ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ

গ্রেফতারি পরোয়ানা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি ধর্তব্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিনা পরোয়ানার আসামি গ্রেফতার করার বিধান রয়েছে। এ ধরনের আসামিকে আদালতে পাঠানোর পর আদালত জামিন দিতে পারেন। মামলা তদন্তকালীন ধর্তব্য অপরাধের সবআসামিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করার বিধান রয়েছে। অধর্তব্য অপরাধ হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে গ্রেফতার করা যায়। মামলায় আদালতও অগ্রিম গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করতে পারেন।

একটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো তাদের বিরুদ্ধে আদালত প্রথমে চার্জ গঠন করেন। চার্জ গঠিত হলে তাদের আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে সব আসামি মামলা তদন্তকালীন গ্রেফতার হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে আদালত ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন। ওয়ারেন্টগুলো তামিল করার পর আদালতকে অবহিত করা হলে আদালত সে মামলা বিচারিক আদালতে পাঠান। চেষ্টা করেও কোনো মামলায় আসামি গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে আদালতকে পরোয়ানা তামিল না হওয়ার প্রতিবেদন বা এনইআর দাখিল করতে হয়। পরবর্তীতে আদালত ওই আসামির বিরুদ্ধে ক্রোকি পরোয়ানা এবং হুলিয়া জারি করেন। আসামির বিরুদ্ধে মামলার বিচারকার্য শুরুর আগে এ ধরনের বিধান রয়েছে।

ফৌজদারিমামলায় বাদী, আসামি ও সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিচারকার্য সমাধা করার নিয়ম। আসামি উপস্থিত না হলে বা গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে আসামির অনুপস্থিতিতেও বিচারকার্য সমাধা করার বিধান রয়েছে। আবার বিনা-পরোয়ানায় গ্রেফতার বা গ্রেফতারি পরোয়ানায় গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালত জামিন দিতে পারেন। জামিনপ্রাপ্ত আসামিকে আদালতে মামলার শুনানীর দিনে উপস্থিত থাকতে হয়। শুনানীতে অনুপস্থিত হওয়ার কারণেও আদালত পুনরায় ওই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করতে পারেন। তিন কারণে আদালতে আসামিকে শুনানীর জন্য হাজির হতে হয়। প্রথমতঃ মামলার তদন্তকালীন গ্রেফতারকৃত/সারেন্ডার হওয়া আসামি হিসেবে, দ্বিতীয়ত আদালতের ওয়ারেন্ট মূলে গ্রেফতারকৃত আসামি হিসেবে, তৃতীয়ত সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে।

মামলার আসামির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলত চার ধরনের হয়ে থাকেঃ জিআর ওয়ারেন্ট, সিআর ওয়ারেন্ট, জিআর সাজা ওয়ারেন্ট ও সিআর সাজা ওয়ারেন্ট। আদালতে বিজ্ঞ বিচারকের অর্ডার শিটের মাধ্যমেই ওয়ারেন্টের জন্ম হয়। এরপর আদালত থেকে নির্দিষ্ট ফরম-এ ওয়ারেন্টগুলো তৈরি করা হয়। হিসাব রাখার এবং ভবিষ্যৎ গতিবিধি নজর রাখার জন্য আদালতের পুলিশ প্রসিকিউশন শাখায় নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রারে ওয়ারেন্টধারীর নাম-ঠিকানা, ইস্যুর তারিখ, মামলার সূত্র, ইস্যুকারী আদালতের নাম ইত্যাদি লেখা থাকে। মূলত আসামির স্থায়ী ঠিকানায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। কোর্ট প্রসিকিউশনের জিআরও শাখায় যে রেজিস্টারে ওয়ারেন্টের হিসাব রাখা হয়, তার নাম প্রসেস রেজিস্টার।

কোর্টের জিআরও শাখার প্রসেস রেজিস্ট্রারে অ্যান্ট্রি করার পর ওয়ারেন্টগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় তামিলের জন্য যাওয়ার পূর্বে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কখনও কখনও থানায় সরাসরিওপাঠানো হয়। অনেক সময় অন্য জেলার ওয়ারেন্টের ক্ষেত্রে এ ধরনের হয়ে থাকে। তবে যেখান থেকেই ওয়ারেন্ট আসুক না কেন সংশ্লিষ্ট এসপি অফিস এবং সদর কোর্টের নির্দিষ্ট রেজিস্টারে হিসাব রাখা জরুরি।পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অপরাধ শাখায় ওয়ারেন্টগুলোর হিসাব সংরক্ষণ করে তা থানায় পাঠানো হয় তামিলের জন্য।

থানায় ওয়ারেন্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ারেন্ট রেজিস্ট্রারে অ্যান্ট্রি দেওয়া হয়। ওইরেজিস্ট্রারে ওয়ারেন্টের গায়ে লিখিত আসামির নাম-ঠিকানা, বয়স, মামলার সূত্র ও ইস্যুকারী আদালত এর বিষয়গুলো উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে থানার কোন অফিসারকে কত তারিখে তামিলের জন্য হাওলা করা হলো তাও লেখা থাকে। ওই অফিসার কবে তামিল করে আসামি বা রিকলসহ আদালতে পাঠান করলেন তাও  অ্যান্ট্রি থাকে। একজন তামিলকারী অফিসার যথাসময়ে তামিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে ওয়ারেন্টের গায়ে কৈফিয়ত লিখে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিলে, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওইওয়ারেন্ট অন্য অফিসারের নামে হাওলা করেন। আসামি গ্রেফতার হলে আসামিসহ ওয়ারেন্টটি আদালতে পাঠানো হয়। তখন থানা, জেলা ও কোর্টের ওয়ারেন্ট সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রারে তামিলের বিষয়টি উল্লেখ করে ওয়ারেন্ট খারিজ করা হয়। ওয়ারেন্টের আসামি জামিনে আসলে আদালত থেকে রিকল ইস্যু করা হয়। আসামি মারা গেলেও মৃত্যু সনদপত্রসহ আদালতকে অবহিত করতে হয়। প্রত্যেকটি বিষয়ই থানা, জেলা ও কোর্টের ওয়ারেন্ট সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রারে হালনাগাদ করে রাখতে হয়।

থানা পুলিশ যতগুলো কাজ করে থাকে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল ও গ্রেফতারি পরোয়ানা রেজিস্ট্রার রক্ষণাবেক্ষণ করা। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করতে হয়।যথাসময়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করতে না পারলে বা দীর্ঘ বিলম্ব হলে মামলার বাদী পক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু কলাকৌশল অবলম্বন করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। আসামি গ্রেফতার হলে মামলার বাদী পক্ষ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। সুতরাং আসামির অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে খোঁজ  নেওয়া যেতে পারে। যে সব আসামি বেশি গুরুতর নয় এবং আদালতে হাজিরা দিলে দ্রুত জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে ধরনের মামলার ওয়ারেন্টের আসামি পাওয়া সহজ। দিনে-রাতে দুয়েকবার অভিযান চালালেই হয় আসামি ধরা পড়বে নাহলে সামাজিক সম্মান বজায় রাখার স্বার্থে আদালতে হাজির হবে। সমস্যা দেখা দেয় গুরুতর মামলার আসামির ক্ষেত্রে। আসামিযখন ভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেই আদালতের মাধ্যমে হাজতে পাঠাবে। দীর্ঘমেয়াদি সাজা বা ফাঁসি হবে। তখন আসামি গ্রেফতার এড়ানোর জন্য জীবন-মরণ চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে পুলিশকে সূক্ষ্মভাবে কাজ না করলে গুরুতর মামলার ওয়ারেন্টে, বিশেষ করে সাজা ওয়ারেন্ট তামিল করা কঠিন।

মানুষ সামাজিক জীব। আসামি হলেও সে পালিয়ে অন্য গ্রহে চলে যেতে পারে না। তাকে সমাজের কোথাও না কোথাও বিচরণ করতে হয়। পশু-পাখির মতো বনজঙ্গলে বসবাস করতে পারে না। নিজ বাড়িতে না থাকলেও সমাজে পরিচিত কোথাও তাকে আশ্রয় নিতে হয়। বর্তমানে অপরিচিত কোথাও আশ্রয় নেওয়া কঠিন। এ-রোল, বি-রোলের সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া বর্তমানে সিটিজেনস ইনফরমেশনস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা সিআইএমএস সফটওয়্যারের সুবাধে অপরিচিত লোক হিসেবে কোথাও থাকা কঠিন।

মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তির কারণেকখনও না কখনও তার নিজ বাড়িতে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করে। নিজস্ব লোকের সঙ্গে স্ব-শরীরে বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকে। দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাগণ তাদের এ দুর্বল দিকটাকে পুঁজি করেই তাকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। এ ধরনের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে একনাগাড়ে লেগে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বিট পুলিশিং চালু হওয়ায় থানার কাজ অনেক সহজ হয়েছে। থানার মধ্যকার একটি ইউনিয়ন একটি বিট এবং পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের এক বা একাধিক ওয়ার্ড মিলে একটি বিট। থানার মাঠ পর্যায়ের কাজকে বিটভিত্তিক প্যাকেজ আকারে বিট অফিসারদের দিয়ে বর্তমানে করা হয়ে থাকে। মামলা তদন্ত,ওয়ারেন্ট তামিল, জিডি অনুসন্ধান, ভিআর/পিভিআর অনুসন্ধান, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট অনুসন্ধান-এর মতো মৌলিক কাজগুলো বিট অফিসারগণ নিজ নিজ বিটের মধ্যেই করে থাকেন। এতে ওই এলাকায় তার পরিচিতি বেড়ে যায়। এর ফলেবিট অফিসারগণ কর্তৃক নিজ বিটের ওয়ারেন্ট তামিল সহজ হয়েছে।

প্রত্যেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উচিত ওয়ারেন্টগুলো থানায় প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেইওয়ারেন্ট রেজিষ্টারে অ্যান্ট্রি করা এবং নির্দিষ্ট বিট অফিসারের নামে হাওলা করা। কাজের সুবিধার জন্য কম্পিউটারে প্রত্যেকটা বিটের জন্য একটি করে ওয়ারেন্ট প্যাকেজ খুলতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিটের মধ্যে যাদের বাড়ি, সেই সব জিআর, সিআর ও সাজা ওয়ারেন্ট ওই বিট প্যাকেজে তুলতে হবে। প্রতিনিয়ত নতুন ওয়ারেন্ট আসলে তাৎক্ষণিক কম্পিউটারে নির্দিষ্ট বিটে চলে যাবে। আবার ওয়ারেন্ট তামিল হলে বিট প্যাকেজ থেকেসঙ্গে সঙ্গেই ডিলিট করে দিতে হবে। এতে বিট ভিত্তিক ওয়ারেন্টের তালিকা সব সময়ই হালনাগাদ থাকবে। ওই তালিকা সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিক অভিযান করতে সুবিধা হবে। ওই লিস্টের সঙ্গেমূল ওয়ারেন্টগুলো থাকবে। নতুন ওয়ারেন্ট আসলে এবং ওয়ারেন্ট তামিল হলে রেজিস্টারে অ্যান্ট্রি ও খারিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

প্রত্যেক জেলা বা থানায় মাসে অন্তত একবার ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য বিশেষ অভিযান দেওয়া উচিত। এ সময় অতিরিক্ত জনবল এবং লজিস্টিকস্ সাপোর্ট দিতে হবে পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে। জেলা পুলিশের সিনিয়র অফিসারগণ মনিটরিং-এর দায়িত্বে থাকবেন। বিশেষ অভিযান কখনওরাতব্যাপী করতে হবে। দিনের বেলায় ওয়ারেন্ট তামিল কম হয়।তবে এতে লোক জানাজানি হয় এবংএলাকা ভালো চেনা যায়। পুলিশ আসামির বাড়িতে এসেছে এটা সমাজ জানতে পারে। আসামি বা তার পরিবারের লোকজন সামাজিক চাপের সম্মুখীন হয়। সামজিক সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে বা বার বার পুলিশ বাড়িতে আসার বিড়ম্বনা এড়াতে আসামি অনেক সময় আদালতে গিয়ে উপস্থিত হয়। তাছাড়া দিনের বেলা আসামি না পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে রাতে এলাকা চিনতে ও অভিযান দিতে সুবিধা হয়। এতে সমাজে পুলিশের বিচরণ বেড়ে গিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ভালো ধারণা তৈরি হয়।

নির্দিষ্ট বিট অফিসারের কাছে নির্দিষ্ট বিট এলাকার ওয়ারেন্ট থাকায় অনেক সময় আসামিরসঙ্গেওইবিট অফিসারের সখ্যতা গড়ে উঠতে পারে। সুতরাং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উচিত মাঝে মধ্যে বিট অফিসার বা টিম পরিবর্তন করে অভিযান করা। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আসামি হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ইন্সঃ তদন্ত কর্মকর্তার উচিত অন্যদের না জানিয়ে তাৎক্ষণিক নিজস্ব লোক নিয়ে আসামি গ্রেফতার বেরিয়ে পড়া। এতে অধিনস্থদের ওপর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ ঠিক থাকে এবং অধিনস্থরা কাজের চাপের মধ্যে থাকে। একসঙ্গে অনেক টিম অভিযানে গেলে প্রত্যেক টিম বিভিন্ন বাড়িতে পৌঁছে ওসির সাথে ফোনে কথা বলবে। অনেক সময় আসামি না পাওয়া গেলেও কাছে আত্মীয়ের সঙ্গে ওসিকে ফোনে/ভিডিও কলে কথা বলায়ে দিতে হবে। ভালো কাজ যারা করবে, তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। একজনের ওয়ারেন্ট অন্যজন তামিল করলে তাকে বেশি পুরস্কার দিতে হবে। আর মূল ওয়ারেন্ট যার, তাকে বার বার সুযোগ দেওয়ার পরেও তামিল করতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আসামি পক্ষের মোবাইল কোনো পুলিশ কর্মকর্তার যোগাযোগ হয় কিনা, তাও গোপনে পরীক্ষা করতে হবে।

লেখক : ডিআইজি, সিলেট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *