ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ শাহজাহান, পিএইচডি

বর্তমান সময়ে দেশে ও বিদেশে সর্বাধিক আলোচনার বিষয় হলো ‘করোনা’ নামক বৈশ্বিক মহামারি। মানব স্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এ এক প্রকৃতির প্রতিশোধ নাকি মানব সৃষ্ট কোন অঘোষিত যুদ্ধ তা এখন পর্যন্ত নির্ণীত হয়নি। প্রাকৃতি কিংবা মানব সৃষ্ট যেটিই হউক না কেন সমগ্র পৃথিবীর মানুষ লড়ছে এ মহামারীর বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধে বাংলাদেশও লড়ছে। কারণ এর প্রকোপ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান। সঙ্গত কারণে এ বিষয়ে পুলিশের করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

‘করোনা’ পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা, পর্যালোচনা ও করণীয় সম্পর্কে বিশেজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য বৈজ্ঞানিকদের নিরন্তর প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। রাষ্ট্র যন্ত্রের সকল মেশিনারী কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশ প্রতিপালনে আত্ম-সমর্পিত ও নিমগ্ন এমনকি আত্ম উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত। নানা আঙ্গিকে ও ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র এ মহামারীর লাগাম টেনে ধরার প্রয়াস অব্যাহত রাখলেও সকলেরই চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে নিজ নিজ রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করা।

সকলের জানা আছে, যে কোন প্রাকৃতিক কিংবা মানব সৃষ্ট দুর্যোগ ও মহামারীতে একশ্রেণির স্বার্থান্বেসী লোক অপরাধ প্রবণ মানসিকতার ব্যক্তি/বর্গ সুযোগ নিয়ে থাকে। এদের সাথে যুক্ত হয় ভদ্রবেশী অপরাধী এবং পেশাদার অপরাধীর তৎপরতা। স্থান-কাল পাত্রভেদে অপরাধের মাত্রা, ধরণ ও প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও অপরাধের ঐতিহ্যগত রীতির বাইরে করোনা’র কারণে নতুন অপরাধ প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এ দুর্যোগ যতবেশী দীর্ঘায়িত হবে আশংকা হচ্ছে- ততবেশী ভাইরাসের মত অপরাধের প্রকৃতি, প্রবণতা বদল হতে থাকবে। অপরাধীরা  (যে কোন ধরণের) নানা রূপে নানা কৌশলে তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে তৎপরতা অব্যাহত রাখবে।

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, করোনার মত এ বৈশ্বিক দুর্যোগ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশকেই গ্রাস করায় সকল দেশে এখন লক্ষ্য একটাই- আরো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সম্প্রসারণের পূর্বেই করোনা লাগামহীন যাত্রা বন্ধ করা এবং এটি সত্য অবশ্যই এটি এক সময় বন্ধ হবেও। করোনার  প্রতিষেধক আবিস্কার হবে, মানুষ সচেতন হবে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় এর সমাধানের উপায়ও পাওয়া যাবে। অপরদিকে এ মহামারীর প্রাক্কলিত ব্যয় প্রচুর হবে কিন্তু সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পারস্পরিক সহযোগীতা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার ফলে হয়ত এর প্রাক্কলিত ব্যয় ক্ষতি হ্রাস করা ও সম্ভব হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহের গৃহীত কার্যক্রম হয়ত মৃতের সংখ্যা এবং ক্ষতি কমাতে পারবে কিন্তু এর যে আর্থিক অভিঘাত সে বিষয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত তথ্য সম্পর্কে জানা যাবে না। হয়ত কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো- করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার সাথে স্বাস্থ্য বিভাগীয় কার্যক্রম এবং আইন শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণের সমন্বয়, তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণের ইস্যূটিও যুক্ত। এর কোন একটি বিষয়ে শিথিলতা প্রদর্শন করা হলে ক্ষতি বৃদ্ধিই পাবে, কমবে না এবং জনজীবনে অস্বস্তি পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধিও পাবে।

অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে তাত্ত্বিক বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে আলোচনা করা হলে এটি অনুধাবনের ক্ষেত্রে ভুল তথ্য অনেকের নিকট মনে হতে পারে। তাই বিদ্যমান বিপর্যায়ের বিষয়টি পর্যালোচনার পূর্বে এ সম্পর্কিত অপরাধ বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক। অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অপরাধীরা প্রাত্যাহিক কর্মকান্ডে যে সকল অপরাধ করে অভ্যস্থ তারা পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ তা অব্যাহত রাখে। লরেন্স ও কোহেন এবং মার্কাস ফেলসন এ বিষয়ে যে তত্ত্ব হাজির করেছেন তার নাম হলো- রুটিন এক্টিভিটি তত্ত্ব। তারা তত্ত্বে যে সকল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন তাহলো যে, অপরাধীরা তখনই অপরাধ করবে যখন (ক) লক্ষ্য অর্জনের সহজ সুযোগ থাকে (খ) উপর্যুক্ত রক্ষাকারীর অনুপস্থিতি থাকে এবং (গ) সহযোগী অপরাধীর উপস্থিতি থাকে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুলিশসহ এ কাজে নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সদস্য এবং সামাজিক শক্তিসমূহ মানবিক সেবায় নিয়োজিত থাকায় বর্ণিত তিনটি বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। তাই অপরাধীরা এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। লকডাউন-এ ঢাকাসহ বড় ছোট সকল শহর প্রায় বন্ধ এ সুযোগে অনেক অধিবাসী গ্রামের বাড়িতে থাকায় তাদের আবাসস্থল অনিরাপদ রয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠি খাদ্য সংকটে পড়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়াতে পারে এমন কি-

ভদ্রবেশী অপরাধীরা পুলিশের বেশে কারোনা আক্রান্ত ব্যক্তি পরীক্ষার নামে, স্বাস্থ্য বিভাগীয় কর্মী বেশে কিংবা নিত্যপণ্যের সরবরাহকারীর কর্মী বেশে কিংবা এনজিও কর্মী হিসেবে সাহায্য দেওয়ার কথা বলে তালা/গ্রিল ভেঙ্গেঁ কিংবা কলিংবেল চেপে বর্ণিত পরিচয় দিয়ে ঘরে ঢুকে অস্ত্রের ভয়ে ডাকাতি কিংবা পেশাদার অপরাধীরা অন্য আরো কোন  উপায়ে সম্পদ চুরি করা ও জানমালের ক্ষতি করার মত অপরাধ সংঘটন করতে পারে।

অন্য দিকে মিশেল জে. হিন্ডলিং, মিশেল আর গটফ্রেডসন এবং জেমস গারোফেলো প্রমুখ সমাজ বিজ্ঞানীগণ বলেছেন যে, মানুষের লাইফ স্টাইল (জীবনধারণ প্রণালী) অপরাধমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে। অর্থ্যাৎ ব্যক্তি/বর্গের জীবনধারণ প্রণালী তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের মধ্যে নিপড়িত করে যাতে তারা সম্ভাব্য অপরাধের শিকারে পরিণত হতে পারে কিংবা নিজেরাই অপরাধের সাথে যুক্ত হতে পারে। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই তারা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। বদ্ধ জীবন যাপনে যারা অত্যস্ত নয় কিংবা পাড়া মহল্লায় যারা আড্ডা দিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে কিংবা উৎসুক হয়ে অনেকে পরিস্থিতি দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ে, তারা এ ধরণের ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশী।

লকডাউনের কারণে দিনে রাস্তায় কিংবা মহল্লার গলি পথে কিছু লোকের সমাগম থাকলেও রাতের বেলায় রাস্তা ও গলিপথসমূহ ফাঁকা থাকে।  পুলিশ সদস্যগণ মানবিক সেবায় অনেক বেশী সময় ও জনবল নিয়োগ করায় একটি আর্টিফিশিয়াল গ্যাপ তৈরী হওয়ায় অপরাধীরা এর সুযোগ নিয়ে ছিনতাই, দস্যূতা এমন কি খুনের মত ঘটনাও ঘটাতে পারে।

অভিজ্ঞতা ও গণমাধ্যমের প্রচারিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়েছে যে, করোনা পরিস্থিতিতে অপরাধের গতি প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। অপরাধ সংঘটনের ধরণ এবং অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগে পরিবর্তন এসেছে । কোন কোন অপরাধ হ্রাস পেয়েছে আবার কোন কোন অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার মুখে মুখোশ থাকায় কে ভদ্রলোক আর কে অপরাধী তা তাৎক্ষণিক বিচার করা অনেক সময় পুলিশের নিকট দূরূহ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ লোকেরাও হেনস্তার শিকারে পরিণত হতে পারে। বিষয়টি ইন্সপেক্টর জেনারেল বাংলাদেশ পুলিশ এর নজরেও এসেছে। তাই তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্রিফিং কালে স্পষ্টভাবে এ বিষয়ে পুলিশের করণীয় নির্দেশনা দিয়েছেন (যুগান্তর, প্রথম আলো) তিনি বলেছেন- মানুষকে শারীরিক নির্যাতন করা যাবে না। মানুষের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী যে সকল অপরাধ হ্রাস পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে

(ক) সহিংস অপরাধ (হত্যা, আঘাত)

(খ) মাদকের ব্যবহার ও পরিবহন এবং বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান

(গ) অস্ত্রের ব্যবহার ও পরিবহন

(ঘ) অবৈধ মানব পাচার

লকডাউনের অবকাশ কাটানোর জন্য ঢাকার ও অন্যান্য শহরের চাকুরী জীবি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেমন নিজ নিজ জেলায় ফিরে গেছে তেমনি এসব অপরাধের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরাও শহর ছেড়ে গ্রামে গেছে। সঙ্গত কারণে চাহিদা না থাকায় ভোক্তার অভাব দেখা দেওয়ায় এ ধরনের অপরাধগুলো হ্রাস পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

অপর দিকে যেসকল অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেগুলো হলো যথাক্রমে

(ক) নারী ও শিশুর  বিরুদ্ধে সহিংসতা (শারীরিক ও মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, পারিবারিক দ্বন্ধ ও কলহ, তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, পর্নোগ্রাফি (নারী ও শিশু) প্রস্তুত ও বিক্রয় ইত্যাদি)

(খ) সাইবার অপরাধ (অনলাইনে মালামাল বিক্রয়ে প্রতারণা, অধিক মূল্য গ্রহণ করে মালামাল সরবরাহ না করা, ই-মেইলের ব্যবহার বৃদ্ধি, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার, প্রতারণামূলক পার্সেল এর সংবাদ দিয়ে অর্থ আদায় কিংবা বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি)

(গ) ঘৃণা উদ্রেককারী অপরাধ (প্রবাসীদের প্রতি বিমতা সূলভ আচরণ এবং করোনা পরিস্থিতির জন্য তাদেরকে দায়ী করা, বৃদ্ধ বাবা মাকে করোনা ইনফেক্টেট হওয়ায় রাস্তায়, রেল কিংবা বাস স্টেশনে ফেলে যাওয়া, ডাক্তার ও নার্সদেরকে ভাড়া বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কিংবা ঢুকতে বাধা দেওয়া, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অমূল ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, মেডিক্যাল স্টাফদেরকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মৃত্যুর পর দাফন কাফন করতে না চাওয়া ইত্যাদি)

(ঘ) সম্পদ ও জানমাল সম্পর্কিত অপরাধ- দেশী ও নি¤œমানের করোনা প্রতিরোধকারী সামগ্রী বিদেশী বলে বিক্রয় করা, সরকারী মালামাল ও সামগ্রী মজুদ করা, বিক্রয় করা, পানিতে ফেলে দেওয়া, মাটির নীচে পুঁতে রাখা, নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী বেশী মূল্যে বিক্রয় ইত্যাদি।

(ঙ) নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও করোনা সম্পর্কিত ভেজাল উপকরণ বিক্রয়- ভেজাল ঔষধ উৎপাদন ও বিপনন, নকল পিপিই, মাস্ক, এ সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী উৎপাদন ও বিপনন, বিদেশী ও আমদানীকৃত প্রচার করে নিম্নমানের বর্ণিত সামগ্রী চড়া দামে বিক্রয় ইত্যাদি

(চ) স্ট্রিট অপরাধ- ছিনতাই, দস্যুতা, পথ শিশু নির্যাতন, চিকিৎসা, সামগ্রী, খাবার ছিনতাই ইত্যাদি

যে সকল কারণে এসকল অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয় সেগুলো হচ্ছে পুরুষদের দীর্ঘদিন ঘরে থাকা, পৌরুষত্ব প্রদর্শন, নারীর উপর কর্তৃত্ব স্থাপন, মনোমালিন্য, একঘেয়েমী পরিস্থিতি, হাতে কাজ না থাকা, করোনার জন্য প্রবাসীদের দায়ী ভাবা, বাবা মায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা, মানবিকতা বোধ লোপ পাওয়া, হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা পাওয়ার অনিশ্চয়তা, রাজপথ ও জনপথ জনশুন্য থাকা, পুলিশের উপস্থিতি কম থাকা ইত্যাদি এছাড়া আরো কিছু টার্সিয়ারী কারণ অপরাধ বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন যথা জেল থেকে ছাড়া পাওয়া অভ্যাসগত অপরাধীদের উপস্থিতি, বেকারত্ব, পুন: অপরাধীদের (রেসিডিভিষ্ট) জন্য অনুকুল পরিবেশ, পুলিশিং কাজে পুলিশের মনোনিবেশ হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে করোনা পরিস্থিতির প্রভাব হবে দীর্ঘ মেয়াদী। এ প্রভাব যাদের উপর বেশী পড়বে তারা হলো- খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শিক্ষিত বেকার, কর্মচ্যুত বেকার, কল কারখানায় নিয়োজিত স্বল্প আয়ের বেতনভুক্ত কর্মচারী, গার্মেন্টস ও পাটকল শ্রমিক, কৃষক ও কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিক, যৌনকর্মী।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা  এ-ও আশংকা করছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে খাদ্য সরবরাহ, উৎপাদন, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ ব্যহত হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয় আসতে পারে। রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা যতোটা সহজ কিন্তু আইন শৃঙ্খলা জনিত অরাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ততোটা সহজ না হয়ে জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায়

পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ

ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) চ্যানেল ২৪ তে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুলিশ করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- বৈশ্বিক পর্যায়ে করোনা সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর থেকে ঢাকা রেঞ্জে ভাইরোলোজি বিশেষজ্ঞদের এনে পুলিশ সদস্যদেরকে প্রশিক্ষিত দিয়েছেন। বিদেশ থেকে যারা এসেছে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং পুলিশ সদস্যদেরকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছেন। অন্যান্য সংস্থা এবং যাদের পরিস্থিতি মোকাবেলা করা দায়িত্ব ছিল তারা পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বেই পুলিশ নিজস্ব ব্যবস্থায় নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে ইত্যাদি। পুলিশের আগাম প্রস্তুতি এবং পুলিশ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিমধ্যে জননন্দিত হয়েছে।

সন্দেহ নেই যে,  করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশিং কার্যক্রম ও সেবা নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। যেসব খাতে পুলিশকে ভূমিকা পালন করতে হতে পারে তাহলো-

১.         জনশৃঙ্খলা বজায় রেখে আইনানুগ সেবা প্রদানের কাজ অব্যাহত রাখা

২.         গার্মেন্টস,পাটকল শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির খাদ্য সংকট কিংবা অন্য কোন ইস্যু ভিত্তিক হঠাৎ সংঘটিত জমায়েত ও রাস্তার বেরিকেড ইত্যাদি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা

৩.         সন্ত্রাসী ও জঙ্গী তৎপরতা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা

৪.         হিনিয়াস অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধ করার জন্য আগাম অপরাধ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা পালন

৫.         জনগণের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার কর্মীদের কাজে সহায়তা করা

৬.        এ্যাম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনী স্বাস্থ্য সেবা ও মানবিক সেবায় সহায়তার জন্য ৯৯৯ জরুরী সার্ভিসের কার্যক্রম জোরদার করা

৭.         লক ডাউনসহ ও করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ঘরে আটকে পড়ায় যাদের মানসিক শক্তি কম তারা আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিতে পারে তাদেরকে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহায়তা প্রদান করা

৮.         জেল খানায় বিশৃংখলা সৃষ্টিজনিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা

৯.         নতুন নতুন এলাকা/ অঞ্চল সরকার ঘোষিত লক ডাউন কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত থাকা

১০.       অপমৃত্য ও সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা থাকায় পুলিশের কুইক রেসপন্স টিম ও তদন্ত টিম প্রস্তুত রাখা ইত্যাদি

করোনায় উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্ভাব্য করণীয় কি হতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করে প্রবন্ধ শেষ করতে চাই। সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তিবর্গ ভদ্রবেশী অপরাধী কিংবা পেশাদার অপরাধী কিংবা বিশেষ মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় বা আশ্রয়ে পরিচালিত যে কোন ধরণের কর্মকান্ড সংগঠিত যেন হতে না পারে এ জন্য

১। পুলিশের অপরাধ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরী

২। ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা শক্ত হাতে দমন করে ন্যয্যতা প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য সরকারের উদ্যোগে সকল অংশীজনের সাথে সমন্বয় ও তত্ত্বাবধায়ন জোরদার করার জন্য সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে মনিটর হিসেবে মোতায়েন করা।

৩। খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ফড়িয়া ব্যবসায়ী, মজুদদার আড়ৎদার, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে নজরদারী বৃদ্ধি করা এবং অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়া মাত্রই যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ

৪। পুলিশকে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ মাঠ পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করে পুলিশিং কার্যক্রমে মনোনিবেশ এবং অপরাধ সংগঠনের সুযোগ যেন না ঘটে তা (প্রা-এ্যাকটিভ পুলিশিং এর মাধ্যমে) নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।

পরিশেষে, নির্দ্ধিধায় বলা যায়- করোনা বিপর্যয় হয়ত একদিন নিয়ন্ত্রণে আসবে। জীবন আবার স্বাভাবিক হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে কিন্তু সে মহেন্দ্রক্ষণ কবে কেউ জানে না। তাই পদক্ষেপ নেওয়ার এখনি সময়। পরিস্থিতির অবনতি চরম পর্যায়ে চলে গেলে তখন শক্ত হাতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিনা ভবিষ্যত বলে দিবে। পরিস্থিতি অবনতির জন্য নানাবিধ উপাদান প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে, আর  তাই  অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির রসদ যুক্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির গতি প্রকৃতি পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে অপরাধের ধরনেও আসবে পরিবর্তন। আর তাই কালবিলম্ব না করে সুযোগ সন্ধানীরা জল ঘোলা করে তাতে মাছ শিকার করার পূর্বেই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। এটি এখন পরিষ্কার যে, প্রযুক্তির যুগে অপরাধের ধরণে নতুন উদ্ভাবন জটিল কোন বিষয় নয়। অপরাধীরা ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ হাত ছাড়া করবেনা এটা নিশ্চিত বলা যায়। তাই সময় থাকতে আগাম প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমিচীন।

লেখক : পরিচালক (আরএন্ডপি),

পুলিশ স্টাফ কলেজ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *