ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

প্রফেসর ডঃ জিয়া রহমান

শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও প্রগতি এই নীতিবাক্য ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস”।

২৫ মার্চ রাত্রে যখন ইয়াহিয়া খানের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের মানুষকে আক্রমণ করে, তখন তারা চারটি জায়গা বেছে নিয়ে তার ওপর আক্রমণ চালায়। সেই জায়গা চারটি হচ্ছে- রাজারবাগ, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৬)। বর্বরোচিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকায় প্রথম গণহত্যা শুরু করে আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্-এ ওই রাতেই প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয়। বেইজ ফর অল স্টেশন্স অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেন অ্যান্ড ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাকড বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেভ ইয়োর সেলভস, ওভার।’ পুলিশের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হন (সারা বাংলা, ২০১৮)। যতদিন বাংলার স্বাধীনতা থাকবে, যতদিন বাংলার মানুষ

থাকবে, ততদিন এই রাজারবাগের ইতিহাস লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। সেদিন জাতির জনকের হুকুমে এবং আহ্বানে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী এগিয়ে এসেছিল মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে, বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করতে। উল্লেখ্য, ১২৬২ জন শহীদ পুলিশ সদস্যর তালিকা স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সাথে বলা যায় স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে রাজারবাগের এবং পুলিশের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ত্রিশ লক্ষ লোকের সঙ্গে পুলিশের অনেক লোকও আত্মত্যাগ করেছিলেন। সেটি স্মরণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “তাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, তাদের ইজ্জত আপনারা রক্ষা করবেন। তাদের সম্মান আপনারা রক্ষা করবেন। তাদের আত্মা যাতে শান্তি পায়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমনি কষ্টকর”। তিনি পুলিশের পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,  “সেদিন দেখেছিলাম আমাদের পুলিশ বাহিনীর না আছে কাপড়, না আছে জামা, না কিছু। অনেককে আমি ডিউটি করতে দেখেছি লুঙ্গি পরে। একদিন রাত্রে তারা আমার বাড়ি গিয়ে ছিল। তাদের পরনে ছিল লুঙ্গি, গায়ে জামা, হাতে বন্দুক”। এটা থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, তিনি পেশাদারিত্ব দেখার পাশাপাশি, পুলিশের সদস্যদের কাজের প্রতি আন্তরিকতাটাও অনুভব করতেন।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশসমূহে দুর্নীতি একটা অভিশাপের মত হয়ে দাড়িয়েছে। এটি এমন এক সামাজিক ব্যধি যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ বাস্প ছড়াচ্ছে। ব্যক্তি যখন নিজের উদ্দ্যেশ্য সাধনের জন্য ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে, তখন মানুষ তার আশ্রয় নেয়।  ঐসব জায়গায় (দুর্নীতি) জোর দিতে গিয়ে ১৯৭৫ সালে প্রথম পুলিশ সপ্তাহে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়ে ছিলেন। যা আজও পুলিশ বাহিনীর জন্য অনুসরণীয় হয়ে আছে। উক্ত ভাষণে তিনি পুলিশকে, মানুষকে ভালোবাসতে ও সেবা দিতে ও সৎ থাকতে বলেছেন, পুলিশকে যেন মানুষ ভয় না করে  ভালোবাসে, সেভাবে কাজ করে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে বলেছেন। সেসব কথামালা যেন পিআরবি-৩৩ এর প্রতিচ্ছবি, যেখানে বলা হয়েছে, একজন দক্ষ পুলিশের গুণ হচ্ছে মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও সুনাম অর্জন করা, জাতির জনক স্বাধীন দেশের পুলিশকে শোষক হিসেবে নয়, জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। তাই পুলিশের কাজ জনগণকে ভালোবাসা ও দুর্দিনে সাহায্য করা। যেন মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে করে, মানুষ ‘মাছের রাজা ইলিশ, মানুষের রাজা পুলিশ’ উক্তিটাকে ভুলে যায়। জাতির জনকের এসব নির্দেশনা পিআরবি ২৬০ নং ধারার সারমর্ম চলে আসে, যেখানে বলা হয়েছে, পুলিশ যাতে জনগনকে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকে। মানুষ আশা করে, চোর, বদমাইশ, গুন্ডা, দুর্নীতিবাজ যেন তাদের ওপর অত্যাচার করতে না পারে। পুলিশ এমন ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করবে না, যেখানে মানুষের ভাবনায় সন্দেহের উদ্রেক হয়, আসলেই কি ‘বাঘে ছুলে আঠার ঘা, পুলিশ ছুলে ছত্রিশ ঘা’?

যখনই কেউ অন্যায় করবে, তৎক্ষণাৎ তা প্রতিহত করতে হবে, কারণ Rotten Apple theory অনুসারে বলা যায়, একটা পচা আপেল যেভাবে অন্য সব আপেলকে নষ্ট করে, ঠিক তেমনিভাবে একজন দুর্নীতি পরায়ন, অন্যজনকেও দুর্নীতি করাতে সহায়তা করে। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি (জাতির জনক) আরো বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ যেন আপনাদের জন্য গর্ব অনুভব করতে পারে, আপনারা যদি ইচ্ছা করেন, আপনারা যদি সৎ পথে থেকে ভালোভাবে কাজ করেন, যদি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকেন, তাহলে দুর্নীতি দমন করতে পারবেন। আপনারা যদি আজকে ভালোভাবে থাকেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, যে থানায় ভালো অফিসার আছেন এবং ভালোভাবে কাজ করছেন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনও প্রকার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ, তারা সবসময় সজাগ থাকেন এবং দুষ্টকে দমন করেন। যিনি যেখানে রয়েছেন, তিনি সেখানে আপন কর্তব্য পালন করলে  দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে না”। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদানুসারে, গ্রেপ্তারের পূর্বে, তাকে গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, “সকলের ছুটি আছে, কিন্তু পুলিশের ছুটি নেই। এ জন্য আমার দু:খ হয়। সংখ্যায় আপনারা খুব কম বলেই আপনাদের রাতদিন কাজ করতে হয়। আমি আপনাদের সব অসুবিধার খবর যে রাখি না তা নয়। কিন্তু উপায় কি? সাধারণ মানুষের টাকা দিয়েই সব চলে, তাদের উপর ট্যাক্সের বোঝা চাপানো যায় না। আপনাদের দুঃখ-কষ্টের কথা আমি জানি”। এটা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পুলিশের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র খবরও তিনি রাখতেন। (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৬)

বাংলাদেশ সংবিধানের ১২নং অনুচ্ছেদ অনুসারে, সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বিলোপের কথা বলা আছে। সেটি স্মরণ করাতে গিয়ে জাতির জনক বলেন “আমি বাঙালি, বাঙালি জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই সম্মানের সঙ্গে, আমার রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, বুড্ডিস্ট তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে এবং খ্রিস্টান তার ধর্ম কর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। তবে একটা কথা হলো” এই ধর্মের নামে আর ব্যবসা করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্য যেন সংবিধানের মূলনীতিরও প্রতিবিম্ব। সুতরাং, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের মৈত্রীর বন্ধন তৈরি করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই বাঙালি, এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। সেটি রক্ষার্থে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে সম্মুখসারির ভূমিকা রাখতে হবে।

আত্মসমালোচনা এমন এক গুণ যার মাধ্যমে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধন করে এগিয়ে যাওয়া যায়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমাদের উন্নতি নির্ভর করবে, কতবেশী নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, যেটি অনেকাংশে নির্ভর করবে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু বলেন, “আত্মসমালোচনা করতে না পারলে নিজকে চিনতে পারা যায় না। তারপর আত্মসংযম, আর আত্মশুদ্ধি। তাহলেই দেশের মঙ্গলসাধন করা যাবে। আত্মসমালোচনা না করলে আত্মশুদ্ধি করা যায় না। আমি ভুল নিশ্চয়ই করব, আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই, আমি মানুষ, আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে থাকতে হবে, আই ক্যান রেকটিফাই মাইসেলফ। আমি যদি রেকটিফাই করতে পারি, সেখানেই আমার বাহাদুরি। আর যদি গোঁ ধরে বসে থাকি যে, না আমি যেটা করেছি, সেটাই ভালো। দ্যাট ক্যান নট বি হিউম্যান বিইং”। সুতরাং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ভুল বের করে এনে এক নতুনত্ব সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, “যদি আলোচিত হতে চাও, সমালোচনাকে ভয় করা যাবে না, মনে রেখ সমালোচনাও একপ্রকার আলোচনা”।

সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, বৈষম্য এবং শোষণের বেড়াজালে যখন আমাদের নারী সমাজ অবহেলিত, ঠিক সেই সময় নারীর এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাতির জনক বলেন,” পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না। সেজন্য আজকে আপনাদের কাছে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। যাতে পুরুষ ভাইরা আমার, যখন কোনো রকমের সংগ্রাম করে নেতা হন বা দেশের কর্ণধার হন তাদের মনে রাখা উচিত, তাদের মহিলাদেরও যথেষ্ট দান রয়েছে এবং তাদের স্থান তাদের দিতে হবে”। বাংলাদেশ পুলিশে নারী পুলিশের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে এবং তাদের সফলতাকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(২) ধারায় বলা আছে রাষ্ট্র ও গণজীবনে সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। নারী ও শিশুদের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সুতরাং, আমাদের নারী বান্ধব থানা তৈরি করতে হবে। নারীরা যেন নির্ভয়ে তাদের সমস্যার কথা বলতে পারে সেক্ষেত্রে আরো নজর দিতে হবে, তাহলে আমরা একটা জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারব।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ পুলিশ দায়িত্ব এবং কাজের গতি অনেকাংশে বেড়ে যায়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশ বাহিনীর মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের সম্পদ ও জানমালের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। আইন পালন আর অপরাধ দমনের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। সাম্প্রতিককালের জঙ্গিবাদ দমন, নিয়ন্ত্রণে এবং করোনাকালীন দুর্যোগে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। আমরা জানি, পুলিশের জন্য সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে নাই। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ যখন বিশ্বে মাথাচড়া দিয়ে উঠল, বাংলাদেশেও এর প্রভাব বিস্তার শুরু করল। কখনো সরাসরি তাদের জঙ্গি তৎপরতার আবার কখনো লোন উলফ (জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর আদর্শের প্রতি অনুগত কোনো ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে যে হামলাগুলো চালায়) পদ্ধতিতে। হলি আর্টিসান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা মোকাবিলায় চার পুলিশ সদস্য আত্মোৎসর্গ করেছেন। অকুতোভয় এই পুলিশ সদস্যদের জীবন উৎসর্গের বিনিময়ে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা পায় (সমকাল, ২০১৭), কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স পলিসি ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের একাধিক ইউনিটের সমন্বয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব হয়। কাউন্টারটেরোরিজম বিভাগ, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম, ক্রাইমসিন ম্যানেজমেন্ট ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগস্কোয়াড, এসটিজি (ডিডব্লিউ, ২০১৬), অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, গোয়েন্দা সক্ষমতা, ইন্টেলিজেন্স এনালাইসিস করার সক্ষমতা, সাইবার পেট্রোলিং, অপারেশন চালানোর ক্যাপাসিটি, তদন্ত চালানোর সাপোর্ট, মসজিদভিত্তিক প্রচারণা ইত্যাদি বাংলাদেশের সকল জঙ্গি কার্যক্রমের পাকা ধানে মই দিতে সক্ষম হয় (বিবিসি, ২০১৯)

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় যখন পুলিশের হাতে জর্জফ্লয়েডের মৃত্যুতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়েছে, ঠিক সেই সময় করোনাকালে বাংলাদেশ পুলিশের এগিয়ে আসা, প্লাজমা দান, দাফন কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখা, ত্রাণ দেওয়া, বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি পুলিশের রুটিন কাজে পরিণত হয়, যেটা মানবিক কার্যক্রমের এক প্রতিচ্ছবি এবং প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত, ঠিক যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ হয়। করোনাকালে, ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পুলিশের ২৯ সদস্য মারা যান (প্রথম আলো, ২০২০), মোট আক্রান্ত মানুষের ১০ শতাংশই পুলিশ সদস্য (বিবিসি, ২০২০), ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএমপিসহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটে লকডাউনসহ বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা দিতে গিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৮ হাজার ৮১১ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন (বাংলাদেশ জার্নাল, ২০২০) এই দুর্যোগকালে বাংলাদেশ পুলিশের এমন দায়িত্ববোধ এবং ত্যাগ, জাতির জনকের স্বপ্নের পুলিশকেই নির্দেশ করে। সাধারণত আমরা দেখতে পাই, পুলিশ প্রোঅ্যাকটিভ এবং রিঅ্যাকটিভ এর ভূমিকা পালন করে থাকে। রিঅ্যাকটিভ মানে ঘটনার পরে অকুস্থলে গিয়ে সামগ্রিক ঘটনা তদন্ত করে অপরাধীকে শনাক্ত করার মাধ্যমে অবদান রাখা, প্রোঅ্যাকটিভ মানে পুলিশের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীরা অন্যত্র পলায়ন করে কিংবা অপরাধ করার সাহস দেখায় না। বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে যেখানে রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং এর চর্চাই বেশি দেখা যায়, সেখানে করোনা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশকে দুইটাই সমানভাবে করতে দেখা যায়।

শান্তিময় ও নিরাপদ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুলিশের সাথে জনগণের সেতু বন্ধন ও আস্থা তৈরি হয়। এর মাধ্যমে সমাজ থেকে জঙ্গিবাদ ও মাদকসহ আরও অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কমিউনিটি পুলিশিং দিবস উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি আশা করি, মুজিববর্ষে নতুন স্পৃহা ও আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে পুলিশ সদস্যরা জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনতার পুলিশে পরিণত হয়। জনগণও পুলিশের পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতাও শ্রদ্ধাই হবে কমিউনিটি পুলিশিং এর মূলকথা”। তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী কমিউনিটি পুলিশিং এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে ৬০ হাজার ৯১৮ টি কমিটির মাধ্যমে ১১ লাখ ১৭ হাজার ৮০ জন কমিউনিটি পুলিশিং সদস্য পুলিশের সঙ্গে একযোগে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে, বাংলাদেশে রেলওয়ে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং হাইওয়ে পুলিশে ও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে অপরাধ দমনে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আগামীতেও নারী নির্যাতন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি পুলিশিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসকরি। (ডেইলি স্টার, ২০২০)

পরিশেষে, অপরাধের শাস্তির ধরন এবং প্রকৃতি সম্পর্কে জনগণকে অবগত করাতে হবে, সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ কাজ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে জনগণের প্রতি পুলিশের আস্থা অর্জন করতে হবে এবং জনবান্ধব ও জাতির জনকের স্বপ্নের পুলিশ ব্যবস্থা কার্যকর করতে পুলিশকে আরও বেশি কর্মদক্ষ, জবাবদিহিতা, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলাবোধ, মূল্যবোধ, নীতি ও ঔচিত্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।

  লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান,  ক্রিমিনোলজি বিভাগ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *