ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

গ্রেফতার একটি চরম প্রকৃতির আইনগত প্রক্রিয়া। পুলিশ অফিসার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে আবদ্ধ বা স্পর্শ করত কিংবা কথার মাধ্যমে তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি জানিয়ে দিলেই সেই ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হয়[১]। কোনো ব্যক্তির পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া তার মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি চরম অবস্থা। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে ‘ আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না’[২]। গ্রেফতার প্রক্রিয়া কোন ব্যক্তির ‘জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ- সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার’ কে সংকুচিত করে[৩]।

ফৌজদারি কার্যবিধিতে নয়টি শর্ত সাপেক্ষে পুলিশকে কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে৪]। কিন্তু এ ধারায় পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের নির্দেশনায় ‘গ্রেফতার করিতে হইবে’ (shall arrest) শব্দমালা ব্যবহার না করে সচেতনভাবেই ‘গ্রেফতার করিতে পারিবে’ (may arrest) শব্দমালা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশ অফিসার কেবল সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোয় প্রয়োজনবোধে কোন ব্যক্তিকে আদালতের নির্দেশ বা পরোয়ানা ব্যতীত গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু আইনের নির্দেশনা অনুসারে পুলিশ কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতারে বাধ্য নয়। কেবল বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় নয়, পৃথিবীর কোন দেশের বিচার ব্যবস্থাতেই কোনো অবস্থাতেই সন্দিগ্ধদের গ্রেফতার করা বাধ্যতামূলক নয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে দণ্ডবিধিতে বর্ণিত অপরাধগুলোকে ধর্তব্য ও অধর্তব্য- এ দুভাগে ভাগ করা হয়। সেসব অপরাধের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট থাকলে পুলিশ তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারে সেগুলোকে ধর্তব্য অপরাধ বলা হয়[৫]। দ-বিধি ভিন্ন বিশেষ আইনের অপরাধগুলোর

প্রকৃতি কি হবে সংশ্লিষ্ট আইনে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অপরাধের প্রকৃতি যাই হোক না কেন, কোনো আইনে অপরাধী বা সন্দিগ্ধদের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা আইনের বাধ্যবাধকতা নয়। এটা আইনের একটি নির্দেশনা বা অপশনমাত্র যা পুলিশ অফিসারদের সদিচ্ছা ও পেশাগত বিবেচনার উপর নির্ভর করে।

মোট কথা, পুলিশ কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা কোনোভাবেই অবাধ বা নিরঙ্কুশ নয়। পুলিশের হাতে রাষ্ট্র তথা নাগরিকগণ আইন অনুসারে যেমন অস্ত্র তুলে দিয়েছে, তেমনি সেই অস্ত্র ব্যবহারের বিধি নিষেধও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই তো পুলিশ কর্তৃক অস্ত্র, বিশেষত আগ্নেয়াস্ত্র, ব্যবহারের ঘটনাগুলো পরবর্তীতে প্রশাসনিক/নির্বাহী অনুসন্ধানের মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে পুলিশ যদি যৌক্তিকতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়, তবে ব্যবহারকারী পুলিশ সদস্য, বিশেষত তাদের দায়িত্বশীল অফিসাররা, বিভাগীয় এবং ফৌজদারি বিচারের সম্মুখীন হন।

পুলিশ কর্তৃক বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতার ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে পুলিশ কর্তৃক বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ পুরোপুরি পালনের ব্যাপারে যথেষ্ট অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। এমনও ঘটনা বিরল নয় যে, কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ সন্দেহবসত গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে করেছে। কিন্তু আদালতে পরে প্রতিবেদন দেয়া হলো, যে অপরাধের সন্দেহে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তিনি সেই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। অর্থাৎ ওই ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা পুলিশের জন্য সঠিক ছিল না।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষেত্রে এর চেয়েও জঘন্য ঘটনার উদাহরণ আছে যেখানে কোন ব্যক্তিকে প্রথমে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা হল। পরে তার বিরুদ্ধে ডাকাতির অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে পুলিশ আদালতে আবেদন করে তাকে একটি ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার দেখাল (বহুল প্রচরিত শোন এরেস্ট)। ওই ব্যক্তি ডাকাতির মামলায় শোন এরেস্ট হয়ে পুলিশের হেফাজতে বেশ কিছু দিন (১৫ দিন পর্যন্ত)  কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখী হলেন। ডাকাতি মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেল হাজতে বন্দি রাখা হল। কিন্তু পুলিশ ডাকাতি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে পাঠানো প্রতিবেদনে জানাল, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। তাই তাকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে।

এখন এই সন্দিগ্ধ ব্যক্তি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে যে দীর্ঘদিন হাজতে থাকলেনও, যার ফলে তিনি মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন তার জন্য পুলিশকে দোষারোপ করা হলেও পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের তেমন কোনো সংস্কৃতি বাংলাদেশে নেই। এক্ষেত্রে পুলিশ অফিসাররা দ-বিধির সাধারণ ব্যতীক্রমের আওতায় সরল বিশ্বাসে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অজুহাতে নির্দোষ ধরে নেয়ার সুবিধা পেয়ে থাকে[৭][৮])। কিন্তু তাই বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা কোনো আইনগত ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে পারবেন না, এমন নয়। ভুক্তভোগী চাইলে দেওয়ানি আদালতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা, এমনকি ফৌজদারি আদালতেরও মামলা করতে পারেন। কিন্তু আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি এমনিই যে পুলিশ তথা আইনি মারপ্যাঁচে কেউ সহজে প্রবেশ করতে চায় না। যারা একবার পুলিশ বা আদালতের দারস্থ হয়েছেন কিংবা কোনোভাবে তাদের পুলিশের কাস্টডিতে থাকতে হয়েছিল বা আদালতের বারান্দায় হাঁটতে হয়েছিল, তারা দ্বিতীয়বার থানা বা আদালতের বারান্দায় যাওয়ার কথা চিন্তাও করেন না।

পুলিশের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্ব মহলেই বিরূপ সমালোচনা রয়েছে। স্বনামধন্য ব্যক্তিদের কেউ কেউ এবং অনেক মানবাধিকার সংগঠনও ফৌজদারি কার্যবিধি থেকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিধান তুলে দেওয়ার দাবিও করতে শুরু করেছে। কিন্তু বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিধান তুলে দিয়ে পুলিশকে কীভাবে অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধ উদ্ঘাটন কাজে কর্মক্ষম করে তোলা যাবে সে বিষয়ে কেউ সদুত্তর দিতে পারেন না। কেননা, পুলিশের হাতে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা না থাকলে পুলিশের চোখের সামনেও কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে পুলিশ হত্যার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করতে পারবে না। হত্যাকারীদের তাদের মতো করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার আইনি সুযোগ দিয়ে পুলিশকে থানায় গিয়ে আগে নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু করতে হবে, তারপর অপরাধী বা সন্দিগ্ধদের খুঁজতে অভিযানে নামতে হবে। বলাবাহুল্য, অপরাধ নিবারণ ও উদ্ঘাটন তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমন বালখিল্যপনা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতাকে যৌক্তিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করাই হবে বিজ্ঞচিতো।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট ১৯৯৮ সালে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার তথা সিআরপিসির ৫৪ ধারা প্রয়োগের ব্যাপারে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের জন্য নিম্নলিখিত আট দফা নির্দেশনা জারি করেছেন। যাদের অন্যতম ছিল, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর অধীন কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটকের উদ্দেশ্যে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার না করা; গ্রেফতারকালীন পুলিশকে সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিচয়পত্র প্রদর্শনসহ পূর্ণ পরিচয় দেওয়া; গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে তার আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেয়া; গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া; গ্রেফতারকালীন আহত হলে তার চিকিৎসা দিয়ে চিকিৎসা সনদসহ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করা[৯]। শান্তনার বিষয় হলো, হাইকোর্টের নির্দেশনার অধিকাংশই পুলিশ যথাসাধ্য অনুসরণ করছে। কিন্তু তারপরও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের নিরসন এখনও হয়নি।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ পুলিশের গ্রেফতার ও কাস্টডির বিষয়টি মূলত থানা থেকে কোর্টের মধ্যেই সীমিত। কোন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা হলে তাকে গ্রেফতার স্থান থেকে থানায় আনা হয়। গ্রেফতারকারী অফিসারের হাত থেকে সন্দিগ্ধ চলে যায় থানার হাজতে। যদি এই ব্যক্তি নিয়মিত মামলার সন্দিগ্ধ হন, আর যদি গ্রেফতারকারী সে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হন, তবে তিনি তাকে আইন অনুসারেই তার তদন্তাধীন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে থানার জেনারেল ডায়েরিতে নোট দেবেন। আর যদি গ্রেফতারকারী অফিসার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিন্ন অন্য কোনো অফিসার হন, তবে তিনি তাকে হয় সরাসরি তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে সমর্পণ করবেন কিংবা থানার হাজতে রেখে জেনারেল ডায়েরিতে নোট দেবেন। পরে তাকে হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রহণ করে জিজ্ঞাসবাদ করবেন কিংবা সময় মতো তাকে আদালতে উপস্থাপন করবেন। কোনো ব্যক্তিকে তদন্তাধীন মামলায় গ্রেফতার করা না হলে তার বিরুদ্ধে সন্দিগ্ধ অপরাধের জন্য নিয়মিত মামলা রুজু করতে হবে, নয়তো তাকে সন্দিগ্ধ হিসেবে সিআরপিসির ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠাতে হবে।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে সিআরপিসির ৫৪ ধারায় আদালতে দিতে হলে আদালত পুলিশ তথা প্রসিকিউশন পক্ষকে তার বিরুদ্ধে সন্দেহের কারণ দর্শাতে বলবেন। সে মুহূর্তে কারণ দর্শিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে আদালত গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দিতে পারেন। আর কারণ যদি পরবর্তীতে দেখানোর জন্য অনুসন্ধানের অনুমতি পাওয়া যায়, তবে পুলিশ আদালতে সময় মতো (সাধারণত ১৫ দিনের মধ্যে) আদালতে প্রতিবেদন পাঠিয়ে তাকে হয় কোন মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখাতে হবে, নয়তো তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রমাণ নেই বলে আদালতকে জানাতে হবে। এরপর আদালত তাকে জেল হাজতে থাকা কিংবা মুক্তির নির্দেশ দিতে পারেন।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত দিতে থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা খুবই কম। কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলে অফিসার ইন চার্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাগজ কলমে তখনই জানতে পারবেন যখন সকালে প্রাত্যহিক প্রতিবেদন পাঠান হয় কিংবা থানার জেনারেল ডায়েরির কপি পরের দিন সকালে সার্কেল এএসপি/অতিরিক্ত এসপির দফতরে পাঠান হয়। আলোচিত বা কাক্সিক্ষত ঘটনা বা মামলা না হলে, থানার অফিসাররা কর্তৃক কোন ব্যক্তিকে কখন, কি কারণে গ্রেফতার করা হলো, তাকে কখন থানার হাজতে ঢোকান হলো, কখন বের করা হলো বা মুক্তি দেয়া হল তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে জানার পদ্ধতিগত কোনো সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় বলা যায়, আইনি পদ্ধতি অনুসারে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের ভাগ্য থানা পুলিশ কিংবা আদালতের উপরই নির্ভর করে।

পুলিশের প্রশাসনিক স্তরে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার বিষয়টির উপর সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ আরোপের দুটি উপায় আছে। প্রথমত, আকস্মিক থানা পরিদর্শন করে হাজতে রাখা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া, দ্বিতীয়ত, থানায় রক্ষিত ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের রেজিষ্ট্রার পর্যালোচনা করা। থানা পরিদর্শন ঘন ঘন হলে ও ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের গ্রেফতারকার্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সিনিয়র অফিসারদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বাছ বিচারহীন ৫৪ ধারার প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগকে নিরুৎসাহিত করা যায়। কিন্তু তা কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয় না। কারণ, এ ব্যবস্থা অনেকটাই প্রতিকারমূলক; নিবারণমূলক নয়। তাই এজন্য পুলিশকে নিবারণমূলক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লক্ষ করলে দেখা যাবে, উন্নত দেশের পুলিশ বিভাগগুলোতে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের অধিকার, সুবিধা ও গ্রেফতারের যৌক্তিকতা নিরূপণের বিশেষ ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। ব্রিটিশ পুলিশের জন্য প্রযোজ্য আইন [১০] অনুসারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু পুলিশ স্টেশনে (ডেজিগনেটেড পুলিশ স্টেশন) রাখা যেতে পারে। প্রত্যেক ডেজিগনেটেড থানায় একজন করে কাস্টডি অফিসার নিয়োগ করা হয়।

কোনো পুলিশ অফিসার কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কাস্টডি অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কাস্টডি অফিসার গ্রেফতারের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করে তাকে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই হয় মুক্তি দিবেন, নয়তো পুলিশ স্টেশনে রাখার সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে তাকে কেন আটক রাখা হবে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ লিপিবদ্ধ করে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তা জানাতে হবে। কাস্টডি অফিসারের সিদ্ধান্তের ছয় ঘণ্টার মধ্যেই অন্য একজন অফিসার গ্রেফতারের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ করে তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে লিখিত অনুমোদন দেন। প্রথম রিভিউ শেষ হওয়ার ৯ ঘন্টার মধ্যে অন্য একজন অফিসার দ্বিতীয় রিভিও করেন। অর্থাৎ ১৫ ঘণ্টার পরেও যদি কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখতে হয়, তবে বিষয়টি রিভিও করার জন্য তৃতীয় একজন কর্মকর্তার উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে আটক রাখার কাল যত বেশি বৃদ্ধি পাবে, প্রতি নয় ঘণ্টা পরপর নতুন করে রিভিউকারী অফিসার যুক্ত হবে। সাধারণত কাস্টডি অফিসার হিসেবে সার্জেন্ট/সাব-ইন্সপেক্টর পদের পুলিশ কর্মকর্তারা থাকেন। কিন্তু রিভিউয়ার হিসেবে ইন্সপেক্টর ও উচ্চতর পদের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়।

বাংলাদেশের মতোই সাধারণভাবে ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থাতেও কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পুলিশ হেফাজতে আটক রাখা যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পুলিশ কোনো অভিযুক্তকে একনাগাড়ে ১৪ দিন পর্যন্ত হেফাজতে রাখতে পারে[১১।

গ্রেফতার একজন পুলিশ অফিসারের জন্য নিত্যদিনের কর্মকা- হলেও একজন নাগরিকের জন্য তা চরম পর্যায়ের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। গ্রেফতারের ঘটনা কেবল মানুষের মৌলিক মানবাধিকারকেই সংকুচিত করে না, তাকে পারিবারিক, সামাজিক সর্বোপরি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারদের বিজ্ঞোচিত বিবেচনা শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করা দরকার। একই সঙ্গে অযৌক্তিক গ্রেফতার নিবারণ ও ভুলক্রমে গ্রেফতারকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য প্রচলিত আইনি বিধানের পাশাপাশি নতুন কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ পুলিশের অনুশীলনকে বাংলাদেশ পুলিশে আত্মীকরণ করা যেতে পারে।

ব্রিটিশ পদ্ধতিকে কাস্টমাইজড করে ডিউটি অফিসার ভিন্ন অন্য কোনো সাব ইন্সপেক্টরকে থানার কাস্টডি অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। প্রথম রিভিউ অফিসার হিসেবে থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), দ্বিতীয় রিভিউয়ার হিসেবে অফিসার ইন চার্জ ও তৃতীয় রিভিউয়ার হিসেবে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের এএসপি/অতিরিক্ত এসপি হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে আদালতের নির্দেশ ভিন্ন ২৪ ঘণ্টার বেশি পুলিশ হেফাজতে রাখার সুযোগ নেই। তাই আমাদের দেশে তৃতীয় রিভিউয়ারের প্রয়োজন হবে না। এভাবে কাস্টডি অফিসার ও রিভিউ অফিসার নিয়োগ করা হলে কোন ব্যক্তির গ্রেফতার সংক্রান্তে দায়দায়িত্ব একাধিক ব্যক্তির উপর বর্তাবে এবং তারা প্রত্যেকেই আইন ও বিধি অনুসারে তাদের দায়-দায়িত্ব পালন করবেন। এতে এক দিকে যেমন চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রক্ষিত হবে, তেমনি গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির মৌলিক ও মানবাধিকার সমুন্নত হবে।

তথ্য সূত্র:

[1]http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-75/section-14463.html, ধারা-৪৬(১) সিআরপিসি

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-29998.html, অনুচ্ছেদ, ৩২ বাংলাদেশ সংবিধান

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-957/section-30002.html, অনুচ্ছেদ ৩৬, বাংলাদেশ সংবিধান

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-75/section-14518.html, ধারা-৫৪, সিআরপিসি

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-75/section-20861.html, ১৬৭(২):

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11/section-2749.html ধারা-৭৬, পেনাল কোড

http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11/section-2752.htm ধারা-৭৯ পেনাল কোড

https://www.blast.org.bd/content/judgement/55-DLR-363.pdf/ BALST Vs. BANGLADESH (55 DLR 363)] https://www.legislation.gov.uk/ukpga/1984/60/part/IV/crossheading/detentionconditions-and-duration

https://www.legislation.gov.uk/ukpga/2006/11/section/23

লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *