ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ সাইফুল হক

॥১॥

খোকার শিক্ষা ও দীক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন গৃহশিক্ষক হামিদ মাস্টার। তিনি ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করে এর সাথে মুজিবকে সম্পৃক্ত করলেন। যার মধ্য দিয়ে মুজিব মানবিক মূল্যবোধের সিঁড়িতে পা রাখলেন। হামিদ মাস্টার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। স্বদেশী আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছেন। খোকা জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার আপনি জেলে গিয়েছিলেন। আপনার খারাপ লাগেনি। জেলে যায় তো চোর-ডাকাতরা।’ হামিদ মাস্টার বলেন ‘শেখ মুজিবুর রহমান, শোনো, দেশের জন্য যদি কেউ পুলিশের হাতকড়া পরে বা জেলে যায়-এটা গৌরবের ব্যাপার।’ হামিদ মাস্টার তাকে সূর্যসেন, তিতুমীর আর ক্ষুদিরামের গল্প শোনান। তিনি বলেন, ‘এই যে সূর্যসেনের ফাঁসি হলো, সূর্যসেন কি চোর ছিলেন? তিনি হচ্ছেন বিপ্লবী।’ ‘ফাঁসির আগে তিনি বলেছেন, ‘মৃত্যু আমার দরজায় কড়া নাড়ছে। আমি মূত্যুকে আলিঙ্গন করবো, আমার প্রিয়তম বন্ধুর মতো। এই কঠিন মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি একটি স্বপ্ন। আমার সোনালি স্বপ্ন। স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন। প্রিয় বন্ধুরা, সামনে এগিয়ে চলো। জাগো, হতাশার কাছে হার মেনো না। জয় আমাদের হবেই।’ শোনো শেখ মুজিবুর রহমান, ‘যে মরতে ভয় পায় না, তাকে কেউ হারাতে পারে না। জয় তার হবেই।’ খোকার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে মেরুদ- সোজা করে নড়েচড়ে বসে। তাঁর চোয়াল শক্ত হয়। হামিদ মাস্টার ক্ষুদিরাম বসুর গল্প করেন। ১৮ বছরের বালক কী করে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলো। হামিদ মাস্টার দরদ দিয়ে গাইতে লাগলেন, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।’ এই গানের সুর খুবই করুণ আর মর্মস্পশি। বালক শেখ মুজিবের চোখে জল আসে। তার মনে হয়, সেও যদি যোগ দিতে পারতো বিপ্লবীদের দলে, এমনি করে দেশমাতার জন্য যদি সেও ফাঁসিতে ঝুলতে পারতো।

॥২॥

১৯৩৮ সাল। এই সময় ঘটে গেলো একটি ঘটনা। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে একটু উত্তেজনা চলছিলো। দু’একজন মুসলমানের উপর অত্যাচারও হলো। আব্দুল মালেক নামে মুজিবের এক সহপাঠী ছিলো। একদিন সন্ধ্যায় মুজিব মাঠ থেকে ফুটবল খেলে বাড়িতে এসেছে। একজন এসে বললো, ‘মালেককে হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে মারপিট করছে। যদি পারও একবার যাও। তোমার সাথে ওদের বন্ধুত্ব আছে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো।’ মুজিব আর দেরি না করে কয়েকজন ছাত্র ডেকে নিয়ে ওদের ওখানে যায় এবং অনুরোধ করে তাকে ছেড়ে দিতে। রমাপদ দত্ত নামে একজন তাকে দেখেই গাল দিলো। মুজিব তার কথার প্রতিবাদ করলেন। তিনি তার দলের ছেলেদের খবর দিতে বললেন। এর মধ্যে রমাপদরা থানায় খবর দিলো। তিনজন পুলিশ হাজির হলো। মুজিবের দলের লোকজনও হাজির হলো। এর মধ্যেই দু’পক্ষের মারপিট শুরু হয়ে গেছে। তাদের নামে থানায় মামলা হলো। ৭/৮ জনকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হলো। মুজিবকে ধরার জন্য পুলিশ তাদের বাড়ির দিকে আসছে। মুজিবের ফুফাতো ভাই তাকে বললো, ‘মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাও না।’ তিনি বললেন, ‘যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।’ মুজিবকে গ্রেফতার করে কোর্টে তোলা হলো। কোর্টের দারোগা তাকে দেখে বললেন, ‘মুজিব খুব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিলো রমাপদকে। কিছুতেই জামিন দেয়া যাবে না।’ মুজিব বললেন, ‘বাজে কথা বলবেন না। ভালো হবে না।’ তাদেরকে জেলে পাঠানো হলো। মুজিব জীবনে প্রথম জেল খাটলেন। সাত দিন জেলে থাকলো এবং পরে জামিন পেয়ে বের হলেন। পরবর্তীতে দু’পক্ষের আলাপ আলোচনায় মামলা আর চললো না।

॥৩॥

গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল পরিদর্শনে আসবেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক আর বাণিজ্য ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলে সাজ সাজ রব। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, বাগান, মাঠ পরিষ্কার করা হচ্ছে। ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এত বড় দুজন মানুষ আসছেন তাদের স্কুলে। হঠাৎ যদি হক সাহেব বা সোহরাওয়ার্দী সাহেব কোনো প্রশ্ন করে বসেন, কে উত্তর দেবে। ক্লাসে ক্লাসে সব শিখিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকেরা। শুধু মুজিবের মাথায় অন্য চিন্তা। স্কুলের অন্য ছেলেদের তুলনায় সে বয়সে একটু বড়, উচ্চতায়ও। স্কুলের হোস্টেলে তিনি নিয়মিত থাকেন না। কাল প্রধানমন্ত্রী আসছেন, তারই উত্তেজনায় আজকের রাতটা সে থাকছে হোস্টেলে। শীতের রাতে হোস্টেলের চালের দিকে তাকিয়ে তার ঘুম আসে না। চালটা ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। বিছানায় কাঁথার নিচে শুয়ে কুয়াশা ঢাকা চাঁদের আলো দেখছে ছাদের ফুটো দিয়ে। ছেলেটা হঠাৎ বিছানায় ওঠে বসে। ‘এই তোরা ঘুমাস, ঘুমালে চলবে। সবাই উঠে বস?’ অন্য ছাত্ররা সবাই ওঠে বসে। সবাই তার কথা শোনে। মুজিব বলেন, ‘আমাদের হোস্টেলের ছাদ ভাঙা, কিন্তু এইটা ঠিক করার কোনো নামগন্ধ নেই। আমরা কাল প্রধানমন্ত্রীকে বলব এটা ঠিক করে দিতে। তাঁদের ডেকে এনে দেখাব ছাদের কী হাল। তোমরা সবাই থাকবা আমার সাথে।’ পরের দিন অতিথিরা আসলেন স্কুল পরিদর্শনে। সঙ্গে মহকুমা প্রশাসক, প্রটোকল কর্মীরা ও নিরাপত্তা রক্ষীরা। পরিদর্শন শেষে সবাই চলে যাচ্ছিলেন। মুজিব তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে মন্ত্রীদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। আপনারা চলে যাচ্ছেন আমাদের হোস্টেলের চালের কী হবে? হক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কী সমস্যা তোমাদের বোর্ডিং ঘরের? ‘চালটা পুরানো হয়ে ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। এখন শীতের রাতে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢোকে। কুয়াশা পড়ে।’ হক সাহেব বললেন, ‘কত টাকা দরকার?’ হাজার বারো’শ টাকা হলে হবে। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী তার কর্মকর্তাকে নিজের ফান্ড থেকে অনতিবিলম্বে টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

॥৪॥

স্কুল পরিদর্শন শেষ করে ডাক বাংলোয় ফিরে গেলেন শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। দুপুরের খাবার খেতে খেতে কথা উঠল ওই বেতের মতো চিকন শরীর, লম্বা চোখে কালো চশমা পরা ছেলেটাকে নিয়ে। ‘কী রকম সাহস? কী রকম স্পষ্ট করে জানালো তাদের অভাব-অভিযোগ। এই রকম তরুণই তো চাই।’ বললেন সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দী এক কর্মকর্তাকে বললেন, ‘চেনেন নাকি ছেলেটাকে?’ কর্মকর্তা হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। ‘ডেকে আনুন না তাকে। ছেলেটাকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। একটা স্লিপ পাঠিয়ে দেন যেন ও এসে সরাসরি আমার সাথে দেখা করতে পারে।’ মুজিবকে ডেকে আনা হলো স্কুল থেকে। প্রধান শিক্ষক গিরিশ বাবু ভীষণ দুচিন্তাগ্রস্ত। কী-না-কী শাস্তি হয়ে যায়, মুজিবের? সোহরাওয়ার্দী বাংলারই নেতা ছিলেন, কিন্তু ঠিক বাঙালি ছিলেন না। তিনি কথা বলতেন ভাঙা বাংলায়, কিন্তু উর্দু ও ইংরেজিটা ভালো বলতেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত সোহরাওয়ার্দী ব্যারিস্টার হিসেবে ছিলেন খুব নামকরা। মুজিবকে ডেকে এনে সোহরাওয়ার্দী যথারীতি উর্দু-ইংরেজি মেশানো বাংলায় বললেন, ‘তোমার নাম মুজিবুর রহমান।’ ‘জি, শেখ মুজিবুর রহমান।’ ‘তোমার সাহস, তোমার কথাবার্তা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তোমার মতো ছেলেই আমাদের দরকার, দেশের দরকার।’ সোহরাওয়ার্দীর ভাঙা ভাঙা বাংলা বলা মুজিবের খুবই পছন্দ হলো। তিনি আরো বললেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ মুজিব বললেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। মুসলিম ছাত্রলীগও নেই।’ সোহরাওয়ার্দী আর কিছুই বললেন না। শুধু নোটবুক বের করে মুজিবের নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে মুজিব একটা চিঠি পেল, তাতে তিনি মুজিবকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং কলকাতায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। মুজিব নেতার চিঠির উত্তর দিলেন।

॥৫॥

মুজিবের বয়স ১৮। রেনু ১১। এবার তাদের আনুষ্ঠানিক বিবাহ দিতে হয়। লুৎফর রহমান শুভদিন দেখে দিনক্ষণ ধার্য করেন। টুঙ্গিপাড়ার আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশী ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। রেনু পঞ্চম শ্রেণি পাশ দিয়ে ফেলেছেন। এখন তিনি শাড়ি পরেন আর বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বই পড়েন। আর ঘর গৃহস্থালির কাজে মাকে সাহায্য করেন। এর সঙ্গে তিনি রপ্ত করেছেন আর একটি বিষয়। সেটা হলো পান খাওয়া আর পান সাজানো। মুজিবও তার কাছ থেকে পান চেয়ে খান। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করেন। সাত দিনের জেল খেটে মুজিব বাড়িতে এলে, রেনু জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি চুরি করেছো যে তোমারে জেলে নিল?’ মুজিব বলে, ‘চুরি করি নাই রেনু। মানুষের উপকার করতে গিয়েছিলাম। হিন্দু-মুসলমান মারামারি করতে নিয়েছিল; আমি সেইটা থামাতে গিয়েছিলাম।’ রেনু উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, ‘তুমি যে লাঠি নিয়ে মারামারি থামাতে গেলা, তোমার মাথায় যদি একটা বাড়ি মারত লাঠি দিয়ে?’ মুজিব রেনুকে বোঝায়, ‘শোনো রেনু, যে মরতে ভয় পায় না, তাকে কেউ হারাতে পারবে না। জয় তার হবেই। আমি ভয় পাই না। জয় আমার হবেই।’ বিয়ে হলো বটে, কিন্তু এখনই একসঙ্গে থাকা হচ্ছে না দুজনের। মুজিব আবার ফিরে গেলেন গোপালগঞ্জে। পড়াশুনা চলছে, প্রাইভেট পড়ছেন, কিন্তু পড়ার চেয়ে তাঁর মন বেশি পড়ে থাকে বাইরে। তাঁর গৃহশিক্ষক আব্দুল হামিদের মুখে শোনা বিপ্লবীদের বীরত্বগাঁথা তাঁর রক্তে বাজে। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে হবে। ইংরেজ তাড়াতে হবে। মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছে। গোপালগঞ্জেও আছে তার মহকুমা অফিস। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ফিরে এসেছেন ইংল্যান্ড থেকে। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা লিয়াকত আলী খান তাঁকে জোর করে ফিরিয়ে এনেছেন ভারতবর্ষের মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভালো করেছে। মুজিব মুসলিম লীগের গোপালগঞ্জ অফিসে যেতে শুরু করলেন। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এটা-ওটা কাজ করেন। পার্টির যে কোনো কাজের ডাক পড়লেই  হলো, তিনি ঝাঁপিরে পড়েন। তাঁকে মুসলিম লীগ গোপালগঞ্জ শাখার নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক করা হলো। এর মধ্যে তাকে দু-তিনবার পুলিশ ধরেছে।

  লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার, (ট্রাফিক-

  উত্তরা), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *