হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন বাধা দিচ্ছেন। সেখানে থাকতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি আসে।

বড় ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার অসুস্থ বড় ভাইটাও সম্ভবত মারা গেছে। বাসায় একটা ডাক্তার বা কেউ এসে কনফার্ম করতে পারবেন? কোনো হেল্প?’

লাশ নিলো না স্বজনরা, দাফন করলো পুলিশ

ফেরদৌসি বেগম (২৭)। ২৮ মে ২০২০ খ্রিঃ দুপুরে তিনি হঠাৎ করে মাথা ব্যাথা ও শ্বাস কষ্টজনিত সমস্যা অনুভব করেন।  ভর্তি হন নরসিংদী সদর হাসপাতালে। সন্ধ্যা ৭টা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

ফেরদৌসি বেগমের স্বামী আল আমিন মালদ্বীপ প্রবাসী। তাঁর শ্বশুর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার খাল্লা গ্রামে এবং বাবার বাড়ি একই থানার সলিমগঞ্জ গ্রামে। তাঁর স্বামী ১০ বছর ধরে প্রবাসে আছেন। নরসিংদী পৌরসভার সালিধা এলাকায় ৫ম শ্রেণীতে পড়া ছেলেকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন তিনি।

মৃত্যুর পর ফেরদৌসি বেগম লাশ গ্রহণে বেঁকে বসেন তাঁর শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ির স্বজনরা। কারণ, তাদের ভয় ফেরদৌসি বেগম করোনায় মারা গেছেন। কিন্তু করোনা হয়েছে কি-না সেটি নিশ্চিত না হওয়ার পরও লাশ বুঝে নিয়ে দাফন না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন স্বজনরা। স্বজনদের এমন অবস্থানের কথা জানতে পেরে এগিয়ে আসে পুলিশ। নরসিংদী মডেল থানা হাসপাতাল থেকে ফেরদৌসি বেগমের লাশ বুঝে নেয়। ২৯ মে ওই নারীর কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে দাফনের। জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাজ সম্পন্ন করে। বাদ জুম্মা ওই নারীর জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর শহরের পৌর কবরস্থানে ফেরদৌসি বেগমকে অন্তিম শয়নে শায়িত করে পুলিশ।

করোনায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন। আত্মীয়স্বজন জানাজায় নেই, ভয়ে দূরে দাড়িয়ে আছে। করোনা শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে,

প্রয়োজনে আমি প্রিয়জন,

প্রয়োজন ফুরালে দুর্জন।

আবেগপ্রবণ ও সামাজিক বাঙালি চরিত্রের সাথে করোনাকালীন অমানবিক ঘটনাগুলো খাপ খায় না। এ যেন চেনা বাঙালি সত্ত্বাকে অচেনা করে তুলেছে। মূলত: এটা ঘটেছে আতংক ও ভয় থেকে।  করোনা মহামারি সারাবিশ্বের মানুষকেই আতংকিত করে তুলেছে। এলোমেলো হয়ে গেছে মানুষের জীবন যাপন থেকে শুরু করে সব কিছুই। এর পাশাপাশি ভিন্ন চিত্রও আমাদের নজর এড়ায় না। করোনায় বিপন্ন মানুষের প্রতি যেমন পুলিশ বাড়িয়েছে সহায়তার হাত; তেমনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নানাভাবে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনাগুলো অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু তারপরও আমরা বলবো, এগুলো ভয়ার্ত মানুষের দ্বারা সংঘঠিত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন সব সংকট কাটিয়ে মানুষ আবার হয়ে উঠবে সামাজিক। মানবিক হয়ে উঠবে।

তথ্য সূত্র : বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইন্টারনেট।

লেখক : পুলিশ সুপার, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। পরিচালক, বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স মেস।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *