ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ফরহাদ হোসেন

ভ্রমণ আমার অতি প্রিয়। এবারের ভ্রমণ ছিল মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং সিংগাপুর। বরাবরের মত আমি এবারও একাই ভ্রমণে গিয়েছিলাম।

রাত ১২.০৫ এ মালিন্দ ফ্লাইটে ঢাকা বিমান বন্দর হতে কুয়ালালামপুর হয়ে কম্বোডিয়ার পথে রওয়ানা হলাম। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই একটা খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুক্ষীণ হতে হলো, ৩০ মিনিট দেরী করে আসলেও ততোটা বিরক্তি লাগেনি কিন্তু যখন বিমানে উঠে বসলাম তখন অগনিত মশার কামড়ে মনে হতে লাগলো যেন এমনিতেই উড়ে যাবো। মালয়েশিয়ান বিমানবালাকে একটু বকার স্বরেই বললাম এতো মশা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছো, উত্তরে নিজেই হতবাক !!! বললেন ঢাকাতে এসে দরজা খোলার সাথে সাথে মশাগুলি বিমানে প্রবেশ করেছে। কিছুক্ষণ কামড় সহ্য করতেই হলো। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে আসার পথে ১ ঘন্টা ৩০ মিনিটের যাত্রা। সাগরের উপর দিয়ে বিমান উড়ে চলেছে। নীচে দেখার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ২/৩ স্তরের মেঘের পাহাড় তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিমান যেহেতু প্রায় ১২০০০ ফুট উপর দিয়ে চলছিলো সেজন্য হাল ছাড়িনি এবং সফল হলাম আকাশে কোন কোন স্থানে মেঘ না থাকায় নীচে কিছু কিছু পানির জাহাজ দেখতে পেলাম। বিশাল জলরাশির শুধু পানি আর পানি। একটু ঘুমিয়ে নিলাম ফ্লাইটের মধ্যেই। পাইলটের ঘোষণায় ঘুম ভেঙ্গে শুনতে পেলাম নমপেন বিমান বন্দর পৌঁছাতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগবে। নীচে তাকিয়ে হতাশ হয়ে গেলাম। শুধুই মাঠ আর মাঠ, মাঝে মাঝে ২/১টি জায়গায় জনবসতি চোখে পড়লো। ভীষণ খারাপ লাগলো কোন দেশে যাচ্ছি। কিন্তু একটু পরেই একটা নদী (যেটি মেকং নদী নামে পরিচিত) এবং নদীর পরেই সুন্দর একটা পরিপাটি শহর দেখতে পেলাম। বিমানের উপর থেকেই এতোটা পরিপাটিভাবে সাজোনো দেখাচ্ছিলো যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। সকাল ১১ টায় মালিন্দো এয়ারের ফ্লাইটটি কম্বোডিয়ান বিমান বন্দরের রানওয়েতে ছোয়া মাত্রই চোখে পড়লো রানওয়ে বরাবর পাশাপাশি চলে গেছে একটি জলাধার। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রানওয়ে, বিমান বন্দর ছোট হলেও চোখে পড়ার মত সুন্দর। ইমিগ্রেশন সিষ্টেমে সাহায্য করার জন্য কর্মরত সকলেই যেন অস্থির। খুবই ভালো লাগলো। বিভিন্ন দেশের জন্য ON Arrival Visa একটা  ফরম পূরণ করে তাৎক্ষনিক ভিসা গ্রহণ করা যায় তবে একটা হোটেল বুকিং বা থাকার জন্য ঠিকানা ও এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি জরুরী। আমার সরকারী পাসপোর্ট; কোন কিছু ছাড়াই ১ মাসের থাকার Visa সহ Thank you

জানিয়ে কম্বোডিয়া প্রবেশের অনুমতি মিললো। বিমান বন্দরের বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে হোটেলে যাবার জন্য টেক্সি কাউন্টারে গিয়ে ভাড়া জানতে চাই। ১৫ ডলারে টিকেট দিতে চাইলে আমার কাছে টাকার অংকটা বেশী মনে হলো, আমি সেটা না দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ন্ত্রনে কর্মরত একজনকে ঠিকানা দেখিয়ে ১০ ডলার দিতে চাইলে তিনি আমার জন্য একটা সুন্দর টেক্সির ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রায় ৪০ মিনিট পরে টেক্সিযোগে নমপেন এর 178 ষ্ট্রিট এর RS Hotel ll গেষ্ট হাউজ এ পৌঁছালাম। ভ্যাটসহ মাত্র ৫১ ডলারে তিন রাত থাকার জন্য একটা সুবন্দোবস্ত হলো। মন মাতানো একটা সুন্দর হোটেল। হোটেলের তিনতলায় আমার কক্ষ থেকেই দেখেতে পেলাম কম্বোডিয়ার “রয়েল প্যালেস” এরিয়া। রয়েল প্যালেস হলো কম্বোডিয়ান রাজার বাসস্থান। স্বাভাবিকভাবেই ইচ্ছা হলো সরাসরি সামনে থেকে দেখার। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম, তারপর বের হয়ে খুজে পেলাম কতগুলি খাবারের রেষ্টুরেন্ট। কিন্তু আমার টার্গেট হালাল খাবারের রেষ্টুরেন্ট, পেয়েও গেলাম একটা ইন্দোনেশিয়ান রেষ্টুরেন্ট যেটার সামনে ইংরেজিতে হালাল লেখা। মনের প্রশান্তিতে দুপুরের লান্স করে নিলাম। খাবারের মূল্য আমাদের দেশের মতই। প্রধান বড় শহর হলো রাজধানি “নমপেন”। শহরটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি করেই সাঁজানো। প্রশস্ত রাস্তা এবং সকলেই শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে গাড়ী চালানো, সংখ্যায় বেশী হলেও রাস্তায় যানজট নাই বললেই চলে। সুউচ্চ, দৃষ্টিনন্দন বিল্ডিংগুলি সকলেরই দৃষ্টি আর্কষণ করে। মূলত: নমপেন শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি বিশাল দীর্ঘ নদী যেটাকে বলা হয় মেকং রিভার। এই মেকং নদীই কম্বোডিয়াসহ চায়না, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ভিয়েতনাম মোট ছয়টি দেশকে সংযুক্ত করেছে যার মাধ্যমে নদীপথে যাত্রীসহ মালামাল পরিবহনের দেশগুলি বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। এই অঞ্চলের মানুষ মেকং নদীকে তাদের উন্নয়নের আর্শীবাদ মনে করেন। যাহোক একটি অটোরিক্সা ভাড়া করে শহরে বিভিন্ন দর্শণীয় স্থান ভ্রমণ করে মনের ক্ষুধা মিটিয়ে নিলাম। এরই মধ্যে যেয়ে উপস্থিত হলাম কম্বোডিয়ান রয়্যাল প্যালেস-এ। ২০ ডলারে টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলি দর্শনার্থীদের সরাসরি দেখার সুযোগ থাকে যেমন কানাডার জাতীয় পার্লামেন্ট ভবন, তেমনি কম্বোডিয়ার রয়্যাল প্যালেস বা রাজার বাসস্থান। মধ্যযুগের কারুকাজে সমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদটি বেশ কয়েকটি ভবন নিয়ে স্থাপিত। মূলত: রাজপ্রাসাদটিতে সোনালী রং এর আধিক্যই বেশী। মনোমূগ্ধকর প্রাসাদগুলি দেখতে প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক ভিড় করেন। ১,৮১,০৩৫ স্কয়ার কিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৬২ লক্ষ। নমপেন শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী তীর এমনভাবে বাধানো দেখলে মন প্রাণ ভরে যায়। নদীপাড়ে সুন্দর পরিবেশে এমনভাবে উন্মুক্ত যুগল চেয়ার বসানো, যেখানে বসে মন খুলে কথা বলে সারারাত অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহনশীলতা ও কৃতজ্ঞতার উপস্থিতি লক্ষ্য করার মত। স্বল্প ভাড়ায় ট্যুরের সুন্দর ব্যবস্থা আছে। পর্যটকের সাথে সকলেই খুব ভালো ব্যবহার করে যদিও আমার একটা খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষ কায়দায় একটা পান্থশালায় অবস্থানের সময় টেবিলের পাশে রাখা আমার ওয়ালেট থেকে বেশকিছু ডলার চুরি করে জাল ডলার রেখে দেয়ায় অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল আমাকে।

যাহোক কম্বোডিয়া ভ্রমণ শেষে এবার ভিয়েতনাম যাত্রার পালা। আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল বাসে করে ভিয়েতনাম এর হো চি মিং শহরে যাবো। ভ্রমণের জন্য এটা আমার কাছে একটা নতুন দেশ নতুন অভিজ্ঞতা। সিঙ্গাপুর কিংবা কুয়ালালামপুর বিমান বন্দর থেকে ফ্লাইটের সময়সূচী দেখতে যেয়ে সব সময় চোখে পড়তো এই হো চি মিং সিটি। মনে মনে ভাবতাম কি এমন সিটি এটা। বিপুল সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালিত হয় এই সিটিতে। মাত্র ১২ ইউএস ডলারে আগের দিন টিকেট কেটে ৩১শে এপ্রিল তারিখে রওয়ানা হলাম হো চি মিং সিটির উদ্দেশ্যে। বাসে ভ্রমণ, কম্বোডিয়া থেকে ভিয়েতনাম, অজানা এক আর্ন্তজাতিক বর্ডার। দুটি দেশই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে নিজেদের প্রতিস্থিত করেছে। আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয় জানে না এমন মানুষ কমই আছে। রাস্তা পরিপাটি, দুইদিকে শুধু মাঠ আর মাঠ, মাঝে মাঝে কিছু কিছু বাড়ী চোখে পড়লো। প্রায় ৫ ঘন্টা যাত্রার পর পৌঁছে গেলাম কম্বোডিয়া-ভিয়েতনাম সিমান্তে। বাস নো-ম্যানস ল্যান্ডে আমাদের নামিয়ে দিয়ে কিউ ধরে অপেক্ষা করতে বলল বাসের মহিলা গাইড লিনোভো। এর আগে ৩০ মিনিটের জন্য যাত্রা বিরতিতে আমরা যে যার মত দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। বাসের মোট যাত্রী ছিলো ২৪ জন। এরই ফাঁকে গাইড লিনোভো সকলের থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নিয়েছিলো ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার জন্য। রাস্তার ধারে রেষ্টুরেন্টের প্রায় সবগুলির বাঁশ কাঠের কারুকাজ সমৃদ্ধ এবং পাশাপাশি বিভিন্ন হস্ত শিল্পের সমরোহ যেকোন পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য জ্বল জ্বল করছে। সীমান্তে অপেক্ষারত আমার মত আরো ২৭জন। ইমিগ্রেশন অফিসার একে একে পাশপোট-এ সীল দিয়ে গাইডকে তা দিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আপত্তি বাধলো আমার সময়। সরকারী পাসপোর্ট, আমাকে এক ট্রাভেল এজেন্সি জানিয়েছিল ভিসার প্রয়োজন নাই ভিয়েতনাম এ প্রবেশের জন্য। কিন্তু ইমিগ্রেশন অফিসার কোনভাবেই রাজী নয় ভিসা ছাড়া প্রবেশের অনুমতির জন্য। শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দিল ২০০ ডলার প্রয়োজন পোর্ট ভিসার জন্য। কোন উপায় না পেয়ে অবশেষে ২০০ ডলার দিলাম এক অফিস সহকারীর নিকট। আর তখনই বিপত্তি। দুইটির মধ্যে একটি নোট হাতে নিয়ে বলল, কেন আমি তাকে জাল নোট দিয়েছি? প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না কিন্তু পরে ভালো করে দেখলাম সত্য সত্যই নোটটি জাল। এক পর্যায়ে সে আমাকে ঈশারা দিয়ে জানালো আমাকে এখন পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে। এতোক্ষণে আমার গা থেকে ঘাম ঝড়তে শুরু করেছে। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে হীন নগন্য ব্যক্তি মনে হতে লাগলো। ভাবার চেষ্টা করতে থাকি কিভাবে জাল ডলার আমার ওয়ালেটে আসলো। একদিকে পুলিশ আতঙ্ক অন্যদিকে কিভাবে এখান থেকে ছুটতে পারি সে চিন্তা। আমার জীবনের কঠিনমত খারাপ সময় ছিল সেটা। আমাকে সংশ্লিষ্ট অন্য এক লেডী অফিসারের কাছে নিয়ে গিয়ে ডলার সম্পর্কে অভিযোগ জানালে মহিলা আমাকে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুব সুক্ষ্মভাবে অবলোকন করে আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকালো, কিছুক্ষণ স্থির তারপর ওকে ঈশারা করলো আমাকে ছেড়ে দেবার জন্য। আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় মনে করলাম এই সময়টাকে। পৃথিবীটাকে নতুন করে আবার দেখার সৌভাগ্য হলো। যাক আমার কাছে আর দুইটা ১০০ নোটের ইউএস ডলার ছিল সেটা দিয়ে কোন রকমে পোর্ট ভিসা করে ভিয়েতনাম প্রবেশ করে সোজা “হো চি মিং” সিটি। এক দেশ থেকে আর এক দেশ সেটাও আবার বাসে, জার্নির সময়টা খুব ভালোই কাটছিল। তবে এদেশটা কম্বোডিয়ার চেয়ে অনেক ফাষ্ট। রাস্তায় অনেক যানবাহন, সিগন্যাল বাতিতে প্রায় সময়ই অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। রাস্তায় স্কুটি (মটর বাইক) দেখে মনে হলো প্রায় প্রতিটি ভিয়েতনামির জন্য হয়তো একটি করে স্কুটি (মটর বাইক) রাখা অত্যাবশ্যক। একসময় আমাকে বহন করা বাসটি যেয়ে থামলো হো চি মিং সিটির বাস ষ্ট্যান্ডে। বাস থেকে নেমে শুরু হলো নিজেকে সারভাইব করার যুদ্ধ। পকেট টাকা নাই, এদিক ওদিক তাকিয়ে চেষ্টা করছি একটা ভালো কোন কম ভাড়ার হোটেল খোঁজার, অবশেষে একটা বিজনেস সেন্টারে এয়ার টিকেট এবং হোটেল ভাড়া লেখা একজন হাসিখুশি মেয়েকে পেয়েও গেলাম। চটপট ভিতরে গিয়ে অসহায়ের মত সব খুলে বললে মেয়েটি আমার প্রতি সদয় হয়ে বলল Tell me what do you need? আমি ওর থেকে একটা “হো চি মিং”, ভিয়েতনাম হতে মালয়েশিয়া এয়ার টিকেট ও দুই রাত থাকার রুম। সে অনায়াসে আমার সে ব্যবস্থা করে দিয়ে বলল, আমি মালয়েশিয়া যেয়ে ওর টাকা দিলেও চলবে। কোন জামানত ছাড়া। এগুলো পাবার পর ওর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার চাহুনীতে – ও বলেই উঠলো Its okay এছাড়ও তিনি আমার একটা ১২ ঘন্টার ইন্টারনাল ট্যুরের ব্যবস্থা করে দিলেন, যেটির মূল্যমান ছিল ১৭ ইউএস ডলার। আমার কাছে ৩৫ ডলার ছিল সেটি দিয়ে মোটামুটি ২ দিন চলে যাবে। যাহোক রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে নিলাম। সকাল ৬.৩০ ঘটিকায় উঠে তড়িঘড়ি করে রওয়ানা হলাম নির্দিষ্ট স্থানে; যেখান থেকে ট্যুরের বাস যাত্রা আরম্ভ হবে। আমার মত আরো অনেকে অপেক্ষারত ছিল একই জায়গায় যেটি কিনা একটি পাবলিক পার্ক। বিভিন্ন বয়সের মানুষ ব্যয়াম, জগিং এ ব্যস্ত আর আমি ইতস্তত বোধ করছি ঠিক জায়গা এবং ঠিক সময়ের মধ্যে আছি কি না? অবশেষে মিনিট পাঁচেক পর ২০-২২ বয়সের একজন সুদর্শন স্মার্ট ছেলে নিজেকে আমার আজকের ট্যুরের গাইড বলে পরিচিত হয়ে ইংরেজি, চাইনিজ এবং ভিয়েতনাম ভাষায় বলল-আমরা এখন এখান থেকে যাত্রা শুরু করবো। এই ট্যুরে প্রথমে বাস, এরপর নদীতে ট্রলার, এরপর বাই-সাইকেল, এরপর নিজে নিজে নৌকা চালানো এবং সবশেষে আবার সেই ট্রলার এবং পরিশেষে বাসে করে এইখানে ফিরে আসবো। এতোগুলি কথা শুনে হাঁপিয়ে উঠেছি জানিনা ট্যুরের আর কি কি অপেক্ষা করছে, তবে এ ধরণের জংগল ট্যুর আমার জীবনে প্রথম। যাহোক মোট ১৮ জন বিভিন্ন দেশের পর্যটকসহ যাত্রা আরম্ভ করলো আমার বাস। এক দিনের এই ট্যুরে সকাল ৭.৩০টায় বাসে এক ঘন্টা ৩০ মিনিটের প্রথম গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম “কেই বে” (Cai be) তে। রাস্তার দুই ধারে আমাদের দেশের মতই প্রাকৃতিক দৃশ্য কিন্তু মোটামুটি অবাক করার বিষয় হলো রাস্তায় যেতে যেতে যে কয়টি নদী চোখে পড়লো তার প্রতিটিই পানিতে ভরা এবং প্রতিটি নদীতে প্রচুর পরিমানে জেটী/ঘাট দেখতে পাওয়া গেলো। প্রচুর সংখ্যক ট্রলার, ইঞ্জিন চালিত বোট, কার্গো লঞ্চ জেটীতে মালামাল উঠানামাসহ নদীতে চলমান পরিলক্ষিত হলো। অর্থাৎ নদীর সর্বোচ্চ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভিয়েতনামকে পৃথিবীর রোল মডেল বলা যেতে পারে। বাস থেকে নেমে আমাদের বলা হলো ইঞ্জিন চালিত বিশেষ ধরণের ট্রলারে উঠার জন্য। ট্রলারে পাতানো চেয়ারে যে যার মত বসলাম, গাইড বর্ণনা করতে লাগলো একের পর একটা বিষয়। এরই মাঝে জানালো সামনের দিকে দেখুন ফ্লটিং/ভাসমান বাজার, নৌকায় (৩০/৪০টি নিরাপত্তা দুরত্বে) করে খাবারসহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের সমাহার নিয়ে মেকং নদীর একটি শাখা নদীতে এ বাজার দেখা গেল। ১৫/২০ মিনিট চলার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটা ক্যান্ডি (চকলেট) ফ্যাক্টরীতে, নৌকা থেকে নেমে ২ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। পরিবারের সকল সদস্যদের সমন্বয়ে সম্পূর্ণ হাতে এবং হাতে তৈরি যন্ত্রের সাহায্যে চোখের সামনে নারিকেল, চাউলের আটা বিশেষ কায়দায় মোড়কসহ ক্যান্ডি বানিয়ে আমাদের মাঝে পরিবেশন করা হলো বিনা মূল্যে। এরপর আবার নৌকায় করে শাখা নদী থেকে মূল মেকং নদী পার হয়ে অপর দিকে নিয়ে যাওয়া হলো দুপুরের খাবারের জন্য। এটি ছিল একটা আকর্ষণীয় এ্যাডভেঞ্চার বিষয়। নৌকা থেকে নেমে প্রথমে কিছুটা হাটা পথে যাওয়ার পর সকলকে বলা হলো সেখানে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা প্রত্যেককে একটা একটা করে সাইকেল নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে। আমরা মিনিট ১৫ ঘন জংগলের মাঝে সরু রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম, রাস্তায় আমাদের উদ্দেশ্যে দাড়িয়ে থাকা এক ভিয়েতনামী মহিলা হাতের ঈশারায় পাশের একটি উন্মুক্ত রেষ্টুরেন্টে সবাইকে প্রবেশ করিয়ে নিলেন। সাইকেল রেখে সকলেই এক এক করে নিজেকে ফ্রেস করে দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিয়ে গ্রামীণ পরিবেশে খোলা জায়গায় বিশেষ ডাইনিং টেবিলে আসন নিলাম। খাবার খেয়ে পাশেই বাঁসের খুঁটিতে ঝোঁলানো দড়ির ঝুলন্ত বিছানায় কিছুটা সময় জিরিয়ে নিয়ে আবার রওয়ানা হলাম পরবর্তী গন্তব্যের পথে। আবারো নতুন চমক নতুন অভিজ্ঞতা,এবার চার আসন বিশিষ্ট ডিংগি নৌকা। চার জন করে বসে, চার জনের হাতেই চারটি বৈঠা, মাঝি শুধু মাত্র দাড় নিয়ে দাড়িয়ে নৌকার দিক নির্দেশনায় থাকে। আমরা পৃথিবীর চার দেশের (বাংলাদেশ, জাপান, আমেরিকা ও লন্ডন) চার জন নিজে বৈঠা বেয়ে ৫০ ফুট প্রস্থের খাল বরাবর এগিয়ে চললাম। অপূর্ব অনুভূতি, কিছুটা ভয় আবার এ্যাডভেঞ্চার সব মিলে কিছু বুঝবার আগেই খাল বেয়ে চলে এলাম মূল নদীতে, এসেই চোখে পড়লো আমাদের সেই বড় ট্রলার। ছোট ডিংগি নৌকা থেকে ট্রলারে উঠে রওয়ানা দিলাম আবার পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। এবারের গন্তব্য ফ্রুট ভিলেজ। ৪৫ মিনিট ট্রলারে যাবার পর পৌঁছে গেলাম ফ্রুট ভিলেজে। ট্রলার থেকে নেমেই ভিয়েতনামের লোকাল ভাষায় গানে গানে উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমাদের বরণ করে নেয়া হলো। ভাষা না বুঝলেও অংগভংগিতে ভালোভাবেই বুঝে নিলাম তাদের গানের অর্থ। গান আর নাচের তালে তালে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম অভ্যর্থনাকারীদের অনুসরণ করে। বিভিন্ন ধরণের ফলের সমারহে সাজানো টেবিলের সামনে আমরা যে যার আসনে বসার পর আমাদেরকে মনোরঞ্জনের জন্য আরোও ২/৩টি গান নাচ পরিবেশন করা হলো। বিভিন্ন ধরণের ফলের মধ্যে শুধু ড্রগন ফল আমার কাছে পরিচিত মনে হলো। এবার দিন শেষে ফেরার পালা- সবাই ট্রলারে উঠে রওয়ানা হলাম হোটেল(হেম গু দাও ষ্ট্রিট, ডিষ্ট্রিক্ট-১) গন্তব্যের দিকে। শেষ হয়েও যেন শেষ হবার নয়, ট্রলারে করে ফেরার সময় যেটা দেখলাম সেটিও হতে পারে আমাদের দেশের জন্য মাছ উৎপাদনের বড় ক্ষেত্র। বিশাল নদী (মেকং)-র তীর বরাবর  প্রায় ১ কিমি এর মত করে জায়গায় পানিতে ড্রাম দিয়ে জালের মাধ্যমে ঘিরে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র তৈরী করে অবাধে নদীতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ভ্রমণের মাধ্যমে যে জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এটি একটি বড় উদাহরণ। সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁছে গেলাম শহরে, প্রশস্ত রাস্তার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে নদী, ওপারেও রাস্তা চোখে পড়লো। এক সময় হোটেলের কাছে নামিয়ে দিলো আমাদের। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার শেষে একটু আগেভাগে ঘুমিয়ে সকালবেলায় রওয়ানা হলাম “হো চি মিং” বিমান বন্দরের দিকে। অল্প টাকায় বিমানের টিকেট ক্রয় করে অতিরিক্ত ৩০ ডলার গচ্চা দিতে হলো লাগেজ এর জন্য। শিক্ষার শেষ নাই, এটি ছিল আমার জন্য একটি শিক্ষা। ভ্রমণে জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনার দরজা উন্মুক্ত হয়। ভিয়েতনাম, বর্তমানে বাংলাদেশকে টপকে গার্মেন্ট রপ্তানীর দিক থেকে উপরে অবস্থান করছে, এর একটি অন্যতম কারণ উন্নত ও সাবলীল যোগাযোগ বব্যস্থা।

ভিয়েতনামের “হো চি মিং” সিটি ও এর আশেপাশে ঘুরে এতোটুকু বলতে পারি যারা এ্যাডভেঞ্চার, রকিং, অথচ স্মুথ ভ্রমণে নিজেকে প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে শহরের স্বাদ নিতে চান তারা বেড়াতে যেতে পারেন “হো চি মিং” ভিয়েতনাম-এ একটু আলাদা ভাবে অবলোকন করার জন্য। 

লেখক : পুলিশ পরিদর্শক,

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *