ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

আধুনিক পুলিশিং এর যাত্রা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হলেও সত্যানুসন্ধানের ইতিহাস অতি প্রাচীন।লিখিত ইতিহাসের বাইরেও ধর্মীয় উৎসগুলো সত্য উদ্ঘাটনের নানা মাত্রিক ঘটনায় ভরপুর।ঘটনা ও অভিযোগের বর্ণনা থেকে মিথ্যা অংশটুকু আলাদা করে নির্ভেজাল সত্যটুকু খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা খোদ মানব জাতির বয়সের সমান। তবে এক্ষেত্রে মানুষের আদি কৌশলগুলো ছিল কুসংস্কার ও ধর্মীয় রঙে রঞ্জিত।মানুষের মনে ধর্মীয় চেতনা উন্মেষের পূর্বে সত্যানুসন্ধানের রূপ কেমন ছিল তা আমাদের জানা না থাকলেও, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ধর্মীয় উন্মেষের পরবর্তী সত্যানুসন্ধান ছিল পুরোপুরি ধর্মাশ্রয়ী।এ সময় মনে করা হত, সত্য গোপনকারী বা প্রতারক স্রষ্টা বা দেবতা কর্তৃক অভিশপ্ত হবে যা প্রকাশ ঘটবে তার কোনো না কোনো অনিষ্টের মাধ্যমে।তবে এসব প্রাচীন কৌশল বা পদ্ধতির মধ্যে কিছু কিছু মনোবৈজ্ঞানিক বা শরীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান ছিল।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে অদ্যাবধি পৃথিবী নামক গ্রহটির যেমন ভৌত পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটেছে এর ওপর বসবাস করা সৃষ্টি কুলেরও।কিন্তু বাইবেলের যুগ থেকে শুরু করে উত্তরাধুনিক যুগেও মানুষের মৌলিক আচরণ বা প্রেষণার মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বলেই বুদ্ধিমান মানুষের বিশ্বাস।

পৃথিবীর মানুষ কর্তৃক কৃত আদি পাপ বলতে বাইবেলে বর্ণিত অ্যাডাম ও ইভের নিষিদ্ধ ফল ‘গন্ধম’খাওয়ার ঘটনাকে উল্লেখ করেন।কিন্তু এই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পরবর্তী ঘটনায় মানুষের দোষারোপ, পাল্টা দোষারোপ কিংবা নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও প্রকটরূপে দেখা দেয়।

নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পরে প্রথম মানব-মানবী অ্যাডাম ও ইভের অন্তরে জ্ঞানের উন্মেষ হলে তারা বুঝতে পারে যে তারা উলঙ্গ। স্বর্গের উদ্যানে স্র্রষ্টার কণ্ঠ শুনে তারা নিজেদের বৃক্ষের আড়ালে লুকোবার চেষ্টা করেন। স্র্রষ্টা তাদের জিজ্ঞেস করেন, কেন তারা লুকোবার চেষ্টা করছে। তখন তারা উলঙ্গ বলে ¯্রষ্টার সামনে লজ্জার কথা বলে। স্র্রষ্টা জানতে চান, তোমরা কিভাবে বুঝলে যে তোমরা উলঙ্গ? তোমরা নিশ্চয়ই সেই নিষিদ্ধ ফল খেয়েছ। স্র্রষ্টার জেরার মুখে অ্যাডাম বলে ইভই তাকে এ নিষিদ্ধ ফল খেতে উৎসাহিত করেছে।এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে ইভ বলেন, আমার দোষ নেই।একটি দুষ্ট সাপ আমাকে বিভ্রান্ত করে নিষিদ্ধ গাছের কাছে নিয়ে গিয়ে তা খাইয়েছে।বাইবেলের ঘটনার কয়েক হাজার বছর পরেও মানুষের আচরণের সেই দোষারোপ পাল্টা দোষারোপ বা সত্যকে অস্বীকার করার রীতি তথা মানবিক আচরণের কোনে পরিবর্তন ঘটেনি।এখনও দোষী মানুষ নিজেদের নির্দোষ দাবি করে, নিজের দোষ গোপন করে কিংবা নিজেদের দোষ অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু আদিকালের দোষ অস্বীকারের বিপরীতে দোষ বা অপরাধ কর্ম তথা সত্য ঘটনা উদঘাটনের প্রচেষ্টাও আদিকাল থেকে সক্রিয় ছিল।এ সত্য অনুসন্ধানের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে।

দ্বন্দ্ব যুদ্ধের মাধ্যমে সত্যানুসন্ধান

সত্যানুসন্ধান পদ্ধতির আদিমতম রূপটি ছিল সম্ভবত দ্বন্দ্ব যুদ্ধের মাধ্যমে মিথ্যাবাদী চিহ্নিত করা।শিকারের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহের যুগে শিকারের মালিকানা নির্ধারণ ছিল একটি দুরূহ ব্যাপার।কোনো বন্য পশুকে ধাওয়া করে তার ওপর তীর বা বল্লম ছুড়ে তাকে বধ করে দখলে নেওয়াই ছিল মানুষের বেঁচে থাকার উপায় বা একমাত্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু এক সাথে যখন অনেক শিকারী বল্লম বা তীর ছুড়তো তখন শিকারের গায়ে প্রকৃত পক্ষে কার তীরটি লেগেছে সে নিয়ে বিস্তর বাদানুবাদ হতো।প্রত্যেকেই শিকারকে তার নিজের বলে দাবী করত।ঐ সময় যেহেতু আজকের মতো অনুসন্ধান বা তদন্তের কোনো কৌশল মানুষের জানা ছিল না এবং পেশি শক্তিই সম্পদের মালিকানা স্বত্বের ফয়সালা টানত। তাই দ্বন্দ্বযুদ্ধই ছিল মালিকানা নির্ধারণের একমাত্র পদ্ধতি।এক্ষেত্রে সরল ধারণাটি ছিল যে জয় সব সময় সত্যের পক্ষেই থাকে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যেত অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও ধূর্ত ব্যক্তিটিই দ্বন্দ্ব যুদ্ধে জয়লাভ করে।মধ্যযুগে এ ধরনের চিন্তায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও তার ধরন একই থেকে যায়। প্রাচীনকালে মনে করা হত, সত্য সব সময় বিজয়ী হয়।আর ধর্মাশ্রয়ী বিশ্বাসের বা মধ্যযুগে মনে করা হত স্র্রষ্টা সব সময় সত্যের পক্ষে। মধ্যযুগে নাইট উপাধিধারী লর্ডরা প্রায়শই নিজেদের কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতো। যদিও জয় পরাজয় শারীরিক শক্তি, দ্বন্দ্ব-কৌশল কিংবা বিজয়ীর ধূর্ততার ওপর নির্ভর করত, তবুও বিষয়টির ওপর একটি অতিপ্রাকৃত তথা ধর্মীয় আবরণ দেওয়া হত।

শপথের মাধ্যমে সত্যানুসন্ধান

এ পদ্ধতিতে মনে করা হতো যে দেবতা বা স্র্রষ্টা সত্যবাদীকে রক্ষা করবেন।বাইবেলে ডানিয়েলকে সিংহের খাঁচায় ছুড়ে ফেলার গল্প বর্ণিত রয়েছে।একইভাবে রামায়ণে সীতার সতীত্বের পরীক্ষার জন্য রাম তাকে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সত্যবাদী ডানিয়েলকে ক্ষুধার্ত সিংহ স্পর্শ করেনি।তেমনি সতী সীতাকেও অগ্নিদগ্ধ করেনি।শপথের মাধ্যমে সত্যানুসন্ধানের এ জাতীয় কৌশলে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রাবাল্য থাকলেও এগুলোতে কিছু কিছু মনোবৈজ্ঞানিক ও শরীরবৃত্তিক উপাদানও ছিল।

চালের গুঁড়ার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ

এধরনের পরীক্ষা পৃথিবীর অনেক অনেক সমাজেই প্রচলিত ছিল এবং এগুলোর কিছু কিছু রেশ আধুনিক যুগেও লক্ষ করা যায়।এ পদ্ধতির প্রাচীনতম রূপটি দেখা যেত ভারত ও চীনে।খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে চীন দেশে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ অব্দের দিকে এ ধরনের পদ্ধতি প্রচলিত ছিল।এ পদ্ধতিতে সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে শুকনো চালের গুঁড়ো মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর তা মুখ থেকে বের করার আদেশ দেওয়া হত।যদি মুখে নেওয়া চালের গুঁড়া লালায় সিক্ত হয়ে সহজভাবে মুখ থেকে বের করা যেত, তবে ঐ সন্দিগ্ধকে নিরপরাধ বলে ধরে নেওয়া হত।কিন্তু মুখে নেওয়া চালের গুঁড়া যদি লালায় ভিজে না গিয়ে শুকনোই থেকে যেত এবং তা মুখ থেকে বের করা কষ্টকর হত ও মুখে লেগে থাকত, তবে ধরে নেওয়া হত সন্দিগ্ধ অপরাধী।

চীন ও ভারতের এ কৌশল ইউরোপের অন্ধকার যুগে (১১৫০ খ্রি.) আমদানি হয় এবং তা রোমান ক্যাথলিক যাজকরা নিজেদের মতো করে প্রয়োগ করে।যাজক সম্প্রদায়ের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে তাকে শনাক্ত করার জন্য করসনিড (Corsnead) নামের একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

বার্লি থেকে তৈরি এক খণ্ড রুটির সাথে এক খণ্ড পনির একটি বেদির মধ্যে রেখে দেওয়া হত। সন্দিগ্ধকে সামনে রেখে যাজক গুরু কিছু প্রার্থনা পরিচালনা করেন।এরপর সন্দিগ্ধকে পনির ও রুটি খেতে দেওয়া হয়।তারা বিশ্বাস করেন যে মিথ্যুক যাজক রুটি-পনির খাবার সময় ফিরিস্তা জিবরাইল তার গলা টিপে ধরবে এবং অপরাধী রুটি-পনির গিলতে ব্যর্থ হবে। সম্ভবত শরীরের হরমোন নিঃসরণ বা শরীরবৃত্তিক রূপান্তর পর্যবেক্ষণ করে অপরাধী শনাক্ত করার এটাই ছিল প্রথম পদ্ধতি।

গাধার লেজ ছুঁয়ে সত্য উদঘাটন

প্রাচীন কালের কিছু কিছু সত্য নিরূপণকারী পরীক্ষায় মনস্তাত্তি¡ক বিষয় জড়িত থাকত।এমনি ধরনের একটি পরীক্ষা ছিল উত্তর বাংলার রাজমহল অঞ্চলে।খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের দিকে এ ধরনের একটি পরীক্ষায় গাধা ব্যবহার করা হত। পরীক্ষাটি সাধারণত একজন গুরু বা সাধুর আখড়ায় অনুষ্ঠিত হত।সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে একটি ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করান হত।ঘরের, ভিতর একটি গাধা থাকত।সর্বসাধারণের কাছে এই গাধা ছিল পবিত্র।

সন্দিগ্ধকে বল হত যে ঘরের ভিতরে থাকা গাধার লেজ ধরে টান দিতে হবে। যদি এতে গাধা চিৎকার করে ওঠে তাহলে সন্দিগ্ধ অপরাধের সাথে জড়িত বলে মনে করা হবে।গাধার লেজের মধ্যে কুপির কালি মাখানো থাকত।নির্দোষ সন্দিগ্ধরা নির্ভয়ে গাধার লেজ ধরে টান দিত। এতে গাধা চিৎকার করত কিংবা নাও করত। তবে এতে সন্দিগ্ধের হাতের তালুতে কালি লেগে থাকত।

প্রবঞ্চক সন্দিগ্ধরা ঘরের ভিতর প্রবেশ করত। কিন্তু গাধার লেজে হাত দিত না। এতে গাধার চিৎকার করার কোনো কারণ থাকত না। তবে সে যখন ঘর থেকে বের হয়ে আসত তখন তার হাতে কোনো কালি থাকত না।সাধু তার হাত দেখেই চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত যে সেই আসল অপরাধী।

দাঁড়িপাল্লা ভারসাম্য পরীক্ষা

দাঁড়িপাল্লায় সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে চড়িয়ে ভর পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য নিরূপণের অনুশীলন অতি প্রাচীন।খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ শতাব্দী পূর্বে রচিত বিষ্ণুপুরানে এর নিদর্শন পাওয়া যায়।এ পরীক্ষায় সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে একটি দাঁড়িপাল্লার একদিকে বসিয়ে দিয়ে অন্যদিকে কিছু ওজন চাপিয়ে পাল্লার ভারসাম্য রক্ষা করা হত।পাল্লার দাঁড়ির এক অংশে ক্ষুদ্র গর্ত করে কিছু তরল পদার্থ স্থাপন করা হত যাতে ভারসাম্যপূর্ণ পাল্লার সামান্য পরিবর্তনও পরিমাপ করা যায়।

সন্দিগ্ধকে পাল্লায় চড়িয়ে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পর তাকে পাল্লা থেকে নামিয়ে আনা হত।এরপর তাকে একজন বিচারক বা যাজকের সামনে হাজির করা হয়।ধর্মগুরু সন্দিগ্ধের উদ্দেশ্যে সুদীর্ঘ বক্তব্য রাখতেন।অতঃপর সন্দিগ্ধকে আবার দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে দেওয়া হত।এখন ভারসাম্যপূর্ণ পাল্লার পরিমাপে সন্দিগ্ধের শরীরের ওজন যদি কিছুটা হলেও কম হত তবে সন্দিগ্ধকে নির্দোষ ঘোষণা করা হত।

অতি প্রাচীনকালে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিহীন এসব পদ্ধতিকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়।আধুনিক বিজ্ঞান মতে, একজন মানুষের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় প্রতিঘণ্টায় তার শরীরের ১২ গ্রাম ওজন কমতে পারে।পাল্লার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা থেকে সন্দিগ্ধকে নামিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্মগুরু বা বিচারকের উপদেশ বা ঝাড়ফুঁকের মধ্যে রাখা হলে তার ওজন কিছুটা হলেও কমতে পারে যা সূক্ষ্ম দাঁড়িপাল্লায় ধরা পড়তে পারে।

ফুটন্ত পানিতে পরীক্ষা

কেবল প্রাচীন কালেই নয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকেও এ ধরনের পরীক্ষা আফ্রিকার অনেক দেশে প্রচলিত ছিল। ‘এ উইচক্রাফ্ট ইন আফ্রিকা’ নামক প্রবন্ধে লেখক গেটি এ ধরনের একটি পরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছিলেন।একটি কাপড়ের দোকান থেকে কিছু কাপড় হারানো গেলে চোর শনাক্ত করার জন্য বারুটস (Barutse) গোষ্ঠীর মানুষরা ফুটন্ত পানির পরীক্ষা অনুষ্ঠান করে।এ পদ্ধতিতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধী শনাক্ত করার লক্ষে এলাকার নারী পুরুষ এক স্থানে একত্রিত হয়।অদূরে একটি পাত্রে পানি গরম হতে থাকে।এরপর লাইন ধরে ধরে প্রত্যেক সন্দিগ্ধ একে একে হেঁটে গিয়ে ফুটন্ত পানির পাত্রে নির্বিকারভাবে ডান হাত ডুবিয়ে দিতে হয়।এভাবে সকল ব্যক্তির হাত গরম পানিতে ডোবানো হলে ঐ দিনের মতো পরীক্ষা স্থগিত রেখে পরদিন সবাইকে মাঠে উপস্থিত হতে বলা হত।

পরদিন সকালে সন্দিগ্ধদের মাঠে লাইন ধরে দাঁড়াতে বলা হত।তাদের ডান হাত খোলা রাখতে বলা হয়।এরপর প্রত্যেকের হাত পরীক্ষা করা হয়।কোনো ব্যক্তির হাতে ফোসকা পাওয়া গেলে তাকে দোষী সাব্যস্ত হয়। মনে করা হয়, যে নির্দোষ ব্যক্তির হাত কখনো গরম পানিতে পুড়বে না।

শরীর শুকে অপরাধী শনাক্তকরণ

আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে ‘মেডিসিনম্যান’নামের এক শ্রেণির ওঝা বা গণক রয়েছে।তারা মানুষের শরীরের গন্ধ শুকেও অপরাধী শনাক্ত করতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।এই ওঝাকে ঘিরে সন্দিগ্ধদের গোল করে দাঁড় করানো হয়। এরপর গণক একটি গর্ত বা পরিখার মধ্যে প্রবেশ করে।কিছু পরে ওঝা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে গর্ত থেকে বের হয়ে গোল হয়ে দাঁড়ানো সন্দিগ্ধদের যে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শরীর শুকতে থাকত।প্রথম চেষ্টায় ধৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা না হলে ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে ওঝা আবার গর্তের ভিতরে ঢুকে পড়ত।কিছুক্ষণ পর আবার গর্ত থেকে বের হয়ে এসে আর একজন ব্যক্তিকে ধরে তার শরীরের গন্ধ শুকতে থাকত।এভাবে ঐ ওঝা বা গণক কয়েক ঘণ্টা ধরে সন্দিগ্ধদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত একজনকে প্রকৃত অপরাধী বলে ঘোষণা করত।আধুনিক তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের ইতিহাসে এ পদ্ধতি যতই অবৈজ্ঞানিক মনে হোক না কেন ওঝা কর্তৃক শনাক্ত করা ৯৯% ব্যক্তিই পরবর্তীতে তাদের অপরাধ স্বীকার করে নিত।

লাল পানির মাধ্যমে সত্য উদঘাটন

এ ধরনের পরীক্ষা পশ্চিম আফ্রিকায় প্রচলিত ছিল।লাল পানি হল সাসি নামক এক প্রজাতির গাছের বাকল ভেজানো পানি যা অত্যন্ত তিক্ত স্বাদের।এটা পান করলে প্রচণ্ড বমির উদ্রেক হয়। অপরাধী শনাক্তকরণ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় বলে এ গাছকে ‘অর্ডিল ট্রি’ বা ‘দোষ স্বীকারকারী গাছ’নামেও অভিহিত করা হয়।

সাসি পরীক্ষার শুরুর পূর্বে সন্দিগ্ধকে প্রায় ১২ ঘণ্টার মতো উপোস রাখা হত।এরপর তাকে দানা জাতীয় কিছু শস্য যেমন চাল, জব ইত্যাদি খেতে দেওয়া হত।এরপর তাকে প্রচুর পরিমাণে সাসি-বাকল থেকে তৈরি লাল রঙের পানি প্রচুর পরিমাণে পান করানো হত।সন্দিগ্ধ যদি এই পানি পান করার পর বমি করে ইতোপূর্বে খাওয়ানো চাল বা যবের সবটুকু বের করে দিতে পারত, তবে তাকে নির্দোষ বলে বিবেচনা করা হত।আফ্রিকা মহাদেশের বিখ্যাত পরিযাজক লিভিংস্টোন লক্ষ্য করেছিলেন যে আফ্রিকার সন্দিগ্ধদের মধ্যে এই পরীক্ষা দেবার আগ্রহ অত্যন্ত প্রবল।তারা মনে করত যে এই বমি-উদ্রেককারী সাসি-সরবতের সাথে ভিকটিমের আত্মা আসামির হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে এবং যদি সে অভিযুক্তকে নির্দোষ বুঝতে পারে তবে ইতোপূর্বে খাওয়া সকল চাউল পেট থেকে বের করে নিয়ে আসে।

আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে অবশ্য এর বিপরীত বিবেচনাও দৃশ্যমান হত। যদি কোনো অভিযুক্ত এক খণ্ড ‘ওডোম’ কাঠ চিবানোর পর এক কলসি পানি পান করার পরও তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া বা অসুস্থতার চিহ্ন দেখা না যেত তবে সন্দিগ্ধকে দোষী বলে ধরে নেয়া হত।কিন্তু অভিযুক্ত যদি অসুস্থ হয়ে পড়ত তবে তাকে নির্দোষ ধরে নেওয়া হত।এক্ষেত্রে অবশ্য মিথ্যা অভিযোগের দায়ে অভিযোগকারীকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।

(চলবে)

  লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২),

  পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *