ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ডিটেকটিভ রিপোর্ট

বাংলাদেশ পুলিশের বিদায়ী ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) বাংলাদেশ পুলিশ পরিবারের সদস্য হিসেবে সুদীর্ঘ ৩৫ বছরের পথ-পরিক্রমা শেষে ১৪ এপ্রিল ২০২০ বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আইজিপি থাকাকালীন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এই বিদায়লগ্নে কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছে বাংলাদেশ পুলিশ।

কেবল বাংলাদেশ পুলিশের প্রধান হিসেবে নয়, সমগ্র কর্মজীবনেই তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট ছিলেন। আধুনিক, প্রযুক্তিজ্ঞান সমৃদ্ধ, সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম মননে-মানসে মানবিক পুলিশ প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। সর্বোপরি বাংলাদেশ পুলিশকে ‘জনতার পুলিশ’ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর একান্ত প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য ও তাদের পরিবারের সার্বিক কল্যাণে তিনি বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আইজিপি হিসেবে তার কর্মকালে সদস্যদের কল্যাণে রেশন, চিকিৎসা সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতার আমূল সংস্কার করেন। কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের জন্য রেশন সুবিধা ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের আজীবন রেশন সুবিধা চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশ সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের জন্য মেধাবৃত্তি প্রবর্তন করেছেন। এ ছাড়াও, ১৩টি জেলা শহরে পুলিশ হাসপাতাল নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।

বিদায়ী ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) এর সময়কালে পুলিশের নিয়োগ,পদোন্নতি এবং পদায়নসহ সার্বিক কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পুলিশে ৩৫০০জন সাব-ইন্সপেক্টর এবং ১০ হাজার কনস্টবল নিয়োগ অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশে ২১৫টি পুলিশ সুপারের পদ সৃজন করা হয়েছে এবং ২৩০ জন কর্মকর্তাকে পুলিশ সুপার পদে সুপার নিউমারারি পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও শূন্য পদসমূহের বিপরীতে যথাসময়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন এবং মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। পুলিশের সেবা জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জনসাধারণের অতিপ্রিয় ও পরিচিত ‘জাতীয় জরুরি সেবা- ৯৯৯’ কে আধুনিকায়ন করা হয়েছে তারই কর্যকালে। পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স এবং ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবা পেতে মানুষ ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে এখন কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে। এমনকি করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির চিকিৎসাসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রাপ্তির লক্ষ্যেও জনসাধারণ ৯৯৯ এর শরণাপন্ন হচ্ছে।

বিদায়ী আইজিপির দক্ষ নির্দেশনায় সার্বিক আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, একাদশ জাতীয় নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, জেলা পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। এছাড়াও সাইবার অপরাধ দমন, চরমপন্থী- জলদস্যু ও বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ, সাইবার অপরাধ, বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করেছে।

দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমন সনাক্তের পরপরই বিদায়ী আইজিপির নির্দেশনায় এ ভাইরাস প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করা, সরকারি নির্দেশনা ও জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, লিফলেট বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে বাংলাদেশ পুলিশ। লোকাল ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা, মসজিদ, মন্দির, পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজারে জনগণকে সচেতন করার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

বিদায়ী আইজিপির নির্দেশে সর্বপ্রথম ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্তৃক জনসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের লিফলেট ও সনাক্তকরণ সিল প্রদান করেছে। বিদেশ হতে আগত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও জেলা আনসার এ্যাডজুটেন্টগণের নিকট প্রেরণ করা হয়। এ ছাড়াও বিদেশ হতে আগত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা প্রদান/উৎসাহিতকরণ/সচেতনতামূলক কার্যক্রম(মাইকিং/লাল পতাকা টানানো/ স্টিকার) গ্রহণ করা হয়। দেশি-বিদেশী নাগরিকগণের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

করোনাকালে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং মজুদদার ও কালোবাজারি রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সকল ধরণের সমাবেশ, গণজমায়েত এবং সোশ্যাল ডিসট্যান্স ও চলাচল সীমিতকরণ/রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত আছে।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

বিদায়ী আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বিপিএম (বার) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর থানাধীন মান্দারী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৬ষ্ঠ বিসিএস-এ (১৯৮৪) পুলিশ ক্যাডারে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করেন। চাঁদপুরের এ কৃতি সন্তান নিজ জেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সমাজ কল্যাণ বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘Combating Terrorism in Bangladesh: Challenges and Prospects’.

এ কর্মকর্তা দেশের গন্ডির বাইরে যুক্তরাজ্যের University of Leicester হতে ‘Criminal Justice and Police Management’ বিষয়ে Post Graduation Certificate এবং যুক্তরাষ্ট্রের University of Virginia থেকে ‘Criminal Justice Education’ বিষয়ে Certificate of Achievement অর্জন করেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের FBI National Academy, Virginia হতে উচ্চতর পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি সাফল্যের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের Harvard University থেকে ‘US-South Asia Leader Engagement Program’ সম্পন্ন করেন।

বত্রিশ বছরের গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও সুনামের সাথে কাজ করেছেন। তিনি অ্যাডিশনাল আইজি (গ্রেড-১) স্পেশাল ব্রাঞ্চ, অ্যাডিশনাল আইজি সিআইডি, অ্যাডিশনাল আইজি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, পুলিশ কমিশনার রাজশাহী, পুলিশ কমিশনার খুলনা, ডিআইজি সিআইডি, কমান্ড্যান্ট, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার নোয়াখালী, কমান্ড্যান্ট, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, রংপুর, পরিচালক, পুলিশ স্টাফ কলেজ, এসএস, নগর বিশেষ শাখা ঢাকা, এডিসি ডিএমপি, স্টাফ অফিসার-টু-আইজিপি, অ্যাডিশনাল এসপি সিলেট, মহামান্য রাষ্ট্রপতির পুলিশ লিঁয়াজো অফিসার এবং এএসপি নেত্রকোণা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দেশের গন্ডি ছেড়ে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে ড. পাটোয়ারী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সুদানে Deputy Police Commissioner (Acting), জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কসোভোতে Chief of Administration, Missing Persons Unit, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সিয়েরোলিওনে Chief of Operations, UN Protection Force ক্রোয়েশিয়াতে Station Commander হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০১০ ও ২০১১ সালে দুই বার বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পুলিশ পদক, বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম)-এ ভূষিত হন। এছাড়া তিনি দু’বার IGP’s Exemplary Good Service Badge লাভ করেন। তিনি নিজ উদ্যোগ ও চেষ্টায় বিভিন্ন নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ সকল বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে স্পেশাল ব্রাঞ্চকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।

ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার)  বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদা, রাজশাহী, পুলিশ স্টাফ কলেজ ঢাকা, ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুল ঢাকা, স্কুল অব ইন্টেলিজেন্স স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ঢাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়-এর একজন রিসোর্স পার্সন হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করেন।

ড. পাটোয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ‘ভিক্টিমোলোজি এন্ড রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বিষয়ে এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইলের ‘ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ’ এর একজন ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।

তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *