ই-পেপার

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাহার আকন্দ বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। অনুকূল পরিবেশ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলা হয়নি। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে ইতিহাসের জঘন্যতম জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর লালবাগ থানায় মামলা রুজু হয়। সিআইডির তৎকালীন ডিএসপি সাইফুদ্দিন আহমেদকে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। তদন্তভার নিয়ে জেলখানায় গেলে তাঁকে ঘটনাস্থল জেলখানায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে বলা হয়। দেশে তখন সামরিক শাসন ছিল। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চাইলেন। কিন্তু অনুমতি দিতে গড়িমসি চলে। দীর্ঘ ২১ বছরেও অনুমতি পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্তও অগ্রসর হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনুমতি পাওয়া যায়। তখন আমি এএসপি হিসেবে সিআইডির স্পেশাল টিমের দায়িত্বে ছিলাম। আমাকে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। জেলখানা হত্যা মামলা তদন্তকালে মেজর ফারুকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জনাব আ ফ ম মুহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে পিএ হিসেবে ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আগস্ট মাসে জনাব মুহিতুল ইসলাম বিটিভিতে ১৫ আগস্টের ঘটনার ওপর একটি ডকুমেন্টারি উপস্থাপন করেন, যাতে তিনি ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার এজাহার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতির জনকের হত্যার বিচার করার শুভসূচনা হলো। এই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে। তিনি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার দুয়ার খুলে দিলেন। আমাকে জেলহত্যা মামলা, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও সেরনিয়াবাত হত্যা মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। জনাব মুহিতুল ইসলাম ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন যে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট ৮টা থেকে ১৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তাঁর ডিউটি ছিল। ওই সময়ে টেলিফোন মিস্ত্রি আবদুল মতিন, বাড়ির রাখাল আবদুল আজিজ, একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, কাজের বুয়া, কাজের ছেলে সেলিম ওরফে আবদুল এবং আবদুর রহমান ওরফে রমাও ওই বাড়িতে ছিলেন। ওই দিন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের এবং বঙ্গবন্ধু নিজে উপস্থিত ছিলেন।

বাড়ির পাহারায় এসবির ডিএসপি জনাব নূরুল ইসলাম, ইন্সপেক্টর জনাব খোরশেদ ও অন্যান্য পদবির পুলিশের আরও কয়েকজন অফিসার ও জোয়ান ছিলেন। তা ছাড়া সেনাবাহিনীর কপিতয় সদস্য ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন। রাত ৮টা থেকে ৯টার সময় বঙ্গবন্ধু বাইরে থেকে বাসায় আসেন। তাঁর দেহরক্ষীরা তাঁকে বাসায় পৌঁছায়ে দিয়ে চলে যান।

জনাব মুহিতুল ইসলাম পাহারারত আর্মি ও পুলিশের সাথে গল্প করছিলেন। রাত একটার দিকে তিনি তাঁর নির্ধারিত বিছানায় শুতে যান এবং ঘুমিয়ে পড়েন। ভোররাত অনুমান সাড়ে ৪টা বা ৫টায় টেলিফোন মিস্ত্রি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ওঠান এবং প্রেসিডেন্ট সাহেব ডাকছেন বলে জানান। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে টেলিফোন ধরেন। টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে।’ তাঁকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাগাতে বলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে লাইন লাগানোর চেষ্টা করেও লাইন পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি গণভবন এক্সচেঞ্জেও লাইন লাগানোর চেষ্টা করেন। সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে আসেন এবং তাঁকে বললেন, ‘তোকে লাইন লাগাতে বললাম, তুই লাইন লাগাইলি না?’ গণভবন এক্সচেঞ্জে ধরেছে, কিন্তু কোনো উত্তর আসছে না। তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর হাত থেকে টেলিফোন রিসিভার নিয়ে বললেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি।” ঠিক তখনই একঝাঁক গুলি অফিসকক্ষের দক্ষিণে জানালার গ্লাস ভেঙে অফিসকক্ষের দেয়ালে লাগে। তখন অন্য টেলিফোনে চিফ সিকিউরিটি অফিসার মুহিউদ্দীনের টেলিফোন আসে। তিনি ধরেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি ভাঙা কাচ তাঁর কনুইয়ে লাগে এবং রক্ত বের হয়। এই সময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং হাত ধরে তাঁকে শুতে বলেন। তিনি শুয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যে গুলি বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন তিনিও উঠে দাঁড়ালেন। ওপর থেকে কাজের ছেলে সেলিম বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবি ও চশমা নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু মুহিতের অফিসকক্ষে পাঞ্জাবি পরেন এবং বারান্দায় এসে আর্মি সেন্ট্রি ও পুলিশ সেন্ট্রিকে তিনি বলেন, ‘এত গুলি আসছে, তোমরা কিছু করো?’ এই বলে তিনি ওপরে উঠে গেলেন। এই সময় শেখ কামাল নিচে এসে বলেন, ‘আর্মি, পুলিশ ভাইয়েরা আমার সাথে আসুন। সাথে সাথে তিন থেকে চারজন কালো ও খাকি পোশাকধারী লোক তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। মুহিত ও ডিএসপি নুরুল ইসলাম সাহেব শেখ কামালের পেছনে দাঁড়ায়। ডিএসপি সাহেব মুহিতের পাঞ্জাবি ধরে টান দিয়ে অফিসকক্ষের দিকে নিয়ে গেলেন এবং বাইরে কী ঘটছে, তা দেখার চেষ্টা করেন। এই সময় পুনরায় গুলির শব্দ শোনেন। গুলি খেয়ে শেখ কামাল লাফ দিয়ে মুহিতের পায়ের কাছে এসে পড়েন। কামাল সাহেব চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’ এ কথা বলার সাথে সাথে তারা কামালকে লক্ষ্য করে গুলি করে। কামাল গুলিবিদ্ধ হন। মুহিতের হাঁটুতে এবং ডিএসপি নূরুল ইসলাম সাহেবের পায়ে গুলি লাগে। তখন মুহিত বুঝতে পারছেন, যারা গুলি করছে, তারা সবাই আর্মির লোক এবং হত্যাকা- ঘটানোর জন্য এই বাড়িতে আসছে। ডিএসপি নূরুল ইসলাম সাহেব মুহিতকে টেনে অফিসে নিয়ে যান। সেখানে একজন এসবির অফিসারের পায়ের কাছে একটি রিভলবার পড়ে আছে এবং তিনি ভীতসন্ত্রস্ত। ডিএসপি সাহেব মুহিতসহ দুজনকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তখন আর্মির মেজর বজলুল হুদা তাঁদের চুল টেনে ধরে। তার সাথে অস্ত্রধারী আরও আর্মি ছিল। আর্মিরা তাদের সবাইকে গেটের কাছে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে পুলিশের লোক এবং টেলিফোন মিস্ত্রিকেও লাইনে দাঁড় করায়। মুহিতের পাশে একজন এসবির অফিসার ছিল। হঠাৎ একজন আর্মি অফিসার এসে এসবির অফিসারকে গুলি করে। তিনি গুলি খেয়ে পড়ে যান। কয়েকজন আর্মিকে তাদের পাহারায় রেখে বাকিরা ফায়ার করতে করতে বাড়ির দোতলায় যায়। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ এবং সাথে সাথে গুলির শব্দ। মহিলাদের আহাজারি ও আর্তচিৎকার শুনতে পেলেন। এই সময় গোয়ালঘর ও রান্নাঘর থেকে বুড়ি ও রাখাল আজিজকে এনে লাইনে দাঁড় করায়। ওপর থেকে শেখ নাসেরকে নিয়ে আসে। নাসের বলেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না, ব্যবসাবাণিজ্য করে খাই।’ তখন একজন আর্মি বলল, ‘শেখ মুজিব বেটার দেন নাসের।’ যে অস্ত্রধারী আর্মির লোকটি তাঁকে নিয়ে এসেছিল, সে নাসের সাহেবকে একটি রুমে নিয়ে বসতে বলেন। শেখ নাসের যে রুমে বসেন, সেই রুমের বাথরুমে নিয়ে তাঁকে গুলি করে। এই সময় নাসের সাহেব পানি পানি বলে চিৎকার করেন। তখন একজন আর্মির লোক অন্য একজন আর্মির লোককে বলে, ‘যা, পানি দিয়ে আস।’ সে সেখানে যায় এবং পানির পরিবর্তে আবারও গুলি করে। এর মধ্যে শিশু রাসেল ও রমাকে লাইনের নিকট নিয়ে আসে। রাসেল মুহিতকে জড়াইয়া বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ মুহিত রাসেলকে বলেন, ‘তারা তোমাকে মারবে না।’ এ সময় খাকি পোশাকধারী একজন লোক রাসেলকে তাঁর কাছ থেকে জোর করে নিয়ে যায়। রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চায়। মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা প্রলোভনে ভেতরে নিয়ে যায়। তারপর মুহিত ভেতরে গুলির শব্দ শুনতে পান। এই সময় মেজর বজলুল হুদা গেটের কাছে মেজর ফারুককে কী যেন জিজ্ঞেস করে। বজলুল হুদা বলে, ‘অল আর ফিনিশড।’ মুহিত ও অন্যরা তখন গেটের পাশে লাইনে দাঁড়ানো ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে রাস্তা দিয়ে ট্যাংক যাওয়া আসা করছিল। ট্যাংকের ওপর কালো পোশাকধারী আর্মির লোক। সকাল ৮টার দিকে কর্নেল জামিল সাহেবের মৃতদেহ গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে নিয়ে আসে। এই সময় মেজর ডালিমকে খাকি পোশাক পরা অবস্থায় বাদী ঘটনাস্থলে দেখেন। মেজর ডালিমকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আর্মিদের সাথে কথা বলতে দেখেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, শেখ নাসের, এসবির অফিসারকে হত্যা করার সময় বাদী মুহিতুল ইসলাম আসামি মেজর ফারুক, মেজর বজলুল হুদা, মেজর নূর চৌধুরী, মেজর ডালিমকে চিনতে পারেন। তা ছাড়া ঘটনার পর লোকমুখে দেশি-বিদেশি সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনে এ সংক্রান্ত লিখিত বইয়ের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, আসামি খন্দকার মোশতাক আহম্মদ, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, মেজর রশিদ, মেজর ফারুক, মেজর শাহরিয়ার, মেজর আজিজ পাশা, মেজর শারফুল হোসেন, মেজর রাশেদ, মেজর মহিউদ্দীন, ক্যাপ্টেন কিশমত, রিসালদার মোসলেম উদ্দীনসহ সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ বাহিনীর সদস্য, সেনাবাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের কিছু সদস্য ও উচ্চাভিলাষী কিছু রাজনৈতিক নেতার সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে। বাদীর এই অভিযোগ থানায় প্রাপ্ত হয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সফিউল্লাহ মামলা রুজু করেন। মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করার আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক মামলার তদন্তভার মৌখিকভাবে সিআইডির ওপর অর্পণ করা হয় এবং সেই মোতাবেক মামলার তদন্ত সিআইডির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আমাকে তদন্তভার দেওয়া হয়। সেই মোতাবেক আমি ১৯৯৬ সালের ৩ অক্টোবর মামলার তদন্তভার গ্রহণপূর্বক একই দিন সকাল ১০টায় সরেজমিনের তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই এবং বাদীর দেখানো মতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। (চলবে)

অতিরিক্ত ডিআইজি (অব)।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x