ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন

বাঙালির আত্মপরিচয়জ্ঞাপক স্লোগান ‘জয় বাংলা’ আজ একাকার হয়ে মিশে আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে; শিরায়, উপশিরায়, ধমনীতে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীজমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে এই স্লোগান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান যে গতি ও শক্তি সঞ্চার করে তার তুলনা বিশে^র ইতিহাসে নেই। ছোট্ট দু’টি শব্দের একটি স্লোগান কীভাবে পুরো একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, কী করে একটি জাতিকে স্বাধিকারের পথে উদ্বুদ্ধ করে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে, কী করে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষকে একই চেতনার আলোকে উজ্জীবিত করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তারই একটি বড় দৃষ্টান্ত। বাঙালির জাতীয় জীবনে যেসব শব্দ গ্রথিত হয়ে আছে, ‘জয় বাংলা’ তার একটিই শুধু নয়, বরং বলা চলে প্রধানতম।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ (১৮৮২), মহাত্মা গান্ধীর ‘Quit India’ ‘ভারত ছাড়ো’ (১৯৪২), নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ‘দিল্লি চলো’ (১৯৪৩)-এর মতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জয় বাংলা’ (১৯৭১) এমন একটি মন্ত্র, যার মধ্যে নিহিত আছে অসীম শক্তি। ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামে প্রবলভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে এ স্লোগান। এর আগে বাঙালি কখনো এত তীব্র, সংহত ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয়নি, যেখানে একটি পদেই প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতি, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষার সৌন্দর্য ও জাতীয় আবেগ। সফল অপারেশন শেষে অবধারিতভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জয় উদ্যাপন করতেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন এ দেশের মানুষের মধ্যে কোনো ধর্মের, বর্ণের ভেদাভেদ ছিলো না। সবার পরিচয় ছিলো একটাই ‘আমি জয় বাংলার লোক’। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শেষে উচ্চারিত স্লোগান ‘জয় বাংলা’ আজও শিহরিত করে। এ স্লোগানে উচ্চারিত প্রতিটি অক্ষর বাংলা মায়ের সন্তানদের দেশাত্মবোধকে জাগ্রত করে। আর সে কারণেই বাংলার মুক্তিসেনারা ’৭১-এ যুদ্ধের মাঠে আত্মাহুতি দিয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন বাংলা মায়ের কোলে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলে। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে বুলেট ও বেয়নেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বাংলা মা কে চিৎকার করে জানান দিয়েছেন ‘জয় বাংলা’ বলে।  

বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলা শব্দ দু’টি ওতোপ্রতভাবে জড়িত। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম স্লোগান এই জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু ছাড়া জয় বাংলা যেমন অর্থহীন তেমনি জয় বাংলা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শব্দটি পূর্ণতা পায় না। বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলা স্লোগান কোনো দলের স্লোগান নয়, এ স্লোগান মুক্তিকামী বাঙালির। জয় বাংলা বাংলাদেশ জন্মের স্লোগান, জয় বাংলা মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, জয় বাংলা স্বাধীনতার স্লোগান, জয় বাংলা বাঙালির মুক্তির স্লোগান, জয় বাংলা এ দেশের মানুষের ঐক্যের স্লোগান, জয় বাংলা আমাদের অস্তিত্বের স্লোগান, জয় বাংলা আমাদের জাতীয় স্লোগান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উদ্ভাবনের পেছনে যে নামটি জড়িত তা হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘.. বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা স্লোগানটি নজরুলের কবিতা থেকে নিয়েছিলেন।.. নজরুল প্রেরণা ও চেতনার কবি। তার কবিতা ও গানে অসাম্প্রদায়িকতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।’ (‘জয় বাংলা স্লোগান নজরুলের সৃষ্টি’, রাইজিংবিডি.কম, ২৫ মে ২০১৫)। এর আগে ২০ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র, কুমিল্লা উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘.. .. the slogan `Joy Bangla’ came from rebel poet Kazi Nazrul Islam and it is the slogan of the entire nation’. (Joy Bangla was inspired by Nazrul’s poetry: PM, dhakatribune.com, ঢাকা ট্রিবিউন, ২০ এপ্রিল ২০১৩)

বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ শব্দবন্ধ যে নজরুলের ‘ভাঙার গান’ কাব্যের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতা থেকে নিয়েছেন সে তথ্য পাওয়া যায় বাংলা শামসুজ্জামান খানের ‘বাংলাদেশ উদ্ভব ও জয় বাংলা’ শীর্ষক লেখায়। (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ঢাকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

মাদারীপুরের শান্তি-সেনা-বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দাস (১৮৯৯-১৯৫৬) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী। এ জন্য জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তাঁর আত্মত্যাগ, স্বজাত্যবোধে মুগ্ধ হয়ে পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি উপলক্ষে ১৯২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নজরুল কবিতাটি লেখেন, যা ১৯২৪-এ তাঁর ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশ পায়। কবিতাটি তিনি সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করেন এবং হারমোনিয়াম সহকারে গেয়ে শোনান। বিপ্লবী রাজনীতি ও বিপ্লবীদের প্রতি নজরুলের আগ্রহ প্রথম থেকেই ছিল গভীর। বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ উৎসর্গ করে সে প্রমাণও তিনি রেখেছেন। ১৯২৩-এর ১৫ ডিসেম্বর নজরুলের কারামুক্তি ঘটে। তার অন্তত দু’মাস আগে মুক্তি পান পূর্ণচন্দ্র দাস। পূর্ণচন্দ্র মুক্তি পাওয়ার সময় নজরুল জেলে বসে কবিতাটি লেখেন। বলাবাহুল্য, ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ (১৯২৪ সালের আগস্ট) মাসে প্রকাশিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১১ নভেম্বর বইটি বৃটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এই গ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম পঙক্তি ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্ত-জমাট, শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী!’

৫৪ চরনের দীর্ঘ কবিতা ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’। গানের ভঙ্গিতে লেখা কবিতাটির শিরোনামের নিচে নজরুল ‘গান’ কথাটি লিখে দিয়েছেন। প্রতি স্তবক ৬ চরণে, মোট ৯টি স্তবক। এই কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ‘জয় বাঙলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পঞ্চম স্তবকের তৃতীয় চরণে উল্লেখ আছে ‘জয় বাঙলার পূর্ণচন্দ্র’। কবিতাটি যখন ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন এর নিচে লেখা হয়, ‘মাদারিপুর শান্তি-সেনা-বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি-উপলক্ষে রচিত।’

‘জয় বাঙলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ!

জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!

স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,

বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

(নজরুল-রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, প্রথম খ-, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ.১৬৭)

এই স্লোগানের উৎপত্তি সম্পর্কে আর একটি তথ্য পাওয়া যায় তা হলো, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত নবপর্যায় (১৯৪০) ‘নবযুগ’ পত্রিকার ৩রা বৈশাখ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ (১৯৪২) সংখায় ‘বাঙালির বাঙলা’ নামে প্রকাশিত প্রবন্ধ। ১৯৪২ সালে তরুণ বঙ্গবন্ধু কলকাতায় অবস্থান করেছেন এবং রাজনীতিতেও তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তখনই তিনি কলকাতার ‘হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন’-এ যুক্ত হয়ে পড়েন। লেখাপড়া আর রাজনীতি দুটোই করেছেন; কিন্তু সময়টা বেশি দিয়েছেন রাজনীতিতে। এসময়ই মুজফ্ফর আহমদ সংশ্লিষ্ট ‘নবযুগ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বাঙালির বাঙলা’। ১৯২০ সালে ‘নবযুগ’ বের হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ১৯৪০-এ ‘নবযুগ’ আবার বের হয় এবং আন্দোলনরত তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই পত্রিকায় নজরুলের প্রবন্ধ ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রকাশ পায় ৩রা বৈশাখ, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ সংখ্যায়, যা ১৯৪২ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের জন্য খুবই আগ্রহব্যঞ্জক হয়ে উঠে। এই প্রবন্ধের প্রভাবেও বঙ্গবন্ধুর মনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ভ্রূণ স্থাপিত হয়েছিল, যা পরে তিনি বাঙালির মুক্তির স্লোগান হিসেবে ছড়িয়ে দেন। এ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন-

বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও :

‘এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির-আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা, করি না ভয়

যত পরদেশি দস্যু ডাকাত

রামা’দের ‘গামা’দের।’

বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।’

(নজরুল-রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, সপ্তম খ-, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ.৫৮)

প্রবন্ধের শেষে নজরুলের ভাষ্যই যেন ‘জয় বাংলা’-র শেকড়। ‘বাঙলার জয় হোক’ আর ‘জয় বাংলা’ অর্থগত দিক থেকে একই অর্থ প্রকাশ করে। নজরুল এখানে জাতীয় চেতনাকে ধারণ করেছেন। একই সঙ্গে শেখ মুজিবও একই চেতনার প্রচারক ছিলেন আমৃত্যু। তাইতো কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে ২৪ মে (১১ জ্যেষ্ঠ) ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন স্বাধীন বাংলাদেশে। তিনি জানতেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুল ছিলেন অবিরাম প্রেরণার উৎস। তাঁর রচনা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উজ্জীবিত করেছে। তাই বাঙালির জয়ে কবির জন্ম-উৎসব দেশে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করেন। ‘হে কবি’ সম্বোধন করে নজরুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কের প্রতিনিধি হিসেবে পত্র নিয়ে যান তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী মতিউর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তফা সারওয়ার। চিঠিতে উল্লেখ থাকে, ‘.. অনুগ্রহপূর্বক আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন। মুক্ত, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ ও আমার পক্ষে আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনার জন্মবার্ষিকীতে আপনার আদর্শে বাংলাদেশকে সিক্ত হতে দিন। আমরা বাংলাদেশে সাগ্রহে আপনার আগমনের প্রতীক্ষা করছি। আমি আশা করি, আপনি অনুগ্রহ করে আসবেন। জয় বাংলা।’ (বাংলাদেশ : প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বিবৃতি, বাণী, নির্দেশ ও সাক্ষাৎকার, শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমি, পৃ.৬৭৩)।

পাকিস্তানের ২৪ বছরের দুঃশাসন, অন্নহীনের হাহাকার, বস্ত্রহীনের চিৎকার, রুগ্নের আর্তনাদ, গৃহহীনের ফরিয়াদ, আপামর জনতার করুণ আহাজারি, বুকফাটা কান্না স্বাধীনতার মহানায়ক তথা ইতিহাসের এক বংশীবাদক বঙ্গবন্ধুর মহান হৃদয়কে আলোড়িত করে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তখন বাউলের একতারায় একটি নাম বঙ্গবন্ধু, মাঝির ভাটিয়ালিতে একটি নাম বঙ্গবন্ধু, বস্তাটানা কুলি-মজুরের কণ্ঠেও একটি নাম বঙ্গবন্ধু, কিষাণের ভাওয়াইয়াতেও ফুঠে উঠে একটি নাম বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু তখন জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এবং একমাত্র ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হলেন। যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে তরুণ যুবকদের বুকে প্রচ- আবেগ, উদ্বেগ ও উত্তেজনা, শিশু-কিশোরদের চোখে সীমাহীন কৌতূহল, বসয়স্কদের চোখে-মুখে ভীতি, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ, নারীসমাজ অজানা উৎকণ্ঠায় প্রকম্পিত। এমনি পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শক্তভাবে দেশের হাল ধরলেন।

আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির উদ্দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়ার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।..  মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’।

পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ২৫ মার্চ ঘুমন্ত, নিরস্ত্র, নিরাপরাধ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে নির্বিচারে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। আর সেই রাতেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে ১টা ৩০ মিনিটে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় বাঙালির প্রাণের নেতা, বাঙালির অভিভাবক, স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁকে গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাসভবন যেমন তছনছ করা হয়, তেমনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িটিও রেহাই পায়নি ঘাতকদের ধ্বংসলীলা থেকে। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন্ বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টা উঠে আসে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে ধানম-ি বাসভবন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং তা ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

২৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যায়িত করে। ঢাকায় গ্রেফতারের তিন দিন পর অর্থাৎ ২৯ মার্চ তাঁকে বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ (লায়ালপুর) জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানায়। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে নিঃর্শত মুক্তি প্রদানের দাবি জানানো হয়। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, কাজেই পাকিস্তানের কোনো অধিকার নেই তাকে বন্দি করে রাখার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার উদ্দেশ্যে লন্ডন পাঠানো হয়। লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছালে তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে লাখো জনতার সমাবেশ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় হলেও মূলত সেদিনই বাঙালিদের বিজয়ের পরিপূর্ণতা আসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ ১৯৭১ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ সমাপ্ত করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে। সেই ভাষণের পর থেকে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। তৎকালীন বর্ষীয়ান জননেতা মওলানা ভাসানী ১৯৭১-এর শুরু থেকে ‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ’, ‘আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি স্লোগান ব্যবহার করতেন। ১৯৭১-এর মার্চ থেকে জনসভা, মিছিল এবং প্রচারণায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যবহৃত হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করা হতো। এই বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসঙ্গীত ছিল ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল ‘জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে। ১১ মে, ১৯৭১ তারিখে মুজিবনগর প্রেস থেকে সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রেজিস্টার্ড নম্বর-১ হয় এবং পত্রিকাটি সরকারি অনুদানও পেত। (হাসিনা আহমেদ, ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের পত্রপত্রিকা, পৃ.৩৪)

২০২০ সালের ১০ মার্চ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণের জন্য মহামান্য হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন। বিচারপতি নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার পর জাতীয় দিবসগুলোতে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারী ও রাষ্ট্রীয় সব কর্মকর্তা সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ যেন বলে এবং সারাদেশের সব শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ যাতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয় সেই আদেশ দান এবং তা পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মহামান্য হাইকোর্টের এই নির্দেশনার মধ্য দিয়ে সবচেয় বড় যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলো তা হচ্ছে, ‘জয় বাংলা’ কোনও একটি দলের স্লোগান নয়, বরং সবার। উল্লেখ্য, ‘জয় বাংলা’ কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা প্রদান চেয়ে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বশির আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। (‘জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার রায়’, bdnews24, ১০ মার্চ ২০২০)

অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে সার্কুলার দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, সব সাংবিধানিক পদ, সরকারি, বেসরকারি অফিসে কর্মরতদের বক্তব্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাসেম্বলি, সভা, সেমিনার, সমাবেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করতে হবে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। (জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান করার সিদ্ধান্ত, যুগান্তর প্রতিবেদন, অনলাইন সংস্করণ, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২)

একটি জাতির জীবনে যখন স্বাধিকার ও মুক্তির প্রসব বেদনা শুরু হয়, তখন সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একজন নেতার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই ধীরে ধীরে সেই নেতৃত্বের জায়গায় শেখ মুজিবুর রহমান নিজের অবস্থানটি পোক্ত করেছিলেন। জীবনের ৪০ শতাংশ সময় (আবুল বারকাত, বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ, পৃ.৭৩) জেলখানায় কাটালেও যে সময়টুকু বাইরে ছিলেন, তার সবটুকুই বলা চলে তিনি ব্যয় করেছেন বাঙালি জাতির স্বাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য।

তাই বলা যায়, যে স্বপনের কথা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে বলেছেন, ১৯৫১ সালে সে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুও দেখেছেন এবং তা বিস্তার ও প্রতিষ্ঠায় সমমনাদের সমর্থন চেয়েছেন। সে-সূত্রে বলা যায়, কাজী নজরুলের কল্পপুরুষই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি বিদেশি শক্তিকে নজরুলের সেই ‘খবরদার’ বলেছিলেন; তাঁর উচ্চারিত ‘বাঙলার জয় হোক’ বচনেই বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিত করেছিলেন-যে স্লোগান হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের বীজমন্ত্র, স্বাধীনতার প্রথম আনন্দধ্বনি। (নজরুল-রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, সপ্তম খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ.৫৮)

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক)

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *