ই-পেপার

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাহার আকন্দ বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

অপরাধ তদন্তে সাক্ষ্য সংগ্রহই তদন্তকারী অফিসারের মূল কাজ। সাক্ষী কয়েক প্রকার হয়ে থাকে। যেমন, মৌখিক সাক্ষী, দালিলিক সাক্ষী, বস্তুগত সাক্ষী, পারিপার্শিক সাক্ষী ইত্যাদি। ঘটনা প্রমাণে ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিটি সাক্ষীই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় চাক্ষুস সাক্ষী থাকেনা, সেক্ষেত্রে অন্যান্য সাক্ষী দ্বারা ঘটনা প্রমাণ করতে হয়। অন্যান্য সাক্ষী দ্বারা প্রমাণের ক্ষেত্রেও মৌখিক বিবৃতির প্রয়োজন হয়। এই জন্য মৌখিক বিবৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬১ ধারার উপধারা (১.) এ বলা আছে; ফৌজদারী কার্যবিধি অনুসারে তদন্ত পরিচালনাকারী পুলিশ অফিসার অথবা সরকারের আদেশ দ্বারা এই সম্পর্কে নির্ধারিত পদ অপেক্ষা নিম্ন পদস্থ নহেন এইরুপ পুলিশ অফিসার মৌখিকভাবে ঘটনা ও পরিস্থিতির সহিত পরিচিত বলিয়া অনুমিত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করিতে পারেন। উপধারা (৩.) এ বলা আছে, পুলিশ অফিসার এই ধারা অনুসারে সাক্ষ্য গ্রহণকালে তাহার নিকট কোন বিবৃতি দেওয়া হইলে তিনি তাহা লিপিবদ্ধ করিতে পারেন-।

আবার কার্যবিধি ১৬২ ধারায় বলা হয়েছে; এই অধ্যায় মোতাবেক পরিচালিত তদন্তের সময় কোন ব্যক্তি পুলিশ অফিসারের নিকট বিবৃতি দিলে তাহা যদি লিপিবদ্ধ করা হয়, তাহা হইলে বিবৃতিদাতা তাহাতে স্বাক্ষর করিবেন না।

ফৌজদারি কর্যবিধি ১৬৩ ধারার (১.) উপধারায় পরিস্কার বলা আছে; পুলিশ অফিসার অথবা কর্তৃত্ব সম্পন্ন অন্য ব্যক্তি ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ২৪ ধারায় বর্ণিত কোন প্রকার প্রলোভন, হুমকি বা প্রতিশ্রুতি দিবেন না বা দেওয়া যাইবেনা। উপধারা (২.) এ বলা আছে, এই অধ্যায় মোতাবেক তদন্তের সময় কোন ব্যক্তি তাহার স্বাধীন ইচ্ছায় কোন বিবৃতি দিতে চাহিলে পুলিশ অফিসার বা অন্যকেহ তাহাকে হুশিয়ারি দ্বারা বা অন্য কোনভাবে বারণ করিবেন না।

উপরে বর্ণিত অবস্থায়, ফৌজদারী কার্যবিধিতে পুলিশকে বিবৃতিদাতার বিবৃতি নেওয়ার অধিকার রয়েছে। বিবৃতি যাতে, বিবৃতিদাতার স্বেচ্ছা ও স্বতঃপ্রণোদিত হয় তার প্রতি সতর্ক করা হয়েছে। কোন প্রকার হুমকি ভয়ভীতি প্রলোভন দ্বারা কাউকে বিবৃতি দেয়া থেকে বিরত করা যাবেনা। সর্ব প্রকার সতর্কতা অবলম্বনের পরই কোন ব্যক্তির বিবৃতি গ্রহণ করার কথা বলা আছে। পুলিশ সেই শর্ত পূরণ করেই কাঃ বিঃ ১৬১ ধারা মোতাবেক বিবৃতি লিপিবদ্ধ করে থাকে। পুলিশকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের অপরাধ তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়া আছে। এই ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতি আস্থা রেখেই এই দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশ অফিসার কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পরিচালিত সকল কার্যক্রমের বৈধতা আছে অথচ ১৬১ ধারায় সাক্ষ্য নিলে তাতে বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নেয়ার বৈধতা দেয়া হয়নি। বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নেয়া থেকে বিরত রেখে এখানে স্বাধীন দেশের একজন প্রথম শ্রেণীর নাগরিককে প্রকারান্তরে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।

আমাকে একবার এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারের সাথে কাজ করতে হয়েছিল। আমার সামনে তিনি মামলা সংক্রান্তে একজন সাক্ষীর বিবৃতি গ্রহণ করলেন এবং তাতে বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নিলেন। আমি তাকে আমার দেশের আইনের কথা স্বরণ করালাম। তখন তিনি হাসলেন এবং বল্লেন, “তাদের এই ক্ষমতা আছে”।

আমরা যদি একটু খেয়াল করি, দেখতে পাই তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষীর মোকাবেলায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু তাতে বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নেয়া হয় না। স্বাক্ষর বিহীন বিবৃতিটি তদন্তকারী অফিসারের কাছেই থাকে। আবার অনেক সময় বক্তব্য নোট করে নিয়ে যান এবং পরে লিপিবদ্ধ করেন। যদি তদন্তকারীর কোন অসৎ উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তার সেই সুযোগ থেকেই যায়। যদি বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নেয়া হয়, তবে এই বিবৃতিতে তদন্তকারী অফিসারের আর কিছু করার সুযোগ থাকেনা। বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর না নেয়াতে অসদুপায় অবলম্বন করার সুযোগ থেকে যায়। অন্যদিকে আদালতে আইনজীবিদের পক্ষে সাক্ষী এবং তদন্তকারীর মধ্যে নানাভাবে অসংগতি সৃষ্টি করার সুযোগ থাকে। যার মাধ্যমে মামলার ক্ষতি করা যায়।

আমি এই বিষয় নিয়ে আমাদের দেশের স্বনামধন্য একজন আইনজীবি যিনি ফৌজদারি মামলার উকিল হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন, তাকে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করি, তিনি যে মন্তব্য করলেন তা আমার কাছে পুরাপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। উনার সোজাসাপ্টা জবাব ‘আপনারা (পুলিশ) এখনও এই পর্যায়ে আসেন নাই’। অর্থাৎ বাংলাদেশ পুলিশ এখনও সাক্ষীর জবানবন্দিতে স্বাক্ষর নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নাই। আমার নিজের কাছে মনে হয় বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর না নেয়ার কারনে আইনজীবি, পুলিশ সকলেরই অসৎ পথ অবলম্বনের সুযোগ থেকে যায়।

অথচ ফৌজদারী কার্যবিধি ১৫৪ ধারা মোতাবেক এজাহার নেয়ার সময় তাতে একই পুলিশ বাদী বা সংবাদদাতার স্বাক্ষর নিয়ে থাকেন। তাতে পুলিশের উপযুক্ততা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। তখন পুলিশ ঠিক আছে। কিন্তু এই পুলিশ কার্যবিধি ১৬১ ধারা মোতাবেক বিবৃতি নিলে তাতে বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নেয়ার উপযুক্ত নয়। আবার অনেক সময় পুলিশ সাদা কাগজে (Plain paper) এজাহার নিয়ে থাকে এবং তাতে ঠিকই বাদীর স্বাক্ষর নিয়ে থাকে। আমার মনে হয় আসলে বিষয়টি যোগ্যতার নয়। বিষয়টি হলো বিবৃতিদাতার স্বাক্ষর নিলে বিবৃতিদাতাকে আদালতে এত জেরা করার সুযোগ থাকবেনা। পুলিশের সাথে অসংগতি সৃষ্টি করারও এত সৃযোগ থাকবেনা। পুলিশকে অবমূল্যায়ন করা যাবেনা। পুলিশকে অবমূল্যায়ন করে তার কাঁধে ভর করে অপরাধীকে খালাশ করে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। উন্নত দেশগুলোতে সাজার মান বেশি হওয়ার কারণ পুলিশের তদন্তকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।

আমাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। পুলিশের তৈরি নথিপত্রকে বিভিন্নভাবে অবমূল্যায়ন করে মামলার বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। যার ফলে আইনের ফাঁক দিয়ে আসল অপরাধী খালাশ পাওয়ার অভিযোগ শুরতে পাওয়া যায়। এতে করে অপরাধ দমনে পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছে। পুলিশের তদন্তকে যথাযথ মূল্য না দেয়ার। ফলে পুলিশও অনেক সময় মানসিকভাবে দুর্বল থাকে। ধরে নেয়া হয় পুলিশের তৈরি নথিপত্রে বিশ্বাস করা যায় না। অনেক সময় পুলিশের ছোটখাট ভুলত্রুটিকে বড় করে তুলে ধরে মামলা খালাশ করে দেয়া হয় বা বলা হয়, ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আসামি খালাশ।’ এমন অভিযোগ বহুল ক্রলিত। কারণ আইনে আদালতে মনে করার “(may presume)” করার সুযোগ আছে। একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি অর্ধেক খালি, বিষয়টাকে দুইভাবেই মূল্যায়ন করা যায়। অর্ধেক পানিকে বাদ দিয়ে শুধু খালি জায়গা নিয়ে বিচার করা যায়। যিনি বিচারক তার সে সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ অর্ধেক পানি থাকলেও বলতে পারবেনা গ্লাসে পানি নেই। পুলিশকে বলতে হয় প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হলো। আসামিকে বাদ দিতে পারবেনা। বিচারের ভার আদালতের।

যেভাবে এজাহারে কাঃ বিঃ ১৫৪ ধারায় বাদীর স্বাক্ষর নেয়া হয় অনুরুপভাবে কার্যবিধি ১৬১ ধারার বিবৃতিতেও স্বাক্ষর নেয়া যেতে পারে। তাতে বিবৃতিদাতা যখন জবানবন্দী দিবেন তখন তিনি ভেবে চিন্তে দিবেন। আবার তদন্তকারী কর্মকর্তাও জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করার সময় সকল প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করবেন। তদন্তকারী অফিসারের দায়িত্ব বেড়ে যাবে। তাতে তদন্তের মান বৃদ্ধি পাবে। আদালতের বিচার আরও সহজ হবে এবং বিচারের ফলাফল ভাল হবে। ফলে আইন শৃঙ্খলার উন্নতি হবে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের নিজস্ব বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করা যেতে পারে। এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে আলাপ করে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে।

লেখক : অতি: ডি,আই,জি (অব)।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x