ই-পেপার

দীন মোহাম্মদ

আজ রাতে আমাদের ফ্লাইট। কাসাব্লাঙ্কা থেকে স্বপ্নের প্যারিস যাত্রা!

কাসাব্লাঙ্কা শহরতলীতে অবস্থিত আমাদের হোটেলের সুইমিং পুলের লনে থরে থরে সাজানো চেয়ারে টান টান হয়ে হেলে শুয়ে জলকেলি দেখছি। কয়েকজন আফ্রিকান সুইমিং পুলে চিৎ সাঁতার, ডুব সাঁতার, ভুঁট সাঁতার দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ব্যাকস্টোক, বাটারফ্লাই টাইপের সাঁতার দিয়ে আনন্দে শিহরনে বাক বাকুম হয়ে যাচ্ছেন।

জলিল বলে, এরা মরু এলাকার লোক তো পানি পায় নাÑ এ জন্যে পানি দেখে এদের মাথা ফোরটি নাইন হয়ে গেছে। কেউ আর রুমে থাকতে পারছে না।

আসলেই তাই। ঘন্টার পর ঘন্টা এরা পানিতে ডুবে আছে। এদের জ্বর-টর হয়না নাকি? আমাদের দেশে বাতাসে আর্দ্রতা থাকায় পানির সংস্পর্শে শরীর থেকে তাপ শুষে নিয়ে শরীর ঠান্ডা শীতল করে দেয় বলে জ্বর আসতে পারে। এ জন্য পুকুরে কেউ বেশিক্ষণ ঝাপাঝাপি করলে মা-চাচিরা লাঠি-কুঞ্চি নিয়ে হাজির হন। কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে ঘরে তোলেন।

মজিদ বলে, আফ্রিকাতে সুপেয় পানির অভাব শিঘ্রি দূর হতে চলেছে। ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্টে বলা হচ্ছে লিবিয়া, আলজেরিয়া, চাঁদের মরু বালির নিচে সতের মিটার পুরু বিশাল এক পানি ভান্ডারের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। ঐ এলাকায় যে পরিমান পানি আছে তা সারা বিশ্বের মোট সুপেয় পানির চেয়ে দ্বিগুণ। আফ্রিকার পানির কষ্ট দ্রুত মিটে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

আমার ডান পাশের চেয়ারে এক ইন্ডিয়ান বসে আছেন। তিনি বাংলা বোঝেন বলে মনে হলো। ইংরেজিতে বলেন, পানির রিজার্ভ থাকলেও সেটা দক্ষতার সঙ্গে তুলতে পারা হবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির দিক দিয়ে আফ্রিকানরা অনেক পিছনে পড়ে আছে। তারা এখনো জমির চাষ দেয়াও বোঝে না। ভুট্টা-যব লাগানোর জন্য গাধা দিয়ে জমিতে যে চাষ দিয়ে থাকেÑতাতে জমিতে মাটির কম্পোজিশন লুজ হয় না।

ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হলো। নাম অশোক নায়াল। বাড়ি পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যের আরব সাগর তীরে। অনেক দিন পশ্চিমবঙ্গে থাকায় বাংলা মোটামুটি বুঝতে পারলেও, বলতে পারেন না। হিন্দি জানেন; কিন্তু অন্যান্য গুজরাটির মতো তিনিও হিন্দিকে বিদেশী ভাষা বলে মনে করেন। তামিলনাড়ু, কর্নাটক, অন্ধপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কেরালার মত অনেক প্রদেশের মানুষ হিন্দির নামই শুনতে পারে না।

ইন্ডিয়ান ইংরেজিতে বলেন, তিনি তিন দিন কাসাব্লাঙ্কা থাকবেন। এরপর তার নিজের বসবাসের শহর মরোক্কো সংলগ্ন জিব্রাল্টারে চলে যাবেন। ওখানে একটি আইটি ফার্মে নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের কাজ করেন। মাঝে মাঝে আশেপাশের দেশে বেড়াতে বের হন।

মজিদের মুখটা সকাল থেকে কেমন শুকনা শুকনা মনে হচ্ছে। কী ব্যাপার?

জলিল বলে, বুঝলেন না, স্যারের বান্ধবী হনুফার আজ অফ ডে। হোটেলে আসবে রাত আটটায়। তখন আমরা এয়ারপোর্ট!

অশোক বলেন, আপনারা কোথায় যাবেন?

আমরা আজ রাতের প্লেনে প্যারিস যাব।

আপনারা ভুল করেছেন। সড়ক পথে ইউরো বাসে বা ট্রেনে যেতে পারতেন। মরোক্কোর টানগির বা স্পেনের টারিফা থেকে ফেরিতে জিব্রাল্টার হয়ে, গ্রানাডা-আলহামব্রা দিয়ে ভ্যালেনসিয়া-বার্সেলনা অথবা মাদ্রিদ যেতে পারতেন। ইউরো বাস বা ট্রেন জার্নি খুবই ভাল। বার্সেলোনা বা মাদ্রিদ থেকে প্যারিস যাওয়া তো কোন ব্যাপার না। স্পেনের কান্ট্রি সাইড আসাধারণ। সম্ভবত ইউরোপের সবচেয়ে সুন্দর দেশ স্পেন। আপনারা সত্যি মিস করলেন!

আসলেই তাই। এ যাত্রা জিব্রাল্টার-স্পেন দেখা হবে না। ছোট বেলা থেকেই ভূগোলে পড়ে এসেছি ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের মধ্যে সংযোগ প্রণালীর নাম হলো জিব্রাল্টার। এই প্রণালী মরোক্কো ও স্পেনকে অর্থাৎ অফ্রিকা ও ইউরোপকে আলাদা করেছে।

ইবারিয়ান পেনিনসুলার দক্ষিণে বুড়ো আঙ্গুলের মতো মোটা লম্বা পাথুরে-পাহাড়ী এলাকা নিয়ে ব্রিটিশ টেরিটরি জিব্রাল্টার অবস্থিত। ব্রিটিশ এ প্রদেশটির মোট আয়তন মাত্র ৬.৭ বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা হলেও মাথাপিছু আয়ে পঞ্চম সমৃদ্ধ দেশ।

আশোক বলেন, তারেক পাহাড় বা জাবাল তারেকের স্প্যানিশ ভার্সন হলো জিব্রাল্টার। এটা আসলে বারবার উমায়েদ জেনারেল তারিক ইবনে জিয়াদ এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। যিনি ৭১১ সালে মরোক্কো থেকে মুর সৈন্যদল নিয়ে ইবারিয়ান পেনিনসুলা আক্রমণ করেন। মুর মুসলিমরাই জিব্রাল্টার এলাকার প্রথম বাসিন্দা। পরবর্তীতে প্রায় ছয়শত বছর মুসলিমরা স্পেন শাসন করেছিলেন। স্থানীয়রা এখন দেশটিকে শুধু জিব বা রক বলে ডাকে।

জলিল বলে, জিব্রাল্টারের লোকজন কি চায় যে, ব্রিটিশরা তাদের এখনো শাসন করুক?

চায়। বারমুডা, ফকল্যান্ড, কেম্যান, ভার্জিন আইল্যান্ড এর মতো জিব্রাল্টারের আধিবাসীরাও চায় ব্রিটিশরা তাদের শাসন করুক। স্প্যানিশদের চাপে আর অবরোধের কারণে ১৯৬৭ সালে একবার গণভোট আয়োজন করা হয়েছিল। তখন ৯৯% লোক ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। স্পেন দাবি পরিবর্তন করে ব্রিটিশদের সাথে যৌথ সার্বভৌমত্বের প্রস্তাব দেয়। ২০০২ সালে ৯৯% ভোটার যৌথ সার্বভৌমত্বের ধারণা বাতিল করে দেয়। জোর করে তাদের অন্য কোন রাষ্ট্রের অধীনে দেয়া যাবে না, মর্মে একটি অনুচ্ছেদ বর্তমানে জিব্রাল্টারের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জিব্রাল্টারে কী সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?

বারবারি ম্যাকাকুইস বা এ্যাপস নামের এক ধরনের বানর শহর এলাকায় ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। হয়তো বান্ধবী নিয়ে কেউ ওয়েস্ট বা ইস্ট সাইড বিচে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। হঠাৎ দেখা যাবে হাত থেকে আইসক্রিম কেড়ে নিয়ে দে দৌঁড়! অথবা স্যান্ডেল খুলে সাগরে গোছল করতে নেমেছে-স্যান্ডেল নিয়ে লাপাত্তা। সোনারে বাবারে তুমি আমার নুটুপুটু ডেকে ডেকে তারপর রাজি-খুশি হলে ফেরৎ দিয়ে যাবে। সবাই এসব অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করে। ইউরোপের একমাত্র বন্য বানরগুলো যাতে বিলুপ্ত না হয়ে যায়। স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে, ব্রিটিশরা আসার সাথে সাথে বানরগুলো মরোক্কো থেকে এসেছে, ব্রিটিশরা জিব্রাল্টার ছেড়ে চলে গেলে বানরগুলোও চলে যাবে। ছোট্ট এক পাথুরে দেশের সারা রাস্তায় বন্য বানরের দাপিয়ে বেড়ানো দেখার জন্যই এখন প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে। আপনারা এটা মিস করলেন!

মজিদ বলে, না এটা আমরা ভেবেছিলাম। আমাদের ছুটি মাত্র পনের দিন। এত অল্প সময়ে সবকিছু দেখা যায় না।

অশোক বলেন, এটা সঠিক, সব কিছু অল্প অল্প না দেখে কিছু জিনিস ভালভাবে দেখা ভাল। অনেকে বেড়াতে বের হয়ে খালি টাচ এ্যান্ড ব্যাক করে এসে গর্বে বুক ফাটিয়ে বলে-বাহ্ সব দেখে আসলাম। আসলে তারা নিজের প্রতি সুবিচার করে না। কোন দেশ, দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে বাইন মাছের মত কাদায় ডুব দিতে হয়। স্থানীয়দের সাথে থাকতে হয়, তাদের রান্না ঘরে যেতে হয়, ড্রয়িং রুমে বসে লোকজনের সাথে আড্ডা দিতে হয়। বাজার, শপিং মল, কসাইখানায় ছ্যোঁক ছ্যোঁক করে গন্ধ নিলে তবে যদি কিছু জানা যায়।

জলিল বলে, স্যার, এখন থেকে আগে কসাইখানাই খুঁজে বের করে গন্ধ…।

মজিদ ধমক দিয়ে থামায়ে দিয়ে বলে, এজন্যে যারা মনবুসো-জেডিএস-বিশ্বব্যাংক স্কলারশিপ নিয়ে জাপান যায়, তাদের বাধ্যতামুলকভাবে ঐ দেশের কোন এক ফ্যামেলির সঙ্গে এ্যাটাচমেন্টে পাঠানো হয়। তাদের সাথে একসঙ্গে খাবে, থাকবে, ঘুমাবে, রান্না করবে তবেই দেখা-জানা কিছুটা পূর্ণতা পায়।

মজিদ বলে, শুনেছি নর্থ অফ্রিকাতে নাকি ইউরোপীয় ভূখ- আছে। এটা কোথায়?

অশোক বলেন, মরোক্কোর উত্তরাঞ্চলে মরোক্কোর সীমানা বেষ্টিত দুইটি ¯প্যানিশ শহর আছে। জিব্রাল্টার প্রণালী দ্বারা শহর দুইটি মেইনল্যান্ড স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন। স্বশাসিত সিটি প্রদেশ হিসাবে স্পেনের অঞ্চল হিসাবে গণ্য।

ব্রিটিশ জিব্রাল্টারের দক্ষিণে মরোক্কোর ভূখ- সংলগ্ন শহর প্রদেশ সিউটা আয়তনে ১৮.৫ বর্গ কিলোমিটার। ৭১১ সালে এ এলাকা থেকেই মুসলিম যোদ্ধা তারিখ ইবনে জিয়াদ স্পেন আক্রমণ করেছিলেন। শহরটি প্রায় আড়াইশ বছর (১৫১৫ থেকে ১৬৬৮ সাল) পর্তুগিজরা শাসন করে স্পেনের হাতে তুলে দেয়। সিউটার জাতীয় পতাকায় এখনও পর্তুগিজ শিল্ড বহাল আছে।

অন্য শহরটির নাম মেলিলা। এটিও মরোক্কোর উত্তরাঞ্চলে ভূ-মধ্য সাগরের তীরবর্তী স্প্যানিশ স্বশাসিত শহর। প্রায় ২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ প্রদেশটি ব্রিটিশ জিব্রাল্টারের প্রায় তিন গুণ বড়। সাগরে মাছ ধরাই শহরের মানুষের মূল জীবিকা। প্রতিদিন শহরের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মরোক্কো থেকে প্রায় ছয় ফুট উঁচু সুরক্ষিত সীমানা বেষ্টনির নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে এ শহরে প্রবেশ করে। পণ্য আদান-প্রদান করে, কেনাকাটা বা কাজ করে মূলত শহরের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে।

শহর দুইটির মূল বৈশিষ্ট হলো বড় চারটি ধর্মের সহ-অবস্থান। শহরে বিভিন্ন গীর্জা যেমন আছে; আছে মসজিদ, সিনেগগ এবং হিন্দু মন্দির। সকল ধর্মের উৎসব-পার্বন এখানে সাড়ম্বরে পালন করা হয়। ক্রস রিলিজিয়ন সম্পর্ক বা বিয়েও এখানে হর হামেশা চোখে পড়বে। ধর্মের ভিত্তিতে যারা মানুষকে বিভক্ত করে স্বার্থ হাছিল করতে চায়, তাদের উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্য শহর দুইটি আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

তিনজন প্রায় একসঙ্গে বললাম, হোয়াট এ মিস! মরোক্কোয় বসে থেকে না জেনে বিরাট মিস করলাম। সিউটা আর মেলিলার দম্ভ ছুঁতে পারলাম না! শুধু মন্যুমেন্ট, ইতিহাস আর মানুষ দেখতে যারা বোকার মত ভ্রমণ করতে বের হই, তাদের জন্য এটা একটা বিরাট চপেটাঘাত।

হঠাৎ ভিমড়ি খাওয়ার মতো চমকে উঠে দেখি, হনুফা হন্তদন্ত হয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। কী ব্যাপার? হাতে বড় ব্যাগ কেন? সে কি সত্যি সত্যি আমাদের সাথে যেতে চায়? কী জানি কিছু বুঝতে পারছি না!

আড় চোখে লক্ষ্য করে দেখলাম, মজিদ নির্বিকার। আচরণে কোন উত্তাপ নেই।

লেখক : পুলিশ সুপার, নৌ পুলিশ অঞ্চল, নিরালা, খুলনা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x