ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এম রশিদুল আলম পিপিএম বার

বাবা ছিলেন দারোগা। চোর ডাকাত গুন্ডা বদমায়েশদের দমন শাসন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখে পেশাটাকে ভালো চোখে দেখতাম না। কিন্তু ভাগ্যের লিখন জীবন জীবিকার জন্য এই পেশাকেই গ্রহণ করতে হলো। আর প্রশিক্ষণকাল থেকেই আত্মনিয়োগ করেছিলাম পেশাদারিত্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জন আর বাস্তব প্রতিফলন।

১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাস। খুলনা সিটি কলেজে আইন বিভাগ পড়াশুনা করি আর যুবলীগের রাজনীতিতে জড়িত হিসাবে একটা পরিচিতি ছিল। পুলিশের এস.আই পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করলাম। আবেদনের প্রেক্ষিতে ফরিদপুর জেলা পুলিশ লাইনস্ েশারীরিক মাপ ও বাছাইয়ের জন্য নির্ধারিত দিন উপস্থিত হয়ে পরিচিত অপরিচিত কমবেশি ৩০০ জন সাব-ইন্সপেক্টর পদপ্রার্থীর মধ্যে প্রথম ধাপে টিকে গেলাম। মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী দিন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য বলা হল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পুলিশ লাইনস্ েঅবস্থানকালে নানা গুজব ও বাতাসে ভাসা কথাবার্তায় মন খারাপ হল। আগেই তদবিরের জোরে লোক সিলেক্ট করে ফেলেছে, কেউ বলছে টাকায় রফা হয়ে গিয়াছে-ইত্যাদি। উল্লেখ্য, আমাদের সময় থেকেই এই পদে গ্রাজুয়েট প্রার্থীদেরই আবেদনের জন্য যোগ্য গণ্য করা হয়।

লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর নিজেকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হলো। পরীক্ষা চলাকালীন বলে দেওয়া হয় পরদিন সকালে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নামের তালিকা জানিয়ে দেওয়া হবে এবং সকাল ০৯:০০টা হতে তালিকার ক্রমিকানুসারে মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। উৎকন্ঠা আর মানসিক চাপ নিয়ে হাজির হয়ে দেখতে পেলাম আমার ক্রমিক নম্বর ২(দুই) প্রথম স্থান অধিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি মাস্টার্স করেছেন। তার পিতা ফরিদপুর পুলিশ অফিসের হিসাবরক্ষক। পিতার অনুরোধে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিলেও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিবেন না, কারণ তিনি বি.সি.এস এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ কারণে আমাকে প্রথম সাক্ষাৎকার প্রার্থী হয়ে অংশ নিতে হল। নির্বাচনী বোর্ড আমাদের ৮জনের তালিকা প্রকাশ করে সিভিল সার্জন অফিসে ডাক্তারি পরীক্ষায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দিলেন।

পরদিন সকালে পুলিশ অফিস থেকে চিঠি নিয়ে ঢাকায় রেঞ্জ ডি.আই.জি অফিসে চূড়ান্ত নির্বাচনী সাক্ষাৎকারে হাজির হওয়ার পালা। ঢাকা রেঞ্জ এর ডি.আই.জি মহোদয়ের নেতৃতে এস.পি ময়মনসিংহ জেলা জনাব আবু তালেব ও ঢাকা জেলার এস.পি জনাব এনামুল হক সাহেবদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিলাম। ফরিদপুর জেলা হতে আমি ও জনাব শরীফ সামছুল হক নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে নিয়োগপত্র পেলাম এবং ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে পুলিশ একাডেমি, সারদায় যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হলো। বিভাগীয় তালিকায়ও আমার নাম ১ নম্বরে ছিল।

পুলিশ একাডেমিতে আউট সাইড ক্যাডেট হিসেবে ১লা জানুয়ারি ১৯৭৭ তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হল। মোট ক্যাডেট ৪১ জন প্রথম দিন আমাদের সকলকে ব্যারাকের সামনে সারিবদ্ধ করে বিভিন্ন নির্দেশনা, থাকা-খাওয়া, চলাফেরা, কথাবার্তা এমনকি ঘুমানো আর ঘুম থেকে জাগার বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হলো। চুল কাটানোর জায়গায় নিয়ে সকলকে চলতি ভাষায় পাতলী ছাট দেওয়া হল। রুমে এসে সবার কাটা চুলের শোক পালনের অবস্থা। তবে নিয়মানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশ একাডেমির অপরিহার্য বিষয়। তা আমরা সহজেই অনুভব করলাম। ক্যাডেটদের শারীরিক উচ্চতা অনুসারে নম্বর দেওয়া হলো। আমার নম্বর পড়ল ২৮। মাঠে ময়দানে আর আইন ক্লাশে এই পরিচিতি উল্লেখযোগ্য। আমাদের ৪১ জনের মধ্যে ১৭ জন মাস্টার্স ও ৮ জন অনার্স পাশ ছিল। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ক্যাডেট সাথীদের মধ্যে ১নং ক্যাডেট মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া (চিটাগাং), ২নং ক্যাডেট মনোয়ারুল ইসলাম, ৭নং ক্যাডেট নজরুল ইসলাম (কুমিল্লা), ১০ নং ক্যাডেট নুর মোহাম্মদ (টাঙ্গাইল), মনির হোসেন, সদরুল হক ও আব্দুল হান্নানদের ইতোমধ্যে জীবনাবসান মনে পড়ে চোখের জল সম্বরণ করতে পারলাম না। তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহপাক যেন তাদের বেহেশত নসিব করেন।

দৈনন্দিন প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সকালে পি.টি, তারপর প্যারেড ও আইন ক্লাশ, বিকেলে খেলাধুলা, কখনও প্যারেড, ঘোড়ায় চড়া। রশি বাওয়া আর সারমাউন্টিং ওয়াল টপকানো প্রথমে কঠিন মনে হলেও শারীরিক ফিটনেস এর সাথে ১৫ দিনে সহজে আয়ত্ত হয়ে যায়। বুট পরা ফোসকায় কথা বললে ওস্তাদরা বলতেন মোজার সাথে ফোসকার শুকিয়ে ঠিক হয়ে যাবে। মাঠের ওস্তাদরা সারদার মাঠকে ছাদ ছাড়া ইউনিভার্সিটি টাইটেল দিয়ে এখন এটাই আসল ভার্সিটি বলে মনে করিয়ে দিতেন। তবে আশার কথা আইন ক্লাশের শিক্ষকরা প্রথম থেকেই সান্ত¡না আর সাহস দিয়ে মনোবল চাঙ্গা রাখার পরামর্শ দিতেন। সলেমান ওস্তাদ, তরিকুল ওস্তাদ, হযরত আলী সুবেদার এবং আইন ক্লাশের শিক্ষক জনাব আব্দুন নুর, আবু ইসহাক, মোঃ ময়েজউদ্দিন, আশরাফ আলী স্যারদের অবদান আমরা কখনও ভুলতে পারব না। এরপর সি.ডি.আই জনাব আঃ শুকুর, সি.আল.আই জনাব সামছুদ্দিন আহমেদ এবং সর্বোপরি প্রিন্সিপাল জনাব এম.এম. শরীফ আলী ও ভাইস প্রিন্সিপাল জনাব পি.বি মিত্র স্যারদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা না জানালে গভীর আত্মযন্ত্রণায় আমাদের ভুগতে হবে।

প্রশিক্ষণ সময়ের দু একটি করুণ স্মৃতি। ৬ মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে আসা জনাব সাইদুর রহমান এর পি.টি চলাকালীন অকাল মৃত্যুবরণ এবং ২জন ক্যাডেট জনাব আঃ সালেহ্ ও জাহাঙ্গীর (উভয়েই খুলনার) বৈবাহিক সম্পর্ক গোপন করে চাকরিতে যোগদান করায় চাকরিচ্যুতি। দীর্ঘ ১ মাস প্রশিক্ষণের কঠিন সময় পার করে তাদের বিদায় দেওয়া শুধু আমাদেরই নয় ওস্তাদ আইন শিক্ষক সকলের চোখের পানি ঝরিয়েছিল। একদিন প্রিন্সিপাল স্যার প্যারেড গ্রাউন্ড-এ ঘোড়ায় চড়ে ঢুকলেন। আস্তে আস্তে আমাদের প্লাটুনের সামনে এলেন। সি.ডিআই সাহেব ঘোড়ার পাশে এলেন। ঘোড়ায় বসেই আমাদের ৪/৫ জন ক্যাডেটদের নাম ও ক্যাডেট নম্বর উল্লেখ করে ফলআউট করালেন। প্রিন্সিপাল স্যার অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে একাডেমিতে প্রকাশিতব্য ম্যাগাজিনে সকলকে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যেকোনো বিষয়ে লেখনী দেওয়ার আহ্বান জানালেন। সময় দেওয়া হল ১৫ দিন। প্রিন্সিপাল স্যার চলে গেলে সি.ডি.আই সাহেবের কাছে আমরা জানতে চাইলাম প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে মাত্র ১বার আমাদের সাথে দেখা হয়েছে-কিন্তু কিভাবে আমাদের নাম ধরে ফল আউট করালেন। উনি বললেন স্যার তো পি.এস.পি অফিসার আর খুব মেধা সম্পন্ন। আপনাদের সকলের ছবি আর নাম স্যারের ফাইলে আছে। ফাইল দেখেই স্যার সব মনে রাখতে পারেন। যেমন আদেশ তেমনি কাজ। শুরু হলো রাতের পড়ার ফাঁকে লেখা তৈরির পালা। লেখা জমা দেওয়ার কয়েকদিন পর আমার ডাক পড়লো প্রিন্সিপাল মহোদয়ের অফিসে। সুসজ্জিত পোশাকে প্রিন্সিপাল মহোদয়ের অর্ডারলি আমাদের আইন ক্লাশের সামনে এসে জনাব আব্দুন নুর স্যারের হাতে আমার নাম ও ক্যাডেট নম্বর সম্বলিত স্লিপ দিলেন। সকলের চোখ ছানাবড়া আগের দুই ক্যাডেট সালেহ্ ও জাহাঙ্গীরের মতো অবস্থা হবে কিনা। প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের সামনে সি.ডি.আই জনাব আঃ শুকুর সাহেব আমার অপেক্ষায় ছিলেন। আমাকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে প্রবেশ, হল্ট, রাইটটার্ন, স্যালুট-আপ ইত্যাদি ভালো করে শিখালেন। দোয়া কালাম পড়তে পড়তে রুমে ঢুকলাম। সি.ডি.আই সাহেব বের হলে প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন-কিন্তু এই দুঃসাহস হচ্ছিল না। দ্বিতীয় বার স্যার বললেন “আমি বলছি বসেন”। উনার ব্রিফকেস থেকে আমার জমা দেওয়া লেখাটা বের করে বললেন, আপনার লেখাটা সুন্দর হয়েছে। ছোটখাট ত্রুটি যেমন রেইনট্রি এর স্থলে রেনডি গাছ, বিউগেল স্থলে রেওয়ালী শব্দের লাল কালি চিহ্নিত জায়গাগুলো সংশোধন করে তিনদিন পর জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কর্তৃপক্ষ ১৯৭৭ সালের ম্যাগাজিনে “আমি সারদা থেকে বলছি” লেখাটাই স্থান দিয়েছিলেন।

পুলিশ একাডেমিতে আইন সংক্রান্ত বিষয়াদির ওপর পড়া লেখা মাঠের পি.টি. প্যারেড, রাইডিং অস্ত্র প্রশিক্ষণ, কমান্ড শিখতে আর দিতে এক বছর সুন্দরভাবে কেটে যায় আর শরীরটা আজীবন সুস্থ সবল রাখতে সহায়ক হয়। আর সারদার ভাষায় ‘মগড়া’ হলে কাউকে ‘ওভার ষ্টেয়াল’ এর যন্ত্রণায় পড়তে হয়। প্রশিক্ষণের প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও শেষ পর্যায়ে এসে বুঝা যায় এক বছরের ভালো কাজ, মন্দ কাজ আর প্রতিটি সাবজেক্ট এর চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রশিক্ষকদের মূল্যায়ন প্রতিফলিত হয়। চূড়ান্ত পরীক্ষায় আমার এবং ক্যাডেট নং ৭ নজরুল ইসলাম এর সমান নম্বর হওয়ায় আমাদের দুইজনকে ভাইস প্রিন্সিপাল জনাব পি.বি. মিত্রের নেতৃত্বে বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত “BEST ALL ROUND CADET, 77” হিসাবে আমাকে মনোনীত করে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।  সেই আনন্দঘন মুহূর্ত কোনোদিন ভুলবার নয়।  

পুলিশ একাডেমি থেকে সকলের পোস্টিং জেলা জানিয়ে দেওয়া হয়। আমার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে বদলির আদেশ হলেও আবেদনক্রমে খুলনা জেলায় বদলির আদেশ হয়। দীর্ঘ ১ বছর প্রশিক্ষণের পর চাকরিস্থলে যোগদানের স্বপ্নরাজ্যে প্রবেশের আগ্রহ থাকলেও পুলিশ একাডেমি এতদিনে সকলের একটা আপন জায়গা হিসাবে মনে স্থান করে নিয়েছে যা বিদায়ের মুহূর্তে অনুভব করা যায়।

লেখক : প্রাক্তন সহকারী পুলিশ সুপার

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *