ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

স্নেহাশীষ কুমার দাস

কারাগারে দিনক্ষণ/বছর কীভাবে হিসাব করা হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে জেনে নেওয়া ভালো কীসের ভিত্তিতে তা করা হয়। জেল কোড হচ্ছে কারাগার ও অধঃস্তন কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য পুণীত আইন বিধান। এটি মূলত কারাগার আইন ১৮৯৪, কারাবন্দি আইন ১৯০০ এবং বন্দি শনাক্তকরণ আইন ১৯২০-এর সমন্বয়ে গঠিত।

এটা প্রায় শোনা কথা যে, কারাগারে বছর হয় নয় মাসে। কিন্তু আসলেই কি তাই? না কথাটি ভুলভাবে প্রচলিত। বন্দির সদাচরণ ও কারাবিধি যথাযথ পালনের জন্য সপ্তাহে বা মাসে একজন বন্দি ‘দন্ড হ্রাস’ অর্জন করতে পারে। মূলত এই দন্ড হ্রাস বৃদ্ধির উপর এর মেয়াদ নির্ভর করে, যা কোনমতেই নয় মাসে সীমাবদ্ধ নয়। তাহলে চলুন জেনে নিই জেলকোডে কী বলেঃ

বিধি-৭৫৩ : নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে সাধারণ রেয়াত পাওয়া যাবে না-

১। জরিমানা অনাদায়ে কারাদন্ডের জন্য, ছয় মাসের কম সময়ের সাজার জন্য।

২। বিনাশ্রম কারাদন্ডের জন্য।

কারা আইন, ১৮৯৪ এর ৫৯ ধারার উপধারা (৫) মোতাবেক রেয়াত মঞ্জরী মাধ্যমে দন্ডের মেয়াদ হ্রাসের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধি-৭৫৬ : সাধারণ রেয়াত নিম্নোক্ত হারে অর্জিত হবে-

(ক)      অবিরামভাবে সদাচার            এবং কারাগারের বিধিবিধান যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য প্রতিমাসে ০২ দিন।

(খ)       শিল্প ও অন্যান্য দৈনিক কাজ সঠিকভাবে পালন করার জন্য প্রতিমাসে দুই দিন।

বিধি-৭৫৭ : বিধি ৭৫৬ মোতাবেক রেয়াত অনুমোদন সত্ত্বেও কয়েদি কারাবন্দী ০৮দিন, কয়েদী নৈশ প্রহরী ০৭ দিন, কয়েদী ওভারশিয়ার ছয় দিন এবং কয়েদী নৈশ ওয়াচম্যান পাঁচ দিন হারে প্রতি মাসে সাধারণ রেয়াত পাবে।

বিধি-৭৫৯ : যেসব সাজাপ্রাপ্ত বন্দি কারাগারে বাবুর্চী, সুইপার প্রস্তুতি কাজে সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটির দিনেও কাজ করে, তারা প্রতি মাসের শেষে অতিরিক্ত একটি (০১) রেয়াত পাবে।

বিধি-৭৬৫ : সাধারণ রেয়াতের যোগ্য হোক বা না হোক যেকোন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে বিশেষ কাজের জন্য বিশেষ রেয়াত দেওয়া যেতে পারে, যেমন-

(ক)      হস্তশিল্প শ্লিা দানে কৃতিত্বের জন্য

(খ)       বিরাট আয়সম্পন্ন ভালো মানের কাজের জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি বিধি-৭৬৮ : এই বিধিগুলো

কোনো বন্দিকে প্রদত্ত মোট রেয়াতের পরিমাণ বিশেষ অনুমোদন ব্যতীত দন্ডের মেয়াদের এক চতুর্থাংশের বেশি হবে না। অর্থাৎ এতক্ষণ যাদের মানে হয়েছে, জেলখানায় শুধু রেয়াত আর রেয়াত তাদের জন্য বিধি ৭৬৮টি আর একবার পড়া গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টাদশ অধ্যায় (ধর্মীয় আচারণ) বিধি-৬৮৯ : সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াও সব শ্রেণীর বন্দীকে নিম্নোক্ত গেজেটেড ছুটি দেওয়া হবে

১। দুর্গাপূজা                             ০১ দিন

২। জাতীয় শহীদ দিবস-          ০১ দিন

৩। ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী-             ১দিন

৪। বিজয় দিবস                       ১দিন

৫। বৌদ্ধ পূর্ণিমা-                    ১দিন

৬। ঈদুল আয্হা                     ২টি

৭। স্বাধীনতা দিবস                   ১দিন

৮। ঈদ-উল-ফিতর                 ২দিন

৯। বড়দিন                               ১দিন

১০। মে দিবস                          ১দিন

মোট                                        = ১২দিন।

অনেকের মনে একটা কনফিউশন আছে যে, সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটি ও মানে হয় দন্ডের মেয়াদ থেকে বাদ যায়। ধারণাটি ভুল কেননা একমাত্র রেয়াতেই কেবল দন্ডের মেয়াদ হ্রাস করতে পারে। ছুটির দিনগুলোতে কয়েদিরা বিভিন্ন কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি পান।

সারংশ : উপরিউক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে নির্দ্বিধায় বলা যায় কারাগারে কতদিনে বছর হবে এর নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা

নেই। সেটা ০৯ মাসে হতে পারে আবার ১২ মাসেও হতে পারে। নির্ভর করে রেয়াতের উপর।

এমনকি বিধি ৭০৪ ও৭০৮ অনুসারে সেটা অনেক সময় শাস্তি হিসেবে সেটা বেশিও হতে পারে।

বিষয়-০২ :

# যাবজ্জীবন কারাদ- মানে কি- ১৪ বছর, ৩০ বছর নাকি

আমৃত্যু?

যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মেয়াদ নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি বিভ্রান্তি রয়েছে। আমরা এতদিন জানতাম যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদন্ড এবং দন্ডবিধিতে তাই বলা আছে। কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ আদালত একটি রায় দিয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ড মানে ৩০ বছর এবং সেই সঙ্গে রেয়াত প্রযোজ্য হবে।

সুতরাং উচ্চ আদালতের রায়ের আগে আমরা জেনে নেই, দন্ডবিধিতে কি বলা আছে।

ধারা-৫৭ পেনাল কোড ১৮৬০ :

সাজার মেয়াদের ভগ্নাংশ হিসাবের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ৩০ বৎসর মেয়াদের কারাদন্ডের সমান বলে গণনা করা হবে।

ব্যাখ্যা : যাবজ্জীবন কারাদ- মানে আমৃত্যু কারাদন্ড কিন্তু কখনও যদি সেট ভগ্নাংশে পরিণত করার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা ধরে নিতে হবে ৩০ বছর।

উদাহরণ- এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হলো এবং তার সহযোগীদের এক-তৃতীয়াংশ শান্তি দেওয়া হলো।

সে ক্ষেত্রে তার সহযোগীদের (৩০/৩=১০) ১০ বছর শান্তি দেওয়া হবে।

সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায়ঃ

‘আতাউর মৃধা বনাম রাষ্টু’ মামলায় সম্প্রতি আপিল বিভাগ বলেছে ‘বাংলাদেশের দন্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজার অর্থ হবে ৩০ বছর কারাদন্ড। যদি কোনো ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদন্ড দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে তা হবে আজীবন কারাদন্ড’ সহজ ভাষায় যাবজ্জীবন কারাদ- মানে ৩০ বছর কারাদন্ড। উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে কয়েদি রেয়াত প্রাপ্ত হবেন।

সম্পর্কিত আইন, ১। ৫৭ ধারা, দন্ডবিধি

২। ৩৫এ, ফৌজদারি কার্যবিধি ৩। ধারা ৫৯ কারা আইন

৪। বেয়াত ২১ অধ্যায় জেল কোড তাহালে ১৪ বছর কীভাবে আসলো?

ছোটবেলায় শুনতাম যাবজ্জীবন কারাদন্ড মানে ১৪ বছর। কথাটি যে মিথ্যা, তা আমরা এতক্ষণে জেনে গেছি। তার পরও এর উৎস খোঁজার চেষ্টা করলাম।

বিধি-৫৬৯, জেল কোড : কোনো সশ্রম সাজাপ্রাপ্ত বন্দি রেয়াতসহ ১৪ বছর সাজা অতিবাহিত করার পর তার মুক্তির বিষয়ে সরকারের সিন্ধান্তের জন্য করা মহাপরিদর্শকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠাতে পারেন।

ধারা-৫৫ দন্ডবিধি : যাবজ্জীবন কারাদন্ড দান করা যেতে পারে এই রূপ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীর সম্মুখি ব্যতীরেকে ওই দন্ডকে যেকোনো বর্ণনার অনূধর্য় ২০ বছর (বর্তমানে রেয়াত প্রযোজ্য হবে এবং শাস্তি ১৪ বছরের কাছাকাছিই হবে) মেয়াদী কারাদন্ডে পরিবর্তিত করিতে পারবে।

লেখক : সহকারী পুলিশ কমিশনার (প্যাট্রোল-তেজগাঁও)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *