ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ফারুক আল মামুন ভুঁইয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের রাধাকৃষ্ণের প্রেম,লাইলি মজনুর প্রেম, শিরি ফরহাদ এর প্রেম,রজকিনী চন্ডিদাস, ইউসুফ জুলেখার প্রেম। এমনকি বিশ্ব ভারতের ঐতিহাসিক সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেমের উপাখ্যান বিশেষ করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীতে সারা দুনিয়াখ্যাত বিখ্যাত ইংরেজি সাহিত্যের উপন্যাসিক সেক্সপিয়রের “রোমিও জুলিয়েট” এর প্রচারণা কম হয় নাই।

তেমনি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত কক্সবাজার জেলার আলোচিত ও ঐতিহাসিক টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণে মনোরম পরিবেশে সাজানো দৃষ্টিনন্দন মগ জমিদার ওয়ানথিন প্রু চৌধুরীর একমাত্র কন্যা সুন্দরী রাখাইন তরুণী ও পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্য্যরে প্রেম কাহিনী কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

১৩৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৮৪ সালে কক্সবাজারকে চট্টগ্রাম জেলার একটি মহকুমায় উন্নীত করা হয়। তখন কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, মহেষখালী এবং টেকনাফ থানা নিয়ে গঠিত হয় কক্সবাজার মহকুমা। তখন টেকনাফ উপকূলে মিঠাপানির সংকট ছিল তীব্র। এখনো সে সংকট কিছুটা হলেও আছে। মাটির নিচে জমাট বাঁধা পাথরস্তুপের কারণে গভীর কিংবা অগভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রায় কঠিন। তখনকার সময় একমাত্র ভরসা ছিল পাতকুয়া।

টেকনাফ মডেল থানার আঙ্গিনায় তখন সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছিল পাতকুয়াটি। সাবেক বৃটিশ সরকারের আমলে পরবর্তীতে মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) আরাকান রাজ্য থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা আরাকান মগ সম্প্রদায়ের লোকজনের বসতি ছিল থানার আশে পাশে এলাকায়।

মগ সম্প্রদায়ের থামি ও ব্লাউজ পরিহিত সুন্দরী ললনা মেয়েরা এই কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করত। প্রায় ৫০/৬০ জন সুন্দরী মগ যুবতীদের সাথে কূপে পানি নিতে আসতেন কথিত মগ জমিদার কন্যা মাথিনও। মাথিনের বয়স তখন চৌদ্দ থেকে পনের বছর। অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি বাঙালি মেয়েদের মতো নিখুঁত ও অপরূপা ছিলেন। এই কূপে পানি নিতে আসা যাওয়ার ফাঁকে এভাবেই ধীরাজের চোখে পড়ে। অনুমান ১৯২৩-১৯২৪ সালে টেকনাফ থানার কর্মরত নায়কোচিত চেহারার অধিকারী এএসআই ধীরাজের সাথে পরিচয় হয় মাথিনের। তারপর ধীরে ধীরে গভীর প্রেমে রূপ নেয়। তখন তিনি মাথিনের প্রেমে মুগ্ধ হয়ে যান।

মাথিনের কূপ এবং পুলিশ অফিসার প্রেমের নিদর্শন অমর হয়ে আছে। ১৯৩০ সালে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লেখা “যখন পুলিশ ছিলাম” তারি ভালোবাসার স্মৃতিসুন্দরী মাথিনের কথা লিখেছেন। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে পর্যটনের সম্ভাবনার অংশ হিসেবে এক ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো হাজারো মানুষের মনে ছোঁয়া লেগে আছে। প্রায় ৯৮ বছর আগে টেকনাফ থানার প্রাঙ্গণে কলকাতার সুদর্শন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য্যরে সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক হয়েছিল স্থানীয়(কথিত জমিদার ওয়াথিন) এর কন্যা মাথিনের সাথে। টেকনাফ অঞ্চলের তখনকার একমাত্র পানির গভীর কূপ হিসেবে এই কূপটি থেকে পানি নিয়ে এলাকার লোকজন

তৃষ্ণা মিটাত। পরবর্তীতে ভালোবাসার ঐতিহাসিক প্রেমের নিদর্শনস্বরূপ মাথিনের কূপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছরে আনুমানিক প্রায় ১০ লক্ষাধিকের উপরে দেশী-বিদেশি পর্যটক পরিদর্শনে আসেন।

পরবর্তী সময়ে তাদের প্রেমের আত্মত্যাগের নিদর্শন হিসেবে পুলিশ প্রশাসন এই  জায়গাটি সংরক্ষণ করে এটিকে মাথিনের কূপ হিসেবে নামকরণ করেন। ২০০৬ সালে ধীরাজ মাথিনের ইতিহাসের প্রায় ৮০ বছর পর তৎকালীন

থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব খালেদ হোসেন, সাংবাদিক ও সংগ্রাহক আব্দুল কুদ্দুস রানাসহ অনেককে নিয়ে এই কূপটির সংস্কার করেন এবং এটিকে দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি দেন।

পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ২১শে আগষ্ট পুনরায় সংস্কারের উদ্বোধন করেন সাবেক আইজিপি জনাব এ কে এম শহীদুল হক। এরপরে মাথিনের কূপের গুরুত্ব এবং দর্শনার্থীনের আগমনও বেড়ে যায়। কূপের উত্তর পাশে মাথিনের নামে একটি ব্যাডমিন্টনের মাঠ নির্মাণ করা হয়।

দৃষ্টিনন্দন ফুল ফল গাছ গাছালি ছাড়াও কিছু চেয়ার টেবিল, অন্যান্য স্থাপনাসহ উপকূলীয় দৃষ্টিনন্দন এবং ঐহিত্যমন্ডিত লোক সংস্কৃতির প্রতীক “নৌকা” স্থাপন করা হয়।

প্রাচীন এই পাতকুয়ার আঙ্গীনায় কয়েকবার জাকজমকপূর্ণ ও ভালোবাসার উৎসব হয়েছে। টেকনাফের মগ জমিদার কন্যা মাথিন ও তৎকালীন কলকাতার সুদর্শন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের অমর প্রেম উপাখ্যান ও আত্মজীবনী মূলক দুটি গ্রন্থ “যখন পুলিশ ছিলাম” ও “যখন নায়ক ছিলাম”এবং প্রায় ২ শতাধিক সিনেমা এবং ৫০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য বহু বছর আগে মানুষের মনে ঠায় করে নিয়েছেন। এমনকি পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের মাধ্যমে এখনো তিনি অমর হয়ে আছেন।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যেঃ-………………….

সতীলক্ষ্মী- ১৯২৫, গিরিবালা-১৯২৯, কাল পরিণয়-১৯৩০, মৃণালিনী- ১৯৩০, নৌকাডুবি- ১৯৩২, রাধা কৃষ্ণ-১৯৩৩, ডাকবাঙ্গা-১৯৩৩, সীতা-১৯৩৪, চাঁদ সওদাগর-১৯৩৪, কান্দাহার-১৯৩৫, বাঙ্গালী-১৯৩৬, সোনার সংসার-১৯৩৬, কৃষ্ণ সদমা- ১৯৩৬, রাজাজী-১৯৩৭, সর্বজনীন বিবাহোৎসব-১৯৩৮, অভিনয়-১৯৩৮, পথিক-১৯৩৯, নর নারায়ণ-১৯৩৯, পরশমণি-১৩৩৯, ব্যবধান-১৯৪০, কুমকুম-১৯৪০, কুমকুম দ্যা ড্যান্সার-১৯৪০, নন্দিনী-১৯৪১, শকুন্তলা-১৯৪১, এপার ওপার-১৯৪১, অভয়ের বিয়ে-১৯৪২, মিলন-১৯৪২, পাষান দেবতা-১৯৪২, শহর থেকে দূরে-১৯৪৩, দ্বন্ধ-১৯৪৩, সহধর্মিনী-১৯৪৩, সমাধান-১৯৪৩, আপোষ-১৯৪৩, বিদেশিনী-১৯৪৩, কলঙ্কিনী-১৯৪৫, কতদূর-১৯৪৫, মানে না মানা-১৯৪৫, নতুন খবর-১৯৪৭।

উল্লেখ্য যে, যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা পাঁজিয়া গ্রামে ১৯০৫ সালের ৫ই নভেম্বর জন্ম ধীরাজ ভট্টাচার্য্যরে। তারা বাবা ললিত মোহন ভট্টাচার্য্য ছিলেন ভারতের কলকাতার ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক। ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের শিক্ষাজীবন শুরু নিজ গ্রাম পাঁজিয়া স্কুলে। পরবর্তী তিনি ভর্তি হন মিত্র ইনস্টিটিউশনে। সেখান থেকেই তিনি ১৯২৩ সালে ম্যাট্র্কিুলেশন পাশ করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন আশুতোষ কলেজে আইএসসিতে। কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি সিনেমা ও সাহিত্য চর্চায় ঝুঁকে পড়েন। ফলে কলেজ পাশ করা সম্ভব হয়নি ধীরাজের।

কলেজের ফাঁকে একটি নির্বাক সিনেমায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন ধীরাজ। সিনেমাটি নির্মিত হয় ১৯২৪ সালে। কিন্তু সিনেমায় অংশগ্রহণ তার পরিবার মেনে নেয়নি। ফলে সিনেমা ছাড়তে হয় ধীরাজকে। ভর্তি হন কলকাতার পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে। তারপর বদলি চট্টগ্রাম। সেখান থেকে শাস্তিমূলক বদলি হয়ে দুর্গম টেকনাফে যোগদান করেন।

মগ জমিদার কন্যা মাথিনের সাথে প্রেমের চূড়ান্ত পর্যায়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু হঠাৎ করে কলকাতা থেকে চিঠি আসে ধীরাজের কাছে যে, তার বাবা খুব অসুস্থ থাকে যেতে হবে। কিন্তু মগ জমিদার কন্যা মাথিন তাতে রাজি ছিল না। তার ধারণা ছিল পরদেশী বাবু চলে গেলে আর হয়তো ফিরে আসবে না। কিন্তু ধীরাজকে যেতেই হবে। তাই সে মাথিনকে না জানিয়ে একরকম পলায়ন করে কলকাতা চলে যায়। মাথিন ভীষণ কষ্ট পায় এবং নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেয়। কোনোভাবে থাকে বুঝানো যাচ্ছিল না। একসময় সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

পলায়নের আগে ধীরাজ মহেন্দ্র বাবুর পাশে টেনশনে সিগারেট টানছিলেন। কনস্টেবল হরকিকে দিয়ে জমিদার ওয়াথিনকে রাজি করালেন। ওয়াথিনও কথা বললেন ধীরাজের সাথে। ইতোমধ্যে ১৪ দিনের কেজুয়েল লিভ মঞ্জুর করেন পুলিশ সুপার এইচ বি মুলান্ডু। সাগর উত্তাল, কিভাবে যাবে ছুটিতে ধীরাজ।

তারপর শুঁটকির জাহাজে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন ধীরাজ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাফনদী ও সমুদ্রের লীলাখেলার মধ্যে খুব ভয়ে ভয়ে কলকাতায় পৌঁছেছিলেন এবং চাকরি থেকে ইস্তফা দিবেন বলে মনস্থির করেন। থানার বড় কর্তা মহেন্দ্র বড়–য়া বয়স ৫০। ছিপ ছিপে চেহারা, মুখে হিটলারের গোঁফ ছিল। একখানা ছোট বাঁশের ঘরে ধীরাজের থাকার ব্যবস্থা করা হল। কনস্টেবল যতীন, হরকি, যুগেন দাস, বিশ্বেরসহ ৮/৯ জন কনস্টেবল ছিল থানায়।

একসময় মগ জমিদার কন্যা মাথিনের প্রেমে জড়িয়ে তাকে টেকনাফ ছাড়তে হয়। এরপর কলকাতায় ফিরে তিনি পুনরায় শুরু করেন সিনেমায় অভিনয়। পঞ্চাশের দশকে সিনেমায় অভিনয় করে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের নক্ষত্রে পরিণত হন। সাহিত্যেও ছিল ধীরাজের প্রবল আগ্রহ। সিনেমার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন আত্মজীবনীমূলক পৃথক দুটো গ্রন্থ। একটি “যখন পুলিশ ছিলাম” এবং অন্যটি “যখন নায়ক ছিলাম”। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ দুটি পাঠক মহলে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করেছিল। এছাড়াও তার আরো দুটি গ্রন্থ আছে। এরমধ্যে “মন নিয়ে খেলা” “সাজানো বাগান” “মহুয়া মিলন” উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থ লিখে তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অজ¯্র অনুরাগী অন্তরালে ঠাঁই করে নেওয়া কালজয়ী অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের মৃত্যু হয় ১৯৫৯ সালের ০৪ মার্চ মাত্র ৫৪ বছর বয়সে।

১৯৩৪ সালে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য বিয়ে করেছিলেন চব্বিশ পরগনার গোপলপুর নিবাসী বিনোদ চৌধুরীর মেয়ে সরস্বতী চৌধুরীকে কিন্তু তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। যশোরের কেশবপুর থেকে আট কিলোমিটার পূর্বদিকে পাঁজিয়া গ্রামে রয়েছে ধীরাজের পূর্বপুরুষের দ্বিতল বসত বাড়ি। পাঁজিয়া হাইস্কুল ও নাট্যমঞ্চ এখনও ধীরাজের স্মৃতিধারণ করে চলেছে।

ধীরাজের মাথায় শুধু একটা চিন্তা মাথিন। বিছানায় ছটফট করে ঘুম আসে না। কখনো ভাবেন মাথিনকে বিয়ে করে বাংলা ভাষা শেখাবেন, তিনি শিখবেন মগী ভাষা। আবার ভাবেন টেকনাফে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন কেন? মাথিনকে নিয়ে কলকাতায় চলে যাবেন। চোখের সামনে ফোটে ওঠে তাঁর ছোট্ট মধ্যবিত্ত সংসার। উৎসাহে একটু ভাটা পড়ে। বাবা মা মাথিনকে ভালো মনে গ্রহণ করবেন তো……..?

  লেখক : পুলিশ পরিদর্শক ও টিভি অভিনেতা

  ইনচার্জ, টেকনাফ ট্রাফিক জোন, কক্সবাজার

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *