ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মুফতী মোঃ আবদুল্লাহ

হজ বিষয়ক ৫টি হাদীস:

১। ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিবেদিতভাবে, সর্ব প্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতামুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করলো, সে নবজাতক শিশুর অনুরূপ নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরল’।  

২। ‘তোমরা হজ্জ ও উমরাহ পাশাপাশি সম্পাদন কর। কেননা, এ দু’টি দারিদ্র ও পাপ দূরীভূত করে’।

৩। ‘যাকে বাহ্যিক কোনো সমস্যায় বা অত্যাচারী শাসক বা অপরাগকারী কোনো রোগ হজে যেতে বাধা দেয়নি। তারপরও সে হজ করল না। তাহলে এমন ব্যক্তি ইহুদি হয়ে মারা যাক বা খ্রিস্টান হয়ে মারা যাক, সমান কথা’। অর্থাৎ হজ না করার দরুন সে যেন বাস্তবে ইহুদি-খ্রিস্টানের অনুরূপ হয়ে গেল। 

৪। ‘যে ব্যক্তি হজ্জের ইচ্ছে করল (ফরয হয়েছে বিধায়) সে যেন তাড়াতাড়ি করে’। 

৫। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি নবীজীর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করল, আমার বোন হজ্জ করার মান্নত করেছিল, অতঃপর সে মারা গেল! (এখন কী করণীয়?) নবীজী (সা) বললেন : যদি তার কাছে কারও ঋণ প্রাপ্য থাকতো তা হলে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? লোকটি জবাবে বলল, হ্যাঁ। নবীজী (সা) বললেন, সুতরাং তুমি তার পক্ষ থেকে (বদলীর মাধ্যমে) আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করে দাও! তাঁর পাওনা অধিক পরিশোধযোগ্য।

পিতামাতার আনুগত্য বিষয়ক পাঁচটি হাদিস

পিতা-মাতার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে, তাঁদের অবাধ্য হলে তার শাস্তি পরকালেও ভোগ করতে হবে এবং মৃত্যুপূর্বে দুনিয়াতেও ভোগ করতে হয়। 

নিম্নে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো ঃ-

হাদিস-১ : হযরত আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন: তাঁর কাছে একজন লোক এসে বলল, আমার ১ জন স্ত্রী আছে। আমার মা নির্দেশ দিচ্ছেন তাকে তালাক দিয়ে দিতে। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে আমার বাবা বলছেন, স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিতে। তখন হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) নিজের পক্ষ থেকে তার জবাব না দিয়ে বললেন, আমি নবীজী (সা)-কে বলতে শুনেছি: ‘পিতা বা মাতা হচ্ছেন, বেহেশতে সর্বোত্তম দরজা।’ সুতরাং তুমি যদি চাও, তা ভেঙ্গেও ফেলতে পার অথবা রক্ষাও করতে পার। অর্থাৎ তাঁদের আদেশ মান্য করে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বেহেশতের পথ খোলা রাখতে পার। আর না হয় তাদের আদেশ অমান্য করে তোমার বেহেশতের পথ রুদ্ধ করে ফেলতে পার।

তবে পিতামাতার অন্যায় আবদারের দরুন তেমন তালাকের পদক্ষেপ না নিলে কোনো পাপ হবে না। 

হাদিস-২ : হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: মহানবী (স) ইরশাদ করেছেন: “পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ্র অসন্তুষ্টি নিহিত’। 

হাদিস-৩ : হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বাকরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : প্রিয় নবী (সা) বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ্ সম্পর্কে বলবো? সাহাবাগণ বললেন: হ্যাঁ, অবশ্যই। নবীজী (স) বললেন: আল্লাহর সঙ্গে শেরেক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া —–’। 

হাদিস-৪ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন, অন্যতম কবীরা গুনাহ্ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির তার মাতা-পিতাকে গালিদান। সাহাবাগণ আরজ করলেন; ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা)! কেউ কি তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়? নবীজী (সা) বললেন : হ্যাঁ, সেটা এভাবেও হয় যে, তুমি আরেকজনের বাবা-মাকে গালি দিলে এবং সে তোমার বাবা-মাকে গালি দিল’। 

হাদিস-৫ : হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: প্রিয় নবী (সা) ইরশাদ করেছেন, তিনটি দোয়া-মুনাজাত এমন রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে কবুল হয; (১) নিপীড়িতের দোয়া, (২) মুছাফিরের দোয়া, (৩) সন্তানের ক্ষেত্রে পিতার বদ-দোয়া বা অভিশাপ’। 

‘বিপদগ্রস্ত, বন্যাদুর্গত ও অসহায় এর সহায়তা বিষয়ক পাঁচটি হাদিস :

১। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন : আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু কিয়ামতের দিনে বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার খোঁজ-খবর নাওনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমার খোঁজ-খবর করব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক।  আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি তার সেবা-শুশ্রƒষা করলে তার কাছেই আমাকে পেতে। হে আদম   সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি কী করে তোমাকে আহার করাতে পারি? তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক। তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে আহার চেয়েছিল? তুমি তাকে খেতে দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তাকে আহার করাতে, তা হলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি কী করে তোমাকে পান করাব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, আমার আমুক বান্দা তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তা আমার কাছে পেতে।’ 

২। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি ইমারত সদৃশ, যার এক অংশ আরেক অংশকে মজবুত করে।’ অর্থাৎ সবল মুমিনদের সাহায্য-সহযোগিতায় অসহায় ও দীনহীনরা সবল হয়ে উঠবে, তাদের দৈন্যতা কেটে যাবে; এটিই শাশ্বত ও সত্য ধর্ম ইসলামের শিক্ষা ও প্রত্যাশা।

৩। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,  মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন: ‘যে ব্যক্তি চায় যে, তার রোজি-উপার্জনে প্রবৃদ্ধি/বরকত প্রদত্ত হোক বা প্রশস্ততা আসুক এবং তার জীবনায়ু বেড়ে যাক; তা হলে সে যেন আপনজদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে”।

৪। সহীহ হাদিসের বাছাইকৃত ‘রিয়াদুস্সালেহীন’ নামক গ্রন্থে বোখারী/মুসলিম ইত্যাদির বরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে, যার ভাষ্যে বলা হয়েছে যে, যে সব গরিব-দুঃখী, বিপন্ন ও অসহায় মানুষের প্রতি আমরা অবহেলা প্রদর্শন করে থাকি মূলত অনেক ক্ষেত্রে তাদের উছিলায় আমাদেরও রিযিক পৌঁছে থাকে অথচ আমরা তাদের-মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত নই। যেমন :

‘নিশ্চিত তোমাদের রিযিক দেয়া হয় এবং তোমাদের সাহায্য করা হয় তোমাদের মধ্যকার দুর্বল-অসহায়দের খাতিরেই।’

৫। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, প্রিয় নবী (সা) ইরশাদ করেছেন: ‘অসহায় বিধবা (স্বামী পরিত্যাক্তা বা স্বামীমৃতা) ও মিসকিনের সাহায্যার্থে (যেকোনো প্রকার সাহায্য) কর্মতৎপর ব্যক্তি আল্লাহর রাহে জিহাদরত ব্যক্তির সমতুল্য। বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলছেন, আমার মনে পড়ছে, মহানবী (সা.) এমনটিও বলেছিলেন যে, তেমন সাহায্যকারী ব্যক্তি একনাগাড়ে রোযা পালনকারী ও সারা রাত ইবাদতকারী ব্যক্তির অনুরূপ সওয়াব প্রাপ্ত হবে।’

রাষ্ট্র ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, মুসলমানদের রাষ্ট্রের চতুর্দিকের সীমান্ত পাহারাদারী মর্যাদা বিষয়ক ৫টি হাদিস

১। মহানবী স. ইরশাদ করেছেন : একদিন এক রাত দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস ধরে সিয়াম পালন করা ও সালাত আদায় করার চেয়েও বেশী মূল্যবান। এ দায়িত্ব পালনকালে সে যদি মারা যায়, তা হলে যে কাজ সে করছিল মৃত্যুর পরেও তা তার জন্য জারি থাকবে, তার রিযিক অব্যাহত থাকবে, কবর আযাব ও কবরের বিপদ থেকে সে নিরাপদ থাকবে।

২। হযরত ফুদালা ইবন উবায়দ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ স. বলেছেন, মৃত্যুর পর প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল নিঃশেষ হয়ে যাবে। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহ্র পথে দেশের সীমান্ত পাহারা দেয় তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে কবরের আযাব ও পরীক্ষা থেকেও নিরাপদ থাকবে।

৩। হযরত রুবাই বিনতি মুআবিয়া রা. বলেন, আমরা মেয়েরা রাসূলুল্লাহ্ সা. -এর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করতাম। আমরা সেখানে লোকদের পানি পান করানো, খিদমত ও সেবা- শুশ্রূষা এবং শাহাদাতবরণকারীদের  ও আহতদের মদীনায় নিয়ে আসার কাজ করতাম। 

৪। প্রিয় নবী সা. ইরশাদ করেছেন, যে লোকের কোনো কন্যা সন্তান রয়েছে এবং সে তাকে জীবন্ত প্রোথিত করেনি এবং ঘৃণার চোখেও দেখেনি, তার উপর নিজের পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকার দেয়নি, তাকে মহান আল্লাহ্ জান্নাত দান করবেন।

৫। হযরত মু‘আয রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সা. বলেছেন, মুসলিম উম্মাহ্র অন্তর্ভুক্ত যে ব্যক্তি ক্ষণকালের জন্যও আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম করে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়’।

(চলবে)

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ,

বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-১০০০।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *