ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ডিটেকটিভ ডেস্ক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তার ৫৫ বছরের জীবনে ৮টি জন্মদিন কাটিয়েছেন জেলখানায়। তবে জেলখানায় তার এই ৮টি জন্মদিন কীভাবে কেটেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়েও এ বিষয়ে খুব একটা তথ্য নেই। তবে ১৯৬৭ সালে জাতির পিতার ৪৭তম জন্মবার্ষিকীর দিনটির ঘটনা কারাগারের রোজনামচায় কিছুটা তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধু।

তিন দিন আগে দেখা করে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানদের জন্মদিনে আসার অনুমতি পাবে কিনা সেই শঙ্কা ছিল বঙ্গবন্ধুর মনে। আবার আসতে পারে এমন ভাবনাও ছিল। বইয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘মন বলছিল, যদি আমার ছেলেমেয়েরা ও রেণু আসতো, ভালোই হতো।’ দ্বিতীয় ভাবনাই সত্য হয়। ফুলের মালা নিয়েই পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দেখতে আসে। ওই সময় জেলগেটে ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের পাঠানো কেকও কাটেন জাতির পিতা।

১৭ মার্চ ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ডায়েরির লেখাটা ছিল এমন-

“আজ আমার ৪৭তম বার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিনই নিজে পালন করি নাই। বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকতো। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধহয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আমার আবার জন্মদিবস! দেখে হাসলাম। মাত্র ১৪ তারিখে রেণু ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেখতে এসেছিল। আবার এত তাড়াতাড়ি দেখা করতে অনুমতি কি দিবে? মন বলছিল, যদি আমার ছেলেমেয়েরা ও রেণু আসতো, ভালোই হতো। ১৫ তারিখেও রেণু এসেছিল জেলগেটে মণির সাথে দেখা করতে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি নূরে আলম আমার কাছে। ২০ সেলে থাকে। কয়েকটা ফুল নিয়ে আমার ঘরে উপস্থিত। আমাকে বলল, এই আমার উপহার আপনার জন্মদিনে। আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। তারপর বাবু চিরঞ্জন সুতার একটা রক্তগোলাপ এবং বাবু সুধাংশু বিমল দত্ত একটি শাদা গোলাপ এবং এমদাদুল্লা সাহেব একটা লাল ডালিয়া আমাকে উপহার দিলেন। আমি থাকি দেওয়ানী ওয়ার্ডে। আর এরা থাকেন পুরানা বিশ সেলে। মাঝে মাঝে দেখা হয় আমি যখন বেড়াই আর তারা যখন হাঁটাচলা করেন স্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য। খবরের কাগজ পড়া শেষ করতে চারটা বেজে গেলো। ভাবলাম ‘দেখা’ আসতেও পারে। ২৬ সেলে থাকেন সন্তোষ বাবু, ফরিদপুরে বাড়ি। ইংরেজ আমলে বিপ্লবী দলে ছিলেন, বহুদিন জেলে ছিলেন। এবার মার্শাল ল জারি হওয়ার পরে জেলে এসেছেন, ৮ বৎসর হয়ে গেছে। স্বাধীনতা পাওয়ার পরে প্রায় ১৭ বৎসর জেল খেটেছেন। শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে মুক্তি পেয়েছিলেন। জেল হাসপাতালে প্রায়ই আসেন। আমার সাথে পরিচয় পূর্বে ছিল না। কারণ ভয় তাদের- আমি ‘খারাপ’ করে ফেলব, নতুবা আমাকে ‘খারাপ’ করে ফেলবে। আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। ২৬ সেলে যাবেন। দরজা থেকে আমার কাছে বিদায় নিতে চান। আমি একটু এগিয়ে আদাব করলাম। তখন সাড়ে চারটা বেজে গিয়েছে। বুঝলাম, আজ বোধহয় রেণু ও ছেলেমেয়েরা দেখা করার অনুমতি পায় নাই। পাঁচটাও বেজে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জমাদার সাহেব বললেন, চলুন আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রওয়ানা করলাম জেলগেটের দিকে। ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলেমেয়েদের চুমা দিলাম। দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়েছে। রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেলগেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেট থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।

আর একটা কেক পাঠাইয়াছে বদরুন। কেকটার উপর লিখেছে ‘মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে’। বদরুন আমার স্ত্রীর মারফতে পাঠাইয়াছে এই কেকটা। নিজে তো দেখা করতে পারল না, আর অনুমতিও পাবে না। শুধু মনে মনে বললাম, ‘তোমার স্নেহের দান আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। জীবনে তোমাকে ভুলতে পারব না।’ আমার ছেলেমেয়েরা বদরুনকে ফুফু বলে ডাকে। তাই বাচ্চাদের বললাম, ‘তোমাদের ফুফুকে আমার আদর ও ধন্যবাদ জানাইও’।

ছয়টা বেজে গিয়েছে, তাড়াতাড়ি রেণুকে ও ছেলেমেয়েদের বিদায় দিতে হলো। রাসেলও বুঝতে আরম্ভ করেছে, এখন আর আমাকে নিয়ে যেতে চায় না। আমার ছোট মেয়েটা খুব ব্যথা পায় আমাকে ছেড়ে যেতে, ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি। ব্যথা আমিও পাই। রেণুও বড় চাপা, মুখে কিছুই প্রকাশ করে না।

ফিরে এলাম আস্তানায়, ঘরে ঢুকলাম, তালা বন্ধ হয়ে গেল বাইরে থেকে। ভোর বেলা খুলবে।

আটটি জন্মদিন কেটেছে কারাগারে

স্বাধীকার আন্দোলন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অন্তত আটটি জন্মদিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালে তার ৩১তম জন্মদিন কাটাতে হয় কারাগারে। পাকিস্তান সরকার তাকে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি বন্দি করে। টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে কাটিয়ে তিনি মুক্তি পান ১৯৫২ সালে। বন্দিদশায় ১৯৫১ সালে তার ৩২তম জন্মদিন কাটে জেলে।

এরপর আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে ১৯৫৮ সালের ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হয়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে কাটাতে হয়। গ্রেফতারের ১৪ মাসের মাথায় তিনি মুক্তি পেলেও সেদিনই কারা ফটকে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় তার ৪০তম (১৯৫৯ সাল), ৪১তম (১৯৬০) ও ৪২তম (১৯৬১) জন্মদিন কাটে বন্দিদশায়। ওই দফায় ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মাথায় ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি আবার গ্রেফতার হন এবং মুক্তি পান একই বছরের ১৮ জুন। ফলে ৪৩তম (১৯৬২) জন্মদিনটিও তাঁর কাটে জেলখানায়। এরপর ১৯৬৭ সালে ৪৮তম এবং ১৯৬৮ সালে ৪৯তম জন্মদিনের সময়ও তাঁকে জেলে থাকতে হয়েছে।

সেদিন ইন্দিরা এসেছিলেন

১৯৭২ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ১৭ মার্চ দিনটিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন বাংলাদেশ সফরে। তার উপস্থিতিতে সারাদিনই রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে এরই মাঝে স্বজন, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভাকাক্সক্ষীদের সঙ্গেও কিছুটা সময় কাটান তিনি। প্রতিবেশি দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর জন্য ভারত থেকে সেদিন ফল আর মিষ্টি উপহার এনেছিলেন। দৈনিক বাংলার ১৮ মার্চের পত্রিকা বলছে, বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মবার্ষিকী পালন হয় সে বছর। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে ফল ও মিষ্টি উপহার দেন। সেগুলো তিনি ভারত থেকেই এনেছিলেন কোটি মানুষের শুভেচ্ছা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন হিসেবে। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বিশেষ বিমানযোগে সেদিন সাড়ে ১০টায় ঢাকায় আসেন। ১০টা ৫৫ মিনিটে তিনি হেলিকপ্টারযোগে বঙ্গভবন যান। ইন্দিরা বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে মঞ্চে আরোহণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ৩টা ৪৩ মিনিটে তার ভাষণ শুরু করেন। শেষ করে ৩টা ৫৭ মিনিটে। আর অতিথি ইন্দিরা গান্ধী বিকাল ৪টায় বক্তৃতা শুরু করে ৪টা ৩৩ মিনিটে বক্তৃতা শেষ করেন। সেদিন তিনি ‘জয় বাংলা‘ স্লোগান দিয়ে বাংলায় বক্তৃতা শুরু করেন। এইদিন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব প্রথম সরকারি অনুষ্ঠানে ঘরের বাইরে আসেন। শুরুতে সেদিন ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে সাহস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে দুর্দশা মোকাবিলা করেছে সেজন্য দেশবাসীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আমি এসেছি। আজকের দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও সুখের দিন বটে। কারণ আজ শেখ মুজিবের জন্মদিন। তিনি এদেশের মুক্তিদাতা। আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি কামনা করি। তিনি দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *