ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

জুরির মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করার পদ্ধতি

প্রাচীন ও মধ্যযুগের সত্য নিরূপণের উপরিউক্ত পরীক্ষাগুলো যত অবৈজ্ঞানিক বা অমানবিকই হোক না কেন আধুনিক বিচার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এসবই মানুষের কাছে ছিল বিকল্পহীন। কিন্তু সভ্য জগতে মানুষ সত্য নিরূপণের জন্য নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রচেষ্টা অব্যহত রাখল। এক সময় বিচারকালীন অভিযোগের সত্যতা নিরূপণের জন্য পাশ্চাত্যে জুরি ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। সন্দিগ্ধ/অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি বোর্ডের, সামনে উপস্থিত হতে অপরাধ সম্পর্কে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করত। একই সাথে অভিযোগ আনয়নকারী ও তার পক্ষের লোকজন অপরাধীর অপরাধ প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করত। সেই প্রাচীন জুরি পদ্ধতি এখনও নানারূপে বিদ্যমান। পূর্বের বা প্রাচীন ব্যবস্থার উপর এখন কেবল আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোতে প্রচলন না থাকলেও ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশেই উচ্চস্তরের কিছু বিচার ছাড়া প্রায় সকল ধরনের বিচারকাজে জুরি প্রথা আধুনিক বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নির্যাতনের মাধ্যমে অপরাধ উদঘাটন

সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে নির্যাতন করে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় তথা অপরাধ উদঘাটনের চেষ্টা অতি প্রাচীন হলেও আধুনিক সমাজ এ পদ্ধতি থেকে এখনও বের হয়ে আসতে পারেনি। তবে মজার বিষয় হল, পৃথিবীর কোন দেশেই সত্য উদ্ঘাটনের জন্য নির্যাতনকে বৈধ বলা হয়নি। বরং আইনের মাধ্যমে নির্যাতনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও পৃথিবীর অনেক সমাজে সন্দিগ্ধকে নির্যাতন এখনও নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে নির্যাতন নিষিদ্ধ বিধায় নিজেদের অধিকারভুক্ত কিউবান সার্বভৌমত্বের দ্বীপ গুয়ানতানামোতে ধৃত আলকায়েদা সন্দিগ্ধদের অমানসিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পরিচালনা করেছে।

নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসের এক পর্যায়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হয় তৃতীয় মাত্রার জিজ্ঞসাবাদ। যদিও তৃতীয়মাত্রা বলতে গ্রেফতার এবং এর পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদকেই বোঝান হত, তথাপিও কালক্রমে তৃতীয় মাত্রা বলতে সন্দিগ্ধকে নির্যাতন বা প্রচ- কষ্ট দিয়ে তথ্য আদায়কেই বোঝান হয়।

পুলিশি তদন্তের পূর্বেকার ইউরোপে ডাইনি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দুইটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হত। সন্দিগ্ধের শরীরে শয়তানের চিহ্ন বা ডেভিল’স মার্কস এবং সন্দিগ্ধের মুখ থেকে স্বীকার করা যে সে ডাইনি। এই উভয় পদ্ধতিই ইউরোপের ইতিহাসে ইনকুইজিশন নামে পরিচিত হয়। ডাইনী দমনের ইউরোপীয় অন্ধ প্রচেষ্টা এখনও হৃদয়বান পাঠক-গবেষকদের আতঙ্কিত করে।

মোজোর দোলনা – সত্যানুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা

প্রাচীন অবৈজ্ঞানিক বা আধা-বৈজ্ঞানিক সত্য নিরূপণ ব্যবস্থাগুলোর বিপরীতে কিছু কিছু বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাও পরিচালিত হত। ইটালিয়ান মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক এনজেলো মোজো কর্তৃক আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক দোলনা তথা মোজোর দোলনা ছিল এমনি একটি প্রাথমিক ও সরল উদ্যোগ। মোজো মানুষের হৃদ স্পন্দন ও রেচন প্রক্রিয়ার সাথে অপরাধীর মিথ্যা বলার একটি নিবিড় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, কোন অপরাধী বা অভিযুক্ত যখন মিথ্যা বলে তখন সত্য উঘাটন তথা ধরা পড়ার ভয়ে তার হৃদযন্ত্রের কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। তার মগজে হাঠাৎ করে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হয় এবং শরীরের ঘর্মগ্রন্থি থেকে অতিমাত্রায় ঘাম নিঃসরিত হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে কোন আনুভূমিক দোলনায় লম্বা করে শোয়ানো হলে তার শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং তার মাথার দিকটি অবনত বা দাঁড়ি পাল্লার পরিমাপে নিচের দিকে হেলে পড়বে। মোজো তার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিজস্ব গবেষণাগারে কিছু কিছু অনুশীলন করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে কোন দিন তা ব্যবহার করেননি। তাই সত্য নিরূপণে তার দোলনা পদ্ধতি কেবল তত্ত্বের খাতাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, মোজোর দোলনা তত্ত্বের অনেক বিষয় পরবর্তীতে পলিগ্রাফ বা লাইডিটেকটর যন্ত্রের কর্মপদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয়েছে।

সিজার লোমব্রোসোর জাত-অপরাধী

সিজার লোমব্রসো নামের ইটালিয়ান আর্মির এক ডাক্তার অপরাধীদের শরীরবৃত্তীয় গঠন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। তিনি মানুষের শারীরিক গঠনের মধ্যেই অপরাধীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় বলে মনে করতেন। তার মধ্যে অপরাধীগণ জন্ম থেকেই অপরাধী। তাদের শারীরিক বিকৃতি দেখেই শনাক্ত করা যায়। তার মতে, বিবর্তনের ধারায় কোন কোন মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ সঠিকভাবে বিবর্তিত হয় না। অর্থাৎ এসব ব্যক্তি আদিম মানুষের স্তরেই থেকে যায়। এসব ব্যক্তির নাম তিনি দিয়েছেন অ্যাটাভিস্ট। অ্যাটাভিস্টদের শরীরে বিশেষ কিছু চিহ্ন বা অসংগতি থাকে যেগুলো দেখে তাদের স্বাভাবিক বা নন-ক্রিমিনাল ব্যক্তিদের থেকে সহজেই পৃথক করা যায়। লোমব্রোসো স্বাভাবিক মানুষের সাথে অস্বাভাবিক বা অপরাধী মানুষের শারীরিক গঠনের পার্থক্যগুলোর দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছিলেন। যেমন, অপরাধীর হাতে বা পায়ে পাঁচটির বেশি আঙ্গুল থাকবে, তার দেহের প্রতিসাম্য রক্ষিত হবে না ইত্যাদি।

যদিও অপরাধী বা সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে লোমব্রোসোই ছিল আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনাকারী তথাপিও তার অপরাধী শনাক্তকরণ পদ্ধতি রীতিমত অবৈজ্ঞানিক বলে বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়েছে।

গ্যলভানোমিটার

লুইজি গ্যালভানি প্রথম প্রাণিদেহের উপর বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন। পরীক্ষাগারে একটি ব্যাঙ ব্যবচ্ছেদের সময় তা হঠাৎ করে নড়ে ওঠে। এ থেকে গ্যালভানি মনে করেন যে প্রাণিদেহে বিদ্যুতের অস্তিত্ব রয়েছে। গ্যালভানির এ ধারণা ভুল হলেও প্রাণিদেহের উপর বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রতিক্রিয়া ছিল সঠিক। গ্যালভানির ধারণা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেড বিদ্যুৎ প্রবাহ ও চৌম্বকীর, ক্রিয়ার পারস্পরিক কার্যকরণের সম্পর্ক আবিষ্কার করেন।

গ্রালভানো মিটার মানুষের শরীরে প্রবাহিত বিদ্যুৎ প্রবাহের শক্তি বা তীব্রতা পরিমাপ করতে পারে। ১৮২০ সালে আন্দ্রে আম্পেরে নামের এক বিজ্ঞানী এ যন্ত্র আবিষ্কার করনে। ১৮৯৭ সালে হ্যারোল স্টিকার প্রস্তাব করেন যে গ্যালভানো মিটার ব্যবহার করে সন্দিগ্ধের সত্যবাদিতা বা প্রবঞ্চনা শনাক্ত করা যায় স্টিকার পরীক্ষা করেন যে মানুষের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরের চমড়ার ঘর্মগ্রন্থি থেকে নিসৃত ঘামের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।

এই পরিবর্তন গ্যালভানোমিটারের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। গ্যালভানো মিটারের সাহায্যে পরিমাপকৃত সাড়াকে গ্যালভানিক একিন রেসপন্স বা জিএসআর বলা হয়। স্টিকার আরো প্রস্তাব করেন যে সন্দিগ্ধকে প্রাসঙ্গিক ছবি প্রদর্শন এবং প্রশ্ন করার সাথে সাথে তার শরীরে গ্যালভানোমিটার স্থাপন করলে তার আবেগগত যে পরিবর্তন হবে সেটা শরীর বৃত্তীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব।

প্রবঞ্চনা বা মিথ্যা বলার সাথে যে শারীরিক পরিবর্তন হয় তা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের মাধ্যমে পরিমাপ করার প্রথম ধারণা দেন হাভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হুগো মুসটেনবার্গ। হুগো মনে করতেন যে বিচারের ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্যদান বিচার ব্যবস্থার বিশুদ্ধতাকে নষ্ট করছে। অন দি ইউটনেস স্ট্যান্ড নামে লিখিত একটি বইয়ে সাক্ষ্যদান কালে একজন সাক্ষির চেহারা তথা শরীরবৃত্তীয় যে সব পরিবর্তন আসতে পারে এবং সেগুলো কিভাবে পরিমাপ করা যাবে। তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েদিলেন। তিনি নিম্নলিখিত শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিমাপের কথা বলেছিলেন পেশী সংকোচন, চোখের সঞ্চালন, শ^াস-প্রশ্বাসের পরিবর্তন, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া এবং চামড়ার ওপর বিদ্যুৎ প্রবাহের ক্রিয়া অর্থাৎ ইলেকট্রোথার্মাল একটিভিটি হুগোর পুস্তক প্রকাশের পরে তার প্রস্তাবিত শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সন্দিগ্ধের জবানবন্দির সত্যতা নিরুপনের জন্য নানাবিধ নিরীক্ষা চলতে থাকে।

লাই ডিটেকটর বা পলিগ্রাফি

ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত ও সাড়া জাগানো ঘটনা হল পলিগ্রাফি বা মিথ্যা নিরুপক এ পদ্ধতির ব্যবহার বিংশ শতকের গোড়ার দিকে এ পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়ে তা ১৯৪৪ সালে ফেডারেল ইমপ্লোয়ি প্রটেকশন অ্যাক্ট পাশ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চলে। লাই ডিটেক্টর বা পলিগ্রাফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোকে এমন সাড়া ফেলে যা রীতিমত রূপকথার জন্ম দিতে থাকে। কিন্তু কালক্রমে লাই ডিটেক্টর একটি আধা বৈজ্ঞানিক তদন্ত কৌশল হিসেবে এখনও অনেক দেশে টিকে আছে। পলিগ্রাফী প্রবর্তনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯১৫ সালে উইলিয়াম মোল্টন মাসর্টন নামের একজন মনোবিজ্ঞান ও আইনজীবী তার মক্কেলদের বর্ণনার সত্যতা যাচাই করার সময় তাদের হাতে ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র লাগিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। একই সাথে তিনি স্টেথেসকোপ যন্ত্র ও চালু রাখেন। প্রশ্ন করাকালীন মক্কেলের রক্তচাপ ও শ্বাস প্রশ্বাসের পরিবর্তন পরীক্ষা করে তিনি সত্য মিথ্যা নিবারণের চেষ্টা অব্যহত রাখেন।

বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে জানাজানি হলে ক্যার্লিফোনিয়া অংগ রাজ্যের বার্কলে নগর পুলিশ কমিশনার এত উৎসাহিত হন। তিনিই ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশিং জগতের প্রথম বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার

পথিকৃৎ। তিনি তার সংস্থার কর্মরত মনোবিজ্ঞানী জন লার্সনকে এই বায়না কাজে লাগিয়ে যন্ত্র তৈরির তাগিদ দিলে লার্সন ১৯২১ সালে একটি অতি সরল যন্ত্র তৈরি করেন যা জিজ্ঞাসাবাদ কালে সন্দিগ্ধের রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও শরীরের ঘর্ম নিঃস্বরণ রেকর্ড করতে পারত। এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম লাই ডিটেকটর। এরপর ১৯৩০ এর দশকে লিউনার্ড কিলার লার্সনের যন্ত্রের সাথে একটি গ্যালভানোমিটার প্রশ্ন করাকালীন সন্দিগ্ধের শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রতিরোধ পরিমাপ করতে পারে।

১৯৪৫ সালে শিকাগো পুলিশের সায়েন্টিফিক ক্রাইম ডিটেকশন ল্যাবরেটরির পরিচালক জনই রিড লার্সো-কিলার পলিগ্রাফের সাথে একটি বাড়তি অংশ যোগ করেন যা সন্দিগ্ধের প্রশ্নোত্তরকালীন পেশীর কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন রেকর্ড করতে পারত। সর্বশেষ ক্লিভ বাকস্টার নামে আর একজন বিজ্ঞানী পলিগ্রাফ যন্ত্রের রিডিং বা ফলাফল সংখ্যা সূচকে প্রকাশের পদ্ধতি চালু করেন। ১৯৮০ এর দশকে কম্পিউটারের ব্যবহার সুলভ হলে লাই ডিটেকটরেও কম্পিউটারাইজেশন ঘটে। পলিগ্রাফ পরীক্ষা অত্যন্ত জটিল পদ্ধতিতে চলে। এখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পলিগ্রাফারের প্রয়োজন পড়ে।

পলিগ্রাফ পরীক্ষা তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়। পরীক্ষা পূর্বস্তরে সন্দিগ্ধকে পরীক্ষার যাবতীয় নিয়মাবলী বুঝিয়ে দেয়ার সাথে সাথে পলিগ্রাফার যন্ত্রের নির্ভুলতা সম্পর্কে তার শক্ত অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি নিজেকে পুলিশ বিভাগের সাথে সম্পর্কহীন একজন টেকনিশিয়ান বলে দাবী করেন। তিনি সন্দিগ্ধকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তার কোন ভয় নেই। তিনি সত্য কথা বলবেন। আর মিথ্যা বললে এই যন্ত্র তা সঠিকভাবেই শনাক্ত করবে।

এরপর সন্দিগ্ধকে তিনি যন্ত্রের সাথে স্থাপন করবেন। পলিগ্রাফ যন্ত্রের তিনটি অংশ থাকে যথা- নিউমোগ্রাফ, সাইকোগ্যালভানোমিটির ও কার্ডিওসাইমোগ্রাফ। এসবই একটি বিদ্যুৎ পরিচালিত কলম ও চলমান চার্টের সাথে সংযুক্ত থাকে যেগুলো প্রশ্নোত্তরকালে সন্দিগ্ধ এর শরীরের নানা ধরনের পরিবর্তন রেকর্ড করতে পারে। শ্বাস কষ্টকে মেশিনে সংযুক্ত করার সময় তার পেটের উপর দিয়ে একটি ও বুকের উপর দিয়ে অন্য একটি বরাবরে বেল্ট বা পাইপ জড়ানো হয়। রক্তচাপ পরিমাপের জন্য দুই হাতের বাহুতে প্রেসার কাপ লাগানো হয়। আঙ্গুলের ডগায় দেয়া হয় বিদ্যুৎ পরিবাহি ধাতব তার। এ সব কিছুই সন্দিগ্ধ ব্যক্তির স্বয়ংক্রিয় স্নায়ু ব্যবস্থার পরিবর্তন পরিমাপ করে। রক্তচাপের পরিবর্তন, শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীরতা ও মাত্রা, নাড়ির স্পন্দন হার ও তীব্রতা, ত্বকের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা, শরীরের তাপমাত্র এবং হাতের তালুতে যন্ত্রের পরিমান ইত্যাদি সব কিছুই একটি লাই ডিটেকটর বা পলিগ্রাফিতে পরিমাপ বা তুলনা করা হয়।

পরীক্ষা চলাকালীন পলিগ্রাফার সন্ধিগ্ধকে তিন ধরনের প্রশ্ন করে সেগুলোর উত্তরকালীন সন্দিগ্ধের পরিবর্তন লক্ষ করেন। প্রথমে থাকে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এগুলোর সাথে অপরাধের কোন সম্পর্ক নেই এবং এগুলোর উত্তর অবশ্যই সঠিক হবে অর্থাৎ সন্দিগ্ধ অবশ্যই সত্য কথা বলবে। যেমন আজ কি শনিবার? দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন হল প্রাসঙ্গিক যা আলোচিত অপরাধ কর্মের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর এরই সন্দিগ্ধ সত্য বা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করবে যেমন- আপনি কি সোলায়মান কে খুন করেছিলেন। তৃতীয় শ্রেণির প্রশ্নকে বলা হয় নিয়ন্ত্রিত প্রশ্ন। এসব প্রশ্নে সন্দিগ্ধ কোনো সাধারণ সত্যকে অস্বীকার তথা মিথ্যা বলার সুযোগ বেআইনি কাজ করছিলেন?

লাই ডিটেকটর যন্ত্র বা পলিগ্রাফির তাত্ত্বিক ধারণা হল যে মানুষ সাধারণত সত্য কথা বলে। মিথ্যা বলা কষ্টকর। তাই সত্য বলার ক্ষেত্রে তাদের শরীরের সকল অঙ্গের কর্ম প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু যখন কেউ মিথ্যা বলা শুরু করবে তখনই তার ভিতর উদ্বেগের সৃষ্টি হবে। যা হৃদস্পন্দন ত্বকের ঘর্ম নিঃস্বরণ ইত্যাদির মাত্রা বৃদ্ধি করবে।

পরীক্ষা চলাকালে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তরে যদি সন্দিগ্ধের উত্তেজনা বা উদ্বেগের মাত্রা অপ্রাসঙ্গিক ও নিয়ন্ত্রিত প্রশ্নের উদ্বেগের মাত্রার চেয়ে বেশি হয় তবে ধরে নেয়া হবে সন্দিগ্ধ মিথ্যা কথা বলেছে। অন্যদিকে অপ্রাসঙ্গিক ও নিয়ন্ত্রিত প্রশ্নের ক্ষেত্রে সন্দিগ্ধেরে উদ্বেগমাত্রা প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মাত্রার চেয়ে বেশি হলে ধরে নেয়া হবে সন্দিগ্ধ সত্যবাদী অর্থাৎ সে পলিগ্রাফি টেস্টে উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে উভয় দিকে উদ্বেগের মাত্রা যদি সমান সমান থাকে তবে পরীক্ষার ফলাফল আনির্দিষ্ট বা ইনকনক্লুসিভ বলা হবে।

পলিগ্রাফি টেস্টের ব্যাপক ব্যবহার এবং বাঘা বাঘা মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, পুলিশ অফিসার ও তদন্তকারীদের এর পক্ষে সাফাই দেখে মনে হবে আধুনিক তদন্ত ক্ষেত্রে এর অবদান অত্যন্ত ব্যাপক। কোন কোন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং অনেক পুলিশ অফিসার দাবি করেন যে পলিগ্রাফি টেস্টের সাফল্যের হার ৯৫-৯৯% তবে কিছু কিছু পরিমিত গবেষণায় এই হার ৬০-৭৫% বলে উল্লেখ করা হয়েছে যার গড় করলে এই হার কম বেশি ৫০% হয়। অর্থাৎ পলিগ্রাফ পরীক্ষার একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে শনাক্ত করার হার শতকরা ৫০। এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল চাকরিতে প্রবেশ করা চাকরিতে অব্যাহত থাকা, সশস্ত্র বাহিনীতে রিক্রুটমেন্ট ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই পলিগ্রাফি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ছিল। কিন্তু আমেরিকার ন্যাশনাল রিসার্স কাউন্সিলের গবেষণায় এ পরীক্ষার অসারতা প্রমাণিত হয়। এর বিপক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে পলিগ্রাফি টেস্টের বিরুদ্ধে আইন পাশ হয়। ১৯৮৮ সালে ফেডারেল সরকারও আইন পাশ করে।

ট্রুথ সিরাম

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে গাইনি চিকিৎসকগণ প্রসূতির বেদনা দূর করে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে কিছু ব্যথানাশক ও চেতনালোপকারী ঔষধ ব্যবহার করতেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বেলেডোনা গোত্রের ঔষধ স্কোপোলামিন। স্কোপোলামিন ব্যবহারকারীদের অন্যতম ছিলেন মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডাঃ রবার্ট হাউস।

ডা. হাউস লক্ষ করলেন স্কোপোলামিন কিংবা ক্লোরোফরম প্রয়োগ করা হলে প্রসূতির নিদ্রা ও চেতনার মাঝামাঝি অবস্থার মধ্যে পড়ে যাকে বলা হয় টোয়াইলাইট স্লিপ বা গোধূলীর তন্দ্রা। এর ফলে তারা একটা সম্মোহিত অবস্থায় পড়েন যখন একান্ত গোপনীয় বিষয়গুলো অন্যের সামনে প্রকাশ করতে কুন্ঠিতবোধ করেন। এসময় তার কোনো তথ্য গোপন রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে ওষুধের ক্রিয়া শেষ হলে তারা ঐ সম্মোহিত বা নিদ্রা-সমীক্ষণের কথা ভুলে যায়।

বিষয়টি ডা. হাউস পরবর্তীতে অপরাধী জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা শুরু করেন। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত প্রথম নিবন্ধের পর থেকে বিষয়টি পুলিশ ও বিচারিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে। ডা. রবার্ট হাউস তার সিরামের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য কয়েকশ নিরীক্ষা পরিচালনা করেন। আমেরিকার চিকিৎসকরা পুলিশের পরীক্ষাগারেও এর ব্যবহার নিয়ে নিরীক্ষা চালান। এসময় গোটা মার্কিন মুল্লুকেই ট্রুথ সিরামের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছিল। ফৌজদারি জিজ্ঞাসাবাদের সাথে জড়িত বিশেষজ্ঞরা ট্রুথ সিয়ামের পক্ষে নিরন্তর ওকালতি করলেও এর ব্যবহার সন্দিগ্ধের জন্য নিরাপদ ছিল না। সন্দিগ্ধের শরীরে সিরাম প্রবেশ করিয়ে সন্দিগ্ধ নিদ্রা-জাগরণের সন্ধিক্ষণে পৌঁছিলে জিজ্ঞাসাবাদকারীগণ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এতে সন্দিগ্ধ যা বলত সেটা তার সচেতনমূলক স্বীকারোক্তি হতে পারে না বলে সন্দিগ্ধের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে ১৯৬৩ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রুথ সিয়ামের ব্যবহারকে অসাংবিধানিক ও জবরদস্তিমূলক বলে রায় দেন।

কন্ঠস্বর বিশ্লেষণ

কথা বলার সময় মানুষের কন্ঠস্বরের উঠানামা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে অপরাধী সনাক্ত করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে। লে. কর্নেল এলান বেল নামে একজন সেনা গোয়েন্দা অফিসার এবং লে. কর্নেল চার্লস ম্যাক কুইস্টন নামের একজন পলিগ্রফার ১৯৬০ এর দশকে মানুষের কন্ঠস্বর শনাক্ত করার একটি যন্ত্রের নকশা তৈরি করেন যার নাম দেয়া হয় সাইকোলোজিক্যাল ষ্ট্রেস ইভ্যালুরেটর বা সংক্ষেপে পিএসই। ১৯৮০ এর দশকে এ যন্ত্রের একটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সংস্করণ বের করা হয় যার নাম দেয়া হয় কমপিউটার ভয়েস স্ট্রেস অ্যানালাইজার বা সংক্ষেপে সিভিএসআর। একটি নোটবুক কম্পিউটারের সাথে একটি মাইক্রোফোন যোগ করে এটা তৈরি করা হয়। প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর ট্রুথ ভেরিফিকেশন’ সিভিএসআর যন্ত্রের কর্মপদ্ধতির উপর তারা একটি ম্যানুয়েলও তৈরি করে। সিভিএসআর এর কর্মকৌশল তত্ত্বে বলা হয়, যে মানুষের কন্ঠস্বরে মাইক্রোট্রেমোর নামের অশ্লাব্য এক প্রকার কম্পন তৈরি হয় যা সত্যবাদী ও মিথ্যাবিাদী মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন গ্রাফ তৈরি করে এই যন্ত্র কম্পিউটার পর্দায় প্রদর্শন করে। সত্যবাদী সন্দিগ্ধের কন্ঠস্বর কম্পিউটারের পর্দায় উঁচু উঁচু শীর্ষ প্রদর্শন করবে। কিন্তু মিথ্যা বলার সময় পর্দায় কেবল সরল মশৃণ দাগ বা লাইন তৈরি হবে।

পলিগ্রাফ বা লাই ডিটেকটর যন্ত্রের কর্মপদ্ধতির অনুরূপ পদ্ধতি সিভিএসআর ব্যবহারের সময় অনুসরণ করা হয়। কোন সন্দিগ্ধ এর পরীক্ষার পূর্বে পরীক্ষার সময় ও পরে সাক্ষাৎকার গ্রহণের যা প্রশ্ন করার রীতি প্রচলিত আছে। সিভিএসআর যন্ত্র প্রস্তুত ও বাজার জাতকরণ সংস্থা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর ট্রুথ ভেরিফিকেশনের মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেড় হাজারেরও বেশি পুলিশ বিভাগে তাদের নির্মিত যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। তাদের মতে এ যন্ত্রের ব্যবহার এতই সহজ যে এর ব্যবহারের জন্য বিশেষজ্ঞের দরকার পড়ে না। পুলিশ বিভাগের যে কোনো অফিসারকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিলেই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে সত্য নিরূপণের জন্য আসামীকে ল্যাবরেটরিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখার দরকারও পড়ে না। সবচেয়ে সুবিধার কথা হল, এটা সন্দিগ্ধের অজ্ঞাতেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে সিভিএসআর যন্ত্রের উদ্ভাবক, বাজারজাতকারী ও ব্যবহারকারীগণ যাই বলুন গবেষণায় এর কার্য়করিতা সন্তোষজনক বলে প্রমাণিত হয়নি।

জবানবন্দি বিশ্লেষণ

আসামির জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার রীতি অতি প্রাচীন। বাইবেলে হযরত সোলায়মান(আ) এর বিজ্ঞতার নানা গল্পেও জবানবন্দি বিশ্লেষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার এক শহরে একই সময় দুই নারী সন্তান প্রসব করে। কিন্তু একজন প্রসব করে মৃত বাচ্চা অন্যজনের বাচ্চাটি ছিল জীবিত। উভয় মা যখন জীবিত বাচ্চাটির মালিকানা দাবী করছিল তখন সোলায়মান বাচ্চাটিকে দুভাগ করে দুই নারীকে দেয়ার নির্দেশ দেন। এতে বাচ্চাটির প্রকৃত মা মিনতি করে বলেন যে বাচ্চাটি তার নয় এটা ঐ মায়ের। তাই এটা যেন তাকে না দিয়ে ঐ মহিলাকেই দেয়া হয়। অন্যদিকে বাচ্চাটিকে দাবী করা অন্য মহিলার কোন বিকৃতি হল না। সে বাচ্চাটিকে দুই ভাগ করার ফয়সালায় বরং খুশিই হল। এবার সোলায়মান বুঝতে পারলেন সেই প্রকৃত মা যে বাচ্চাটিকে হত্যা না করে অন্যকে দেয়ার অনুরোধ করে। কারণ, কোন মাই তার সন্তানের মৃত্যু কামনা করে না।

কিন্তু ঘটনাটি এত সরল ছিল না। যদি দুই মায়ই বলতো যে সন্তানটি তার নয়, অন্যকে দিয়ে দেয়া হোক? তাই সোলায়মান এত সহজভাবে তার ফয়সালা দেননি। তিনি দুই মায়ের জবানবন্দির ভাষার শব্দ ব্যবহার বিশ্লেষণ করেছেন। এক মা দাবী করে বলেছেন, মৃত বাচ্চাটি তার; জীবিত বাচ্চাটি আমার। অন্য মহিলা বারবার বলেছেন, জীবিত বাচ্চাটি আমার, মৃত বাচ্চাটি তোমার। জীবিত ও মৃত বাচ্চার সর্বশেষ স্মৃতি যার কাছে যেমন ছিল সেই অনুসারেই তারা জীবিত ও মৃত শব্দ দুটো বাক্যের শুরুতে বা পরে ব্যবহার করেছে। যে মা দাবী করেছিল যে, জীবিত সন্তানটি তার, কিন্তু মৃত বাচ্চাটি অন্যজনের, সেই মায়ের কাছে কেবল জীবিত সন্তানেরই স্মৃতি ছিল। সে মৃত সন্তানটি দেখেনি। অন্যদিকে অপর মহিলার সন্তান মৃত হওয়ায় তার স্মৃতিতে শেষ পর্যন্ত মৃত সন্তানটির স্মৃতিই জাগরূক ছিল। তাই তিনি ‘মৃত সন্তানটি’ তোমার আর ‘জীবিত সন্তানটি’ আমার বলেছে। এ থেকে বিজ্ঞ সোলায়মান(আঃ) জীবিত সন্তানের প্রকৃত মাকে শনাক্ত করেছিলেন। (মাহবুব তৌফিক:২০১৪)

১৯০২ সালে উইলিয়াম স্টার্ন নামের এক জার্মান মনোবিজ্ঞানী টি ইউটনেস সাইকোলোজি নামে একটি পুস্তক রচনা করেন। এ পুস্তকে স্টার্ন প্রস্তাব করেন কোন ব্যক্তির বিবৃতি বা জবানবন্দি প্রদানের ক্ষমতা তার বুদ্ধিবৃত্তিক বা কগনেটিভ সামর্থ্যে ও জবানবন্দি গ্রহণকারীর গৃহীত পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। পরে এ বিষয়ের উপর র্স্টান বিস্তারিত গবেষণা করেন। তাই তাকে জবানবন্দি বিশ্লেষণ পদ্ধতির জনক বলে অভিহিত করা হয়।

আসামীর লিখিত জবানবন্দি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার সাথে তার জড়িত থাকা, না থাকা সত্যাসত্য নিরূপণের এ পদ্ধতিকে নানা দেশে নানা নামে অভিহিত করা হয়। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে একে বলা হয়, বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ, সংক্ষেপে স্ক্যান। অনেকে এটাকে তদন্ত সংক্রান্ত ভাষা বিশ্লেষণ বা ইনভেস্টিগেটিভ ডিসকোর্স অ্যানালাইসিসও বলে থাকেন।

মানুষের লিখিত জবানবন্দি বা কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা নিরূপণ করার পদ্ধতিটি ১৯৮০ সালের মাঝামাঝিতে চালু করেন ইজরাইলি সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কোড বিশ্লেষক ও পরবর্তীতে বিখ্যাত পলিগ্রাফার আভিনোয়াম সাপির। সাপিরের তত্ত্বানুসারে সন্দিগ্ধরা এমনভাবে সরাসরি মিথ্যা বলা ঝুঁকি নেন না যাতে তার পুরো মিথ্যাটাই ধরা পড়ে। তাই তার উত্তম কৌশল হল, জবানবন্দির মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করা। দ্বিতীয়ত, সত্যবাদী সন্দিগ্ধের কথা বলা, জবানবন্দি দেয়া সব কিছুই মিথ্যাবাদী সন্দিগ্ধ থেকে ভিন্নতর হবে। কারণ মিথ্যাবাদীগণ কল্পনা থেকে কথা বলবেন, জবানবন্দি লিখবেন। কিন্তু সত্যবাদীরা সত্য ঘটনা লিখবেন তাদের স্মৃতি থেকে। এমতাবস্থায়, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা লিখিত জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এমনভাবে সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করতে পারবেন যেখানে ঘটনা জানার প্রয়োজনও হবে না। অর্থাৎ একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জবানবন্দি বিশ্লেষককে পরিচিত অপরিচিত যে কোন ব্যক্তির জবাবন্দী দেয়া হলে তারা তা বিশ্লেণ করে বলতে পারবেন যে এ জবানবন্দির পিছনের মানুষটি সত্যবাদী না মিথ্যুক।

জবানবন্দি বিশ্লেষকরা সাধারণ চারটি দিক বিবেচনা করেন, ১.জবানবন্দিতে ব্যবহৃত পদবিন্যাস, ২. ঘটনা বহির্ভূত তথ্যের অনুপ্রবেশ, ৩. ভাবাবেগ প্রকাশক শব্দের ব্যবহার ও ৪. ঘটনা প্রবাহে বর্ণনার ভারসাম্য।

মিথ্যাবাদী সন্দিগ্ধরা উত্তম পুরুষের ব্যবহার সীমিত রাখে, তারা অতীকালের ব্যবহার এড়িয়ে চলে সব কিছুই বর্তমানে নিয়ে আসবেন। ঘটনার সাথে তাদের দেয়া তথ্যের মিল তো থাকবেই না, বরং এমন কিছু বাড়তি তথ্য এখানে সন্নিবেশ করবেন যার কার্যকরণ রক্ষিত হবে না। সাপিরের মতে একটি জবানবন্দিতে তিনটি অংশ থাকবে, ঘটনার পূর্ব, ঘটনার সময় ও ঘটনার পরবর্তী বর্ণনা। একটি সত্য জবানবন্দিতে ঘটনাপূর্ব, ঘটনা চলাকালীন ও ঘটনার পরবর্তী বর্ণনা যদি সমান সমান হয় তবে সেটাকে সত্য বলা যাবে। কিন্তু মিথ্যাবাদী সন্দিগ্ধরা অবশ্যম্ভাবীরূপে ঘটনা চলাকালীন বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করবে। কারণ ঘটনাকে তার স্মৃতি থেকে নয়, কল্পনা থেকে বর্ণনা করে।

জবানবন্দি বিশ্লেষণে কোনো সন্দিগ্ধকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হলে, তাকে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থাপন করা হবে। জবানবন্দি বিশ্লেষণ পদ্ধতি বর্তমানে বহুল প্রচলিত জিজ্ঞাসাবাদ তথা সত্য উদ্ঘাটন পদ্ধতি যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এমনকি এশিয়ার দেশের পুলিশ বিভাগগুলোও ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছে।

উপসংহার

তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের ইতিহাস মানব সভ্যতার সমান বয়সি। সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ নানা কারণে সত্য উদ্ঘাটনে আত্মনিয়োগ করেছে। কিন্তু সত্য চিরকালই মরীচিকার মতো মানুষের নাগালের বাইরে থাকতে চেয়েছে। তদন্ত জগতের সত্য মানুষের মনজগতে দারুণভাবে নিবদ্ধ। বস্তুর অবস্থান থেকে সত্য সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের মন থেকে সত্য বের করা অত্যন্ত কঠিন। তাই তো প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ সত্য উদ্ঘাটনের বৈজ্ঞানিক উপায় আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। সত্য উদ্ঘাটনে মানুষের প্রচেষ্টা বহুলাংশে সার্থক হলেও এখনও তাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। (সমাপ্ত)

  লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২),

  পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *