ই-পেপার

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান

পুলিশের সব ইউনিটের মধ্যে সবচেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ ইউনিট। বাড়তে থাকা পরিবেশ দূষণ এবং রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ থাকার কারণে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, চোখে কম দেখা, তীব্র মাথাব্যথা, হৃদরোগ সহ নানা জটিল রোগের সংক্রমণ দেখা যায়। প্রায় ১০ হাজার ট্রাফিক পুলিশ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে সেবা দিয়ে আসছে। তাদের অধিকাংশই নানা রোগে আক্রান্ত। মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে হাসিমুখে নানা রোগে নিজের শরীরে আশ্রয় দিয়ে চলছে আমাদের ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে দেখে নেওয়া যাক রাজধানী ঢাকার বায়ু দূষণের কী অবস্থা। বায়ু দূষণ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের র‌্যাংকিংয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকার বাতাস সবেচেয়ে দূষিত বাতাসগুলোর একটি। ২১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে সংখ্যাটির সবেচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা ছিল চতুর্থ। সংস্থাটির সূচক অনুযায়ী, ৫১-১০০ নম্বর পাওয়ার অর্থ হলো বাতাসের মান ভালো। ১০১-১৫০ নম্বর পাওয়ার অর্থ হলো বাতাসের মান দূষিত। আর ২০১-৩০০ নম্বর পেলে মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকতে এবং চলাচল সীমিত রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়। ২১ জানুয়ারি তারিখে ঢাকা বায়ু দূষণে নম্বর পেয়েছে ২৪১। ২০১৯ সালের নভেম্বরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে ঢাকা ছিল এক নম্বরে। সংস্থ্যাটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাষ্ট্র। যেখানে এই ভয়াবহ দূষণে ঘরে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়, সেখানে ট্রাফিক পুলিশ দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে রাস্তায়। যা তাদেরকে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।  

ট্রাফিক পুলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নানা গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। অধিকাংশ গবেষণাই ট্রাফিক পুলিশের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রতি দিক নির্দেশ করেছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন ট্রাফিক পয়েন্টে শব্দ দূষণের মাত্রা পরিমাপ ও তার ভিকটিম কারা এই নিয়ে একটি গবেষণা করেন  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন গবেষক। তাদের গবেষণায় বের হয়ে আসে, ট্রাফিক পুলিশ এবং বাস চালক ও তার সহযোগীরা শব্দ দূষণের সবচেয়ে বড় ভিকটিম। যা তাদের নানা ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। পাশের দেশ ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ব্রহ্মপুর শহরের ৪৮ জন ট্রাফিক পুলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ২০০৯ সালে এক দল গবেষক গবেষণাকাজ পরিচালনা করেন। তাদের গবেষণায় বের হয়ে আসে, শতকরা ৪৩ ভাগ ট্রাফিক সদস্য রক্তশূন্যতায় ভুগছেন, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যথায় আক্রান্ত শতকরা ২৭ ভাগ সদস্য আর উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত শতকরা ২৫ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। তাদের মধ্যে শতকরা ১৬ ভাগই ফুসফুসের নানা রোগে আক্রান্ত। গবেষণাটির উপসংহারে এই স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য উড়িষ্যা রাজ্যে তীব্রমাত্রার বায়ুদূষণকেই দায়ী করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্যারে ইউনিভার্সিটি এবং নয়াদিল্লীর তেরি স্কুল অব এ্যাডভান্সড স্টাডিজের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি  যারা অফিসে কাজ করে তাদের তুলনায় অনেক বেশি। শতকরা ৫৯ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ যেখানে ঘন কফের সমস্যায় আক্রান্ত সেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ অফিস চাকুরে এই ধরণের ঘন কফের সমস্যায় থাকেন। অফিস চাকুরেদের কেউ জরিপে কফের সাথে রক্ত যাওয়ার কথা বলেননি, অন্যদিকে শতকরা ২৬ ভাগ পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন তাদের কফের সাথে রক্তও যায়। শুধু বায়ুদূষণই নয়, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সাথে তাদের শ্রবণশক্তিও কমতে থাকে। এমনই বের হয়ে এসেছে ২০০৬ সালের একটি গবেষণায়। গবেষকদের ট্রাফিক সদস্যরা জানান, তাদেরকে প্রায় সময়ই অপর প্রান্তের জনকে জোরে কথা বলতে অনুরোধ করতে হয়। গবেষণাটির নমুনার ৮৬ জনের মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগ ট্রাফিক সদস্যই জানিয়েছেন, তাদের সাথে অন্যেরা জোরে কথা বলে যাতে তারা পুরোপুরি ভাবে শুনতে পান। নেপালের রাজধানীর কাঠমন্ডুর ১১০ জন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যের শ্রবণশক্তি নিয়ে পাঁচ জন গবেষক একটি গবেষণা কাজ পরিচালনা করেন। তাদের গবেষণায় বের হয়ে আসে, দায়িত্ব পালনের কারণে শতকরা ৬৬ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ শ্রবণ ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, কমে যায় তাদের শ্রবণশক্তি। গবেষণাটিতে পুলিশের সদস্যদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পুলিশ সদস্যদের পেশাগত স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা কাজ দেখতে পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিবেদন দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের ডেইলি বাংলাদেশ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের চোখে পানিশূন্যতা, চোখ ফুলে উঠা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, রক্তের হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া, পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া ও শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়। 

এই সমস্যা আরো বেশি প্রকট হয়ে উঠছে বাড়তে থাকা পরিবেশ দূষণ ও রাজধানীতে নানা নির্মাণ কাজের জন্য। নগর বিশারদরা বলেন, একটি শহরে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকতে হয় ভালোভাবে যাতায়াতের জন্য। সেখানে ঢাকা শহরে রাস্তা আছে শতকরা সাত থেকে আট ভাগ। যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। আবার এই সড়কের শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ পার্কিংয়ের নামে বেদখল থাকে। এই অপর্যাপ্ত রাস্তায় প্রতিদিন নামছে ৩১৭টি গাড়ি। এই সব মিলিয়ে ঢাকা শহরে যানজট তীব্র থাকে সব সময়ই। যানজট শব্দ দূষণের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

তবে আশার কথা হলো, ঢাকায় অচিরেই মেট্রোরেলের কাজ শেষ হবে। রাজধানীর চারপাশে চক্রাকার সড়কও নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কাজ চলছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের। এই সব প্রকল্প শেষ হলে রাজধানীতে যানজট কমে আসবে, আশা করা যায় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বাদ দিয়ে জনগণ মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ব্যবহার করবে। যা হয়ত বায়ু দূষণ কমাবে, কমবে শব্দ দূষণও। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা  জরুরী। প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর তাদের পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে দেখা উচিত। যেমন, বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী নয়াদিল্লীর ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে দিল্লী হাইকোর্ট। বাংলাদেশেও প্রতিটি জেলা শহর সহ রাজধানীতে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশকে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা জরুরী। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষায় থাকলে সচেতনতা বাড়বে। ভগবত গীতায় বলা হয়েছে, ‘দেখ ফুলকে, কীভাবেই না সে সুগন্ধ আর মধু বিলিয়ে বেড়ায়। যখন তার জীবনীশক্তি শেষ হয়ে যায়, তখন সে নীরবেই ঝড়ে যায়।’ ঠিক তেমনি দেশজুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি ট্রাফিক পুলিশ এত দূষণের মধ্যে থেকেও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন জনগণকে তাদের মারাত্মক সাস্থ্যের ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করে।

তথ্যসূচি:  

Hossain, M. I., Rashid, K. N., & Ahmed, T. (2013). Assessment of occupational noise hazard in road ways and traffic intersections in Dhaka city. Journal for Civil Engineering, IEB, 41(2), 111-122.

Satapathy, D. M., Behera, T. R., & Tripathy, R. M. (2009). Health status of traffic police personnel in Brahmapur city. Indian journal of community medicine: official publication of Indian Association of Preventive & Social Medicine, 34(1), 71.

Tripathi, S. R., & Tiwari, R. R. (2006). Self-reported hearing quality of traffic policemen: A questionnaire-based study. Indian journal of occupational and environmental Medicine, 10(2), 82.

https://www.daily-bangladesh.com/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%9D%E0%A7%81%E0%A6%81%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE/23539

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানের শিক্ষক।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ইউনিভার্সিটি

অব টেক্সাস এ্যাট আরলিংটনে উচ্চশিক্ষার্থে অধ্যয়নরত।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x