ই-পেপার

আমির মুহম্মদ খসরু

এক.

পুবের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করার আগেই দূরে কোথাও একটি কি দুটি কাক ডাকে। বেশ লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয় বলে সেই ডাকে তেমন জোর অবশিষ্ট থাকে না। খুব মৃদু ক্ষীণ এক ধ্বনিতরঙ্গ বিছানায় লেপ্টে থাকা মাহিনের ঘুমন্ত কান দুটি আলগোছে স্পর্শ করে। ওর নিদ্রালস দেহটা তাতে সামান্য নড়েচড়ে ওঠে। কিন্তু চোখের পাতা দুটি বন্ধই থাকে। ঘুমের তেমন ব্যাঘাত হয় না। হঠাৎ কাছেপিঠে ডেকে ওঠে আরো দুয়েকটা কাক। শব্দের উৎস এবার খুব কাছে হওয়ায় ওর দু’কানের পর্দায় ফাটাফাটি ধাক্কা লাগে। ঘুম টুটে গিয়ে তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকায় মাহিন-    

 ঘরের মধ্যে, জানালার ওপাশে তখনো প্রায় মিশমিশে অন্ধকার। অতএব, বাইরে আবছা আলো ফুটে ওঠা পর্যন্ত বিছানায় চুপচাপ শুয়ে অপেক্ষার পালা। তারপর একসময় যখন চারপাশ থেকে সহস্র কাকের কা কা চিৎকার মুহুর্মুহু কানে বাজতে থাকে, পুবের আকাশটাও তখন অল্প অল্প আলোকিত হতে শুরু করে এবং মাহিনও তখন নেমে পড়ে বিছানা থেকে। জুতো জোড়া আর ব্যায়ামের পোশাক পরে ওহাব কাকার সঙ্গে মাঠে বেরুনোর জন্য তৈরি হয়-

রাতশেষ এবং দিনশুরুর এই বিশেষ সময়টায় অর্থাৎ কাকডাকা ভোরে প্রতিদিন প্রায় এই এক নিয়মে ঘুম ভাঙে ওর।

কাকডাকা ভোর। বেশ মিষ্টি দুটি শব্দ। এই যুগল শব্দের মধ্যে বেজে ওঠে এক অভ্যস্ত শান্তির সুর।

কিন্তু একদিন হঠাৎ রাত ও দিনের এই মিলন-মুহূর্তের  চিরচেনা রূপটি আমূল পাল্টে গেল। কাকডাকা ভোরে সেদিন কাক ডাকল না। মাহিনের ঘুম ভাঙিয়ে দিল সম্পূর্ণ অচেনা আর বিদঘুটে যত শব্দের তা-ব। অবিরাম কানফাটানো সেই শব্দ। যেন

রূপকথার সব দৈত্য গল্পের পাতা থেকে একযোগে উঠে এসে ঠা ঠা হাসি হাসছে আর চোখের সামনে যা পাচ্ছে তাই দুমড়ে-মুচড়ে, ভেঙেচুরে ছত্রখান করে দিচ্ছে। শব্দগুলো অবিরাম একটা চক্র পূরণ করে চলেছে—-ঠা-ঠা-ঠা-ঠাস্… গুড়–ম গুড়–ম…দ্রিম-দ্রিম… ঠা-ঠা-ঠা-ঠাস্…গুড়–ম গুড়–ম…

বিছানায় খানিকটা নড়েচড়ে উঠল মাহিন। তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে বসে জানতে চাইল, কী হচ্ছে এসব?

-চুপ! চিৎকার করিস না। বিছানা থেকে নেমে যা। ফ্লোরে শুয়ে পড়্। জল্দি।–ওর বাঁ হাত ধরে হালকা টান দিল বড় ভাই অয়ন। ফ্লোরে মাদুর বিছিয়ে এইমাত্র শুয়েছে সে। মাহিনের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ওর বালিশটা টেনে নিয়ে পেতে দিল নিজের বালিশের পাশে। বলল, একদম মাথা তুলিস না। শুয়ে থাক্। গুলি লাগতে পারে।

– কিসের গুলি, ভাইয়া?- বড় বড় চোখে অয়নের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল মাহিন।

– পাকিস্তানি আর্মি অ্যাটাক করেছে। বাঙালিদের মারছে ওরা।

– কেন মারছে?

– বাবা বলেছে, ওরা বাঙালিদের শত্রু।

চুপচাপ কী যেন ভাবতে থাকে মাহিন। কৌতূহল চাপতে না পেরে হঠাৎ আবার প্রশ্ন করে, বাবা সেদিন বলেছিল, পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হবে। এটা কি সেই যুদ্ধ, ভাইয়া?

– বলতে পারব না। অস্ত্র ছাড়া কি যুদ্ধ হয়? বাঙালির হাতে তো অস্ত্র নেই।

– অস্ত্র নেই, তুমি কী করে জানলে?

– বাবাই বলেছে।

অস্ত্র নেই অথচ যুদ্ধ হবে! সাত বছরের শিশু মাহিনের কাছে বাবার কথাগুলো মাঝে মধ্যে কেমন যেন গোলমেলে মনে হয়।

দুই ভায়ের বয়সের ব্যবধান মাত্র পাঁচ বছর। দুজনেই ওরা শিশু। দুজনের কেউই আসলে জানে না কী হচ্ছে, কেনই বা হচ্ছে। বাবার মুখ থেকে বিভিন্ন সময়ে যা শুনেছে, টুকরো-টাকরা সেইসব কথাই পরস্পরের মধ্যে কিছুক্ষণ চালাচালি করে ওরা। তারপর চুপচাপ পাশাপাশি শুয়ে থাকে। চারপাশে বিচিত্র পাখির কলগুঞ্জনের বদলে শোনা যায় টানা উৎকট গোলাগুলির আওয়াজ। সেইসঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে ওঠে ঘরের দরজা-জানালা।

– রিনি কই? প্রশ্ন করে মাহিন।

– মাঝখানের রুমে।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রিনি সবচেয়ে ছোট। বয়স মাত্র তিন মাস। ওর জন্য মাহিনের খুব টেনশন হচ্ছে। ওকে দেখার জন্য শোয়া থেকে উঠতে যাচ্ছিল। হাত ধরে টেনে ওকে আবার বসিয়ে দিল অয়ন। – খবরদার। দাঁড়াবি না। হামাগুড়ি দিয়ে যা।

নির্দেশমতো হামা দিয়ে এগোতে লাগল মাহিন।

-আরে! এভাবে না!! হাঁটু ভাঙিস না। পা টান্ কর। কনুইতে ভর দে। মাথা আরো নিচু র্ক।- চিৎকার করে উঠল অয়ন। ছোট ভাইকে দেখিয়ে দিল কীভাবে হামা দিতে হবে। তর সইছিল না মাহিনের। পাশের ঘরের দরজার কাছে এসে উঠে দাঁড়াতে যাবে। এমন সময় মাথার উপরে বোমা ফাটার মতো শব্দ হলো একটা। সঙ্গে সঙ্গে দ্রিম দ্রিম শব্দে ভীষণ কেঁপে উঠল ঘরের দেয়াল ও দরজা। দ্রুত মেঝের সমান্তরালে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মাহিন। কয়েক সেকেন্ড এভাবে থাকার পর ধীরগতিতে হামা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

খাটের পায়ার কাছে মেঝেতে তোশক এবং তার উপর কম্বল বিছিয়ে কাঁথা দিয়ে বুক পর্যন্ত ঢেকে শুইয়ে রাখা হয়েছে রিনিকে। দুই কানে তুলো দেওয়া। ঘুমাচ্ছে। চারপাশে কি ঘটছে, কিছুই জানে না। পাশে শুয়ে মাহিনের পিঠাপিঠি বড় বোন অর্চি। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘরের পশ্চিম পাশের দেয়ালের কাছে মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ধাতব জিনিসের দিকে। এইমাত্র দেয়ালে বাড়ি খেয়ে নিচে পড়েছে ওটা। দেয়ালের মধ্যে ছোটখাটো একটা গর্ত তৈরি হয়েছে।

মাহিনকে দেখামাত্র দ্বিগুণ আতঙ্ক নিয়ে ওর দিকে তাকাল অর্চি।  কিরে! তুই এখানে কী করছিস? বাবা বলেছে যে-যার রুমে ফ্লোরের উপর শুয়ে থাকতে। তোর দেখি অনেক সাহস! মরতে চাস বুঝি? বলেই তর্জনী তুলে ঘরে ঢোকার দরজার কাছের দেয়ালে মাহিনের মাথা সমান উচুঁতে একটা জায়গা দেখাল।

বেশ বড়সড় একটা গর্ত তৈরি হয়েছে দেয়ালের ওই জায়গাটায়। ফ্লোরের ওপর এখানে-সেখানে পড়ে আছে ভাঙা ইট আর সিমেন্টের টুকরো। বলল, দেখ্, গুলি করেছে আমাদের ঘরে। ব্যাপার বুঝতে মাহিনের দেরি হলো না। সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে গেল ওর দেহ। উত্তরের দেয়ালটা যেখানে দরজার কাঠের সঙ্গে মিশেছে, ঠিক সেই জায়গা ভেদ করে গুলিটা এসে বাড়ি খেয়েছে পশ্চিমের দেয়ালে। দরজার কাছে এসে মাহিন যে-মুহূর্তে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, তখনই ওর মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে গুলিটা। আরেকটু হলেই ও মরত।

রাবেয়া বেগমও বেঁচে গেছেন অল্পের জন্য। গুলিটা তাঁকেই লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছিল। বাইরে প্রচ- গোলাগুলির আওয়াজ শুনে বড় মেয়ে রীতিকে সঙ্গে নিয়ে ডাইনিং রুমের জানালাগুলো বন্ধ করার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। কলোনির উত্তর-পূর্ব কোণে খাকি পোশাক আর হেলমেট পরা অস্ত্র-হাতে একজনকে দেখে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে তর্জনী তাক্ করে বলে উঠলেন, দেখ্ দেখ্,্ রীতি। একজন মুক্তিযোদ্ধা।

তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো খাকি পোশাকধারীর দেহ বিদ্যুৎগতিতে একটা পাক খেল। হাতে তাক্ করা অস্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল সেই খুনে বুলেট। তবে একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো সেটা।

দুই.

বন্ধ ঘরের ভেতর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সারাদিন পাক বাহিনীর তা-ব নিয়ে আলোচনা চলতে লাগল। ঘরের দেয়ালে লেগে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া পাক সেনার ছোড়া গুলিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আতঙ্কিত গলায় ভোরবেলাকার ঘটনা বর্ণনা করছিলেন মাহিনের মা রাবেয়া বেগম। ÑÑ আমি তো ভাবলাম, ও একজন মুক্তিযোদ্ধা কলোনির মধ্যে পাক সেনা কেন আসবে? গুলিটা আমার কানের এত কাছ দিয়ে গেছে, আরেকটু হলেই মরতাম। – বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ডান কানের লতি ছুঁয়ে বললেন মাহিনের মা।

মাথা নাড়লেন সাঈদ আহমেদ। – কলোনি বাদ দেবে কেন? শহরের সব এলাকাতেই ঢুকে পড়েছে ওরা। আর যাকে সামনে পাচ্ছে, তাকেই মারছে। আমরা তো বাঙালি। ওদের চোখে আমরা দুশমন। এ-মুহূর্তে যারা বেঁচে গেছে, মনে করো লটারিতে পুরস্কার জিতেছে তারা। গম্ভীরভাবে কথাগুলো বলার পর একটু থেমে যোগ করলেন, তবে জীবনটা তো আর লটারি নয়। এটা একটা লড়াই। বাঙালি লড়বে। লড়াই করেই বাঁচবে।

‘লড়াই’ শব্দটা মাহিনের কানে কেমন একটা মন্ত্রধ্বনির মতো বাজে। বিছানায় দু’কনুইয়ের ভর দিয়ে দুই হাতের তালুতে থুঁতনি রেখে গভীর মনোযোগ দিয়ে বাবার কথা শুনছিল ও। বাবার কণ্ঠের উদ্দীপনা সংক্রামিত হয়েছে ওর মধ্যে। মনের ভেতর খচ্খচ্ করতে থাকা প্রশ্নটা জিজ্ঞেস না করে পারল না। – কিন্তু তুমি তো বলেছ, বাঙালির কাছে অস্ত্র নেই। অস্ত্র ছাড়া কীভাবে যুদ্ধ হবে?

– হুম! ওরা রাতের আঁধারে শান্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা করেছে। নিজেকে রক্ষা করার অধিকার তো সব মানুষেরই আছে। আর এটা তো গোটা জাতির টিকে থাকার প্রশ্ন। কোটি কোটি বাঙালির আত্মরক্ষার যুদ্ধে অস্ত্র পাওয়া কঠিন হবে না। তবে শুরুটা হবে হালকা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে। আর তাই গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে হবে আমাদের ছেলেদের।

– গেরিলা যুদ্ধ কী, বাবা? কৌতূহলী মাহিন আবার প্রশ্ন করে। 

– হানাদার বাহিনীর সৈন্য অনেক। তাদের আছে প্রচুর ভারী অস্ত্র। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গোপন জায়গা থেকে ওদের উপর   হঠাৎ আক্রমণ চালাতে হবে। এটাই গেরিলা যুদ্ধ।

– এতে কি গেরিলারা সফল হবে? রাবেয়া বেগমের কণ্ঠে সংশয়।

– মুক্তি আর স্বাধীনতার যুদ্ধে সফলতা পায় নি এমন কোনো দেশ আছে, বলো? গোটা দেশ হানাদারদের বিরুদ্ধে একাট্টা। অস্ত্র ছাড়া পাক সেনাদের আর কোনো শক্তি নেই। শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ হয় না।

এমন সময় আবার প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো। দু’চার সেকেন্ডের জন্য কথা থামালেন মাহিনের বাবা। তারপর শান্ত গলায় বক্তব্য শেষ করলেন, তাছাড়া শত শত মাইল দূর থেকে এসে এখানে ওরা বেশিদিন টিকতে পারবে না।

কিছুদিন পরই মাহিনের কাকা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন। ঘরে নতুন বিয়ে-করা বউ। যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা যেদিন স্ত্রীকে জানালেন, সেদিন ঘরের পরিবেশটা আরো ভারী হয়ে উঠল- 

ওহাব কাকা বললেন, এখন যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই, জলি।

– কেন?

– আমার যে বয়স, তাতে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখানো আমার জন্য জরুরি। তাছাড়া এটা এমন এক পরিস্থিতি যখন নিরপেক্ষ থাকা যায় না। এমনকি নিরপেক্ষতার ভাণও করা যায় না। হয় আমাকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে হবে, নয়তো পাক সেনাদের সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে। কোন বাঙালির পক্ষেই হানাদারদের সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয়। ধর, যুদ্ধে গেলাম না। আবার ওদের সাপোর্টও দিলাম না। সেটা কি সম্ভব? না। কারণ আমি যুদ্ধে না গেলেও হানাদার পাকবাহিনী আমাকে জ্যান্ত রাখবে না। একই পরিণতি হবে আমার মতো আমার বয়সী যারা, তাদের সবার। অতএব কী চাও তুমি? – জিজ্ঞাসু চোখ মেলে ওহাব কাকা চাইলেন স্ত্রীর অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে।

জলি কাকি কিছু বললেন না। আরো বেশি করে কাঁদতে লাগলেন। ওহাব কাকা এবার তাঁর মাথায় হাত রাখলেন – আমাকে তো জ্যান্ত রাখবে না। সেই সঙ্গে তোমাদেরও মেরে ফেলতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে পরদিনই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত চলে গেলেন ওহাব কাকা। তিনি যখন ঘর ছেড়ে যাচ্ছিলেন, পরিবারের সবার চোখ তখন ছল ছল করছিল যেন চিরবিদায় দিতে হচ্ছে তাঁকে।

ওহাব আহমেদের বয়স তখন ২৫। চেহারায় জ্বলজ্বলে তারুণ্য। লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠ শরীরটা খাঁটি অ্যাথলেটের মতো। মাথায় ছোট ছোট মিলিটারি-ছাঁট চুল। প্রশস্ত কপালের নিচে উঁচু ধারাল নাক। লম্বাটে গোল ভরাট অথচ টানটান মুখটা গাম্ভীর্যে ভরা। বড় গোল গোল দুই চোখের চাহনি আশ্চর্যরকমের জীবন্ত আর অন্তর্ভেদী। সেইসঙ্গে ঠোঁটের উপর একজোড়া পুরুষ্টু  গোঁফে তাঁকে পুরোপুরি সেনাবাহিনীর এক জাঁদরেল অফিসারের মতোই লাগে। পাক সেনারা তাঁকে নাগালে পেলে সঙ্গে সঙ্গে খুন করবে, এতে আর সন্দেহ কি। কিন্তু ওহাব আহমেদ ভালোবাসেন রবীন্দ্র সঙ্গীত আর নজরুল গীতি। চমৎকার গানের গলা তাঁর। রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্ত করো ভয়’ আর নজরুলের ‘যত ফুল তত ভুল’ গান দুটি বহুবার তাঁর কণ্ঠে শুনেছে মাহিন। শিশুদের সঙ্গে মিশতে পারেন একজন শিশুর মতো। হাসেন অবশ্য কদাচিৎ। কিন্তু ওই হাসিতে বোঝা যায় ভেতরের মানুষটিকে। তাঁর চলে যাওয়ায় মাহিন একজন বন্ধু আর অভিভাবকের অভাব বোধ করতে লাগল।

ভারতে গিয়েই মাহিনের কাকা চিঠি লিখলেন। চিঠিতে ছিল তাঁর জন্য দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শ। আরো লিখলেন, সীমান্ত পার হয়ে প্রতিদিনই তরুণরা আসছে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। চিঠির ইতি টানা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আশাবাদ দিয়ে।

মে মাসেই দেশের ভেতরে গেরিলাদের অ্যাকশন শুরু হয়ে গেল। এদিকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা দেখাতে চাইছে, দেশের অবস্থা স্বাভাবিক। সরকারি অফিস-আদালতে প্রতিদিন উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে তারা। মাহিনের বাবা ডাক বিভাগে চাকরি করেন। তাঁকেও প্রতিদিন অফিস করতে হচ্ছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে অফিস যাচ্ছেন। বাসায় ফিরে একদিন সন্ধ্যায় শোনালেন লোমহর্ষক এক কাহিনি।

লেখক : অনুবাদক ও গবেষক।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x