ই-পেপার

দীপক চন্দ্র সাহা

কোভিড-১৯ বর্তমান বিশ্বের একটি আতংকের নাম। জীবাণু-দানব বিশ্বঘাতী মহামড়ক এই ভাইরাস নোভেল ভাইরাস করোনা বা ’কোভিড-১৯’ নামে সবার কাছে পরিচিত। অতিক্ষুদ্র ও অতি ভয়ংকর দানব দমনের প্রধান সমস্যা হলো এর দারুণ ছোঁয়াচে স্বভাব এবং ভাইরাসটি ক্ষণে ক্ষণে তার জীব বৈশিষ্ট বা ‘জেনোম’ এর স্বরূপ বদলাচ্ছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুগে যুগে বড় দাগের মহামারী বালাইতে সর্বস্বান্ত হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বাংলার ১২৭৬-এর মহামনন্তরে বৃটিশসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি প্লেগ, ওলাওঠা, গুটি বসন্ত, কলেরা প্রভৃতি মহামারির কথা কে না জানে? ১৮৬০ থেকে নতুন করে শুরু হয় প্লেগ, ম্যালেরিয়া, বসন্ত ও কলেরা মহামারি। এর আগে বৃটিশ কোম্পানীর দুঃশাসন ও লুন্ঠনে নিঃস্ব রিক্ত বাংলায় ইতিহাসের চরমতম আকাল দুর্ভিক্ষের সঙ্গী হয়ে আসে এ ধরণের বড় বড় মড়ক। বলা হয়ে থাকে, বাংলা ১২৭৬-এর মহামণন্তরে কেবল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যারই দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ১৮৯৭ সালে বৃটিশ সংসদে গৃহীত হয় ‘মহামারি ব্যাধি-আইন।’ কেননা এর আগের বছর থেকে বাংলায় হানা দেয় ‘প্লেগ’ মহামারি। বৃটিশ দু:শাসনের একশ’ বছরে বাংলার এক কোটি মানুষের প্রাণহানী ঘটে। দুর্ভিক্ষ-কবলিত জরা-জীর্ণ অপুষ্টিতে কঙকালসার মানুষগুলোকে খুব সহজেই কুপোকাত করতো মহামারি আকারের রোগব্যধি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, উত্তর-পূর্ব চীনে মাটি খুঁড়ে এমন একটি পত্ন-সমাধি পাওয়া গেছে যা অন্ততঃ পাঁচ হাজার বছর আগের বলে ধারণা। এই গণসমাধিতে কংকালের মাড়ি দেখে প্রত্নবিশারদদের মনে হয়েছে এরা মহামারি জাতীয় কোনো রোগের শিকার হয়েছিল। এই একই জায়গায় (হামিং মাংঘা) আবিস্কৃত আরও কয়েকটি গণকবরের ধ্বংসস্তুপও একই ধরণের মহামারি প্রকোপের সাক্ষ্য দেয়। খৃষ্টপূর্ব-৪৩০’এ রোমের এথেন্সে ঘটেছিল এমনই এক প্রাণঘাতী মহামারি। এটা ছিল এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যকার যুদ্ধের বহু বছর পর। এই মহামারিতে কম করে হলেও এক লাখ রোমানের মৃত্যু হয়। গ্রীক ইতিহাসবিদ থুকিডাইডিসের  বর্ণনা মতে ”স্বাস্থ্যবান লোকগুলো একদিনের মধ্যে প্রচন্ড জ্বর, চোখ ফোলা, শ্বাসকষ্ট, বমি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং প্রচন্ড মাথাব্যথার উপসর্গ নিয়ে দলে দলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।”

এর পরবর্তী পর্যায়ে ১৬৫ থেকে ১৮০ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে অবশিষ্ট রোমান ও স্পার্টানদের ধ্বংস ডেকে আনে ’এন্টোনাইন’ নামের এক প্লেগ মহামারি। ধারণা করা হয় এই রোগটি ছিল পৃথিবীর এই অংশে দেখা দেওয়া গুটি বসন্তের মতো। ৫০ লাখের মত মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ‘এ্যান্টোনাইন’ প্লেগে। একদিকে মহামারি অন্যদিকে গৃহযুদ্ধ ও বারবারিয়ানদের হামলায় গোটা রোমান সভ্যতা পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে যায়।

বর্তমান তিউনিসিয়ায় ছিল প্রাচীন কার্থেজ নগরী। এই ক্যার্থেজের ক্যাথোলিক যাজক সেন্ট সাইপ্রিয়ানের নামে চিহ্নিত একটি মহামারির নাম সাইপ্রিয়ান প্লেগ। এই মহামারির কাল ছিল ২৫০ থেকে ২৭১ খৃষ্টাব্দ। এতে কেবল রোমেরই ৫ হাজার মানুষ এক দিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মৃতদেহগুলো যে বিশাল চুল্লিতে পুড়িয়ে ছাই করা হয়, সম্প্রতি তার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। প্রাচীন ল্যাটিন ভাষায় রোগটির নাম mortalitate বলে উল্লেখ করায় এটিও সংক্রমণশীল মহামারি ছিল বলে ধারণা করা হয়।

৫৪১ থেকে ৫৪২ সালে হানা দেয় ’জাস্টিন প্লেগ।’ এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে পর্যুদস্ত করে দেয়। ওই সময়কার পৃথীবীতে দ্রুত সংক্রমিত এই ঘাতক ব্যাধি তখনকার মোট জনসংখ্যার ১০% ভাগ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বাইজানটাইনের সম্রাটের নাম অনুসারে এই মহামারির নাম হয় ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগ’। বাইজেন্টাইন সম্রাটের শাসন কাল ছিলো ৫২৭ থেকে ৫৬৫ সাল)। পরবর্তী কালে তার রাজধানী (এখনকার তুরস্কের) ‘হাগিয়া সোফিয়া’ শহরটি কার্যতঃ মানবশূণ্য হয়ে পড়ে।

কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) নামের মহামারির কথা ইতিহাসে উল্লেখিত আছে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ নিশ্চিহ্নকারী মড়ক হিসাবে। প্লেগ প্রকৃতির এই মড়ক ইউরোপের ইতিহাসকেই কার্যতঃ বদলে দেয়। কৃষ্ণবর্ণ আফ্রিকী ক্রিতদাসদের মধ্যে প্রথম সংক্রমণ ঘটার ফলেই হয়তো এর নামকরণ হয়েছে ‘কৃষ্ণ মহামারি’ হিসাবে। ১৫৪৫ থেকে ১৫৪৮ সময়কালটি চিহ্নিত হয়ে আছে ‘কোকোলিৎজ’ মহামারির যুগ হিসাবে। এই মড়কের মূলে ছিলো একটি দ্রুত সংক্রমনশীল ‘হেমারজিক’ জ্বরের ভাইরাস। এটি ঘটে মেক্সিকো-সহ দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে। গণকবরগুলো থেকে সংগ্রহ করা কংকালের ‘ডিএনএ’ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিস্কার করেছেন, সেই প্রাণঘাতী জ্বরের সমতূল্য হলো এখনকার টাইফয়েড। তারই ধারানুক্রমে ঘটে ষোঢ়শ শতাব্দীর ’আমেরিকান প্লেগ’ মড়ক। ধারণা করা হয় ইউরোপীয় দরিয়া-আভিযাত্রীদল এটা দেহে বয়ে নিয়ে যায় ইউরোপ থেকেই। স্পেইনীয় অভিযাত্রী দলের বহু প্রাণ কেড়ে নেয় এই মড়ক।

১৬৬৫ থেকে ১৬৬৬’র ‘লন্ডন প্লেগ’ এর বিবরণ পাওয়া যায় বহু সাহিত্য ও বাণিজ্য-পত্রাদি থেকে। রাজা দ্বিতীয় চার্লস’এর শাসনাধীন ইংল্যান্ড প্রায় খালি হয়ে যায় সেই প্লেগে। এক বছরের মধ্যেই প্রাণ হারাতে হয় লক্ষাধিক ইংরেজকে। শুধু রাজধানী লন্ডনেই ১৫% প্রাণহানী ঘটে। এই সময়েরই আর একটি দুর্যোগ ছিলো লন্ডন শহরের মহা অগ্নিকান্ড। মহামারি থেকে বাঁচেনি ফ্রান্সও।

১৭২০ থেকে ১৭২৩ পর্যন্ত ফ্রান্সে ঘটে ‘প্লেগ’ মহামারি। পূর্ব-ভূমধ্যসাগর অঞ্চল থেকে পণ্য বোঝাই এক ফরাসী জাহাজ ব্যাধিটি বয়ে নিয়ে যায় প্রথমে মার্সেই বন্দর ও সেখান থেকে সমগ্র ফ্রান্সে। মার্সেই’ এর ৩০% জনসংখ্যা সহ ফ্রান্সের মোট এক লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এই মড়কে। ১৭৭০ থেকে ১৭৭২ পর্যন্ত রাশিয়াও আক্রান্ত হয় প্লেগ মহামারিতে (রাশিয়ান প্লেগ)। ১৭৯৩-তে দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় মহামারি আকারের হলুদ জ্বর। ‘শিল্প বিপ্লব’ যুগের প্রথম মড়ক ‘ফ্লু’ (১৮৮৯-১৮৯০)। এই ‘ফ্লু’ মড়কে তখনকার পৃথিবীর এক লাখের মতো মানুষের প্রাণহানী ঘটে। ১৯১৬ তে দেখা দেয় মহামারি রূপে ‘আমেরিকান পোলিও’ ব্যাধি আর স্প্যানিশ ফ্লু’র মেয়াদকাল ছিলো ১৯১৮ থেকে ১৯২০। প্রথম এশিয়ান ‘ফ্লু’র প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সময়কালে। এটি ছিলো প্রাণীর ‘এভিয়ান’ ফ্লু’র মানব-সংক্রমণ। ১৯৮০-র শুরু থেকে মড়ক আকারে হানা দেয় ’এইডস্’ বা ’এইচআইভি প্লাস।’ ২০০৯-এ ’জিকা-ভাইরাস।’ সবশেষে এলো জীবানু-দানব বিশ্বঘাতী মহামড়ক নোভেল করোনা বা ’কোভিড-১৯’ ভাইরাস। এই অতিক্ষুদ্র ও অতি ভয়ংকর দানব দমনের প্রধান সমস্যা হলো এর দারুণ ছোঁয়াচে সভাব এবং ভাইরাসটি ক্ষণে ক্ষণে তার জীব বৈশিষ্ট বা ‘জেনোম’ এর স্বরূপ বদলাচ্ছে।

এবার এসেছে ‘ফ্লু’ জীবাণু পরিবারের নতুন এক দানব করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। ছোট বড় মিলিয়ে পৃথিবীর ২১৭টি দেশ/ এলাকায় বিস্তার লাভ করা এ ভাইরাস ইতোমধ্যে প্রায় চার লাখ মানুষের জীবন হরণ করেছে। পৃথিবীর সকল পরাশক্তি করোনা ঝড়ে আজ দিশেহারা। উন্নত বিশ্ব বলতে যাদের বুঝি তারাও প্রকৃতির কাছে অসহায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সফলতার আশাও সুদুর পরাহত। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ইতালীর প্রধানমন্ত্রী জুসেফ কন্টে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্র সেনচিজ পিরেজ, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল ডি হিগিন্সসহ বহু রাষ্ট্রনায়ককে দেখেছি পরাজিত সৈনিকের ন্যায় অশ্রুসিক্ত নয়নে আকাশের পানে তাকিয়ে অব্যক্ত আত্মসমর্পণ করতে। খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও রেহাই পাননি এর আক্রমন থেকে। প্রবল শক্তিধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কিংকর্তব্যবিমূঢ় আজ এর ভয়াবহতায়।

বিশ্বময় নাজুকতার ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও এর মরন ছোবলে জর্জরিত। বিশাল অস্বচ্ছল জনগোষ্ঠীর এ দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু – উভয় পরিমাপেই করোনার বিস্তৃতি দিন দিন বাড়ছে।

আমাদের সরকার ও বিত্তশালীরা সাধ্যের মধ্যে সবটুকু দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে আগলে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ জাতীয় সকল দুর্যোগে বাংলাদেশ পুলিশ বরাবরই অগ্রসৈনিক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে চলমান মহামারী করোনা পরিস্থিতিতেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ পুলিশের অন্যুন ২ লাখ সদস্য করোনা মহামারির এই দুর্দিনে ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি নিজ নিজ সামর্থ্যরে মধ্যে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছ এবং কর্তৃপক্ষ আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তবে এই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ যখন অতি ক্ষুদ্র এবং অদৃশ্য জীবাণু, তখন বিপদ প্রতি মুহূর্তে আমাদের উপর হানা দিচ্ছে। সামাজিক দুরত্ব বজায় না থাকার কারণে আমাদের উপর বিপদের মাত্রা বেশি হচ্ছে। দেশের সহজ সরল মানুষগুলোর অসচেতনতা আসলেই অত্যন্ত দুঃখজনক। মহামারি যুগে যুগে এসেছে। এর প্রতিকার ও প্রতিবিধানও মানুষ করেছে। যারা পারেনি, তারা সমষ্টিগতভাবে ধ্বংস হয়েছে।

পুলিশ বাহিনীর একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে আমিও করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের একজন সারথী। করোনাতংকে যখন মানুষ প্রিয়জনদেরকে অনাদর, অবজ্ঞা ও অবহেলা করতে থাকে তখন আমরা পুলিশ সদস্যরা জীবন বাজি রেখে সংক্রমন রোধ, আক্রান্ত ব্যক্তি ও অঞ্চলের কোয়ারেন্টিন এবং লকডাউন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৃতব্যক্তির সৎকার, অনাহারীকে আহার প্রদান, অসহায়ের সহায় হয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। মানবতার সেবায় এ আমার পরম তৃপ্তি।

সৃষ্টিকর্তার কাছে নতজানু কৃতজ্ঞতা জানাই এ পবিত্র কাজে আমাকে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য। আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই সার্বক্ষণিক তদারকির মাধ্যমে আমাদের সেবার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করার জন্য। এটি নি:সন্দেহে আমাদের জীবনকালের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অসামান্য গৌরব ও অহংকারের বিষয় যে, আমরা দেশের নি:স্বার্থ কর্মী হিসেবে জাতীয় অগ্রাধিকার এবং বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পৃথিবী একদিন করোনামুক্ত হবে। সেদিন প্রশান্ত ও আটলান্টিকের এপার ওপার কর্মচঞ্চলতায় মুখরিত হবে, বেনুকার সূরে ও কিষাণীর গানে আমাদের  হৃদয় উৎফুল্ল হবে, প্রিয়জনের স্পর্শে পৃথিবী পাবে নতুন সাজ। আমরা সেই অপরূপ সাজের অপেক্ষায় রইলাম।

লেখক : অফিসার ইনচার্জ,

ধামরাই থানা, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x